জাদুকরের কলম

কেয়া মুখোপাধ্যায়

 

‘আচ্ছা শোন, আমার হাতের এই ডাস্টারটার দিকে তাকাও। ডাস্টারটা যদি আমরা ভাঙতে থাকি তাহলে কি পাব?’
‘অণু পাব।’
‘হ্যাঁ,অণু পাব।অণুটা যখন ভাঙব তখন কি পাব?’
‘পরমাণু।’
‘পরমাণু ভাঙলে?’
‘ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন।’
‘এদের যদি ভাঙা যায় তাহলে কি পাব?’
‘জানিনা স্যার।’
আমার ধারণা, ভাঙতে ভাঙতে এক সময় কিছুই নেই। শূন্য। এই জগৎ সংসার, বিশ্বব্রহ্মান্ড, গাছপালা, পর্বত-নদী, সব তৈরি হয়েছে শূন্য দিয়ে- সব কিছুই শূন্যের উপর। শুরুটা হল শূন্যে। যার শুরু শূন্যে তার শেষ কোথায়?
ছাত্ররা ভীত চোখে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। মনসুর সাহেব বললেন- তার শেষও শূন্যে। বিশ্বজগৎ হল আঙটির মত। আঙটির যেখানে শুরু সেখানেই শেষ। ...’

মনে হচ্ছিল ডুবে যাচ্ছি। তবে না ডুবলে তো তল পাওয়া যায় না, তাই ডুবতে চাইছিলাম!হুমায়ূন আহমেদের ‘শূন্য’-তে।
তখন কলেজে। বিকেলবেলা বইমেলায় গেছি। কী কী কিনতে চাই সেই লিস্ট সঙ্গে। বন্ধু টেনে নিয়ে গেল বাংলাদেশের স্টলে বই কিনবে বলে। ‘তুই হুমায়ূন আহমেদ পড়েছিস?’ মাথা নাড়ি, না! ‘সে কি রে, একটাও না?’ সে তখন হুমায়ূন আহমেদে মজে আছে, আমার উত্তরে প্রায় হতবাক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, কি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে এ-বাংলার নতুন সাহিত্যকদের লেখার সঙ্গেওপরিচয় ততদিনেনিবিড় হয়েছে, কিন্তু ওপার-বাংলার সাহিত্যিকদের লেখার সঙ্গে সেভাবে আমার কোন যোগ তৈরি হয়নি তখনো। ‘এটা পড়িস’, বলে আমাকে একটা বই ধরিয়ে দিল। বইমেলা থেকে ফিরে এসে রাতের ঘুমের তোয়াক্কা না করে বইগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াটাই দস্তুর। তার কোনও ব্যতিক্রম হল না। নিজের পছন্দের বইগুলোর একটা টেনে নিলাম। কিন্তু গাঢ় খয়েরি রঙে ইউনিভার্সের ছবিওলা প্রচ্ছদে হলুদ দিয়ে লেখা ‘শূন্য’- হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, আমাকে ঠিক যেন স্বস্তি দিচ্ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ পড়িনি শুনে এমন একটা বিস্ময় ছিল বন্ধুর দৃষ্টিতে, যে শেষ অবধি আর সব বই সরিয়ে রেখে ওই বইটাই টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। আর ডুবতেও শুরু করলাম।
আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান যে চেনা জগৎ আর তার বাইরের অচেনা জগৎ- দুই নিয়েই হুমায়ূন আহমেদের কিছু নিজস্ব ভাবনা ছিল। তাঁর কথায়- ‘মাঝে মাঝে আমার অনিদ্রা রোগ হয়। বাসার সবাই ঘুমিয়ে থাকে আর আমি বারান্দায় বসে সিগারেটের পর সিগারেট টেনে হার্ট আর ফুসফুসের যত রকম ক্ষতি করা সম্ভব ক্ষতি করতে থাকি। আর তখন অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা আসতে থাকে। মনে হতে থাকে- আমাদের এই শরীরের ভেতর আছে আরেকটি শরীর, আমাদের এই জগতের ভেতরে আছে আরেকটা জগৎ। সেই জগৎ সম্পর্কে লিখলে কেমন হয়?’ সেই ভাবনা থেকেই লেখা ‘শূন্য’; ফিবোনাক্কি রাশিমালার রহস্য নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের এ এক আশ্চর্য গল্প। সেই আমার হুমায়ূন আহমেদের গল্পে মুগ্ধতার শুরু।

