কলকাতার কাছেই

প্রবুদ্ধ বাগচী

 



সদ্য শেষ হওয়া শারদোৎসবের অষ্টমী সন্ধ্যা । আলোকমালা থেকে দূরে , প্রায় নির্জনে আমি হাঁটছিলাম । শহরের মূল লাইফলাইন থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে এক জনপদের রাস্তায় । মিনিট দশেক হাঁটার পর রাজপথের আলোকসজ্জা উধাও, পুজো প্যান্ডেলের মাইকের আওয়াজ আর তেমন শোনা যায় না । শুনশান চওড়া রাস্তার একদিকে উঁচু পাঁচিল, তার ওপারে বিমানবন্দরের বিমানগুলির বিশ্রামস্থল, পরিভাষায় যাকে বলে হ্যাঙ্গার । অন্যদিকে যতদূর চোখ যায় নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট বাড়ি । পুজোর অবকাশে সেই নয়া বসতের প্রাণ চাঞ্চল্য তখন মুলতুবি । অসমাপ্ত কংক্রিটের ধাঁচার পাশে ইট, বালি , সিমেন্টের অবিন্যস্ত স্তূপ । কোথাও বা তিন দিয়ে কিছুটা ঘেরা । ওরই মধ্যে একটা লোহার চেয়ার পেতে বসে আছেন এক নিরাপত্তারক্ষী । রাত আটটার নিরালা রাস্তা দিয়ে মাঝে মধ্যে পাবলিক বাসের আনাগোনা । অথবা উৎসবে ভেসে যাওয়া শহরের দিকে ছুটে যাওয়া তীব্র মোটর বাইক ।
রাস্তায় হলুদ বাতিস্তম্ভের নিচে একটা বিষণ্ণ চায়ের দোকান । অষ্টমীর সন্ধেতেও পথ চলতি দুয়েকজন বাইক আরোহী বা সাইকেল চালক হয়তো সাময়িক গলা ভেজাতে পারেন এই প্রত্যাশায় দোকান খোলা । নীচু ভলিউমে এফ এম রেডিও তে গান বাজছে । দোকানের বেঞ্চিতে বসতে বসতেই হুটারের শব্দ । না, কোনও ভি আই পি নন , একটা সাদা রঙের অ্যাম্বুল্যান্স । এলাকার সাংসদের দান । আহারে ! এই শহর জোড়া উৎসবের কলরোলে ওই বিপন্ন রোগীটি ঠিক ঠিক পরিষেবা পাবেন তো ? বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে ওঠে । বেঞ্চিতে বসি । চা বলি । অসময়ে এমন এক খদ্দের পেয়ে চা দোকানি বিস্মিত, হয়তো কিছু খুশিও । এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেতে দশটাকা লাগে । পুজোর বাজারে হঠাৎ করে মানুষের হাতে কিছু বাড়তি পয়সা আসে, তাতে জিনিসের দাম বেড়ে যায়, পুজোর কদিন । রাস্তার মোড়ে যে ছেলেটা শালপাতার ঠোঙায় ঘুগনি বেচে, পুজোর কটা দিন তার পাঁচ টাকার ঘুগনি দশটাকা হয়ে যায়, ফুচকা ওয়ালা পাঁচ টাকায় তিনটের বদলে এই কয়েকদিন দশ টাকায় চারটে ফুচকা বেচেন । ক্রেতারা মেনেও নেন । ওই বাড়তি লাভ আবার তার খরচ হয় অন্য খাতে । পুজোর অর্থনীতি এইরকম । এই দোকানিই বা তার ব্যতিক্রম হবেন কেন ?
