বিভেদ যেথায় সুরেতে মিলায়...

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

গতবছর শীতকালে, হঠাৎ করেই বাংলাদেশের নাম বড় বড় সংবাদ মাধ্যমের আন্তর্জাতিক খবরের পাতায়, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে... এমন কি বিবিসিতেও আসতে শুরু করেছিল নিয়মিত। হঠাৎ করেই একটা জাগরণ। উপমহাদেশ তো দাক্ষিণ্যের জায়গা। পশ্চিম থেকে সেখানে সাহায্য আর ত্রাণ আসে। কোনও প্রাকৃতিক দূর্যোগ, অথবা অন্যরকম কোনও গুরুতর অসহায়তার মধ্যে কিংবা পশ্চিমের রাজাদের ভ্রুকুটি হতে পারে এমন রাজনৈতিক টানাপোড়েন হ'লেই ওনারা এই দিকে ফিরে তাকান। সেই রকম একটা নিজের মনে থাকা ছোট্ট রাষ্ট্র বাংলাদেশ হঠাৎ করেই একটানা বেশ কয়েক দিন আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রথম পাঁচের একজন হয়ে উঠেছিল। কেমন একটা গণ-অভ্যুত্থানের গন্ধ... হঠাৎ করে একটা প্রতিবাদী মানুষের ভিড় ক্রমে বেড়ে উঠে দেশের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। একটাই শব্দ প্রতিধ্বনি করছিল বাংলাদেশের কোনে কোনে, বাঙালির মুখে মুখে, খবরের কাগজের পাতায় পাতায়, ইণ্টার্নেটের ব্লগে ব্লগে... শাহবাগ্‌... শাহবাগ্‌... শাহবাগ! এই জনজাগরণের সঙ্গে ঢাকায় যারা একের পর এক রাত জেগে কাঠিয়েছেন, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মাঝে... তাঁদের মধ্যে যাদের সঙ্গে পরিচয় আছে, তাঁদের থেকে নিয়মিত খবর নিতাম... আজ কি হ'ল, এখন পরিস্থিতি কি? অবস্থান কেমন? টিভি অথবা খবরের কাগজের সাজিয়ে বলা খবর না, একেবারে তাঁদের কাছ থেকে শুনতে ইচ্ছে করত, যারা শাহবাগে আছেন। ইজিপ্টের তাহরির স্কোয়্যারে যখন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সরাসরি গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, তখন ইজিপ্টের কিছু পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে এই ভাবেই খবর নিয়ে স্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করতাম। তখন মনে হ'ত এই শাহবাগেই বাঙালি আবার ইতিহাস রচনা করতে চলেছে... শাহবাগ চত্বরই বাঙালির তাহরির স্কোয়্যার, এই প্রজন্মের তিয়েনানমেন স্কোয়্যার।

আমি দেশভাগ দেখিনি, ৭১ দেখিনি, ভাষা-আন্দোলন দেখিনি, মুক্তিযুদ্ধো দেখিনি, মারিচঝাঁপি দেখিনি... এ সব কিছুর প্রতিই আমার পরিচিতি বইয়ের মধ্যে দিয়ে, সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে, ছায়াছবির মধ্যে দিয়ে, তথ্যচিত্রের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু শাহবাগ চত্বরে আমার প্রজন্ম, আমার সময়। যারা শাহবাগ আন্দোলনে সেইসময় অতন্দ্র রাত কাটিয়েছেন, তাদের মনে হয়ত ছিল 'রাজাকারের ফাঁসির দাবী', 'বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি', 'যুদ্ধ অপরাধীদের বাঁচানোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ', এমন আরও অনেক সঙ্গত কারণ। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে একটি অন্য মহৎতর উদ্দেশ্যের আভাস এই শাহবাগ চত্বর আমাকে দিয়েছিল... মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ রাষ্ট্র (যা মুসলিম প্রধান আরও একটি সৈরাচারী রাষ্ট্রের পরিত্যক্ত ভূমি হয়ে যেতে পারত) আজ একসাথে পথে নেমে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার দাবি করছে। নতুন প্রজন্ম ধর্মান্ধতা কাটিয়ে উঠে একসঙ্গে বলতে চাইছে 'আমরা বাঙালি... এ আমাদের