চব্বিশ বছরের বিজ্ঞানের এক তরুণ ছাত্র প্রথম উপন্যাস লিখেই পাঠকের মন জয় করে নিলেন। সেটা ১৯৭২, আর সেই ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে যে সাড়া জাগানোর সূচনা, তারপর আর তাঁর পিছনে ফিরে তাকাবার অবকাশ হয়নি, প্রয়োজনও হয়নি। সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লিখেছেন আশ্চর্য সব উপন্যাস আর ছোট গল্প, নাটক আর রম্যরচনা, কল্পবিজ্ঞানের গল্প আবার সেই সঙ্গে শিশু-কিশোর সাহিত্যও। ‘নন্দিত নরকে’ থেকে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ থেকে শুরু করে ‘মধ্যাহ্ন’- কি আশ্চর্য জাদুময়সব সৃষ্টি।কি বর্ণিল, গতিময় অথচ সহজিয়া ভাষাবিন্যাস, অভাবনীয় সব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে ঘটানোর কি অপূর্ব কুশলতা, আর অসমান্য সংলাপ। পাঠক কখনো ক্লান্ত হন না বরং তাঁর কাহিনীর শরীরে জড়িয়ে থাকা অনাবিল প্রসন্নতা পাঠকের মনকে আশ্চর্য স্নিগ্ধতায় ভরে দেয়। সেইসঙ্গে তাঁর গল্পের পরতে পরতে মিশে থাকা জীবন কখনোই আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত সমাজ-সত্যের বাইরে ছুটে বেড়ায় না। মধ্যবিত্ত জীবনের আশা-নিরাশা, অনিশ্চয়তা, মূল্যবোধের দোলাচল-প্রবণতা আর অস্তিত্বের সঙ্কটের গল্প বলতে গিয়ে তিনি এমনভাবে প্রবেশ করেছেন পাঠকের অন্তরের গভীরে, যেখানে পাঠক-লেখক দূরত্ব ঘুচে গিয়ে একাত্মতা সৃষ্টি হয়, যেখানে লেখক শুধু আর দূরবর্তী নির্লিপ্ত স্রষ্টা হয়ে থাকেন না। সাধারণ মানুষের জীবন চূর্ণকথায় ছড়িয়ে থাকে তাঁর লেখাজুড়ে।
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় দুই চরিত্র হিমু আর মিসির আলীর কাজকর্ম লজিক আর অ্যান্টি-লজিক নিয়ে। আজকের তরুণরা ‘হিমু’ হতে চায়, ‘মিসির আলী’-র মত করে যুক্তি খোঁজে। তরুণ পাঠকরা যা হতে চান, তার নাম হিমু আর তাঁরা যা হতে পারেন না, তার নামও হিমু। তাঁদের যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভাবনার শুরু আর শেষে হিমু। একসময় বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তরুণেরা তাঁর বই থেকে বই পড়া শিখেছেন, যুবকেরা বৃষ্টি আর জোছনাকে ভালোবাসতে শিখেছেন, তরুণীরা অবলীলায় প্রেমে পড়তে শিখেছেন। এ এক অসামান্য কৃতিত্ব।
এর পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাহিত্যধারাতেও তিনি বৈচিত্রের বর্ণময় উপহার দিয়ে গেছেন। কখনো মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা গল্প, কখনো বিড়াল কি পিঁপড়ের উপাখ্যান, কখনো আজগুবি ভূতের গল্প, অলৌকিক ফ্যান্টাসি আবার কখনো বা শিশুর চোখে দেখা পারিবারিক জীবনের গল্প- সবেতেই অনায়াস তাঁর লেখনীর জাদু।