নিঝুম রাস্তার ধারে চা গুমটিতে বসে চা খেতে খেতে কথা জমে । উল্টোদিক থেকে একদল সাইকেল আরোহী এসে পড়ে হই হই করে । এঁরা সকলেই শহর থেকে উজিয়ে চলেছে প্রান্তের দিকে । পোশাকে আশাকে কিছুটা ক্লিন্ন । একটু আড়ষ্ট হয়েই জানতে চাই এঁদের গন্তব্য । এই যে রাস্তাটার ধারে আমরা বসে আছি এটা সিধে গিয়ে ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুদিকে । একটা ভাগ চলে গেছে বিদ্যাধরী খাল (আদপে যা একটি প্রাচীন নদী ) পেরিয়ে ভাঙর ভোজেরহাট অর্থাৎ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা । অন্যটা গেছে খড়িবাড়ি, লাউহাটি হয়ে শাসন এলাকায়, উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার আরেকটা প্রান্ত। মাঝের এই অংশটায় যেসব এলাকা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে গেছে এই পথ তার বেশির ভাগটাই রাজারহাট নিউটাউনের অন্তর্গত । চাষের জমি দখল করে এই উপনিবেশের সূত্রপাত হয়েছিল অনেক বছর আগে, নব্বই দশকের শেষাশেষি । তখন স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না, বুম হাতে সাংবাদিকরা ছিলেন না। অবশ্য সংবাদপত্র ছিল, ছিল তাঁদের সাংবাদিকরাও--- কিন্তু কিছুটা আনমনা । রবিঠাকুরের গানের ভাষায় বললে : আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে --- সেই ঘুমের সুযোগে, যারা সত্যিই ওখানে ছিলেন, তাঁরা একদিন ভ্যানিশ হয়ে গেলেন । কিন্তু ভ্যানিশ হয়ে গেলেন কোথায়? ওই একদল সাইকেল আরোহীর মুখে জানা গেল সেই বেত্তান্ত ।
ওই দখল হওয়া জমির মালিক ও বর্গাদাররা রইলেন, তবে আরও একটু দূরে সরে গেলেন । নিউটাউনের প্রাসাদোপম আবাসনগুলিতে যখন অস্তগামী সূর্যের ছায়া পড়ে তখন সেই ছায়া লম্বা হতে হতে পুবদিকের যে মানচিত্র তৈরি করে, সেই মানচিত্রের অঙ্গীভূত হয়ে গেলেন ওই মানুষগুলো । তাঁদের প্রান্তীয় বাসভূমি থেকে এখন দেখা যায় নিউটাউনের প্রাসাদচুড়ো । এই যুবকরা সেই নয়া উপনিবেশের বাসিন্দা । বাপ ঠাকুরদারা জমি জিরেতের আয়ে চালাতেন , এঁরা তো তাতে অভ্যস্ত হননি । এঁরা সকাল হলে সাইকেল চালিয়ে চলে যান শহরে । শহর মানে নয়া বসত । একদিকে যার সীমানা বিমান বন্দর ছাড়িয়ে মধ্যমগ্রাম, অন্যদিকে ভি আই পি রোড বরাবর বাগুই আটি , কেষ্টপুর ছাড়িয়ে লেকটাউন, বাঙ্গুর । পুব দিকে একটু ঢুকে নতুন উপনগরী । এই জনপদ ক্রমশ প্রগতির পথে আগুয়ান । প্রতিদিন নতুন নতুন আবাসনের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে হোটেল, রেস্টুর্যািন্ট , শপিং মল । বড় বড় ফুড চেন, রিটেল চেন, বেসরকারি হাসপাতাল । এইসব বিনিয়োগে এক ধরনের কর্ম সংস্থান হয় বইকি । আবাসনে লাগে পাহারাদার, যার ভদ্রস্থ নাম সিকিউরিটি গার্ড, হোটেল রেস্টুরেন্টে কত ধরনের কাজের লোক, শপিং মলের দোকানে বাহারী পোশাকের কর্মচারী, ফুড চেনে প্যাকেট বন্দি খাবার বাড়ি বাড়ি হোম ডেলিভারি করবার লোক । কত বিচিত্র জীবিকা । ওই সাইকেল আরোহী যুবকদের প্রায় প্রত্যেকেই এইরকমই কোনও না কোনও জীবিকায় সংলগ্ন । সকাল হলে সাইকেল