এ কেমন শুভ্র অবয়ব?

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 


'তপস্যারত সন্ন্যাসী'... 'প্রার্থনারত সৌম্যমূর্তি'... এই সবকিছুই কেমন বার বার এক প্রশান্তির প্রতিভূ হিসেবে চোখের সামনে তুলে ধরা হয়। কখনও বাস্তব চিত্র, কখনও রূপক... তবে এই যেন চিরাচরিত নির্মোহ, নিষ্কাম অস্তিত্বের প্রতীক। আচ্ছা, একে কি প্রতিষ্ঠিত ধ্রুব সত্যর মত মেনে নেওয়া যায়? নাকি এই প্রতীকও আসলে একরকম সামাজিক অভিস্রবন? ঠিক কাকে দেখতে পছন্দ করি আমরা - সন্ন্যাসীর ওই ইমেজ? নাকি প্রার্থনার মুদ্রা? নাকি মন্ত্রোচ্চারণ?... ভাবতে ভাবতে কেমন জানি, পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি... মনে পড়ে যায়। মনে হয়, সেই প্রণামের মুদ্রা বা মন্ত্রেরও আগে ঐ সৌম্যমূর্তিকে সম্ভ্রম করতে শেখা। তাহলে সেই সম্ভ্রমের বস্তুটি আসলে কি? সন্ন্যাসীর চেহারা... খোলস... মুখোস? তপস্যা বা প্রার্থনাই যদি মুখ্য হয়, তো এই চেহারার কল্পনা কেন? কেন এই বাহ্যিক রূপক নির্ভর চেতনার প্রকাশ?

ওই প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর বাইরে বৈচিত্র দেখতে পাই... বার বার, বৈচিত্র চোখে পড়ে। যখন দেখি, কোনও পাড়ার সরস্বতীপূজোর মণ্ডপে একটি চার-পাঁচ বছর ছোট্ট মেয়ে চোখে বুঁজে হাত ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে... বিরবির করে কিছু বলছে। যখন দেখি, রাস্তার ধারের কোনও জাগ্রত কালী মন্দিরের সিঁড়ির সামনে হঠাৎ বসে পড়ল কেউ, তিন-চার বার মাথা ঠুকে নিলো সেই সিঁড়িতে। যখন দেখি কোনও বিখ্যাত দেবস্থানে দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন, হাতের পাত্রে ও নিবেদনের অর্ঘ্য নাকি ভিক্ষাপাত্র, মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়। যখন দেখতাম সাত-আট বছরের সাবির, সাদা ফেজটুপি আর সবুজ লুঙ্গি পরে একটা লাল কাপড়ে মোড়া কোড়ান নিয়ে ছোট ছোট দ্রুত পদক্ষেপে তার বাবার আগে আগে মসজিদের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বাস বা ভক্তির মাপ কি কেবল ঐ বাহ্যিক রূপ দিয়ে করা যায়? ঠিক একই ভাবে, নির্মোহ-নিষ্কাম চরিত্রের ওই খোলসটাকেই বা মেনে নেবো কেমন করে? ভক্তের শীততাপনিয়ন্ত্রিত যানে করে ঘুরে ঘুরে প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি চক্রের যারা হাসি মুখে সমাধান করে দিচ্ছেন... তাদের সেই বরাভয় থেকে নির্গত আশীষ মন্দির-মসজিদের বাইরে সারি সারি অ্যালুমিনিয়ামের ভিক্ষাপাত্রগুলির ওপর কি পরবে কোনওদিন?

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি, বাবরি মস্‌জিদ... এমনকি কাশীর বিশ্বনাথমন্দিরও আক্রান্ত হয়েছিল একসময়... ভবিষ্যতেও এমন অনেক ভাঙাগড়া হবে বার বার। কিন্তু সহস্রাব্দ ধরে, যারা আসে আর যায়... তাদের হাতে সারটুকু কি রইল? চরম হতাশা, নৈরাশ্য, সর্বশান্ত-হওয়ার মুহূর্তে সেই প্রশান্তির প্রতিভূদের ছায়া? কি হয় তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের যারা হলোকস্টের সময় সাইরেনের অপেক্ষা করেছে? যারা জালিয়ানওয়ালাবাগের উঁচু পাঁচিল টপকাতে অক্ষম? যারা হিরোশিমা শহরে, ৬ই আগস্ট ১৯৪৫-এ ভোরবেলা উঠে ভেবেছিল, আজকের দিনটা শুধু পরিবারের সঙ্গেই কাটানো যাক? এমন প্রশ্নের তো শেষ নেই কোনও! যত বেশি সময় অতিবাহিত হয়, কেবল দেখি প্রশ্নর পাহাড় মাথা তুলতে তুলতে সূর্যকে ঢেকে দিতে চাইছে সেই বিন্ধ্য পর্বত হয়... যে অন্য কারও একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। শাড়ীর আঁচল ঘুরিয়ে গলবস্ত্র হয়ে দেবতার থানে মাথা ঠেকায় গৃহবধুর সুদ্ধ-ভক্তি, তার আঁচলের নিচে এখানে ওখানে আশ্রিত কালশীটের ছাপ কোনওদিনও ম্লান হয় না। গুয়ান্তানামো বে থেকে তিব্বত, ভিয়েতনাম থেকে চেচনিয়া... কোন ধর্মের কতজন বলি হয়েছে সেরকম স্ট্যাস্টিক্স সংগ্রহ করা বাতুলতা। চরম সত্য হ’ল নির্বিচারে মানুষ কেমন এমনি এমনি মরে যায়... এতই সস্তা, এতই ফালতু... ব্যাকটেরিয়ার মত মানুষের প্রজনন এবং শেষ হয়ে যাওয়া। আর এত কিছুর মাঝেও পৃথিবীর নানা কোণে, কোনও না কোনও ধর্মযাজক দু’হাত তুলে বলবেন... “দেখো ঈশ্বরের সৃষ্টি এই পৃথিবীতে ওনার কৃপায় কত সুন্দর আছি আমরা, ভক্তিমার্গে চারিদিকে কি প্রশান্তি! বাইরে যা ঘটে ঘটুক, নিজের অন্তরকে সুদ্ধ করে শুধু পরমেশ্বরের ওপর নির্ভর কর।” কি অদ্ভুত আত্মকেন্দ্রীকতার অধ্যায়ন... ব্যক্তির সরল ঈশ্বরবিশ্বাসকে শোষণ করে!

