ভাগ ডিকে বোস

অভীক দত্ত

 

(সব চরিত্র কাল্পনিক, স্থান এদেশে না, হনোলুলু বা ম্যাডাগাস্কার কোথাও একটা হবে)

এই লাইনে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। যে কেউ, যখন তখন বিপদে ফেলে দিতে পারে। না আমি কিন্তু কোন মাফিয়া লাইনের কথা বলছি না। আমি বলছি লেখালেখির লাইনের কথা। এখানকার গোষ্ঠীবাজি বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি অনেক বিখ্যাত মাফিয়া গোষ্ঠীকে হার মানিয়ে দিতে পারে। আর এখানেও আছে কিছু ফ্রি এজেন্ট। যাদের কাজ হল বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ঢুকে সেই গোষ্ঠীগুলিকে ভেঙে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। এখানেও আছে কিছু মক্ষিরাণী। যাদের কাজ হল কয়েকদিন কিছু কচি ছেলের মাথা খেয়ে ঠিক সময় মত সটকে পড়া।
আমি অর্ণব বোস। অনেক ছোটবেলা থেকে কবিতা লিখি। কিন্তু কবিতা লিখে তেমন সুবিধা করতে পারিনি। কোন বড় জায়গায় আমার কবিতা বেরোয় নি। সেই বড় পত্রিকাটিতেও আমার কোন গল্প বেরোয় নি যেটায় বেরলে আমার মত সবাই নিজেকে ধন্য বলে মনে করবে। আর এই কারণেই আমি সত্যদাদের গ্রুপে প্রথম ঢুকেছিলাম। আমার গোষ্ঠীবাজির প্রথম হাতেখড়ি হয় সত্যদাদের গ্রুপে। সত্যদা ওই বড় কাগজে লেখে।তার সাথে নিজের একটা পত্রিকা চালায়। আমার মত অনেকেই ভেবেছিল সত্যদার গ্রুপে থাকলে ওই বড় কাগজে লেখা বেরনোর একটা শর্টকাট পাওয়া যাবে। আমার মত মানে আমি, পিয়াল, তন্ময়, সোহিনী। আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। সোহিনী খুব একটা ভাল দেখতে না। কালো। মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে। কিন্তু লেখে ভাল।ওখানেই প্রথম মদটা শুরু করি। সত্যদা মাঝে মাঝে খাওয়াত। মদ খেয়ে হত কবিতা পড়া। কার কবিতায় কি ভুল আছে সত্যদা দেখিয়ে দিত। কার অক্ষরবৃত্তে কয়টা অক্ষর কম পড়িয়াছে সত্যদা মদের ঘোরে যখন বোঝাত আমরা ভাবতাম স্বয়ং স্বর্গ থেকে মা সরস্বতীর মেল ভারসান এসে আমাদের কবিতা বোঝাচ্ছে। মাঝে মাঝে পিউদিও আসত। পিউদি সত্যদার এক বসের বউ। চকচকে স্কিন। অনেকটা মদ খেতে পারে আর সত্যদার কবিতা ভালবাসে। পীযূষদার গ্রুপের বিশ্বজিৎ একদিন আমাকে বলেছিল পিউদি আর সত্যদার ভেতরে একটা সম্পর্ক আছে। সেটা আমরাও যে বুঝতাম না তা নয়। হালকা হুইস্কির ঘোর হলে পিউদির ইডেন গার্ডেনসের মত খোলা পিঠে সত্যদা হাত বোলাতে বোলাতে জীবনানন্দ আর শঙ্খ ঘোষের মধ্যে পার্থক্য বোঝাত।
সত্যদা প্রথমে আমাকে প্রেসের কাজটা দিল।প্রেসের কাজ দেবার সময় দেখা গেল গ্রুপের বাকিদের রোজ ওই সময়টা কিছু না কিছু কাজ পড়ে গেছে। আমিই সাগ্রহে চেয়ে নিলাম। ভাবলাম বিরাট কিছু করে ফেললাম। প্রেসটা ছিল যাদবপুর এইট বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে। আর আমার বাড়ি শ্যামবাজারে। আমি রোজ কলেজ কামাই করে শ্যামবাজার থেকে যাদবপুর নিজের পয়সায় ঠ্যাঙাতাম প্রেসে যাবার জন্য। ভাবতাম বাংলা সাহিত্য উদ্ধার করছি।
