একটি কবিতা ও তার হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

অপর পুরুষ
যশোধরা রায়চৌধুরী

একদিন গল্পের শুরু । তোমার একাকী সন্ধে তখন সামান্য সিরিয়ালে
মজে আছে । এমন সময়ে
ঘরে ঢুকল পর্দা সরিয়ে
অন্ধকার মুখচ্ছবি, কালো জার্সি, শক্ত, পেশল
অব্যর্থ পুরুষ , যার অতর্কিত ফাঁস
তোমার গলায় বসল - আর তুমি উঠে পড়লে কি জানি কি ভেবে
সোফা থেকে – সাঁৎ করে সে-ও সরে গেল
বারন্দায় বয়ে গেল এলোমেলো হাওয়ার ঝলক
তুমি গেলে রান্নাঘরে- হাত যায় অন্বেষণে – ফ্রিজে
টিংগোর চুইং গাম, ডার্ক চকোলেট
লুকিয়ে আস্বাদ করলে – টিংগো গেছে টিউশনে , শমিতও ফিরবে না
অফিসের চাপ খুব মার্চ মাসে – কৃষ্ণসন্ধ্যায়
তুমি আজ পুরোপুরি একা ও স্বাধীন
কফি খাও উঁচু মগে, টিভি দেখো, চুল আঁচড়াও
ধীরে ধীরে ঢুকে যাও আস্বাদনের ঘোর জালে ...
সঙ্গে থাকে অপর পুরুষ
সঙ্গে থাকে অদৃশ্যশরীর সেই কালো ছায়া , পেছনে পেছনে
ফলো করে, হেঁটে আসে একেবারে বিছানা অবধি

ওরই তুমি ক্রীতদাসী, আকাংক্ষাশ্রমিক
ও তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে তার অঙ্গুলিহেলনে
আয়নার সামনে যাও, ক্লিপ আটকাও আর টাইট পোশাক পরো, সাজো
ও তোমার সঙ্গে আছে ... ফিসফিস করে বলছে, বাজো , মেয়ে, বাজো
রিংটোনে, ডুবে যাও ডানলোপিলোছলে
হালকাফুলকা এস এম এসে, তারপর গড়িয়ে যাও গ্লসি পত্রিকায়
বসন্তের সেল থেকে নতুন নতুন জামা পরো আর
স্তন ভরো উঁচু উঁচু ব্রা-এর খাঁচায়
ধুকুপুকু পুষে রাখো বুকে, যেন পাখিটি, গোপন
এখন তো ওরা নেই , এই ফাঁকে ডেটিং-এ যাবে না ?
শীতল স্মুদির ঠোঁটে আমূল চুমুক দিয়ে স্ট্র দাঁতে কাটবে না ?

সে তোমার মেগাকৃষ্ণ, সে তোমার আসল, আপন
সে তোমার একমাত্র প্রেমিক, অশরীরী
গল্পের শুরুটা এই-ই । পরবর্তী এপিসোডে সে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে
নিজের পোষাক করে পরে নিচ্ছে তোমার শরীরই !



নির্মাণের দু চারিটি অভিজ্ঞতা

এই কবিতাটি ২০১০ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৪১৭-র শারদ সংখ্যা দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার আগে আমি অন্তত ৬-৭ বার লিখেছি। এতবার বোধ হয় আমার কোন কবিতাই মাজা ঘষা নাড়া ঘাঁটা হয়নি। সেদিক থেকে এই কবিতাটি উল্লেখনীয় ।

এতবার বদলানোর ইতিহাস আমার কবিতায় বেশি নেই। একে তো আমার স্বভাবকবি বদনাম আজো ঘোচেনি । হড় হড় করে কবিতা লিখে যাই আমি, এমনটা অনেকেরই ধারণা। ডানদিক বাঁদিকে না তাকিয়ে কবিতা লিখে যাই।

তাছাড়া, লেখার স্বতঃস্ফূর্ততায় আমি নিজেও বিশ্বাসী, এবং ভেতরের চার্জ বা তাগিদঘটিত যে যে ক্রিয়া চললে লাইনের পর লাইন নিজের থেকে আবির্ভূত হয় কবির কাছে, তার উপরে আমার বিশ্বাস অপরিসীম। অপ্রত্যাশিত শব্দবন্ধ, সত্যের নানা অভূতপূর্ব ঝলক আমরা দেখতে পেয়ে যাই সেইসব আত্মবলিদান থেকে। নিজের লস অফ কনশাসনেস থেকে। পরবর্তীকালে সচেতনে সেইসব লাইনকে কাটাকুটি করে চলা , সে নির্মাণের আর একটা পর্ব।