হয়ত এ আমার বিভ্রম, তবু বার বার মনে হয়, চরম দুঃসময়ে ঐ প্রশান্তির প্রতিভূ... নির্মোহ-নিষ্কাম তপস্যারত সন্ন্যাসীর অবয়ব কে মেলে ধরা... ও কোনও রিফিউজ নয়... আসলে ডিকয় (Decoy)। এ এমন এক শিখণ্ডী, যার সামনে পরে সভ্যতার শরশয্যা হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর আমরাও সবাই, পলায়নমুখ হতে হতে... নিজের মাথা বাঁচাতে এমন রূপকেরই ছায়া খুঁজি কোনও না কোনও সময়। দ্রুত ফুরিয়ে আসা মনুষ্যজীবনের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের পুঁজি, তা নিয়ে আর কাঁহাতক ঘরে-বাইরে জেহাদ করা যায়? হয়ত এই আসলে, সব পুঁথিগত জ্ঞান বা আদর্শবাদের নাগালের বাইরের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা। হয়ত এই আসলে, সভ্যতার হাজার হাজার বছর আগের সেই ‘আগে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে’ প্রবৃত্তির উজ্জ্বল জেনেটিক কোড, যার কেবল অল্প-স্বল্প মিউটেশন হয়ে যায় মাঝে মাঝে। একটা গণ্ডি কেটে দেওয়া বড়ই কষ্টের কাজ। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার রুম, ভাবগম্ভীর সেমিনার হল, বিদগ্ধ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জমায়েৎ, হোয়াইট হাউস... এমনকি রাষ্ট্রসংঘের কনফারেন্সেরও ধরা ছোঁয়ার বাইরে যে চরম সত্য... তাকে বলে বেঁচে থাকার তাগিদ। ঠিক যেমন, লং মার্চের সময়, বিশ্বযুদ্ধের মাঝে, এমন কি ৬ই এবং ৯ই আগস্ট ১৯৪৫-এও পৃথিবীর আলো দেখেছে নবজাতকেরা... অথবা তার নয়-দশ মাস পর।

আসলে গোটা পৃথিবীই এখন অল্ডাস হাক্সলি-র দেখা বেনারসের মত। প্রবল কোলাহল আর দেবালয়ের ঘণ্টাধ্বনি। দোকানীর অজ্ঞাতেই ধর্মের ষাঁড় এসে নিশ্চিন্তে লম্বা জিভ দিয়ে শাপ্টে যাচ্ছে সাজিয়ে রাখা কাঁচা আনাজ; আর দোকানী জানতে পারলেও হয়ত কিচ্ছুটি করতে সাহস পাবে না। সেই বাজারে ধর্মের ষাঁড়ের পথরোখার স্পর্ধা কারও নেই, সবাই পথ ছেড়ে দাঁড়ায়। রাশি রাশি মানুষ হুড়োহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে সেই ঘোলা জলের মাঝে... যা তাদের কাছে পবিত্র নদী, পাপমুক্তির উপায়। আর কিছুক্ষণ পরেই সূর্য গ্রহণ হবে। দিনমণি রাহুগ্রস্ত হওয়ার আগেই সরল বিশ্বাসে (না কি অন্ধ বিশ্বাসে?) ঘোলা জলে চারটে ডুব দিয়ে নেওয়ার জন্য যত ব্যস্ততা। আর সেই শান্তির প্রতিভূ, নিষ্কাম-নির্মোহ রূপকেরা? তারাও হয় সেই ঘোলা জলেই ডুব দিচ্ছে ইষ্টনাম হেঁকে হেঁকে... অথবা অনেক ওপরে, সৌম্যমূর্তি ধারণ করে বসে চোখ বন্ধ করে জপ করছে। সে চোখ তাদের বন্ধই থাকে, যদি না সারা দিতে হয় নানাবিধ প্রকৃতির ডাকে।

আপনার মতামত জানান