সেলাম ক্যাপ্টেন ফ্যাতাড়ু/ নবারুণলোকে/ পান্ডুলিপিরা পুড়ে যায় না

সরোজ দরবার

 



‘ভালো করে ঘুমোক। ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে। - এভাবেই শুরু হয়েছিল ৯৭ এর অকাদেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত তাঁর উপন্যাস। অথচ এবার সব ঠিক হল না বলেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এবং আমরা কাঙাল হলাম। খানিকটা স্পর্ধা কমে গেল। তবু সত্যিই কি কমে গেল? আমরা কি জানতাম না, হ্যালোজেনের হলুদ আলোয় ফ্যাতাড়ু একদিন ঠিক উড়ে যায়? জানতাম হয়তো। আর তাই আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই মনে পড়ে যায়, সেই হিসেবটা। ‘মানুষ যদি ১ হয় তাহলে ০ হল মরা মানুষ। মানুষ+মরা মানুষ=১+০=১’। অতএব হিসেব তো বরাবর আছে। ‘আস্ত’ মানুষটা তো থেকেই যাচ্ছেন।
কিন্তু মুশকিল হল, এই ‘আস্ত’ মানুষ কথাটাতে যে তিনি স্বয়ং বিশ্বাস করেন না। রবীন্দ্রনাথ ও নস্ত্রাদামুসকে নিয়ে একটি লেখা লিখতে গিয়ে গোরাতেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ রবীন্দ্রনাথ ‘আস্ত’ মানুষদের কাছে নমস্য। তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে বোঝেন। আমি ‘আস্ত’ মানুষ কোন অর্থেই নই। টুকরো টাকরা, কিছুটা ফ্লুকে লেখক হয়ে যাওয়া। প্রায় নিউরোটিক একটি প্রাণী যে দিশাহার এবং যে কোনো সময়ে যে জাহাজটায় চড়ে সে স্টুপিডগিরি করে বেড়াচ্ছে সেটা টাইটানিকের একটা প্যাথেটিক ক্যারিকেচার হয়ে যেতে পারে।’ ঠিক এই পূর্ণচ্ছেদের সামনে দাঁড়িয়েই আমরা ফিরে দেখতে পারি একটা স্পর্ধার ইতিবৃত্ত। কিংবা বলা ভালো, নতুন করে স্পর্ধিত হতে পারি। ‘পান্ডুলিপিরা পুড়ে যায় না', মিখাইল বুলগাকভের এ উক্তিতে তিনি নিজেই যে প্রবল বিশ্বাস করতেন। সুতরাং আজ আমরা স্পর্ধা হারানোর কথা বলব না, বরং আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণের মধ্যে নিজের সমগ্র অস্তিত্ব আবিষ্কার করেও তথাকথিত ‘আস্ত’ হওয়া থেকে কেউ কীভাবে নিজেকে সচেতন ও সুকঠিনভাবে সরিয়ে রাখতে পারেন, সেই স্পর্ধার স্ফুলিঙ্গতেই চোখ ফেরাব। সে উত্তরও তিনি দিয়ে গেছেন, ‘ অবশ্য আস্ত মানুষরাও যে সুবিধের মাল নয় সেটাও ঠিক কথা। ব্রয়লারও একটা আস্ত পাখি। এই ‘ the new post cold war situation of globalization and universal co modification’ – এর কুৎসিত, হতাশ, দুর্গন্ধময় পরিবেশে সব কিছুই ফালতু বলে মনে হয়। সত্যিই কি স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে তাহলে এটা কোন পৃথিবী?’ এই সব প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের মগজ যখন আপনিই ফালাফালা হয়, তখন হয়তোবা খানিকটা আন্দাজ করতে পারি কেন ‘আস্ত’ থাকাকে প্রবল ও তীক্ষ্ণ ভাষায় অস্বীকার করেছিলেন মিতবাক মানুষটি।