বাংলাদেশ'। এই ঐক্য এতদিন ধরে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে চেনা এই দেশের এক মহৎ আন্দলোনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এক লাফে বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি দেখেছিলাম, বাংলাদেশেরই একাংশ এই অসাম্প্রদায়িকতার অঙ্গীকারকে ভয় পাচ্ছে। যারা ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি পেতে চাইছে তাদের বলছে নাস্তিক। এমনকি এই সাংবিধানিক ভাবে ঘোষিত অসাম্প্রদায়িক দেশ ভারতেও জামাত সমর্থকেরা খোদ কলকাতা শহরে এক জোট হয়ে শাহবাগ আন্দোলনে এই 'নাস্তিক'-দের বিরোধীতা করেছে। এই সাম্প্রদায়িকতার ধারক-বাহকদের ভয় দেখাতে পেরেছিলো শাহবাগ। ধর্মান্ধতাকে নিষ্পেষণ করে যারা অসহায়তার সুযোগ নেন... তাদের কিছুটা হলেও কোন ঠাসা করে দিয়েছিল। আমি সেই আগুন স্পষ্ট দেখেছিলাম আন্দোলনকারীদের চোখে - "একটা কাদের মোল্লা মরলে কিসসু হবে না... একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে... আদর্শ বাংলাদেশ,বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।"

কিছুদিন আগেই তো ২৬শে মার্চ গেল, তারপর নববর্ষ, পঁচিশে বৈশাখ, আরও কত কিছু একের পর এক। সব ছেড়ে হঠাৎ শাহবাগ এবং অসাম্প্রদায়িকতার অঙ্গীকারের কথা বলছি কেন? শাহবাগ বাংলাদেশকে নতুন করে চিনিয়েছে, আর কবিপক্ষে যে দু’জন কবির জন্মদিন পর পর আসে তাঁরা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। এক দিকে রবি ঠাকুর, যাঁর কথা আর নতুন করে কি বা বলব? দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, সমাজসেবক রবীন্দ্রনাথ... সারা জীবন আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন নিজের সামর্থের সবটুকু দিয়ে দুই প্রধান ধর্মের মানুষদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধটা বজায় রাখতে। আর একদিকে কবি, সাধক, শিল্পী কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই নিবেদন –
“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সবই ভাগ হয়ে গেছে শুধু
ভাগ হয়নিকো নজরুল”
আর কোনও কবিকে তো রক্তঝরানো দাঙ্গার মাঝেও এত আশা নিয়ে গান বাঁধতে শুনিনি সেই – “মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান”

রবীন্দ্রনাথের সামাজিক ঐক্যবোধ, ধর্মচিন্তা একটু অন্যখাতে বইত। উনি জানতেন জমিদার হিসেবে, কলকাতার প্রতিষ্ঠিত সমভ্রান্ত পরিবারের একজন হিসেবে ওনার একটা ক্ষমতা আছে, যা হেলাফেলা নয়। উনি সচেষ্ট ভাবেই তার ব্যবহার করতেন, জনগণকে প্রভাবিত করারও চেষ্টা করতেন তাদের হীতার্থে। সে বাংলাতে রক্ষা-বন্ধনের নতুন করে প্রচলন করাই হোক, কিংবা নবান্নের দিন ওনার জমিদারিতে হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা করা। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের নিখিলেশের মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে এই জমিদার রবীন্দ্রনাথই নিজের কথাগুলো বলতে চেয়েছেন। জমিদার হিসেবে প্রজাদের ওপর একটা অধিকার বোধ ওনার ছিল, এবং একই সঙ্গে শহর-গ্রামের মানুষ ওনার এই পিতৃসম স্নেহ এবং শাসন উপেক্ষা করতে পারতেন না। হিন্দু পরিবারের ছেলে বলে এমনিতে মুসলমান প্রজাদের থেকে মানসিক দূরত্ব থাকা স্বাভাবিক। তার ওপর প্রিন্স দ্বারকানাথের আমল থেকে জমিদারীতে নায়েব-গোমস্তারা হিন্দু প্রধান অঞ্চলে মুসলমানদের শোষণ চালাতো, এই সত্য জমিদার রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতায় নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদেশে জমিদারী সামলানোর দায়িত্ব আসার কিছুদিনের মধ্যেই নিজে এক জমিদারী থেকে আর এক জমিদারী ঘুরে বুঝতে পারেন, প্রজাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। মুসলমান প্রজাদের একাংশ তাঁকে অনুরোধ করেন ‘সাহাদের হাত থেকে শেখ দের বাঁচাতে হবে!’ তারপর সংস্কার আর সংস্কার... চেষ্টার পর চেষ্টা... জমিদার রবীন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, যা সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের থেকেও অনেক বেশি সম্মান দাবী করে। কিন্তু অপরদিকে নজরুল, দরিদ্র কাজী পরিবারের ছেলে... সত্যি বলতে ক্ষমতার প্রাচুর্য তাঁর কাছে সুদূর কল্পনা। তিনি তার নিজের জীবনের প্রতিটি ঘটুনা, নিজের বিশ্বাস, উপলব্ধি আর রেখে যাওয়া অজস্র গান আর কবিতার মধ্যেই নিজের মনের ভাবটা রেখে গেছেন... সেই এক ভাতৃত্ববোধের আহ্বান। নজরুল ইসলামের বিস্তৃত সাহিত্য চর্চা, সঙ্গীত চর্চা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইতিমধ্যে চর্চা এবং গবেষণা যে হয়নি তা নয়। এবং আশার কথা দুই বাংলাতেই কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলা অ্যাকাডেমি ইদানিংকালে নজরুল স্মৃতিতে সচেষ্টভাবেই অনেক কিছু করছেন। নিঃসন্দেহে এ আশার বিষয়, কিন্তু এখনও আরও অনেক কিছু করার জায়গা আছে বাংলাদেশের এই মহান জাতীয় কবির জন্য। শুধু সাম্মানিক কিছু প্রচেষ্টা নয়, ওনার স্বপ্ন, ওনার দর্শন এগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য, আগামী প্রজন্মের হাতে এই নজরুল-চিন্তা তুলে দেওয়ার জন্য আমরা দায়বদ্ধ।

মানুষের সংস্কার এমনই একটা জিনিস, যার থেকে বেরিয়ে আসা খুব মুশকিল। তার নিজেকে সচেষ্ট হ’তে হয়, সচেতন ভাবে নিজেকেই নিজে বোঝাতে হয়। আর সে যদি ধর্মীয় সংস্কার হয়, তা হ’লে সে তো চক্রব্যুহ। কাজী নজরুল, জন্মসূত্রে মুসলমান পরিবারের একজন ছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই ইসলামের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে ধর্মীয় সংস্কারবদ্ধতার অন্ধকার ছিল না। মসজিদ নিয়ন্ত্রিত মকতাব ও মাদ্রাসায় গেছেন, কোরান পাঠ করেছেন। নামেই কাজী আছে, ওনার পিতা ফকির আহমেদও কাজী ছিলেন। অল্প বয়সে পিতার মৃত্যুর পর নিজেই মসজিদের কিছু কাজের দায়িত্ব নেন, মুয়াজ্জিনের পদে ছিলেন। নিঃসন্দেহে কট্টর ধর্মীয় আচার আচরণ এবং গোঁরা মনোভাবাপন্ন লোকজনের প্রভাব ওনার ওপর পরার যথেচ্ছ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি হাঁটলেন সেই গোঁরা মনোভাবের একদম বিপরীত পথে। বাঙালির ভাষা বাংলা, সে যে ধর্মেরই হোক। কিন্তু এই মাদ্রাসা থেকে পড়া শুরু করা কাজী পরিবারের ছেলেটি ফারসী-উর্দুর বাইরেও পড়লেন সংস্কৃত। বিদ্রোহী কবির সেই বিদ্রোহময় সাহিত্য জীবন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার অভিযোগে কারাবাস... এসবের মাঝেই ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে প্রমিলা দেবীর সঙ্গে প্রনয় এবং বিবাহ। তাকি গোঁরা ধর্মীয় সমাজ মেনে নেয়? কিন্তু নজরুল নিজেই নিজের ধর্ম-মুক্ত দৃঢ়তার উদাহরণ। নিজের সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত জীবনে একদিকে মৌলভীদের রক্তচক্ষু অন্যদিকে সামাজিক সমালোচনার কোনওরকম গুরুত্ব না দিয়ে দৃঢ়-সংকল্প হয়ে ব্রাহ্ম পরিবারের প্রমিলাদেবীর সঙ্গেই ঘর বাঁধলেন।

