পান্থজনের সখা

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

 





এক
২০১৪ কলকাতা বইমেলায় যখন প্রকাশিত হল আমার প্রথম কবিতার বই ‘ব্যথার বন্দিশ’, স্বাভাবিক ভাবেই আমার বেশ অপার্থিব এক আনন্দ হয়েছিল। সাথে ছিল গভীর আফসোস, এটা ভেবে যে আমার বইয়ের প্রথম কপি-টা আমি রেখে আসতে পারলাম না গুরুদেবের পায়ের কাছে একটি সামান্য কারণে; তা হল আমার জন্মেরও মাত্র ৫২ বছর আগে উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন গীতবিতানের দেশে। পরে ভেবে দেখলাম উনি ছিলেন তো, উনি আছেন, আমি যে ভাষায় লিখি সে ভাষার অলিন্দে নিলয়ে। এমনকি যখন আমার প্রথম বই-প্রকাশ অনুষ্ঠান চলছে প্রেস কর্নারে, সামনের সারিতে বসে কত গুনীজন, তখনও সবার অলক্ষ্যে তিনি মৃদু হাসছেন আমার কুলশীলমানহীন কবিতা শুনে। তবু বিশ্বাস করুন, একটুও উপহাস নেই, গরিমার অনিন্দ্য আলোকে সকলকে অন্ধ করে দেওয়া নেই। শুধু আছে প্রশ্রয়। শান্তিধারা বরিষণ। সত্যি-ই আমার দুর্ভাগ্য এই মানবরূপী দেবতাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলাম না। আবার খুউউউব সৌভাগ্য যে দেবতার স্বর্গলোকে প্রত্যাবর্তনও আমাকে দেখতে হয়নি। ওই ২২শে শ্রাবণের তীব্র বিষাদের অভিঘাত আমি সহ্য করতে পারতাম না। তার থেকে এই ভাল। প্রতি মুহূর্তে দূর থেকে তাঁকে ছুঁয়ে থাকা। গানে গানে।

দুই
রবি ঠাকুর আমার কাছে চির বিস্ময়। তাঁর এক-ই গান, এক-ই কবিতা নিয়েই যে কত দিন কত রাত ভেবে ভেবে কেটে গেছে তার হদিশ নেই। প্রতিবার পাঠে, শ্রবণে, তারা নতুন করে ধরা দিয়েছে। তাদের ব্যাপ্তি চিরকাল বেড়ে বেড়ে গেছে। কখনও মনে হয়নি, এই তো, এইবার এইখানে এসে কবিতা বা গানটা শেষ হল। কখনও হয়নি। হবেও না। সীমার মাঝে অসীম হয়েই থেকে যাবে তারা। ধরা যাক একটি গানের কথা— “আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে...” তিনি যদি শুধু এই গানটাই লিখতেন সারা জীবন ধরে, তাও আমার কাছে তাঁর অমরত্ব নিশ্চিত ছিল। এই বহুশ্রুত গান-টি আরেকবার—
“আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।
এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভ'রে ॥
না চাহিতে মোরে যা করেছ দান-- আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ,
দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহা দানেরই যোগ্য ক'রে
অতি-ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে ॥
আমি কখনো বা ভুলি কখনো বা চলি তোমার পথের লক্ষ্য ধরে;
তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে যাও যে সরে।
এ যে তব দয়া, জানি জানি হায়, নিতে চাও ব'লে ফিরাও আমায়--
পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন তব মিলনেরই যোগ্য ক'রে
আধা-ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে ॥”

একজন মানুষ কীভাবে লিখতে পারেন “এ যে তব দয়া, জানি জানি হায়, নিতে চাও ব'লে ফিরাও আমায়--”, এই যে প্রতিটি অনুভুতির জটিলতা, নানা বিপরীতধর্মী আবেগ একে অপরের সাথে মিশে থাকা, এই যে প্যারাডক্স, এত সহজ অথচ গভীর ভাবে আর কেউ বলতে পেরেছেন কিনা আমি নিশ্চিত নই। “অতি-ইচ্ছা” ও “আধা-ইচ্ছা” দুই-ই যে সংকট, তাও কী অনায়াসে বলে গেলেন উনি। দ্বিতীয় লাইনে ‘কৃপা’ ও ‘কঠোর’ দুটি আপাত বিপ্রতীপ শব্দ পাশাপাশি বসল, কিন্তু কৃপার রসে কঠোরতা সিক্ত হল। নিতে পারার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, তার জন্যও যে নিরন্তর সাধনা, গূঢ় সমর্পণ-- তারও আভাস দিয়েছেন কবি। কী গভীর জীবনবোধ, তাও কেমন সহজিয়া দর্শনে নিবদ্ধ। এই গান গভীর হতাশায় আমার শিয়রে এসে বসে। আমাকে যোগ্য হয়ে ওঠার দিক-নির্দেশ দেয়।


