নজরুল কি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছেন

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 

‘আদরের নৌকা’-র সম্পাদক আমার কাছে জানতে চেয়েছেন নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমার ধারণা ঠিক কী। নজরুল ইসলাম আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁর মতো করে কবিতা লেখার চেষ্টা আশা করি কেউ করবেন না। বাংলা কবিতা নির্মাণের দিক থেকে আজ হাজার আলোকবর্ষ আরো পেরিয়ে এসেছে। আর, নজরুল ইসলামের গুরুত্ব কোনোকালেই কবিতার ফর্মে নয়, বরং কনটেন্টে, ভাববস্তুতে। হয়তো এর ফলেই তিনি সমকালেই জনগণের মন জয় করে নিয়েছিলেন অনায়াসে।
বলতে পারি, তাঁর তুঙ্গ সময়ে নজরুল ছিলেন বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। রবীন্দ্রনাথের ছন্দ এবং কাব্যভাষার দ্বারা বহুলাংশে আচ্ছন্ন হলেও, সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের চেয়েও। সেই জনপ্রিয়তার চিহ্নগুলো আজও দেখতে পাই। এখনও স্কুলের কলেজের অফিসের দেওয়ালে তাঁর সুদর্শন ছবি। চায়ের দোকানে তাঁর ছবি। যে মানুষগুলো কবিতার তোয়াক্কা করেন না, তাঁরাও নজরুলের ছবি ঘরের দেওয়ালে ঝোলান। একটা ‘সঞ্চিতা’ বাড়িতে রাখেন। আজও। আজও বিবিধ অনুষ্ঠানে তাঁর টগবগানো কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হয়। আমাদের পাশের বাড়িতে একজন গায়ক বাস করেন। তিনি শীত হোক গ্রীষ্ম হোক... নজরুলের এই গানটি সপ্তাহে একবার গাইবেনই... ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে...’
হায়! উনি যদি নজরুলের অন্যান্য গানগুলোও জানতেন! একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতাম। গতকালই বাংলাদেশ থেকে সিপাহী রেজা সম্পাদিত একটি ওয়েব ম্যাগে বললাম-
‘মনে আছে কৈশোরের সেই দিনগুলো। হাতে পেয়েছিলাম ‘সঞ্চিতা’। মনে আছে বুঁদ হয়ে থাকতাম। বিশেষ করে ‘সাম্যবাদী’-র কবিতাগুলো। মনে আছে অলস দুপুরে গায়ের রক্ত টগবগ করত। আফশোস হত, কেন ইংরেজ দেশ ছেড়ে চলে গেল, আমার বলিদানের অপেক্ষা করল না! সেই যে বুঝেছিলাম উচ্চারণের শক্তি, আজও তার রেশ মনে লেগে আছে। নজরুল আমার কৈশোরের ভালবাসার কবি। আমার কোনোদিন না হতে পারার নাম নজরুল।
ওঁর প্রেমের লেখা পড়লে বাংলা কবিতার যে কোনো কবিকে রক্তশূন্য মনে হয়।...“আলগা করগো খোঁপার বাঁধন, দেল ওহি মেরা ফাঁস গেয়ি” ... কে লিখবেন বলুন তো?
ওঁর কবিতা যে কোনো তাত্বিকতার বাইরে। যদি কেউ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে জাঁ পল সার্ত্রকে মিলিয়ে দেখতে চায়, সে মূঢ়। কোনো মানে হয় না ওই প্রয়াসের। একটা মানুষের বাঁচা, তার বাঁচতে চাওয়া, তার স্পর্ধা এবং অবরুদ্ধতা... ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পড়ার পরে মনে হয় একটা আশ্চর্য আমার সামনে দিয়ে বয়ে গেল, একজন বীরের জীবন, যে কবচ-কুন্ডল নিয়ে জন্মায়নি, তার রথে চাকা মেদিনী গ্রাস করতেই পারে, কিন্তু যুদ্ধটা সে করবে। তার আস্ফালন... হাস্যকরতাকে হাস্যকর করে তোলে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় আমার।
