আজ আমি কোথাও যাবো না...

সামিউল আজিজ সিয়াম

 

কি বলব আপনাকে ?

কিছুই তো বলা হয়নি। এখন আর কি লাভ ! কতবার ভেবেছি শুধু একবার ছুটে যাবো আপনার স্বপ্নের নন্দন কাননে। যেই ছুটে গেছে আপনি কাওকেই ছোট করে দেখেননি, সবার ভালবাসাকেই আপন করে নিয়েছেন। হয়ত আমাকে আর দশটা গুণগ্রাহীর মতই ভাববেন, আপনার গুণগ্রাহীর তালিকার নাম গুলো ভীতিকর ও বটে, তাতে স্থান হবে ভাবাই দুঃসাহস। তারপর ও আমার পৃথিবীতে আমি আপনার আপন একজন। অনেক কাছের একজন। যে আপনার ভেতরের জগত কে চিনেছে, আপনার অনুভূতিগুলো কে চিনেছে, আপনার সত্ত্বা কে কত লক্ষ কোটিবার অনুভব করেছে নিজ সত্ত্বায়। হয়ত এসবের কিছুই বলা হবে না। শুধু একবার বলব আপনাকে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি। আর শুধু একবার ধন্যবাদ বলব, আমাকে জীবন শেখানোর জন্য... জোছনা শেখানোর জন্য, বৃষ্টি শেখানোর জন্য। সাহিত্য শেখানোর জন্য ( আজ যারা অনেক বিশেষণের পসরা সাজিয়ে বসেছে তাদের অনেকের মতেই অসাহিত্য !!)। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক হওয়ার জন্য। আমি যদি এক মুহূর্তের জন্যও হিমু হয়ে থাকি তাহলে আমার পিতা হওয়ার জন্য। হয়ত তার প্রতি টি সৃষ্টির সৌন্দর্য অনুভবের পর যে আবেগ দিয়ে চোখের একেক ফোটা জল এক কিশোরকে আজকের আবেগী তরুনে পরিনত করেছে, জীবনের সৌন্দর্য আর কদর্য একই সাথে বোঝার যে ক্ষমতা দান করেছে, সেগুলোর কথা নাই বা বললাম। শুধু একবার আপনার পায়ের স্পর্শ নিতাম শুধু। খুব বেশি কিছু কি চেয়েছিলাম ? তাও কি দেয়া যেতো না সেই কিশোরকে যে তার ক্ষুদ্র জীবনের অর্ধেকটাই আপনার সৃষ্টির জগতে কাটিয়েছে ?

জানি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তাম, আপনার মনে হতো ছেলেটা শুধু শুধু এত কাদছে কেন।কারন টা শুধু আমারই জানা থাক।কখনও যাওয়া হয়নি, কারন স্বপ্নরাজ্যের স্রষ্টার সামনে খালি হাতে যেতে চাইনি। এক টুকরো স্বপ্ন হলেও নিতে চেয়েছিলাম, জানি এত বড় স্রষ্টার কাছে কত তুচ্ছই না তা হতো, তাও সেটুকুই অনেক মমতায় মড়িয়ে নিয়ে যেতাম। আমার লেখা প্রথম বইটির কপি, জানি তা সাহিত্যের ধারে কাছেও না, তার কাছে তো না ই, তবুও একটা পাতা বইটার অবশ্যই খুব বিশেষ কিছু হতো, হয়ত উপন্যাসের চেয়েও বিশেষ- উৎসর্গ পত্র টি ঃ

আমার মহান শিক্ষক
হুমায়ূন আহমেদ

সবাই হয়ত ভাবত কোন এক চুটকা লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর নামে বই চালাতে চাচ্ছে। তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। হয়ত আপনি ভাবতেন আমি আপনার ছাত্র তো হওয়ার কথা না, শিক্ষক আসল কোথা থেকে। আমি সেই ব্যাখ্যা কাওকেই দিতে চাইনা... কখনও তো দিইনি, এখন কেন দেব ?

আপনার প্রতি আমার কিছু অভিমান ছিল। আপনার অনেক কাছের মানুষ ভেবেছি নিজেকে, সেই দাবিতেই সব অভিমান। তার বদলা কি এভাবে না নিলে হতো না ?

আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করেছে আমার প্রিয় লেখক কে। কখনও শীর্ষেন্দু, কখনও সমরেশ, আপনার নাম বলিনি, অভিমানে। আমি চিৎকার করে সবাইকে বলতে চাই, আমার প্রিয় লেখক শুধু একজন, প্রিয় ? এই সামান্য শব্দ কি সেই আবেগের জন্য যথেষ্ট ? তিনি আমার সত্ত্বার স্রষ্টা - হুমায়ূন আহমেদ !!!

কয়টা দিন কি চোখ বন্ধ করে থাকা যায় ? কারো শোকবার্তা পড়তে চাই না। RIP আর বিদায় এসব দেখতে চাই না, আপনার ছবির সাথে শোকাবহ সঙ্গীত শুনতে চাই না, আলোচনা সভা দেখতে চাই না, এরা কেন উঠে পড়ে লেগেছে আপনি নেই তা প্রমানের জন্য ? সবার ধারণা আপনি চলে গেছেন। এই দিন তো কক্ষনো দেখতে চাইনি ? আপনাকে তো পত্রিকার শিরোনামে এভাবে মানায় না। আমি কারও পোস্ট পড়িনি, কোন প্রতিক্রিয়া দেখাইনি... সবার প্রতিক্রিয়া দিয়ে আমি কি করব ? আমার প্রতিক্রিয়াই তো আমি সামলাতে পারি না। সারা রাত চিৎকার করে কেদেছি হয়ত, দরজা বন্ধ করে, সবার আড়ালে। আপনি নেই এজন্য নয়। এভাবে কেন যাবেন ? কাল তো চাঁদনীপসর ছিল না ! আপনি কেন কথা রাখেন নি ??? এখন আর জোছনা দিয়ে কি হবে ? বৃষ্টি দিয়ে কি হবে ? এরপরও কি কদম ফুটবে ? ফুটতে পারবে ? প্রান কাঁদবে না তার ?

আমি রবীন্দ্রনাথ কে দেখিনি। দেখতে চাইও নি। আমার জন্য হুমায়ূন আহমেদ ই আমার রবীন্দ্রনাথ। তাকেও যে দেখা হল না ! এমন তো কথা ছিল না,... এমন কেন হবে?

আপনাকে কোনও কথাই বলা হল না। আপনার যে লেখাগুলোকে সিনেমার পর্দায় ফেলার অনুমতি আপনার কাছেই চাইতাম, তাও চাওয়া হল না। আমাকে ক্ষমা করুন স্যার। আজ আমার জীবনের কাছে হেরে যাওয়ার দিন। আজ আমার স্বপ্ন হারানোর দিন। আমার সত্ত্বাকে হারানোর দিন। একদিন তো আমিও আসব, আপনি কি আমার কোনও লেখা পড়বেন ? সেই দিনের অপেক্ষায় থাকব, অনন্তকালের সেই অপেক্ষা শুরু হয়ে গেল। অপ্রতিভ রিক্ত এই আমি কোনও কবিতাও লিখতে পারিনি, তবুও আবেগ ভরা এই পত্র টা কি কোনদিন আপনি পড়বেন ? যার প্রতিটা অক্ষর অশ্রু বিন্দু দিয়ে লেখা, সেই চিঠি আপনি অসীমের জগত থেকে হলেও পড়বেন, আমি জানি।

কোন এক জোছনার রাতে আর কেউ আপনাকে ভাবুক আর না ভাবুক, সেই আবেগী কিশোর দুফোটা চোখের জল অবশ্যই ফেলবে। বৃষ্টির কোন সন্ধ্যায় বৃষ্টি বিলাসের সময় আর কেউ দেখুক বা না দেখুক, আমি জানি আপনি সেই কিশোরের চোখের জল আর বৃষ্টির ফোটা আলাদা করতে পারবেন, আপনি তা পারেন আমি জানি।

আপনি অনেকবার অসুস্থ হয়েছেন। আমি কখনও দোয়া করিনি। ১৯ জুলাই রাত ১১ টা ২০ মিনিটেও করিনি। আজও করব না।

একজন হুমায়ূন আহমেদ এর কারো দোয়ার প্রয়োজন নেই ... !!

(লেখাটি হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর ২দিন পরে লেখা)

আপনার মতামত জানান