এই মৃত্যু উপত্যকা তাঁর দেশ নয়

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



এই মুহূর্তে কলম সরছে না। সেটা শোকে নয়। ত্রাসে। শোকের কোনো সুযোগ আমার নেই। দু-বার মোটে দেখা হয়েছে নবারুণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে, একবার ফোনে কথা হয়েছে। ওঁর পত্রিকায় আমি দুবার লিখেছি। সেটা ওঁর আমন্ত্রণে নয়। সহ সম্পাদক অনীক রুদ্র আমার লেখা চেয়েছিলেন। উনি আমার নিকটজন ছিলেন না। শারীরিক অর্থেই এই কথাগুলো বলছি। কোনো আধ্যাত্মিক বাতাবরণের অবতারণা করছি না।
কিন্তু আজ ফাঁকা লাগছে। এই শূন্যতা, কোনো প্রদেশে বসে যখন এক মোগল রাজপুরুষ সম্রাটের চলে যাওয়ার খবর পেতেন, তাঁর মানসিক অবস্থাটা হয়তো ঠিক এরকমই হত। একটা শিরশিরে ভয় উঠে আসছে শিরদাঁড়া বেয়ে।
এটা জুলাইয়ের শেষ তারিখ। পুজো সংখ্যার রমরমা। উপন্যাসে উপন্যাসে ছেয়ে যাচ্ছে বাংলা বাজার। এই সময়ে চলে গেলেন নবারুণ। এ কি এক চিহ্ন আমাদের সামনে? এর মানে কি মাঝারিয়ানা নিষ্কন্টক হল আরো? বাজারিয়ানা এখন অবাধ হল? আর কোন নভেলিস্ট আছেন আমাদের মধ্যে যিনি দাপটের সঙ্গে বাজারে দাঁড়িয়ে গ্রন্থাগারের কথা ভাববেন? সন্দীপন অনেক দিন নেই। আজ নবারুণও নেই।
নবারুণের কোনো উপন্যাসের নাম, ছোটগল্পের নাম এখানে আমি করব না। তাঁর কবিতা নিয়ে একটাও কথা বলব না। কেন কথা বলব তাঁর কবিতা নিয়ে? একজনের পবিত্রতম উচ্চারণগুলো নিয়ে কথা বলা মানায় না। এই লোকটি জীবনে একটাও মিথ্যে কবিতা লেখেননি। এবং... মিথ্যের সুযোগ না থাকলে কবিতার আলোচনা জমে না আজকাল আমাদের এখানে। হ্যাঁ, মিথ্যে। যেখানে কবির ব্যক্তিগত পৃথিবীটা নেই। নবারুণ তাঁর কবিতায় নিজের পৃথিবী থেকে সরেননি একটা শব্দেও। তাঁর কবিতা নিয়ে কথা বললে কেউ কেউ হেসে উঠতেই পারেন। একজনের মৃত্যু যখন আজ এতটাই তাজা, কেন সুযোগ দেব তাঁদের পরিহাসকে?
বরং দেখুন তাঁর কাহিনির মিথ্যেগুলোকে। যে মিথ্যেকে আমরা জাদু বলি, অবাস্তব বলি। নবারুণ সেই আশ্চর্য কাহিনিকার যিনি বুঝেছিলেন বাস্তবে কোনো বাস্তব থাকে না, শুধু মিথ্যেটাই থাকে। কখন যে সত্যিটা মুখোশ হয়ে যায়, আমরা টের পাই না। নবারুণের মতো মানুষরা পান। গার্সিয়া মার্কেজের মতো মানুষরা পান। কেন বলব না, তাঁর সব উপন্যাস এবং ছোটগল্প মিলিয়ে তৈরি হয় সেই টি-পার্টি, যেখানে অ্যালিস আর হ্যাটারের দেখা মেলে। নবারুণ ছিলেন এক অ্যালিস। খরগোশের পিছনে দিয়েছিলেন এক ছুট এবং ঝাঁপ এক ননসেন্স সমাজব্যবস্থার গর্তে। নিজের চোখের জলে নিজেকেই সাঁতার দিতে হয় সেখানে। নিজেকেই নিজে বেঁটে করতে হয়, নিজেকেই নিজে লম্বা।