তবে এই ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিপরীত স্রোতে সাঁতার কাটার যে সংকল্প, তার দৃঢ়তা বৃদ্ধির সাথে সাথেই উলটো দিকে ধর্মের ধ্বজাধারীদের মন একই ভাবে বিষিয়ে উঠতে থাকে। তাকে এই রক্তচক্ষু এবং কূটবাক্য আজীবন শুনতে হয়েছে কারও না কারও কাছে। কাজী নজরুলের মাতা, পুত্র বুলবুল একে একে চলে যাওয়ার পর তিনি একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ ঈশ্বরের পথ অন্বেষণে ব্যতিত করেন। তাঁর মত ইসলামী ধর্মীয় সঙ্গীত তৎকালীন আর কেউ রচনা করেছেন বলে নজির নেই। কিন্তু এরপরেই যখন তিনি হিন্দু ধর্মের মধ্যে আগ্রহী হলেন, রচনা করলেন ভক্তিগীতি শ্যামাসঙ্গীত। আর যায় কোথা... তার অসামান্য অবদান, এমন মধুর শ্যামাসঙ্গীত-এর সমাদর হওয়ার আগেই শুরু হ’ল নিন্দা। “মুসলমান নজরুল হিন্দুধর্ম গ্রহণ অরেছেন”... “কাজী কলকাতায় কালী পুজো করছে”... কেউ বলল বিধর্মী, কেউ বলল কাফের। ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর । সেদিন ছিল পবিত্র ঈদ-উল-ফিত্র । তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে প্রথমবারের মতো আজান ধ্বনিত হলো ইথারে বেতারে । কে ছিলেন এই প্রথম মুআজ্জিন ? কাজী নজরুল ইসলাম! হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সেই প্রবল দুঃসময়েও ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’থেকে শোনা যেত কোরান তেলাওয়াত। সে কার কণ্ঠস্বর? কাজী নজরুল ইসলাম । চারিদিকে নতুন নতুন উর্দু কাওয়ালীর মধ্যে নতুন সুরে মাতোয়ারা হয়েছিল বাঙ্গালী মুসলমানরা। যার নামেই ‘ইসলাম’ তিনি কি ইসলামের ভুল মানে করতে পারেন? উনি ইসলাম কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলেছেন, সে কেন শ্রেষ্ঠ তাও ব্যাখ্যা করেছেন চমৎকার ভাবে, আল্লাহ একমেবাদ্বিতীয়ম পরমব্রহ্ম... কি অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন সনাতন হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ইসলামের এই যোগ। সব ধর্ম এক, ঈশ্বর এক... পরম ধর্ম মনুষ্যত্ব। এই কথা গুলো মানুষ মনে রাখল না কেন? কেনই বা ওনাকে বার বার শুনতে হ’ল বিধর্মী, কাফের-এর মত বিশেষণ? ওনাকে যে আরও কত কিছু শুনতে হয়েছে, তার হয়ত সেই ভাবে তথ্য সংরক্ষিত নেই, কিন্তু নজরুল রচনাবলীর পাতায় পাতায় ওনার হিন্দু-মুসলিম ভাতৃত্বের আহ্বান, উনি কেন শ্যামাসঙ্গীত আর সুফি সঙ্গীত কে আলাদা করে দেখেন না... তার উত্তর পাওয়া যায়, ওনারই ভাষায়। তিনি সরাসরি বলেছেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই ।অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে । তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” এর থেকে সরল এবং সপাট স্বীকারোক্তি আর কি হ’তে পারে? যে সভায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ওনাকে সংবর্ধানা জানানো হয়েছে, সেই সভায় দাঁড়িয়ে ওনাকে বলতে শোনা গেছে, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের । আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু- মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।” জানিনা, এই সৎ চেষ্টার মানুষ কি মূল্য দিয়েছিল। এর পরেও তো ৪১শের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে হয়েছে, রক্তাক্ত নোয়াখালি, পাটনা থেকে লাহোর… কি জবাব দেব আমরা এই মানুষের কবি কে?