তিন

রাহুল মিত্রের নাম আমি প্রথম শুনি জয় গোস্বামীর একটি বই ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ এর উৎসর্গপত্রে। জয় সেখানে লিখছেন—“রবীন্দ্র সংগীতের নবীন সাধক রাহুল মিত্রকে।” পড়ে একটু অবাকই হয়েছিলাম। গায়ক নন? সাধক? প্রথমে এর অর্থ বুঝিনি। তারপরই এক রাতে আমার ভাতৃপ্রতিম বন্ধু শাশ্বত আমাকে প্রথম রাহুল মিত্রের গাওয়া “তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে...” গানটা শোনায়। তারপর সারারাত সেই গানে ভিজতে থাকা। একটি মানুষ যেন কী নিমগ্ন কন্ঠে, সম্পূর্ণ নির্লোভ ভঙ্গিতে গেয়ে চলেছেন রবীন্দ্রনাথের গান। একই ভাবে। কোনও বিশেষ বৈচিত্র্য নেই। কোথাও নিজেকে অতিরিক্ত প্রমাণ করা নেই। কিন্তু আমি তলিয়ে যাচ্ছি সেই একঘেয়ে অথচ অতলান্ত গানে। কান্না পাচ্ছে। বুক থেকে গলা অব্দি উঠে আসছে স্মৃতির ভার। দলা পাকিয়ে যাচ্ছে অতীতকাল। ভীষণ পবিত্র সেই যন্ত্রণা। সমর্পণের মতো দিব্য। সেখান থেকেই ‘সা’ লাগছে আবার। সা-আ-আ-আ-আ... ‘আ’ মানে আশ্রয়।

চার

বব মারলে একবার বলেছিলেন—“One good thing about music, when it hits you, you feel no pain”।
আমি কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয় যে কোনও উচ্চ মার্গের শিল্প-ই কখনও শুধু একমুখী আবেগের সঞ্চার করতে পারে না। গান শুধু আনন্দ-ই দেবে? কখনও দুঃখ দেবে না? কখনও গানের তীব্র শরশয্যায় শায়িত হব না? তা কি হয়? না, হয়না। তবে হ্যাঁ, সেই রক্তক্ষরণেও তৃপ্তি আছে। শান্তি আছে। যাকে গ্রীক ট্র্যাজেডির পরিভাষায় বলা যায় ক্যাথারসিস। একবার মেদিনীপুরেই জেলা পরিষদ হলে মহালয়ায় একটি অনুষ্ঠান দেখতে গেছিলাম। সেখানে এস্রাজ বাজিয়েছিলেন শুভায়ু সেন মজুমদার। সেই প্রথম আমার সামনে থেকে এস্রাজ শোনা। শুভায়ু সেন মজুমদার সম্পর্কে আমার কোনও ধারনাই ছিল না। প্রথমে উনি যতদূর মনে পড়ে পুরিয়া-কল্যাণ বাজিয়েছিলেন। সে এক ঘোর। শেষ হতেই আমরা কয়েকজন দাবি জানালাম একটু দেশের কোনও বন্দিশ যদি শোনান। উনি তখন সম্মতি জানিয়ে শুরু করলেন দেশ। আলাপ, বিস্তার, জোড়, ঝালা... কখন যেন এসে মিশে গেল “এসো শ্যামল সুন্দরও...” কী অপূর্ব সেই বাজনা। আমি ছটফট করছি, স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিনা। ভেতরে রক্ত স্রোত ছুটছে, কোথায় যে তারা যেতে চায়, জানিনা। এক অপরাজেয় কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভালও লাগছে। চাইছি আরও কষ্ট হোক। প্রথম যৌনতার মতো সে আবেশ। অপ্রতিরোধ্য, অমোঘ, অনিকেত। ঝড়ের মত মীড় আসছে, আর সমের উপর আছড়ে পড়ছে প্রবল ঢেউগুলো, বিদ্যুৎ চমকের মত খুলে যাচ্ছে একেকটা পর্দা, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সুরের চলন, দেখছি গুরুদেবের গান, কথাহীন হয়েও শুধু সুরের মাধুর্যে পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। সেই সন্ধেবেলা আমি নতুন করে পেয়েছিলাম দেশ রাগ-কে, আর গুরুদেবের গান... এই অশিক্ষিত চক্ষু কর্ণেও ধরতে পেরেছিলাম হলের ভেতরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। আর আমি ভিজছি। আলাদা করে নোনাজল চেনার আর উপায় নেই।

আপনার মতামত জানান