চালিয়েই এঁরা চলে যান কর্মস্থলে, এতে বাসের যাতায়াত ভাড়াটা বাঁচে । তারপর কাজ । কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই অবশ্য । এই যেমন অষ্টমীর সন্ধ্যায় যারা এখন বাড়ি ফিরছেন তাঁরা বাড়ি ছেড়েছিলেন সপ্তমীর দুপুরে । কেউ কেউ সারারাত ডিউটি করেছেন হোটেলে, পানশালায় । কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার দুপুর থেকে ডিউটি । এই সন্ধের মুখে ছুটি পেয়ে শ্রমসিক্ত শরীরে তাঁরা যখন ঘরে ফিরছেন তখন মহানগরে অষ্টমীর রাত উদ্বেল হয়ে উঠেছে আনন্দে আর উচ্ছলতায় । অবশ্য এই জনহীন রাস্তায়, চায়ের দোকানের নিরালায় সেই কার্নিভালের ছোঁয়াচ নেই । তবে সাইকেলের প্যাডেলে পা ঠেলে ঠেলে এবার তাঁরা ফিরবেন নিজেদের গ্রামে, হয়তো সেখানে একটা গ্রামের পুজো ; অবশ্য এই দলের মধ্যে আছেন কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবক, শ্রমের তো আর কোনও সম্প্রদায় হয় না , কে জানে হয়তো তারাও মেতে উঠবেন পুজো মণ্ডপ ঘিরে, খানিক জটলা করবেন, বিনোদনে ভেসে যাবেন সাময়িক । আবার সকাল হলে যখন রাতজাগা শহর নিশ্চিন্ত নিদ্রায় জমাট এবং নবমীর আমিষ ভোজনের পরিপাটি স্বপ্নে মশগুল দলে দলে সাইকেল পাখিডাকা রাজপথের কিনার দিয়ে, সাঁ করে নভোনীলে বিলীন হয়ে যাওয়া বিমানের ঝাপট গায়ে মেখে এসে পড়বে ভি আই পি রোডে । সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়বে চার পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের জনপদে, ছড়িয়ে পড়বে বিপণিতে, আবাসনে ।
কথায় কথায় ওই চেয়ার পেতে বসে থাকা নিরাপত্তারক্ষী এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের জমে ওঠা আলাপের মধ্যে । দোকানি ভাবলেন আর এক রাউন্ড চা হলে আরেকটু বাড়তি বিক্রিবাটা --- পুজোর জমজমাট সন্ধ্যায় তিনফুটের চা আর বেকারির সস্তা বিস্কুট কে আর খেতে চায় ? চা এল আবার । ওই নিরাপত্তারক্ষীকে জিজ্ঞাসা করি, পুজোয় আপনার ছুটি নেই ?
অল্প হাসলেন । ছুটি কোথায় ? বরং এই সময় দায়িত্ব আরও বেশি । অন্য সময় আমরা তিনজন থাকি । এখন বাকিরা দেশে গেছে ... এই মালপত্রের সব দায়িত্ব আমার !
মালপত্র মানে ইমারতি দ্রব্য । স্টোন চিপস, বালি, সিমেন্ট, লোহার রড । পুজোর কটা দিন লেবাররাও থাকে না , বুঝলেন ?
তা, বাকিরা ছুটি পেল, আপনি পেলেন না ?
ওদের বাড়ি সব দূরে দূরে । বলতে গেলে আমি কাছাকাছিই থাকি । এই ধরুন, সাইকেলে মিনিট পনের ।
তার মানে আপনাকে সারাদিন এইসব আগলে বসে থাকতে হয় ? পাল্টা প্রশ্নে আমি বিস্মিত ।
মাঝবয়সের মানুষটি বলেন, না সারাদিন নয় । দুপুরে খেয়ে দেয়ে এসে এখানে বসি, সারারাত থেকে একটু বেলায় বাড়ি যাই । আবার খেয়ে দেয়ে চলে আসি ... কাজ তো শুধু বসে থাকা ।
চা ওয়ালা দোকানি ফুট কাটে , আর ক’টা মাস কষ্ট করো । তারপরে তো হাউসিং এর একেকটা ব্লক চালু হয়ে যাবে, লোকজন এসে যাবে । তখন লম্বা লোহার গেটের সামনে সং সেজে বসে থাকবে, বাবুরা এলে গেলে সেলাম দেবে । মাইনে পত্তর নিশ্চয়ই কিছু বাড়িয়ে দেবে তোমার মালিক!