একটা ‘বিদ্রোহী’ লেখার পরে আর কিছু না লিখলেও তাঁর হত। ওই কবিতার স্বকীয়তার প্রতি মোহিতলাল মজুমদারের দাবি মাথায় রেখেই বলছি, আর কিছু নজরুলের না লিখলেও চলত।
কিন্তু সীমাহীন কবিত্ব নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন। তাঁর ত্রাণ ছিল না। একটি নক্ষত্র যেমন অকাতরে নিজের শক্তিকে নিঃশেষ করে, নজরুলও তাই করেছিলেন। অত না লিখলেও তাঁর কি চলত? চলত না। নিজেকে তাহলে তিনি কোথায় ফুরোতেন? এই দিক থেকে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় আরেকটি নামই আছে, তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই এসেছিলেন কবিত্বের অতিরেক নিয়ে, ফুরোতে ফুরোতে তাঁরা চলেছিলেন, আবার বলছি নক্ষত্রদের মতো।
আজ নজরুল ইসলামের কবিতা কেউ জাঁক করে পড়ে না। জীবনানন্দকে পড়ার মধ্যে যে শ্লাঘা আছে, তাঁকে পড়ার মধ্যে বুঝি নেই। অথচ জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ নজরুলের দস্তুরমতো প্রভাব ছিল।
তাঁকে এক সরলচিত্ত কবি হিসেবেই সবাই চিহ্নিত করতে চান। এই আমাদের অভিশাপ। একজন হোসে মার্তি বা লোরকার যা-যা প্রাপ্য, নজরুলের তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা ছিল না। আধুনিকতার ভুল এবগ অবক্ষয়ী ব্যাখ্যা এই মহান কবিকে সিরিয়াস আলোচনা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কবিতার স্বভাবজ স্বাদে আজ আমরা সন্তুষ্ট নই। নজরুল আমাদের কৃত্রিম আধুনিকতার পক্ষে বিপজ্জনক, সন্তোষজনক নন।’
আজ নজরুল ঠিক কবিতার মানুষ নন। তিনি সংস্কৃতির মানুষ। আবৃত্তির মানুষ। নজরুলগীতির লোকপ্রিয়তাও ক্রমহ্রাসমান। পড়ার বইয়ের বাইরে তাঁকে সহসা কেউ পড়েন না সম্ভবত। তাঁর বইগুলো খুব সস্তায় বিক্রি হয় বাংলা মিডিয়াম স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের জন্য। তাঁর বইয়ের দাম এখনকার দুগ্ধপোষ্য কবিদের চেয়ে ঢের কম, এবং দেখতে খুবই খারাপ।
আসলে এই সময়ের পশ্চিমবঙ্গীয় মেজাজের সঙ্গে নজরুল ইসলাম ঠিক মানানসই নন। এই মোবাইল-ফেসবুকের প্রজন্ম তাঁর রক্তঝরা কবিতাগুলো নিতে পারছে না। তাঁর প্রতিবাদের মতোই, তাঁর প্রেমও হয়তো এই সেক্স চ্যাট আর অ্যাস-ক্র্যাকের পরিসরে ঠিক একালীন নয়। এই হোয়াটসঅ্যাপ পিজ্জা-প্রজন্ম তাঁর কবিতার ধারই ধারে না। ঐতিহাসিকভাবে বিচার করে চুরুলিয়ার দুখু মিঞাকে সে আর কী বুঝবে! অথচ ধর্ম নিয়ে, সাম্যবাদ নিয়ে খুব সরল যে কথাগুলো তিনি বলেছেন, ভাবলে বুঝতে পারি আমাদের সমাজ আজও তা থেকে একটুও নড়েনি।
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী ! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’

এই কান্ডারী মমতা ব্যানার্জি হোন বা নরেন্দ্র মোদী, আমাদের শনাক্ত করতে দেরি হয় না।
‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন।’
আজ স্বরাজের বদলে আপনি পরিবর্তন পড়তে পারেন, সে রাজ্য হোক আর দিল্লি।
কে বলতে পারেন? -
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়।

উপরের লাইনগুলো যিনি লিখে গেছেন, তাঁর অমরত্ব নিয়ে যদি আমাদের সংশয় হয়, তাঁকে যদি আমরা সত্যিই ভুলে যাই, কবিতা লিখে আর লাভ কী?
সবচেয়ে বড়ো কথা, বাংলা ভাষায় বেঁচে থেকেই লাভ কী?

আপনার মতামত জানান