কেন পুনরাধুনিক কবিতার কথা?

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 

গত প্রায় আটটি দশকে বাংলা কবিতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমাদের এখানে অবিশ্যি এটাই সমকালীন প্রথা। সমালোচনার ধারণাটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ নামক বিন্ধ্য পর্বতকে পেরোনোর জন্য ‘আধুনিক’ শব্দটিকে কবিতায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক মানসিকতা নিয়ে প্রয়োগ করা হল! আবু সায়ীদ আইয়ুবের মতো কিছু মানুষ ছাড়া কেউ মুখই খুললেন না! এটা সত্যিই অভাবনীয়! আলোকপ্রাপ্তি ছাড়া আধুনিক হয় না, হতে পারে না।
রবিবাবু যেমন বলেছিলেন আধুনিকের ধারণাটা সময় নিয়ে নয়, সময়ের 'মর্জি' নিয়ে। ওটা সমাজের শরীরের চেয়ে সমষ্টির মনের মধ্যে বেশি খুঁজতে হয়।
আজ আমি কবিতা লিখছি। আপনি লিখছেন। কিন্তু কবিতা লেখাটাই সম্ভবত সব নয়। তাকিয়ে দেখুন, কবিতা লেখার ব্যাপারটা এখন কলমি শাকের চেয়ে ঢের সস্তা হয়ে গেছে। জঞ্জালের এই চিৎকৃত পরিসরে নিজের কবিতাটুকু লেখা, এবং তা ছাপিয়ে চলার মধ্যেই হয়তো একজন কবির দায় ফুরোয় না। বাংলা কবিতার ভারও তাঁর একটু বহন করা কর্তব্য। না হলে তাঁর কবিতাও জঞ্জালের আদল থেকে বেরোতে পারবে না।
১৯৩০-এর দশক থেকে যে কবিতাকে ‘আধুনিক কবিতা’ হিসেবে চালানো হয়েছে, তা ছিল অধুনান্তিক কবিতা। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে... এই চার মহারথীর কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা এমন কোনো কথা বলতে পারি না, যা কবিতার অধুনান্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সমর সেনের ক্ষেত্রে তো এইসব প্রবণতা আরো বেশি। দুটো বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে বসে, একটি ধসে পড়া উপনিবেশের মানুষের পক্ষে আধুনিক চেতনার চেয়ে অধুনান্তিকের মধ্যে প্রবেশ করাই সত্য ছিল, খাঁটি ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ‘অধুনান্তিক’ এই ধারণাটা ছিল না। ব্যতিক্রম ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এক অসামান্য কবি, কিন্তু তাঁকে সুকৌশলে আলোচনার বাইরে বের করে দেওয়া হয়।
বাংলা কবিতার অধুনান্তিক তিনের দশকে শুরু হয়। প্রথম সার্থক অধুনান্তিক দেখা যায় ‘সাতটি তারার তিমির’-এ। কিন্তু সেটাকে আধুনিক হিসেবেই চালিয়ে দেওয়া হয়। অন্য কোনো টার্ম ছিল না। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথকে আড়াল করার দরকার ছিল। আমাদের এখানে অধুনান্তিকের ধারণা বিদেশ থেকে আসে। সেটাকে পোস্টমডার্ণ বলা হয়। অবিশ্যি এই টার্ম বোধের ক্ষেত্রে খুব সুবিধাজনক নয়। ধারণাটা জাঁকিয়ে বসে নয়ের দশকে। তখন কিন্তু সামাজিক যাপনের পরিসরে অধুনান্তিক স্যাচুরেটেড হয়ে গেছে। ‘কবিতা পাক্ষিক’-এর মতো পত্রিকা কবিতার ক্ষেত্রে, এবং ‘হাওয়া ৪৯’-এর মতো পত্রিকা তত্ত্বের ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার সম্মুখীন করেছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম কোনো স্পেসে আমরা লিখছি। লেখালেখির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিসর সচেতনতায় শেষ হতে পেরেছে তার ফলে, ভুল নাম নিয়ে ফুরিয়ে যায়নি।
আজ এই ২০১৪-র কবিতাগ্রামের দিকে তাকিয়ে দেখুন, অধুনান্তিক এখন আমাদের যতখানি গ্রাস করে আছে, তা আগের চেয়ে কম নয়। এর ফলেই আজ বাংলা কবিতায় মুড়ি এবং মিছরির ভেদ করা যাচ্ছে না। বিদিশার ছলে দিশাহীনতায় আমরা আরাম পাচ্ছি। চটুলতার জয়জয়কার। বটতলার বইগুলো আজ মূলধারার বই। প্রকৃত এবং নিষ্ঠ কাব্যগ্রন্থগুলো পাঠক ভিক্ষা করছে। জ্ঞানের বদলে, মেধার বদলে, শ্রমের বদলে... একজন কবি আজ সফলতার পিছনে ছুটছেন নিজের কবিতাকে বিক্রি করে দিয়েই।
এই পরিসর থেকে বেরোতে হলে আমাদের তাকাতে হবে আধুনিকের ধারণার দিকে খোলা চোখে। ১৯ শতকে যেটা ঘটেছিল, আজ সেটা আবার অনিবার্য। আমাদের আলোর কথা ভাবতেই হবে। নিজেদের মধ্যে আবার জাগিয়ে তুলতেই হবে শ্রদ্ধাবোধ। জীবনটাকে মুথাঘাসের জমির মতো অনাবাদি সবুজ রেখে হবে না। আর অনির্দিষ্টতার দিকে, প্রলাপের দিকে, সংশয়ের দিকে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ওগুলোর হদ্দ হয়ে গেছে। অবচেতন আমাদের আর কিছুই দিতে পারবে না।
যে মন নিয়ে একজন রামপ্রসাদ সেন তাঁর পদগুলো লিখেছিলেন, যে অগাধ উচ্চাশা নিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এ হাত দিয়েছিলেন, যে মন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখতে পেরেছিলেন ‘সোনার তরী, প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন ‘সাগর থেকে ফেরা’, যে মন থাকলে একটা ‘কপালকুন্ডলা’ লেখা যায়, আমরা কি তা আরেকবার অর্জণ করতে পারি না?
আমরা যদি ভাবি, সমর সেন আমাদের কবিতায় রামপ্রসাদ সেনের চেয়ে জরুরি, আমার মনে হয় এই পরিস্থিতিতে আমাদের কবিতা লেখাটা বন্ধ রাখাই উচিত। অধুনান্তিকের সর্বোচ্চ বিন্দুটিতে সশরীরে বসেই কমলকুমার মজুমদার ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ লিখতে পারেছিলেন, সম্ভবত স্বাধীন ভারতের একমাত্র আধুনিক গ্রন্থ ( কাব্যগ্রন্থই কি নয়?) সেটাই।
আমাদের সম্ভবত আত্মবিস্মৃত হওয়ার আরামটা এবার ছাড়া উচিত।
এই দেশকালে বসেই স্বদেশ সেন কী কবিতা লিখেছেন, ভাবুন! আলোক সরকার কী করে তাঁর কবিতাগুলো লিখে চলেছেন, একবার দেখুন।
আর, আমরা কী লিখছি?

আপনার মতামত জানান