একটা ঘুপচি ছোট ঘরে একটাই কম্পিউটার। আর হরলিক্সের ফ্রেমের মত চশমা পরে বিনয়দা ক্রমাগত টাইপ করে চলেছে। ঝড়ের মত। আমি গম্ভীর হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতাম। আধুনিক, নবাধুনিক, গতানুগতিক সব রকম কবিতার গুষ্টি উদ্ধার হত ওই কম্পিউটার স্ক্রিনে। আর আমি দেখে যেতাম ফার্স্ট প্রুফ, সেকেন্ড প্রুফ, থার্ড প্রুফ। মাঝে মাঝে ফোন কর সত্যদা খোঁজ নিত, “কিরে
কি খবর? তাড়াতাড়ি কর, বইমেলা তো এসে গেল, দিতে পারবে তো ওরা সাতাশের আগে?”
আমি নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে “হ্যাঁ হ্যাঁ” বলে দিতাম। বইয়ের কাজ হয়ে গেলেই মার্কেটে সবাই চলে এল। সবার কাগজ। একটা কোথাও ভুল থাকলে সব আমার দোষ আর ভাল হলেই কৃতিত্ব নিয়ে সবার বুক ছাপ্পান্ন ইঞ্চি। বইমেলায় ঝকঝকে মঞ্চে উদ্বোধনের সময় আমার কোন কাজ নেই। সবাই স্টেজে কবিতা পড়তে উঠছে। বইমেলা আর বই প্রকাশের এত তাড়াহুড়োয় সত্যদা ভুলেই গেছে আমার নামটা। অনুষ্ঠানের শেষটা দেখার জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকিনি, চুপচাপ বাড়ি চলে এসছিলাম।
আর এই বইমেলার ঠিক পরেই কমলকলির জন্য আমি পীযূষদার গ্রুপে ঢুকলাম। কমলকলি ফর্সা টুকটুকে একটা মেয়ে। সুন্দর মদ খায়, আর ওর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকলে কিচ্ছুটি বলে না। সত্যদার গ্রুপ থেকে গেছিলাম বলে কদিন আমার খুব যত্ন আত্তি হয়েছিল ওই গ্রুপে। সত্যদাও অবশ্য একদিন ফোন করে বলেছিল “কিরে তুই আজকাল আসিস না কেন? বর্ধমানে একটা ভাল কবিতাপাঠের আসরে যাবার আছে, তোকে নিয়ে যাব”।
আমি আর যাই নি, কমলকলির দিকে আমার আকর্ষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায়। পীযূষদার সাথে অবশ্য কমলকলির খুব ভাব। এদিক ওদিক যায়। মধুপুর, বেলিয়াতোড়। আমি ভাবতাম কমলকলিকে পীযূষদা নিজের বোনের মত দেখে। আমার মত অনেকেই তাই ভাবত। পীযূষদার বউ পাপিয়াদিও ভীষণ সুন্দরী। ওরকম বউ থাকলে আর কোন মেয়ের দিকে নজর যায় না। একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে। পীযূষদার আড্ডায় পীযূষদাও আসে নি। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঝপথে বৃষ্টি পেয়েছিলাম বলে ঠিক করে ফেলি পৌঁছে যাই, বাড়ি গিয়েই বা কি করব। গিয়ে দেখি কমলকলি বসে আছে। আমি সেদিন অনেকক্ষণ ওর সাথে গল্প করি। ও সবার সাথেই খুব বন্ধুর মত মেশে। কিন্তু বাইরে বৃষ্টি আর আমার ভেতরে তখন কালবৈশাখী। সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম “তোর কি বয়ফ্রেন্ড আছে?”
কমলকলি ওর চোখগুলি দিয়ে অনেকক্ষণ আমাকে বিঁধতে বিঁধতে বলেছিল, “কেন, তোর কি কোন ইচ্ছা আছে?” আমি আর কিছু বলতে পারি নি। চুপচাপ খানিকক্ষণ বসে উসখুস করে বাড়ি চলে এসছিলাম।
পরের দিন থেকে দেখি পীযূষদা আমাকে খুব একটা ভাল চোখে দেখছে না। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কেমন কথা শোনাচ্ছে “এখানে তো ছেলে পিলে সাহিত্যচর্চা করতে আসে না, কেউ কেউ মেয়েবাজিও করতে আসে”।