আসলে, এ তো আমরা সবাই জানি যে ধর্মর সৃষ্টিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আর যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাও তো মানুষই। তো একপাল ভেঁড়ার মধ্যে কেউ কেউ বিপথগামী হয়। মেষপালক নিজেও সৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে। এই ভাবে পবিত্রলগ্নে জন্ম সকল ধর্মে ঘুণ ধরে। মানুষের মানসিকতার ত্রুটি, চ্যুতি-বিচ্যুতি, অন্ধ-সংস্কার... সব একে একে পলীর মত জড় হয়। আর আমরা দেখি ঘোলা জলে ধর্ম নদী। এমন কোনও ধর্মের নাম কি করা যায় - যার মধ্যে ত্রুটি নেই? যা কোনওদিনও কারও রক্ত ঝরায়নি, কাউকে জ্যান্ত পোড়ায়নি, কোনও মায়ের অশ্রু ঝরায়নি। আমি ঈশ্বর বিশ্বাসী, আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বর চেয়েছেন এমন ধর্মান্ধতা নিয়ে তাঁর সন্তানেরা বাঁচুক। মহান কবি ছিলেন মানুষের কবি। কবি মাত্রই আবেগপ্রবণ। তার ওপর তিনি ছিলেন বিদ্রোহী। তিনি একদিকে যেমন চেয়েছিলেন বাঙালি নিজেকে হিন্দু বা মুসলমান নয়, চিনুক নিজেদের বাঙালি বলে, সেইরকমই আর একদিকে তাঁর দেখা দুই ধর্মের ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি সরব ছিলেন। মুসলিম লীগ যখন তাঁর সমর্থনের জন্য আসেন, তিনি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। গভীর দেশাত্মবোধ থেকে লিখেছিলেন ‘আমার লীগ কংগ্রেস’। এমন কি, নজরুলের ‘চিত্তনামা’ কাব্যগ্রন্থের সবকটি কবিতা ও গানই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অকালমৃত্যুর শোক থেকে লেখা। বইটি উৎসর্গও করেন নজরুল চিত্তরঞ্জন-পত্নী বাসন্তী দেবীকে। এর ‘ইন্দ্রপতন’ নামক দীর্ঘ কবিতাটি যখন প্রথম আত্মশক্তি পত্রিকায় ছাপা হয় (১২ আষাঢ় ১৩৩২) তখন এতে এমন কয়েকটি পংক্তি ছিল যাতে চিত্তরঞ্জন দাশকে পয়গম্বরদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পরে কারো কারো আপত্তি-সমালোচনার মুখে গ্রন্থভুক্ত করার সময় নজরুল কবিতাটি থেকে উক্ত পংক্তি ক’টি বাদ দেন। কবি মাত্রই আবেগ প্রবণ, মজার কথা আমরা কথায় কথায় কতজন কেই তো অবতার বল, ঈশ্বরপ্রেরিত বলি। কিন্তু কবির আবেগ থেকে বেরিয়ে আসা পয়গম্বর শব্দটি সেদিন সমাজ মেনে নেই নি। এত কিছুর মাঝেও, তিনি কোনওদিনও চান নি, ওনার কোনও একটি সিদ্ধান্তের জন্য ইতিহাস তাকে মুসলমান কবি বলে চিনুক। তিনি তাঁর দৃঢ় সংকল্পে সার্থক, মুসলিম নয়, হিন্দু নয়... মানুষের কবি নজরুল।

আজ এই প্রজন্মতে এসে, তাঁর আরও একটি জন্মজয়ন্তীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ওনার কবিতা, গান, অমর সৃষ্টি এবং সাহিত্যবোধ নিয়ে নতুন করে কি লিখব জানি না। বর্তমান ভারতবর্ষকে দেখছি, বাংলা কে দেখছি, বাংলাদেশকে দেখছি, বাঙালিদের দেখছি... আর বার বার মনে পড়ছে এই অসাম্প্রদায়িক কবি কেন শুধুই জাতীয় কবি একটি দেশের, কেন বাঙালি সমাজের আদর্শ নন। সারাজীবন ব্যক্তিগত পারিবারিক শোক জয় করে, বহু কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়েও যিনি সংস্কারাচ্ছন্ন হননি... বার বার বলেছেন ধর্মীয় ঐক্যের কথা, নিজে ‘কাজী’ হয়েও গেয়েছেন “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন”, কেন তিনি শাহবাগোত্তর বাংলাদেশে সেকিউলারিজ্‌মের প্রতিভূ হিসেবে প্রাসঙ্গিক নন? কেন পশ্চিমবঙ্গে নজরুল জয়ন্তী মানে কিছু কবিতা আর ক’টা গান?