ফাঁকা রাস্তায় জোর গতিতে মোটর বাইক চালিয়ে ভি আই পি-র দিকে ছুটে যায় এক দম্পতি । মাঝ বয়সী মানুষটি আপন মনেই বলে ওঠেন, দেখেছো কান্ড ! একটা অ্যাক্সিডেন্ট বাধিয়ে ছাড়বে !
চা দোকানি বলে, বাইকের সিটে বসলে সবাই নিজেদের পাইলট ভাবে বুঝেছো ! পাশাপাশি এয়ারপোর্ট তো !
বলতে বলতে উঁচু প্রাচীরের ওপারে প্রকান্ড বিমানের ডানা দেখা যায় , আস্তে আস্তে গড়িয়ে আসছে হ্যাঙ্গারের দিকে । লম্বা উড়ানের আগে যন্ত্রেরও বিশ্রাম প্রয়োজন । পুজোর ছুটিতে মাঝ বয়সী সিকিউরিটিকে ডিউটি করতে হয় টানা আঠারো কুড়ি ঘণ্টা ।
বিনিয়োগ, অর্থনীতি, মজুরি, শ্রম সব নিয়ে যখন একটা নতুন ডিসকোরসের কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, উসখুস করে ওঠে ওই সাইকেল আরোহী যুবকরা । দাদা, এবার উঠি । এখনও মিনিট কুড়ি সাইকেল চালাতে হবে । সত্যিই তো, এঁদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি । নিজের মধ্যে সংকোচ বেড়ে ওঠে, বলি, হ্যাঁ, আপনারা এগোন ।
ওদের মধ্যে একজন বলে ওঠেন, গতকাল দুপুরে বেরিয়েছি জানেন তো ! পরপর দু শিফট । আবার কাল দুপুরের মধ্যে ঢুকতে হবে ।
আবার হিসেব করতে বসি, কতক্ষণ কাজ করেন এঁরা ? আমাদের উন্নয়নের মানচিত্রে এই স্থলভূমিটা খুব অস্পষ্ট বোধহয় । ভাবতে ভাবতে উঠে পড়েন ওঁরা । সত্যি ওদের এখনও অনেকটা যেতে হবে । আবার কাল থেকে ডিউটি । পুজোর শহরে এমন কিছু শ্রম সিক্ত মানুষের স্বেদ না মিশলে বোধহয় আমোদ জমে না । ওই সিকিউরিটি ভদ্রলোক বলেন, আমিও যাই, চেয়ারে গিয়ে বসি । সারারাত থাকতে হবে । এখন সবে ন’টা ।
সারারাত আপনি কি এই চেয়ারে বসে থাকেন নাকি ?
বিষণ্ণ প্রৌঢ় বলেন, ওই মোটামুটি সাড়ে এগারোটা বারোটা অবধি রাস্তার ধারেই বসে থাকি । তারপর রাস্তায় গাড়ি, লোকজন কিছুই আর থাকে না । তখন ওই ভিতরের দিকে একটা ঘর আছে, ঘুপচি মতো, ওখানে গিয়ে বসি । খুব মশা জানেন তো ! তিষ্ঠোতে দেয় না ... রোজ রোজ মশার ধুপ কিনব কোত্থেকে ! ওই ডিমের ক্রেটগুলো জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিই । ভোরের দিকে ঘুম ধরে যায়, তখন ওখানেই চিৎপাত হয়ে যাই ।
চা এর দোকানি বলে, কর্তা, কথায় কথায় রাত হয়ে যাচ্ছে ! ন্যান, এবার ঝাঁপ ফেলব !
আমি বলি, আপনার বাড়ি ?
