ভোকাট্টা!

অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়

 


ছবি-অর্পিশ চট্টোপাধ্যায়


ছেলেটা ছুটছে। বাঁই বাঁই করে। হাঁটু পর্যন্ত কাদা। পেছনে আরও তিনজন। রাস্তা দিয়ে, পাঁচিল দিয়ে, নর্দমার ধার দিয়ে, কার্নিশ দিয়ে ওই আবার রাস্তায় এসে নামল। ততক্ষণে অন্য পাড়ার আরেক দলও সেখানে হাজির। সবার চোখ আকাশে।কিন্তু যে বস্তুটির জন্য এত কসরত সেটা সবাইকে ধোঁকা দিয়ে তক্ষুনি জড়িয়ে গেল একটা দেড়তলা বাড়ির বাংলাদেশ এন্টেনায়। তখন শুরু হলো কাকুতি মিনতি - ওই বাড়ির কর্তা, যিনি এখন ব্যস্ত ছাদে রাখা গাছের পরিচর্যায় - তাঁর প্রতি। "দিননা দাদু, আমিই প্রথম এসেছি"। "না দাদু, আমি প্রথম থেকে ছুটছি, ওটা আমার"। দাদু বিড়ম্বনায়। কিছুটা বিরক্তও। ছোঁড়াগুলোর কাজকম্ম নেই, সারাদিন টোটো। লোকটি বোধহয় একটু রসকষহীন। কোনো কথা না বাড়িয়ে জিনিষটিকে হাতে নিয়ে সোজা নেমে গেলেন নিচে। নতুন কেনা গোদরেজের আলমারির পেছনের দেয়ালে যে পেরেকটা আছে, সেখানে টাঙিয়ে দিলেন মুখপোড়াকে।
কিছুক্ষণ পর টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরল ভদ্রলোকের নাতি, যে বিকেলের ছেলেগুলোরই প্রায় সমবয়সী। ঘরে ঢুকেই তার চোখ পড়ল আলমারির পেছন থেকে উঁকি মারা রঙিন টুকরোটার দিকে। ব্যাগ নামিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, হ্যাঁ, যা ভেবেছিল তাই। হাত বাড়িয়ে বার করে আনলো জিনিসটাকে - হলুদঢালা শরীরের, বেগুনি মাথার আর কালো ল্যাজের একতে, মুখপোড়া ঘুড়ি।
হঠাৎ পুলকিত হয়ে, পরমুহুর্তেই আবার নিভে গেল ছেলেটি। সে ঘুড়ি ওড়াতে পারেনা। না, সে যে ক্যাবলা তা নয় - দিব্বি রেজাল্ট করে, ফুটবলে হাফ-এ খেলে, দুহাত ছেড়ে সাইকেল চালায়, কোচিং-এর সমবয়সী মেয়েদের সাথে আড়চোখে দৃষ্টি চালাচালি করে। এর কোনটাই আপাতভাবে ঘুড়ি ওড়ানোর থেকে সহজ নয়, কিন্তু তবু সে ঘুড়ি ওড়াতে পারেনা। কেন? তার চোখ খারাপ। হ্যাঁ সেই জন্যই। অবাক হবার মত শোনালেও, সত্যি। চশমা পরলেই মিটে যায় ব্যাপারটা, কিন্তু সে চশমা পরবেনা। ফ্যাশন বোধে আটকায়।আর তাছাড়া, চশমা চাপলেই "চারচোখো", "কানা", "দেড়-ব্যাটারী" ইত্যাদি অভিধা জুটবে, যেগুলো তার কাঙ্খিত নয়।
আসলে ব্যাপারটা এই যে - ঘুড়ি বেড়ে আকাশে ওঠার পরে ঘুড়ির মাথা কোনদিকে আছে মাইনাস পাওয়ারের চোখে তা সে ঠাওর করতে পারেনা। ফলত: ঘুড়ি নড়ে চড়ে লাফায় ঝাঁপায় নিজের খেয়ালে, শেষে বেআন্দাজ ছেলের লাটাইয়ের সবিশেষ টানাটানিতে বিরক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরে তাল বা নারকোলের মত উঁচু গাছের মাথা। হ্যাঁচকা টানে, ঘুড়ির মায়া ত্যাগ করে, সুতো ফিরে আসে লাটাইয়ের ঠিকানায়।
অগত্যা ছেলেটি ঘুড়িটাকে টাঙিয়ে আলমারির পিছনের পেরেকেই। যেকোনো কাউকেই দিয়ে দিতে পারত - বন্ধুবান্ধব, কাকু এমনকি বাবাও - যারা ঘুড়ি ওড়ায়, কিন্তু সেটা বোধহয় তার অক্ষমতাকে প্রকট করে তুলবে, এই সম্মানবোধে আটকায়; হয়ত বা কিছুটা হিংসেও কাজ করে। মোটকথা ঘুড়ি ফিরে যায় তার তার কিছুক্ষণ আগে পাওয়া ডেরায়। পাখার হওয়ায় দুলতে দুলতে, আলমারির পেছন থেকে টুকি-টুকি খেলতে থাকে কাগজের রঙিন পাখি। সেই থেকে সে সেখানেই।