নজরুল জয়ন্তী মানে কি দুই দেশে কেবল আবৃত্তি- সঙ্গীতানুষ্ঠানের একটি দিন, এই ভাবে বিদ্রোহী কবিকে স্মরণ করা? অথচ ‘সেকিউলার’ ভারবর্ষেও (যেখানে এতগুলো অঙ্গরাজ্যে প্রতিটি ভাষায় কবি-সাহিত্যিক- সংগীতকারদের ভিড়) সাংস্কৃতিক প্রতিভূ হিসেবে যিনি বাস্তবিক ভাবে অন্য অনেকের থেকে ওপরে, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম! আর সব প্রতিভার ঊর্দ্ধে তাঁর উৎকৃষ্টতম সত্ত্বাটি ছিল, তিনি নিজেকে শুধু মানুষ হিসেবেই চিনেছিলেন এবং চেনাতে চেয়েছিলেন। আশেপাশের সব ধর্মের রঙে ক্রমশ ম্লান হয়ে যাওয়া মনুষ্যত্বের রঙটা চিনতে চেয়েছিলেন বার বার। সাহিত্যে-গানে এবং নিজের জীবনে রেখে যাওয়া এই আন্তরিক ঐক্যবোধের যে প্রতিষ্ঠা, তা আজকের এই সাম্প্রদায়িক দুর্দিনে অনেক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ধর্মের নামে রাজনীতি যে উপমহাদেশকে জীর্ণ করে রেখেছে, তার সামনে নজরুল কে অনেক বড় করে তুলে ধরা কর্তব্য ঐক্যের প্রতীক হিসেবে, এই সহজ সত্য আজ কেন ব্রাত্য? ভেবে পাই না, এত বড় একজন ঐক্যের-ভ্রাতৃত্বের দ্যূত, কি ভাবে শুধুই কবি/সঙ্গীতকার হিসেবে থেকে গেলেন (আর একটু বেশি সম্মান ‘বিদ্রোহী কবি’ নাম)। ঠিক এইটুকুই যেন ছাত্র-ছাত্রীদের মনে রাখা দরকার স্কুলের বই মুখস্থ করার সময়। ভারত সেকিউলারিজ্‌ম নিলো, কিন্তু সেই পথ হ’ল ধর্মের ধ্বজাধারীদের খুশি করা পথ, ভোট-ব্যাঙ্ক রাজনীতি... সাধারণ মানুষ সেই একই তিমিরে। হ্যাঁ লাভের লাভ আগের থেকে একটু বেশ মন খুলে নিজের কথাটা বলতে পারে। তবু তো সলমন রুশডি নির্বাসিত, তবু তো আমরা তসলিমা কে ফিরিয়ে নিতে অক্ষম। আর বাংলাদেশ, শাহবাগ চত্বর... গণজাগরণের মধ্যে দিয়ে যার নামই হয়ে উঠেছিল প্রজন্ম চত্বর। একটা প্রজন্মের অনুপ্রেরণা! সেখানে নজরুল কীভাবে থাকবেন সকলের মাঝে? বাঙালিদের বাংলাদেশ কি কোনওদিনও সত্যিই উঠতে পারবে ‘সংখ্যা-লঘু’, ‘সংখ্যা-গুরু’-র মত চিহ্নিত করণের ঊর্দ্ধে? ভারতবর্ষ কি পারবে সংখ্যাতত্ত্ব আর শতকরা হিসেবের ঊর্দ্ধে উঠে মানুষকে আগে মানুষ বলে চেনার সাংবিধানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে? যেই দেশ ওনাকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দিয়ছে, তারা অন্ততঃ ওনার আদর্শে সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক দেশ হয়ে উঠুক। আমি আশাবাদী। শাহবাগ চত্বরের সেই জ্বলন্ত মোমবাতীগুলো এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে কোনও ধর্ম নয়, মানুষ আর মনুষ্যত্ব শেষ কথা। সেই মোমবাতীর আলো যেন দুই বাংলাতেই জাজ্জ্বল্যমান থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই অগণিত মোমবাতির একটিকেই তুলে এনে ওনার পায়ের কাছে রাখলাম। উনি দেখুন, এখনও আলো নেভেনি।

আপনার মতামত জানান