দৃষ্টিছায়া এলাকা

দেবার্ক মণ্ডল

 

বর্তমানে আমরা উন্নত সভ্য আধুনিক মানুষ। বহু প্রচলিত এই বাক্যবন্ধটি নতুন কোন তথ্য নয়। বাক্যবন্ধটিতে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি বিশেষণগুলির বিপরীতে কিছু শব্দ আছে। এই সময়ের মানুষ হিসেবে আমাদের বিপরীতার্থক ওই বিশেষণ থেকে নিজেদেরকে আলাদা ভাবতেই ভালো লাগে। সভ্যতা ও সময়ের প্রগতির পথে এরকম কিছু বিযুক্তি বা নতুন কোন সংযুক্তি অনভিপ্রেত নয় বরং কাঙ্খিত একটি প্রক্রিয়া। ক্রমান্বয়ে সংশোধনের প্রক্রিয়ায় হয়তো খাঁটি জিনিস পাওয়া যায়। তা বলে সমস্ত খাঁটি জিনিসেরই কি ব্যাবহারোপযোগিতা আছে ? কাঁচা সোনায় কোনো অশুদ্ধি হয়তো থাকে না। কিন্তু পান খাদ বাদ দিয়ে পাওয়া এরকম সোনা থেকে অলংকারের জন্ম হয় না। সময় নিরপেক্ষভাবে খাঁটিত্বকে হজম করার মতো পাকস্থলী যদি আমাদের না থাকে তবে সময়োপযগী পান-খাদই এসে মিশুক আমাদের পছন্দের বিশেষণে বিশেষিত সমাজে। এতে সামাজিক স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। মানুষ খালি পেটে থাকলে তার বিকার লক্ষন একরকম হয়। আবার এরকম মানুষকে হটাত করে অত্যধিক পরিমানে খাওয়ালে তার অন্যরকম বিকার লক্ষন ফুটে ওঠে। মানুষটির সুস্থ স্বাথ্যের জন্য তার পাকস্থলীর সহনশীলতার দিকে খেয়াল রাখাটা জরুরি। শুধুমাত্র খাদ্যের জোগানই যথেষ্ট নয়। বর্তমানে আধুনিক এই যুগমানুষের চিন্তা জগতে ভিন্নতা এসেছে। নতুন চিন্তাকে স্বাগত জানানো, কখনো বা আগবাড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে বাহাদুরি করার মতো সাহস আমাদের আছে। কিন্তু আর্থসামাজিক ও অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আমাদের চিন্তাশক্তিকে যে মানবিকতার প্রশ্নপত্র হাতে পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে আমাদের সফলতার হার ক্রমান্বয়ে উর্দ্ধমুখী---সহজ অথচ স্পষ্ট আভিব্যাক্তিতে একথা বলার মতো সাহস কি আমাদের আছে ?

এখন আমরা ভালোবাসা বললে আর্চিস গ্যালারি বুঝি। বিবেকানন্দের পাঁচটা কথা মনে না থাকলেও বালজাক এর নাম জানা চাই। অর্চিস গ্যালারিকে কনো বিভীষিকা বা বালজাক নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় এমনটা আমার বলার বিষয় নয়। সমস্যাটা একটু আলাদা। তবে সচেতন থাকলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়।। আর্চিস-এর কার্ড,গোলাপ আর কোন নামি ব্রাণ্ডের চকলেট যখন ব্যর্থ হয়ে অনাদরে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে আমরা অনেকেই কেন তখন রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনি—তার আগে নয় কেন ? জীবনের উল্লাসে অনেকেই যারা সখের নাস্তিক, সময়ের উল্টো চালে মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার পরই কোন এক সময় তাদের মনে পড়ে---“নতুন ধর্ম বলছেঃ যে নিজেকে বিশ্বাস করে না সেই নাস্তিক”। বর্তমান আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দের নাম নেওয়া হল। আসলে বাঙালী তো তাই আপদকালীন সময়ে এদেরই শরণাপন্ন হতে হয়। বাচ্চাকে জোর করে দুধ খাওয়ানোর মতো শিক্ষিত করে তোলার প্রয়াস শুধু এ বঙ্গদেশে কেন অনেক জায়গারই পরিচিত প্রথা। রবীঠাকুর,বিবেকানন্দ এরা আজো আমাদের প্রাতঃস্মরনীয়---অত্যধি ক আড়ম্বরের সঙ্গে স্বর্গ তুল্য কোন দুরত্ব রেখে না হয় বার বার এদেরকে অস্বীকার করার মতো আঁতলামি করার মধ্যে দিয়ে এদেরকে আমরা স্মরণ করি। পরিচিত কোন বিনোদন পার্ক, রেস্তোরার সম্ভ্রান্ত পরকীয়া প্রেমে,ফেসবুকের কোন ব্যাক্তিগত গ্রুপে বা আঁতলামি করে তৈরী করা কোন ইস্যুতে এরা আজো আপরিহার্য। তবে এসব জায়গায় সাধারণত এই সমস্ত মানুষদের মহত্বকে তুলে ধরা হয় নিজের কদর,বলাভাল উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবেই।

“মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”—তাই বহু চাষার প্রাণ গেলেও এখনো আশা আছে। বর্তমানে আমাদের চিন্তা জগতে নবতম সংযোজন উত্তর আধুনিকতা। আধুনিকতা বরাবরই যুক্তি নির্ভর। যুক্তি বরাবরই নির্মমভাবে আবেগকে ভাঙতে চায়। এই নির্মম প্রয়াস থেকে বোঝা যায়,যুক্তি আবেগকে ভয় পায়। মুমূর্ষু রোগীর শুকনো দুর্বল পাকস্থলিতে আধুনিকতা তার যুক্তিবোধের লেঠেল নিয়ে জোর করে খাবার ঢোকাতে চায়---যদি কেউ জানতে পারে খাদ্যাভাবের কারণে মৃত্যু ঘটেছে---তাই খাদ্যের যোগান এখানে আশঙ্কা জনিত। উত্তর আধুনিকতা আশা করি কোন লেঠেল বাহিনী বা শিশুর মুখে জোর করে ঢোকানো কোন ঝিনুক বাটি হয়ে উঠবে না। হয়তো যুক্তিনির্ভর স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তা জগতের এই নয়া সংযোজনে আমরা সমাজ-স্বাস্থ্যের পরিপূরক আহারই গ্রহন করতে পারবো। যুক্তিবোধের মরুভুমিতে আবেগ আনুভুতির সচেতন প্রয়াসে মরুদ্যানের আশায় চাষিরা প্রাণ দিয়েছেন। উত্তর আধুনিকতার জলসিঞ্চনে তাদের আশা ফলপ্রসু হবে কিনা ? উত্তর-এর আয়ত্তের বাইরে এখন যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, যথাযথ সময়ই তার নেতিবাচক বা ইতিবাচক উত্তর দেবে।

আপনার মতামত জানান