হুমায়ূন আহমেদেরবইয়ের সংখ্যা তিনশোর বেশি। প্রথম প্রথম সমালোচকরা তাঁকে অকুন্ঠ প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর তাঁদের অনেকে সমালোচনা শুরু করেন। অনেকে বলেন তিনি জনপ্রিয় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু অনেক লিখতে গিয়ে মান ধরে রাখতে পারেননি। আবার কেউ বলেন হুমায়ূন বড় বেশি জনপ্রিয়, তার মানে তাঁর লেখায় গভীরতা নেই; কিংবা হমায়ূন শুধুই গল্প বলেন, দেশ আর সমাজের প্রতি তাঁর কোনও দায়বদ্ধতা নেই। এই প্রসঙ্গে শোনা দুটো ঘটনা বলি। এই প্রবাসে অনেক কিছু খারাপ লাগার মধ্যে খানিকটা ভালো-লাগা নিয়ে আসে দুই বাংলার মানুষদের মিলনে বঙ্গমেলা আর বঙ্গসম্মেলন। এখানে সাহিত্য সেমিনারে দুই বাংলার বিশিষ্ট সাহিত্যিকরা আসেন। ২০০৮ এ কলম্বাসে সাহিত্য সেমিনারে এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার আর অধ্যাপক আনিসুজ্জমান। হুমায়ূন আহমেদেরও আসার কথা ছিল, শেষ অবধি আসতে পারেন নি। বেশি লিখলে লেখার মান পড়ে যায় কিনা এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জমান প্রথম ঘটনাটি বললেন। একবার হুমায়ূন আহমেদ এক অধ্যাপককে একটা গল্প পড়তে দেন তাঁর মতামত জানার জন্যে। অধ্যাপক স্বীকার করলেন গল্পটি মন্দ নয়; তবে তাঁর মতে এতে গভীরতা কম। পান্ডুলিপিটা পকেটে ভরতে ভরতে হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে বলেছিলেনঃ ‘গল্পটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আমি চরিত্রের নাম পাল্টে কপি করে দিয়েছি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় যখন গভীরতার অভাব, তখন আমার লেখা অগভীর হলে আমার দুঃখ নেই।’অধ্যাপনার জীবনের অভিজ্ঞতায় আনিসুজ্জামান দেখেছেন ইংরেজী মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা, বাংলা সাহিত্যে যাদের কোনও আগ্রহ নেই- শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তেই ভালো করে বাংলা শেখার উদ্যোগ নিচ্ছেন। পাঠক সৃষ্টিতে এ এক অসাধারণ সাফল্য। আর একটি ঘটনাজানা গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, হুমায়ূন আহমেদ নিজেও এটি লিখে গেছেন। ঢাকা ক্লাবে একটি বইয়ের মোড়ক খোলা উৎসবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়গিয়েছেন। হুমায়ূনের স্ত্রীকে স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় বললেন হুমায়ূনের কিছু সেরা লেখা বেছে দিতে। শুনতে পেয়ে হুমায়ূন বললেন- ‘বৌদি, আমার ‘অসেরা’ লেখা কিছু নেই। সবই সেরা।’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘হুমায়ূনের সঙ্গে এইখানেই আমার প্রভেদ। আমার কাছে নিজের লেখা সবই মনে হয় খারাপ।’

বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনকে হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে দেখেছেন, সেভাবেই তাকে উপস্থাপিত করেছেন। তিনি যা তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়, তা আমাদের অজানা কিছু নয়। কিন্তু তাঁর দেখার ভঙ্গি আর উপস্থাপনার ভঙ্গিতে এমন এক আশ্চর্য বিশেষত্ব আছে যে আমরা আমাদের চির-চেনা জগৎ আর জানা কথার মধ্যেও নতুনত্ব খুঁজে পাই আর সেই খুঁজে পাওয়া আমাদের আনন্দ আর বিষাদের দোলায় দোলাতে থাকে। আর এই গল্প বলার বিশেষত্বটি যে মান নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই মানে পৌঁছতে অনেকে এক জীবনেও পারবেন না।তাঁর অতি বড় সমালোচকও তাঁর উপন্যাস শুরু করে সমস্তটা না পড়ে রেখে দিতে পারেন না। ‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় পরপর আট বছর তাঁর উপন্যাস ছাপা হয়েছিল; অথচ কলকাতার লেখকদেরও পরপর প্রতি বছর দেশে লেখা ছাপা হত না সেই সময়ে।

‘তখন আমার বয়স মাত্র তেইশ।
আবেগ ও কল্পনায় হৃদয় টইটুম্বুর। বেঁচে থাকাটাই যেনপরম সুখের ব্যাপার। সবকিছুই ভালো লাগে। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় আজকের আকাশটা যেন অন্যদিনের চেয়ে বেশি নীল। গাছের দিকে তাকালে মনে হয় গাছের পাতা এত সবুজ হয় কেন? কারণ ছাড়াই আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে। সারাক্ষণ মনে হয়পৃথিবীতে এত সুখ কেন?
ঠিক তখনই শুরু হল ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন। এরপর একাত্তরের বাঁচা-মরার যুদ্ধ। ভাবুক কল্পনাবিলাসী একটি যুবকের ধরাবাঁধা জীবন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।’
জীবন আর মৃত্যুকে এত ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখাগুলিতে। একদল মুক্তিযোদ্ধার একটা থানা আক্রমণ করতে যাবার এক-রাতের ঘটনা নিয়ে লিখেছেন ‘শ্যামল ছায়া’: ‘হাজী সাহেব চিৎকার করে তার মাকে ডাকতে লাগলেন- ও মাইজি, মাইজি গো। কতকাল আগে এই মহিলা মারা গেছেন। হাজী সাহেব হয়তো তাঁর কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। আজ রাইফেলের কালো নলের সামনে দাঁড়িয়ে আবার তাঁর কথা মনে পড়ল। আল্লাহ্‌র নাম তিনি নিলেন না, এক অখ্যাত গ্রাম্য মহিলাকে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগলেন।’
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর মানুষের জীবনচর্যার গল্প ‘সৌরভ’: ‘স্বাধীনতা একেক জনের কাছে একেক রকম।...মতিউদ্দিন সাহেবের কাছে স্বাধীনতার মনে খুব সম্ভব রাতের বেলায় জানালা খোলা রেখে (এবং বাতি জ্বালিয়ে রেখে) ঘুমানোর অধিকার।’
গভীর ভালোবাসায় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু ছবি ধরতে চেয়েছেন ‘১৯৭১,’ ‘সূর্যের দিন’ ‘আগুনের পরশমণি’-তে। ‘সূর্যের দিন’-এ সোজাসাপ্টা বলেছেনঃ ‘একমাত্র মহাপুরুষদের কাছেই ব্যক্তিগত দুঃখের চেয়েও দেশের দুঃখ বড় হয়ে ওঠে। আমরা মহাপুরুষ না- আমাদের কাছে আমাদের কষ্টটাই বড়।’
যে সাহস নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ ‘হলুদ হিমু কালো র‍্যাব’ লিখেছেন, তা যেমন দুর্লভ, তেমনি বিপজ্জনক; সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা আর দৃঢ় অঙ্গীকার না থাকলে এমন লেখা অসম্ভব।