আমি বুঝেছিলাম। কিন্তু না বোঝার ভান করে ছিলাম। এক মঙ্গলবার পীযূষদা বলেছিল ও থাকবে না, বাইরে যাবে। আমি সেটা ভুলে গেছিলাম। আড্ডায় সেদিন কেউ আসে নি। আমি যথারীতি গিয়ে দেখি দরজাটা ভেজানো। কিছু না বুঝে দরজাটা খুলে দেখি কমলকলিকে কোলে নিয়ে বসে আছে পীযূষদা। দুজনের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত। আমার খুব বেশি জ্ঞান ছিল না।দরজা বন্ধ করে দে ছুট। কমলকলির কমলালেবুর মত বুকদুটো বেশ কয়েকদিন আমার চোখে ভাসছিল।
কিন্তু এই ঘটনার পরে মার্কেটে আমার নামে অনেক বাজে রটনা রটে গেছিল। আমি নাকি কমলকলির বুকে হাত দিয়েছি ফাঁকা ঘরে ইত্যাদি। আমি কয়েকদিন মোবাইল বন্ধ করে পালিয়ে পালিয়ে থাকতাম। চুপচাপ কলেজ করতাম। কিন্তু পারতাম না। ওই জগতটা আমাকে চুম্বকের মত টানত। বইমেলার সময় চলে এল আবার। আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
অনেক ভেবেচিন্তে পীযূষদা আর সত্যদা দুজনেরই বিরোধী শিবির অরুময়দার কাছে যাওয়া ঠিক করলাম। এই বাজারে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। বেশির ভাগ গোষ্ঠীরই নিজের নিজের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আর গ্রুপ চেঞ্জ করলে বেশ রাজকীয় সম্বর্ধনা পাওয়া যায়। লেখাটা বড় ব্যাপার না, গোষ্ঠীটাই বড় ব্যাপার এটা মোটামুটি বুঝতে পারছিলাম। অরুময়দা প্রতিষ্ঠানবিরোধী লোক। প্রতিষ্ঠানবিরোধীতাই তার ধর্ম। একগাল দাড়ি। তার গ্রুপের প্রায় সবারই দাড়ি। এই গ্রুপে আবার কিছুই হয় না। সবাই খালি বাকি গোষ্ঠীর লোকেদের গালাগালি করে। আমিও ফর্মুলা অনুযায়ী যথারীতি সবাইকে গালাগাল করলাম।বিশেষ করে আমার কমলকলি আর পীযূষদা সম্পর্কে অত্যন্ত রাগ ছিল। ওরাও আমার রাগকে উৎসাহ দিত। কিন্তু আমি জানতাম না কখন যে অত্যন্দ্রচন্দ্র ভাট আমার সব গালাগালগুলি মোবাইলে রেকর্ড করে রেখেছে।
একদিন আমরা যথারীতি গালাগাল শুরু করেছি, দেখি কমলকলি পীযূষদাকে নিয়ে হাজির। ভেবেছিলাম অরুময়দা ওদের খেদিয়ে দেবে। দেখি একবারে সাদর আমন্ত্রণ করে বসাল। আর তারপরে কমলকলি আমার নামে যা নয় তাই বলা শুরু করল। আমি নাকি ওকে একা ঘরে মদের ঘোরে রেপ করতে গেছি, আমি নাকি পীযূষদার গ্রুপে থাকাকালীন অরুময়দার নামে যা তা খিস্তি মারতাম ইত্যাদি ইত্যাদি। আইসিং অন দ্য কেক হল তখন যখন অত্যন্দ্রচন্দ্র ভাট আমার গালাগালগুলি ওখানে কমলকলিকে শুনিয়ে দিল। সবাই এমনভাবে আমাকে দেখতে লাগল যেমন মুরগী কাটার আগে মুরগীর গলাটা দেখে। আমার ওখান থেকে এক দৌড়ে পালানো ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
এই কবিতার জ্বালায় আমার পড়াশুনা গেছে। বাবা এখন বাড়ির লাগোয়া একটা দোকান করে দিয়েছে। সকাল বিকেল ওখানে দাদাদের লুকিয়ে জাপানি তেল বিক্রি করি আর বৌদিদের ন্যাপকিন।

কবিতা লেখার থেকে অনেক ভাল আছি এখন। কবিতার একশো আলোকবর্ষের মধ্যে আমি নেই। কবিতা দেখলে আমার অ্যালার্জি হয়। কবিতা কেউ আমার সামনে পড়লে আমি কামড়ে দিই।

আপনার মতামত জানান