কিশোরটি যে ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ থেকে একেবারে বঞ্চিত তা কিন্তু নয়। ওই যে বললাম - তার আসেপাশের প্রায় সবাই ঘুড়ি ওড়ায়। তাই হামানদিস্তেতে টিউবলাইটের কাঁচ গুঁড়ো, আঠা তৈরী, দুইয়ে মিশিয়ে মাঞ্জা বানানো, বেশি রাতের দিকে বা ঠাঠা রোদ্দুরে, যখন লোক কম চলে, ল্যাম্পপোস্ট থেকে ল্যাম্পপোস্টে টেনে মাঞ্জা দেওয়া, তারপর হাত দিয়ে বুঝে সময়মত সেই সুতোকে লাটাইয়ে জড়ানো, সবেতেই সে সবার সাথে হাত লাগায়। মাঞ্জার ধাক্কায় চুলচিরে যায় আঙুল, রক্ত গড়ায় টুপটাপ, চুষে নেই আঙুলটা - বীরের সম্মান দেয় নিজেকে নিজে।
এই করতে করতেই বিশ্বকর্মার দিন আসে। আকাশে বসে ঘুড়ির মেলা। রং-বেরঙের চিল যেন উড়ে বেড়ায় চরাচরে। ছাত-মাঠ-রাস্তা জুড়ে সকাল থেকেই পিকনিক। চা, ঘুগনি, আলুরদম থেকে মাংস-ভাত অবধি থাকে মেনুতে। তেতে-পুড়ে-ঘেমে-নেয়ে পৌরুষ দর্শায় বাঙালি। তেমন তেমন বাড়িতে নেমন্তন্ন করে আনা হয় ঘুড়ি বিশারদ দুরসম্পর্কের আত্মীয়দের। যেমন সেবার এলেন বাবাই-এর উত্তরকলকাতার জ্যাঠতুতো দাদা, যিনি আকাশের এক প্রান্ত থেকে টানতে শুরু করে, আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছনো অবধি সাফ করে দেন মাঝের সব ঘুড়ি। এই সব ঘুড়ি বীরদের হাতে পড়ে ঘুড়িগুলো স্বদর্পে ধেয়ে যায় একে অপরের দিকে; কখনো চ্যালেঞ্জার যেতে,কখনো হারেও। ভো--কা--ট্টা আওয়াজ ওঠে থেকে থেকেই। কেউ না কেউ তো জিতছেই। তুখোড় শিকারীরা আবার বধ করেই ক্ষান্ত হয়না, কেটে ফেলা ঘুড়ি লটকে, কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফেরে।
এই যে ছেলেটি, সে থাকে সব কিছুর মধ্যেই। সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত - কখনো নিজের ছাদে বাবা-কাকার লাটাই ধরে, কখনো বন্ধুদের ছাদে গিয়ে ঘুড়ি বেছে, সুতো খাটিয়ে, হাওয়া তাক করে ধোলাই দেয়। ভোকাট্টা চেঁচায় গলা চিরে। টুয়েলভথ ম্যানের কাজ করে মন দিয়ে। শেষ বিকেলে, আকাশ একটু ফাঁকা হয়ে আসলে, শত্রুপক্ষ জিরোতে বসলে, কোনো এক সহৃদয় সখা একটা ঘুড়ি আকাশে তুলে, টানটান হাওয়ায় রেখে, লাটাই ধরিয়ে দেয় তার হাতে। ভালোলাগায় শিরশির করে ওঠে গা; চোখ কুঁচকে ঘুড়ির মাথা বোঝার চেষ্টা করে সে। এবার সে কিছুতেই পড়তে দেবেনা, বশে রাখবে ঠিক। হঠাৎ আসা দমকা হাওয়ায় খেই হারায় সে। হাতের লাটাই থেকে সুতো ছেড়ে তাল রাখতে চেষ্টা করে। হয়না। সুতো উপড়ে, কুচকুচে কালো ঘুড়ি ভেসে যায় পশ্চিম আকাশের ডুবন্ত সূর্যর লাল আভাকে পেছনে রেখে। উড়তে উড়তে পেরিয়ে যায় কত পুকুর, মাঠ, মফস্বল, শহর, দিন, মাস, বছর, যুগ।
সেই গোদরেজের আলমারিটা বিদায় নিয়েছে যথাসময়ে। ওই দেড়তলা বাড়িটাতে আজ কেউ থাকেনা আর। সোনারং-এর ঘুড়িটাও শুকনা পাতার মত ঝরে গেছে কবে কোন অজান্তে। ধুলোধুসর দেয়ালে সে রেখে গেছে চারকোনা আদরছাপ।
ছেলেটা ঠায় দাঁড়িয়ে আগুনরঙা পশ্চিমে মুখ করে; ফিরতি হাওয়ায় ঘুড়ি ফেরার আশায়। ফেরেনা। কানের কাছে অনবরত বাজে - ভো--কা--ট্টা ! ভো--কা--ট্টা ! ভো--কা--ট্টা !

আপনার মতামত জানান