একদিক থেকে মনে হয়, তাঁর সাজিয়ে যাওয়া অক্ষররা আসলে অস্বীকারেরই কথামালা। বেচামণির বশীকরণ মন্ত্র পড়া নিয়ে ভদির খচে যাওয়া ও সে সূত্রে বিবাদের একটু পরে গিয়েই লখক বলবেন, ‘কিন্তু এই বিবাদে জড়িয়ে পড়লে আমাদের চলবে না। মাগি-মদ্দার কারবারে আদ্যিকাল থেকেই এই ঢং। ঠাকুর দেবতারাও এই লাইনে যথেষ্ট বলশালী। এসব চলবেই এবং এর রকমফের নিয়ে আধবুড়ো কিছু গান্ডু শারদীয়া কত কী-তে আধলা নামাবে এবং বাঙালি পাঠকরা মলাঙ্গা লেন বা মঙ্গোলিয়া, যেখানেই থাকুক না কেন সেগুলি পড়ে ফেলবে। পড়ে তো ফেলেই। এই অসুখের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ট্রিটমেন্ট হল হনুমানের বাচ্চা। কিন্তু সেখানেও ফ্যাকড়া। পশুপ্রেমীরা হাঁউ হাঁউ করে উঠবে। নিরপরাধ, ঐতিহ্যবাহী, রামভক্ত, হনুমানের বাচ্চাদের আপনারা কোথায় পাঠাচ্ছেন! জায়গাটা খাঁচা হলেও বা একটা কথা ছিল।’ ভাষাবন্ধনের মুচকি হাসিটা থামলে আমরা ঠিকই বুঝে যাই, নবাআরুণ মোটেও আমাদের হাসাতে চাইছেন না। বরং তাঁর কলম নির্দেশ ঐ ‘অসুখ’টার দিকে। কীসের অসুখ? যে কারণে কামুর ‘ আ হ্যাপি ডেথ’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাঁর অসুবিধা হয়েছিল। মূলগত কিছু প্রশ্নের উত্তরকে ঢাকা দিয়ে শৌখিন শিল্পের মজদুরীই এই অসুখ। ‘রজার বেকনের ভষায় এই চূড়ান্ত প্রশ্নগুলির প্রস্তাবিত উত্তর ঈশ্বরকে নিবেদিত কুমারীর মতোই বন্ধ্যা থেকে যায়।’ – নবারুণ নিজেই এ কথা জানতেন। সুতরাং ‘বন্ধ্যা মিথ্যাচারের সাহিত্য’ আর ‘সিন্থেটিক অতিকথার সাহিত্য’ কোনওটাই তাঁর ধাতে সয় না। ঋত্বিক জাঁর কাছে যুগপৎ অঙ্গীকার এবং অস্কার, ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে আধুনিকতার প্রশ্নগুলি বুঝতে যাওয়ার বিপজ্জনক’ চেষ্টা দেখে তাঁর যে লোম পুড়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং জলের উজ্জ্বল শষ্যরা বাবুঘাটের কুমারী মাছে পরিণত হয়ে গেলে, এবং ‘কমলকুমারের রোমশ রসিকতা ও সান্ধ্য ভাষাসমৃদ্ধ ক্লিনিকাল রিয়ালিজম ‘বাঙলা ভাষার অদ্বিতীয়’ মার্কসবাদীদে লেখকদের কাছেও শ্রেষ্ঠত্বে অনাদ্যন্ত’ বলে প্রতীয়মান হলে তাঁর পুরন্ধর ভাট দ্বিধাহীন হয়ে সাহিত্য সভ্যতার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেছে,
‘ আজ্ঞাবহ দাস, ওরে আজ্ঞাবহ দাস
সারাজীবন বাঁধলি আঁটি,
ছিঁড়লি বালের ঘাস,
আজ্ঞাবহ দাসমহাশয়, আজ্ঞাবহ দাস!