তবু, বদনাম থাক আর নাই থাক, প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ত লেখনই যে কবিতা হয়ে ওঠে না সে কথা আমার থেকে বেশি আর কেই বা জানে? মাজাঘষা করতে করতেই ডায়েরিতে, ‘এমনি” লিখে ফেলে রাখা লাইনগুলির আকরিক হীরকের দ্যুতি পেয়ে যেতেই পারে, একথা সব কবির জানা। শিল্প তখনই আমরা বলি তাকে, যখন এইসব ঘষামাজা পেরিয়ে লেখাটি রসোত্তীর্ণ হয়।
এ তো সবই তাত্ত্বিক কথা। এ থেকে কোন বিশেষ কবিতার মধ্যে প্রবেশ করা যায়না। কারণ প্রতিটি কবিতাই একটি পৃথক যাত্রা। প্রতিটি কবিতার শরীর একটু একটু করেই গড়ে ওঠে সাদা কাগজের উপরে, তার বাইরের অনেক তথ্য, অনেক ইতিহাস অদৃশ্যভাবে সম্বলিত থেকে যায় ইন্টার টেক্সচুয়ালিটি হয়ে, লেখালেখি সংক্রান্ত রাজনীতি হয়ে ।
এইসব ভেজাল গৌরচন্দ্রিকার একটাই কারণ । এই কবিতাটির ইতিহাস বর্ননা । এই কবিতাটির প্রথম ড্রাফট হয়েছিল ২০০২ সালে । অনেকদিন এটি এর দৈর্ঘ্য এবং বিষয়গত নানা সম্ভাবনা সত্ত্বেও, ঠিকঠাক কবিতা হয়ে উঠতে না পারার কারণে পড়ে ছিল ডায়েরিতে, ফার্স্ট ড্রাফট হিসেবেই।
তখন আমি রাঁচিতে থাকি। আমার চাকরিসূত্রে বাইরে যাওয়া , অনেক চাপ সেই চাকরিতে। মেয়ে ২ বছর বয়সি, ইস্কুলে যেতে শুরু করেনি। তাকে নিয়েও জোর করে বদলি হয়েছি। তার দাবি আমার সময়ের উপরে তখন সর্বাধিক, অফিসের পরেই। আমার বর তখন কলকাতায়, কাজেই বিরহদশায় প্রচুর কমিউনিকেশন গ্যাপ চলেছে, মাঝে মাঝেই অসহ্য হয়ে ওঠে এই ফোন-দাম্পত্য। আমার শাশুড়ি বাধ্য হয়েছেন আমার মেয়েকে দেখার জন্য রাঁচিতে গিয়ে থাকতে , তাতেও বিস্তর অসুবিধে দু পক্ষের, যদিও কেউই সেকথা বলছি না। সব মিলিয়ে একটা কেমন অনিয়ন্ত্রিত খারাপ লাগা জমে উঠেছে। কলকাতার লেখালেখির পরিমন্ডল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াজনিত খারাপলাগা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, লেখালেখিকেই ধরেছুঁয়ে না থাকার কষ্ট, ইত্যাদি এরই সঙ্গে ছিল, তবু একেবারেই যে কিছু লিখছিলাম না, তা-ও তো নয়। কিন্তু কেন যেন এই কবিতাটা ফার্স্ট ড্রাফট হয়েই পড়ে ছিল, এগোয় নি আর।
ফাঁকা ফাঁকা একটি পাড়ায়, গাছপালা ঘেরা নিরিবিলি স্টীল অথরিটির কলোনির ভেতরে আমরা তখন থাকি। সন্ধে হলেই চরাচর ঢেকে যায় অন্ধকারে, বাংলোর চারিপাশে ছোট বাগান ও লন ভরে ওঠে কুয়াশাচ্ছন্নতায়। ঘরের মধ্যে আমরা পরিবারের শুধুমাত্র মহিলাসদস্য, শাশুড়িমা, আমি, মেয়ে ও কাজের মেয়েতি, দরজা জানালা এঁটে বসে থাকি টিভি চালিয়ে। সন্ধ্যা নাবার পর কোন ক্রিয়াকর্ম নেই। বাজার-হাট যাওয়া হয়না । সিনেমা থিয়েটারও নেই। সুতরাং পালাবার পথ টিভি। আমার মনে আছে, সন্ধেবেলা রোজ নিয়ম করে ‘রোজগেরে গিন্নি’ আর ‘এক আকাশের নিচে’ দেখা হত। জি বাংলা আর ইটিভি দুটোই পাওয়া যেত আমাদের কেবলে। মনে আছে , এই কবিতাটি লেখার সময়ে, এক আকাশের নিচে থেকে শুর করে আরো অনেক টিভি সিরিয়ালের ভেতরে অনেক অনেক নারীচরিত্রের লড়াই-আবেগ-সক্ষমতা-অক্ষ মতার মিডিয়াচর্চিত নতুন ট্রেন্ড দেখছিলাম, সচেতনে বুঝে নিতে চাইছিলাম আমার পরিপার্শ্বের মেয়েদের কথা। দেবলীনা কনীনিকা সমতা চৈতি ঘোষাল-দের মুখ দিয়ে যাদের আঁকা হয়, সেই সব বিবাহিতা, ডিজাইনার তাঁতের শাড়ি পরিহিতা, জীবনের নানা ঝড়ঝঞ্ঝায় বিক্ষুব্ধ, অতি বাস্তব কিন্তু অবাস্তব স্টিরিওটাইপ সব মহিলাচরিত্রের ভিড়ে, টিভি-নারীদের ভিড়ে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম একটা চেনা প্যাটার্ন। জীবনের সাফল্য আর অসাফল্যর নিরিখগুলো যাদের দ্রুত পালটে যাচ্ছে। যারা বেশি বেশি করে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মসচেতন। স্বামী বা সন্তানকে বাদ দিয়েও যাদের কামনার বস্তু হয়ে উঠছে অন্য অনেক কিছু। আর সমাজ তাদের সেই অনুমোদনও কোথায় যেন দিয়ে দিচ্ছে, নিজের জন্য বাঁচো, নিজেকে সুখ দাও, নিজের মত করে আনন্দ পাও। আবার, চেহারা বা ফ্যাশনেও যারা ক্রমশ একই ছাঁচের হয়ে উঠতে চাইছে। একই রকম জামাকাপড় পরতে চাইছে, একই রকম করে চুল কাটতে চাইছে। একই রকম করে চুলে ক্লিপ আটকাচ্ছে।