পরিসংখ্যান দিয়ে সেভাবে কিছু বোঝা যায় না হয়তো। তবু আজ বিকেলে অ্যামাজন(ইউ.এস.এ)- তে ‘হুমায়ূন আহমেদ’ টাইপ করে দেখলাম তাঁর ২৫৩-টি বইয়ের লিস্ট পাওযা গেল। আর তার মধ্যে মাত্র ১টি ছাড়া সবকটি বই-ই অ্যাভেলেবল! বিশ্বের যে কোনও লেখকের কাছে এটা রীতিমত ঈর্ষনীয়!

একজন লেখক কখনও সাহিত্য সমালোচকের মন জয় করার জন্য লেখেন না, লেখেন মনের আনন্দে। যদি পাঠকেরা সে লেখা গ্রহণ করে, সে এক বাড়তি পাওয়া। হুমায়ূন আহমেদের লেখা শুধু যে পাঠকেরা গ্রহণ করছেন তা নয়, তার লেখা কয়েক প্রজন্মের পাঠক তৈরি করেছে। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, কলেজ কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাই মূলত তাঁর পাঠক;এমনভাবে বলা যেন তাঁর সর্বজনগ্রাহিতা নেই। কিন্তু এই তরুণ প্রজন্মের মন জিতে নেওয়া, তাঁদেরআনুগত্য আদায় করে নেওয়াটাই তো সব থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জ! ভিস্যুয়াল-কালচারের মায়া এড়িয়ে ছাপার জগতে যাঁরা পা রাখতে চান না, সেই তরুণদের সঙ্গে যখন হুমায়ূন আহমেদের লেখার আনন্দে-আশ্চর্যে সাক্ষাৎকার হয়, যখন তাঁরা বইমেলাতে প্রিয় বইয়ের খোঁজে হন্যে হন, কি হলুদ পাঞ্জাবিতে হিমু সেজে ঘুরে বেড়ান, তখন বোঝা যায় রসায়নের এই অধ্যাপক কি অনায়াসেতরুণ মনের রসায়নটা ধরতে পেরেছিলেন! এ তো একঅসামান্য অর্জন। দু’বাংলার ক’জন সাহিত্যিক সেটা করতে পেরেছেন?

তিনি লিখেছেন- ‘জোছনা আমার অতি প্রিয় বিষয়। প্রবল জোছনা আমার মধ্যে একধরণের হাহাকার তৈরি করে, সেই হাহাকারের সন্ধান করে জীবন পার করে দিলাম।’ হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন দু’বছর হল। এর মধ্যে অনেকবার বাংলার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে, কদমফুলের রেণু মিশে গেছে বাতাসে, চাঁদের হাসির বাঁধ-ভাঙা জোছনায় ধুয়ে গেছে চরাচর। আর পাঠকদের চেতনা ও মননের পাশাপাশি, এইসব বৃষ্টি, জোছনা আর কদম-রেণুতে নিশ্চিত মিশে থেকেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর সমকালীন পাঠকদের কাছে তিনি বড় আপন তো বটেই; সেই সঙ্গে বৃষ্টি, জোছনা আর কদমফুলকে ভালোবেসে, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যতের পাঠকরাও হয়তো আপন করেনেবেন হুমায়ূন আহমেদকে।ওই ভালোবাসাটুকুর নামই জীবন।

আপনার মতামত জানান