একটি সহজবোধ্য ব্যাখ্যা

আষিক

 

জনৈক একটি চলতি হাওয়ার থেকে অনেক দূরের লিটল ম্যাগাজিনে একটি কবিতা পড়লাম। পড়লাম বলাটা ভুল হবে। বলা উচিৎ দেখলাম- মানে ঠিক দেখলাম বলাটাও ঠিক হবে না, বলা উচিৎ কবিতাটা আমাকে দেখল- আর আমি ঠিক মতো দেখতেই পেলাম না। মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া বলে বটে, তবে কবিতাটি মাথার ওপর দিয়ে গেছে না পায়ের নিচ দিয়ে গেছে, নাকি এখনও যায়নি, কিছুই বলা গেল না। বিশ্বাস করুন, ওর মধ্যে একাধিক শব্দ ছিল যেগুলো বাংলায় নয়, ইয়ে, মানে বাংলায় নয়, উর্দুতে নয়, ইংলিশে নয়, গুগল ট্রান্সলেটরে ফেলে দেখলাম গুগল ও ফেল মেরে গেল। তখন আমার মনের মধ্যে একটা সন্দেহ দানা বাঁধল... এমন তো হতেই পারে এই কবিতা গ্রহান্তরের কোনও প্রাণীর লেখা। না, বাংলা তার ভাষা নয়, তবে তার ভাষা বাংলার ভীষণ কাছাকাছি, ওই জন্য পড়তে শুরু করলে মনে হবে যেন বাংলা পড়ছি, কিন্তু কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।


বন্ধুদের ফোন করতে শুরু করলাম। কবিকে তারা চেনে কি না। কী সাংঘাতিক! কয়েকজন বলল বিলক্ষণ চেনে, একজন তো বলল নাকি ওদের পাড়াতেই থাকে। সঙ্গে সঙ্গে আমার "শিবু আর রাক্ষসের কথা" গল্পটা মনে পড়ে গেল। ভাবুন, আমাদেরই মধ্যে, জলজ্যান্ত মানুষ সেজে একটা এলিয়েন একটার পর একটা দুর্বোধ্য কবিতা লিখে যাচ্ছে। আমাদের সঙ্গেই আলোচনা সভায় যাচ্ছে, পাঠচক্রে কবিতা পড়ছে, লিটল ম্যাগ মেলায় লোকজনদের বই গছিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু কাউকে একবারও আসল কথাটা জানাচ্ছে না, যে কেন তার লেখা এতটা ইউনিক। আর মানুষও তেমন, কেউ ভালো বলছে না বুঝে, কেউ নিজের সেরা চেষ্টা করে যা-হোক-একটা মানে খুঁজে ফেলছে আর ভালো বলছে, কেউ খুব বাজে বলে নাক সিঁটকোচ্ছে কিন্তু কারও মাথাতেই এই সাধারণ বুদ্ধিটা খেলছে না- যে এই কবি গ্রহান্তরের প্রাণী।


কবিতা না বুঝতে পারার জন্য মাথার মধ্যে যে বোঁ-বোঁ ব্যাপারটা চলছিল সেটা এখন অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। বরং, আমার এখন সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে অবিশ্বাস্য সব ইমেজারির ভিড়ে। সত্যজিতের প্রোফেসর শঙ্কুর গল্পের দানিকেনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যে তিনবার 'নেভার, নেভার, নেভার' বলে একটা ভয়াল রূপ ধারণ করেছিল। বইমেলায় এরকম ঘটলে তো স্ট্যাম্পেডেই কয়েকশো লোক মারা যাবে! এইসব চিন্তাভাবনায় আমার গা হাত পা অবশ হয়ে এল।


কিন্তু কিছুক্ষণ ঠান্ডা মাথায় ভাববার পর আরেকটা অ্যাঙ্গেল মাথায় এল। করণ জোহরের কাছ থেকে শিখেছি- যে কোনও গল্পের মধ্যেই রোমান্স নিয়ে আসতে হয়। ধরুন, এই এলিয়েনটি হারিয়ে গিয়েছে, আর তার সঙ্গিনীকে খুঁজে পাচ্ছে না। একটার পর একটা লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠিয়ে যাচ্ছে তার নিজস্ব ভাষায়। কেউ কিচ্ছু বুঝছে না, কিন্তু সে জানে, কোনও একদিন তার সঙ্গিনী ঠিক সেই কবিতা পড়েই তাকে চিনে নেবে। প্রতি রাত্রে তন্ন তন্ন করে অনলাইন ফোরামগুলি খুঁজে চলেছে সেই এলিয়েন, চোখ রাখছে সমস্ত পত্রপত্রিকায়, যদি তার সঙ্গিনীও তাদের ভাষায় একটা কবিতা লিখে ফেলে।


চোখে জল চলে এল, একটা গ্রহান্তরের প্রাণীর এই ট্র্যাজিক লাভস্টোরি আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আর মনে মনে ঠিক করলাম, এবার থেকে দুর্বোধ্য কবিদের একটু এড়িয়ে চলব।


[ডিস্ক্লেইমারঃ কোনো বিশেষ জীবিত বা মৃত মানুষ বা এলিয়েন কে উদ্দেশ্য করে এই লেখা লেখা হয় নি]

আপনার মতামত জানান