হঠাত একদিন লক্ষ্য করলাম, আমি নিজে যে রকম চুলের ক্লিপ আগে লাগাতাম সেইরকম আর লাগাচ্ছি না। আমার চুলে উঠে এসেছে পুরনো ধাঁচের ক্লিপের বদলে বাজারে নতুন বেরনো এমন একটা ক্লাচ, দাঁতনখ বার করা , কাঁটা কাঁটা একরকমের ক্লিপ , যা ছোট করে কাটা চুলের অবাধ্য গোছাকে যে কোন মুহূর্তে হাত দিয়ে মুচড়ে পেছনে নিয়ে গিয়ে গুটিয়ে একটা খোঁপার মত করে তাতে লাগিয়ে ফেলা যায় মুহূর্তের মধ্যে, আয়না-চিরুণি কিছুই লাগে না। এই যে চটজলদি সমাধানের মত জীবনের গতির সঙ্গে সঙ্গে পালটানো চুল-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাটি, এটা কোথায় থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল আমাদের মেয়েজীবনে। আমাদের চাকরি, পরিবার, স্বামী সন্তান ম্যানেজ করার সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে চুল ম্যানেজ করার সমস্যাও তো একটা ব্যাপার। সেই একটা অন্তত সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করে দিচ্ছিল ওই উঁচু চূড়ো করে চুল বাঁধার ক্লিপ বা ক্লাচ। যা বাঁধতে গেলে প্রথমত চুলটাকে ঘাড় অব্দি হতে হয়, বেশ খানিকটা ছোট, আর চুলে শ্যাম্পু করাও বাধ্যতামূলক।

তো নিজের কিছু কিছু অভ্যাস এইভাবে পাল্টাতে দেখেছি ঈষত অন্যমনস্কভাবেই। হঠাত একদিন লক্ষ্য করলাম ঐসব সিরিয়ালের নায়িকারাও একই রকম ক্লাচ ব্যবহার করে। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল যেন আমার। তারপর দেখি, হিন্দি ছবির নতুন নতুন হিরোইনরা, সেই সময়ের প্রিটি জিন্টা বা মল্লিকা শেরাওয়াতরাও ওই রকম ক্লাচ দিয়ে চুল বাঁধে। শেষ পেরেক আমার কফিনে পড়ল, যখন দেখলাম স্টার মুভিজ-এর কোন এক হলিউডি ছবিতে অ্যাঞ্জেলিনা জোলিও কথা বলতে বলতে নিজের লঘু বাদামি-সোণালি চুলের গুচ্ছ হাত দিয়ে পেছনে মুড়িয়ে ঠিক সেই ভঙ্গিতেই ক্লাচ আটকালো, যেমনটা ইদানীং আমি করি।