আমরা কেউ তাঁর চরিত্রগুলোকে দেখিনি। কারণ, আমরা সবসময় তাদের দেখি চোখের সামনে। তাঁর একটি চরিত্রও বাস্তব নয়। কারণ, লোহা দিয়ে লোহা বানানো যায় না। বাতাস দিয়ে বাতাস। আমি, আপনি সবাই তাঁর একাধিক বা একটিই চরিত্র। তাঁর উপন্যাস তাঁর গল্প তাই আমাদের শুধু বিরক্ত করে। তিনি জনপ্রিয় হন না, শুধু মান্য হন। মান্যবর নবারুণকে স্বীকার বা অস্বীকার করার কেউ নেই আমাদের মধ্যে আপাতত। তিনি অবশ্যগ্রাহ্য, কিন্তু আমাদের সিরিয়ালসংস্কৃতির কেউ নন।
তাঁর ভাষাটা দেখুন। কেন ওই চরম অশ্লীলতা? শুধু কি ধাক্কা দেওয়ার জন্য? সত্যিই কি প্রান্তিক মানুষ ওই ভাষাতে কথা বলেন? অত অনায়াসে গাঁড়, বাঁড়া, বাল, পোঁদ তাঁরা বলতে থাকেন? না। অকারণে তাঁরা বলেন না। ওগুলো অস্ত্র। ওগুলো তাঁদের ধারণ করতেই হয়। এ এক স্বীকৃতির ব্যাপার। ওই ভাষা স্বয়ং এক চরিত্র। হ্যাঁ, অবশ্যই অস্ত্র। মহাভারত-রামায়ণে যেমন দিব্য অস্ত্রগুলো চেতনাসম্পন্ন ছিল, তারা যেমন কথা বুঝত।
যে কোনো ভাষাই এই অস্ত্র। এটা যিনি বোঝেন না, তাঁর জন্য নবারুণ নন।
এবং প্রতিষ্ঠান? আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার চাতুরিটা তিনি ফাঁস করে দিয়েছেন। আমরা প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা বলতে যেন বাউলপনা বুঝি, বাতুলতা বুঝি। যেন একটা লোক মেঝে ছাত এবং দেওয়াল ছাড়া দাঁড়িয়েছে, তার কাজ করতে চাইছে। আমি সেটা বুঝি না। প্রতিষ্ঠানের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা লোক ভিখিরি হতে পারে, অথবা যোদ্ধা। একজন প্রতিষ্ঠানবিরোধী স্বয়ং এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবেন এটাই আমি বুঝি। তাঁর থাকবে উজ্জ্বল কবচ ও কুন্ডল। মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি অমরত্বের সঙ্গে কিছু কথা বলবেন।
উদাহরণ হিসেবে নবারুণের মতো কিছু মানুষকে পাই চোখের সামনে। বঙ্কিম আর সাহিত্য আকাদেমি তাঁর বুক অবধি পৌঁছে ঝরে পড়েছে। তাঁকে আইডেন্টিটি দিতে পারেনি কোনোই আলাদা করে।
নবারুণের মতো মানুষ বুঝিয়ে দেন প্রতিষ্ঠানের প্রতাপের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে নিজেকেই একটা প্রতিষ্ঠান বানাতে হয়। ঠিক যেভাবে একজন একলা সৈনিক নিজের ট্রেঞ্চ বুঝে নেয়। এই একলার শক্তি যে কোনো একের চেয়ে বেশি বৈ কম নয়, সেই এক যদি কোনো প্রতিষ্ঠান হয়, লড়াইটা বাঘ-সিংহের হয়, হরিণের মতো রূপবান পলাতক হতে হয় না। নবারুণ একজন একলা সৈনিক ছিলেন। কলমটা যে একটা মিসাইলের চেয়ে ঢের এবং অঢেল ঘাতক হতে পারে, সেটা তিনি বলেননি, স্রেফ করে দেখিয়েছেন। এটা আমি শিখতে চেয়েছি তাঁর কাছে। কিন্তু তাঁর পৌরুষের ছিটেফোঁটাও আমার নেই।
আমি তাঁর একটা চরিত্রের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে চাই না নিজেকে। আপনিও সেই দুঃসাহস করবেন না, পাঠক+লেখক।
এমন কী গ্যারান্টি আছে আপনি একদিন জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা হয়ে যাবেন না?
আসুন, চা খাই। একটা পেয়ালা ছুঁড়ে দিন আমার দিকে।

আপনার মতামত জানান