আজ্ঞাবহ দাসবাবাজী, আজ্ঞাবহ দাস’
যতই তাকাস আড়ে আড়ে,
হঠাৎ এসে ধুকবে গাঁড়ে,
বাম্বু-ভিলার রেকটো কিলার,
গাঁট-পাকানো বাঁশ,
আজ্ঞাবহ দাস রে আমার, আজ্ঞাবহ দাস।’
বলা বাহুল্য এ কবিতা ছিল ‘ পায়খানা ধোলাই করার অ্যাসিডের সুইমিং পুলে যে লেখকরা বারমুডা পরিয়া লাফাইতে বদ্ধপরিকর, তাহাদের জন্য রচিত।’ আসলে ঐ সান্ধ্য ভাষা শব্দটি যদি ধার নিই, তাহলে তো বোঝা যায় আসলে এই তুমুল ও অমোঘ ঠাট্টার শব্দে আসলে তিনি ধরিয়ে দিতে চাইছিলেন, সাহিত্যের ‘আসল কথাটা’ কী। ‘ সাহিত্যের ‘আসল কথাটা’ হচ্ছে দুনিয়াটাকে পালটে মানুষের স্বাধীন হউএ ওঠার উপযুক্ত চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা। যে সাহিত্য মানুষের psychological space’ কে এই আশ্চর্জ সংগ্রামের উপযোগী ও বিস্তৃত দ্বান্দ্বিক গতি এনে দেয় না, সেই সাহিত্য ভালো না। তাতে অনেক চটক, জমক, যতিরঙ্গ, শৈলি ও খুচরো কারুকার্জ থাকলেও কথাটা মিথ্যে হয়ে যায় না।’ অর্থাৎ এইটেই হল আসল কথা। এবং এই মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারি, আসলে অস্বীকার নয়, তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে স্বীকারের দিকে। যে স্বীকার নিজের কাছে নিজেকে। যেখানে দুনিয়ার ঠকানোর চেয়েও নিজেরই ঠকানোর সম্ভবনা থাকে ষোলআনা। নবারুণ আমাদের সেই রক্ষাকবচটা বেঁধে দেন। অস্বীকারের সোপান ধরে স্বীকারে পৌঁছনো। ‘ the duty of every revolutionary is to make revolution’ চে-এর এ কথার মতোই তিনি জানতেন, ‘ ব্যারিকেড রাস্তা বন্ধ করে ঠিকই, আবার নতুন রাস্তা দেখিয়েও দেয়।’
এই বিপ্লবে বিশ্বাস হারনানি বলেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’। যে সময়ে দাঁড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা অন্যের উপর নির্ভরশীল থেকে, ‘ ভাবনার বেলায় নিজের অস্তিত্বের বেলুন ফঁপানো ও কয়েকটি পণ্যের বাজারদর ও ম্যাগাজিনের রসদ নিয়ে’ খুব ভালো কবিতা লেখা বা ছবি আঁকা , গান গাওয়া সম্ভব কিনা তা নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান, যে সময়ে তিনি নিজেই জানেন মাঝারি মাপের হয়ে যাওয়াটাই সহজ পন্থা এবং ‘ব্রয়লার মুরগী হওয়ার থেকে কাক হওয়া অনেক ভালো, সেই সময়েও তিনি, এবং সম্ভবত একমাত্র তিনিই বলতে পারেন, ‘ শত আঘাত,সহস্র পরাজয়, লক্ষ মরণ – কোনও কিছুই আমাকে বিপ্লব ও মুক্তির পথ থেকে সরাতে পারবে না। তার কারণ, আমি রাজপথে ফেলে রাখা বোমা নই। আমি মানুষ। আমি লিখি। এবং আমি সংক্রামক। আমার ক্রাচের শব্দ আপনাকে ডাকছে।’ এই হল অবস্থানের সেই স্থানাঙ্ক অসীম পথের সঙ্গে যে সম্পর্ক পাতিয়ে নেয়। ফলত তাঁর অভিমুখ হয়ে ওঠে শিকড়ের দিকে, এবং সেখান থেকেই সে খুঁজে নেয় আধুনিকতার উৎসমুখ। আর তাই কবিতাকেও তিনি নামতে বলেছিলেন, শহরতলীতে। কেননা তিনি জানতেন, ‘ বিষয়টিকে নিয়ে যদি বা ভাবনা কিছু হয়, কাজ হয় বড় কম। ফলে অজান্তেই কবিতা অন্য সব শিল্পের মতোই পিছু হটতে থাকে। বিগত (কয়েকজন বেঁচেও আছেন অসার নিয়মে)কবিদের কয়েকটি আশ্রম আছে। যার থেকে কবির বদলে আমরা পেয়েছি কবি ও কবিতার কিছু জেরক্স কপি। ... এবং তৎসহ বিশাল মাফিয়া ক্ষমতার মত রয়েছে দৈনিক-সাপ্তাহিক- সাহিত্য বণিকের খোলা বাজার-এরা রণ-পা পরা বামন প্রায় প্রসূতি সদনের মত নিয়ন মেনে পরপর ছেড়ে যাচ্ছে, সম্ববত এরা পোলট্রি-বিজ্ঞানের দ্বারা অনুপ্রাণিত।’ আর তাই কবিতার স্বার্থেই চেয়েছিলেন কবিতা নিয়ে আন্দোলন। একদা এক রিকসা চালকের মুখে শুনেছিলেন, ‘নক্ষত্ররা ঘন হয়ে এলে বৃষ্টি হবে’ –এর মতো লাইন। আর তাই চেয়েছিলেন, ‘দুনম্বরী সভ্যতায়, দু নম্বরী মানসিকতায়’ আটকে না থেকে কবিতা যেন শহরতলীতে পৌঁছয়। অবশ্য আজ আমরা নিশ্চয়ই মনে রাখব, অহেতুক ‘কমরেড’ সম্বোধন করলেই কেউ বিপ্লবী হয়ে যায় না, আর দিস্তি দিস্তি খিস্তি লিখলেও কেউ নবারুণ ভট্টাচার্জ হন না। সুতরাং তাঁর পথের অভিমুখটি খুঁজে পাওয়াই আজ আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার হওয়া উচিত। নচেৎ আলখাল্লার দেশে আরও কিছু মাঝি মাল্লার ভিড় বাড়বে বই কমবে না। ‘দু নম্বরী’র সতর্কবার্তাটা এখানে অত্যন্ত আবশ্যক নইলে সেই, ‘ ক্যাট, ব্যাট, ওয়াটার, ডগ, ফিশ... ’
শিল্পী আর টেলিভিশন সেটের মধ্যে এক কলমের আঁচড়ে পার্থক্য করে দিতে পারতেন বলেই তিনি জাতশিল্পী। এক লেখার মধ্যপর্বে লিখেছিলেন, মৃত্যুতে বিজ্ঞান শেষ হয় হোক। আমার ধারণায় মৃত্যুর পরে স্বপ্নের পর স্বপ্নের পর স্বপ্ন... ’। আজ আমাদেরও ধারণা তাইই। মৃত্যুর পরে স্বপ্নের পর স্বপ্নের পর সাঁই সাঁই ফ্যাৎ ফ্যাৎ। কেননা আমরা তো এখনো দিব্যি শুনতে পাচ্ছি, তিনি বলছেন, ‘ ...কিছু না বলা কথা ট্রাজিক অবলার মতো নির্বাক থেকে বার বার সেমিজে চোখ মুছুক এমনটি নিশ্চিয়ই হওয়া বাঞ্ছিত নয়, বাঞ্চতিত তো নেভার-ই নয়।’
ফ্যাতাড়ুরা উড়ে যায়, পুড়ে যায় না।

আপনার মতামত জানান