কেঁপে গেলাম। স্তম্ভিত হয়ে বুঝতে পারলাম, আমার প্রতিটি জেশ্চার, শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমা, প্রতিটি অভ্যাস আসলে কোন না কোন সূত্র থেকে কপি করা। তারপর থেকে সত্তর দশকের মেয়েদের সকলের চেহারার প্রতিসাম্য, ষাট বা আশির দশকের... সব দেখি, লক্ষ্য করি। যে কোন পুরনো সিনেমায় নায়িকার হাবভাব দেখি, আর বুঝি , সেই সময়ের প্রতিটি মেয়ের মধ্যে বয়ে গেছে সেই একই অদৃশ্য কানুনের ঢেউ, একই রকম আচার বিচার অভ্যাস । পঞ্চাশের দশকের সুচিত্রা সেন –এর টাইট সিল্ক ব্লাউজ আমার মায়ের কৈশোরের বা বিয়ের আগে পরের সাদাকালো ছবির সঙ্গে কী দারুণ মিলে গেছে। সত্তরের পিকনিক ছবির নায়িকা আরতি ভট্টাচার্যর ভয়েলের ছাপা শাড়ি আর দীর্ঘ চুল দেখে আমার অবধারিত মনে পড়ে আমার ন’মামিকে, ছোটপিশিকে। আমার শৈশবে দেখা অন্য ক্যারেকটারদের। এ ভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সময় আমাদের ফ্যাশনকে, জীবনচর্যাকে, আমাদের ব্যবহারকে অভ্যাসকে কী ভাবে আড়াল থেকে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে প্রভাবিত করেছে। কী ভয়াল তার অঙ্গুলিহেলন। আমরা তার ক্রীড়নক, তার দাসী।

এই সময়ের প্রেক্ষিতেই এবার আমি ভাল করে, ম্যাগনিফাইং গ্লাসের তলায় রেখে দেখি, আমার সময় আমাকে , আমার চারিপাশের আর সব মেয়েদের, কীভাবে নিয়ন্ত্রন করে চলেছে। আশে পাশে ২০০০ থেকে গজিয়ে ওঠা বড় বড় শপিং মল, তাদের রেডিমেড পোষাকের রেঞ্জ নিয়ে এসে আমাদের অনায়াসে বলে দিচ্ছে কী পরতে হবে কেমন ভাবে পরতে হবে। আর আমাদের সময়ের চিন্তার আবহ আরো বেশি আড়াল থেকে আমাদের বলে দিচ্ছে , কী বিশ্বাস করতে হবে। কী স্বপ্ন দেখতে হবে। কীভাবে আকাংক্ষা করতে হবে। কাকে আকাংক্ষা করতে হবে। কতটা ভাল থাকতে হবে। কতটা খারাপ থাকতে হবে। আমরাও আকাংক্ষাশ্রমিক হয়ে উঠছি।

এইসব লিখতে গিয়েছিলাম সেই ডায়েরির প্রথম ড্রাফটে, পারিনি। রেখে দিয়েছিলাম। তারপর আর কয়েক বছর কেটে গেল। ২০০৯-এর কোন এক সময়ে আমি যখন গৌহাটিতে, তখন কবিতাটি আবার বার করি। আবার মাজাঘষা শুরু হয়। একা একা কফি খাচ্ছে একটি বিবাহিতা মেয়ে , আমার ফার্স্ট ড্রাফটে এই ছবিটাকেই খুব ক্যাচি, সেক্সি, চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়েছিল। তাছাড়া নানা জায়গায় এমন সব অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ছিল যা থেকে আমার মনে হয়েছিল এই লিখে ফেলা লাইনগুলির কবিতাসম্ভাবনা আছে।

ঘষামাজার সময়ে আমি যে লেখাটি দাঁড় করিয়েছিলাম, তাতে “সময়” এই শব্দটা , লক্ষ্যনীয়, বার বার এসেছিল, যাকে , আমি, আমার মতে, আমাদের সর্বপ্রধান প্রেমিক/ নিয়ন্ত্রক/ ক্ষমতাময় চালক ভেবে কবিতাটি প্রথমবার ড্রাফট করি।

আপনার মতামত জানান