আমার ওই ভি আই পি র ওপারে । বাগুই আটির খালটা আছে না, ওরই পাশে । আজ আবার ছেলে বউ নাতনিটাকে নিয়ে হোল নাইট ঠাকুর দেখতে বেরোবে । আমরা কর্তা গিন্নি বাড়ি সামলাব।
কথা বলতে বলতে দুধের গামলা, কাঁচের গেলাস, চা ভেজানো ডেকচি ধুতে থাকেন উনি । ন্যাকড়ার পুটুলিতে জমানো চা পাতার পিন্ডটা ছুঁড়ে ফেলেন রাস্তার পাশের নর্দমায় --- এই ছুঁড়ে দেওয়ার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন আক্রোশ আছে কি ? কে জানে ?
হলুদ হ্যালোজেন আলোয় ধুয়ে যাওয়া পিচ রাস্তা দিয়ে ফিরতে থাকি আমি । আবার মাইকের শব্দ, ঢাকের বাদ্যি, ফিল্মি গান । চারদিকে প্রকান্ড সব আবাসন, প্রত্যেকেরই একটা করে নিজস্ব পুজো । এগুলোকে কি ঠিক সর্বজনীন পুজো বলা যায় ? ভাবতে থাকি শব্দের ব্যঞ্জনা নিয়ে । সে ব্যঞ্জনা কখনও বাড়ে কখনও কমে । আবার যে বারোয়ারি পুজো গুলোকে আমরা সর্বজনীন বলি তাও কি সবার ? ওই যে সাইকেল চালিয়ে আসা যুবকরা, ওই মাঝবয়সী সিকিউরিটি --- ওই সর্বজনের মধ্যে কি ওঁরা শরিক ? ভাবি আর পথ হাঁটি । জনহীনতা থেকে ভিড়ের দিকে । প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে ।
এই যে সামনে একটা আবাসন । বাঃ, নামটা তো বেশ --- ‘হারানো সুর আবাসন’ ! লোহার গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই পথ আটকায় এক যুবক । সিকিউরিটি ।
কত নম্বর ফ্ল্যাটে যাবেন ?
আমি বলি, না ঠাকুরটা দেখতাম ।
ঢুকতে ইশারা করতে আমি এসে বসি ওঁর পাশের চেয়ারটায় ।
যুবকটি অবাক হয় , আমার দিকে অপাঙ্গে তাকায় ।
বলি, এখানে কতদিন আছেন ?
কেন বলুন তো ?
এমনি, জানতে ইচ্ছে করল ।
ও , মাস ছয়েক হল ।
কতক্ষণ ডিউটি করতে হয় এখানে ?
আপনি যে বললেন ঠাকুর দেখবেন ? ওই তো ওইদিকে প্রতিমা , একটু পরেই সন্ধি পুজো শুরু হবে ...
দেখব তো । তার আগে আপনার সঙ্গে একটু গপ্পো ...
ও, আচ্ছা । পুজোর সময় মানুষের মন মেজাজ বোধহয় একটু শরিফ থাকে । নাহলে আমায় আরও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত । যুবকটি বলেন, আমাদের গপ্পো শুনে আর কী করবেন ! এসেছেন ঠাকুর দেখে প্রসাদ খেয়ে চলে যান ।
আপনি ঠাকুর দেখেন না ?
যুবকটি ম্লান হাসে । চুপ করে থাকে ।
কিছু বলছেন না যে ...
গত ছমাস ধরে এই হাউসিং এ ডিউটি করছি ... বিশ্বাস করবেন, রোজ নাইট ডিউটি !
রোজ ?
হ্যাঁ, রোজ । ওই চারটে সাড়ে চারটে অবধি জেগে থাকি । তারপর আর পারি না ... ওই ঘরের ভেতর গিয়ে শুয়ে পড়ি ।
চেয়ারের পাশে একটা ছোট্ট ঘর । লম্বাটে । একফালি বেঞ্চ । কয়েকটা পুরনো খবরের কাগজ । দুটো বড় বড় জলের বোতল ।
আমি ঘরটার দিকে তাকাই । বলি, ঘরে তো ফ্যান নেই !
যুবকটি হাসে । কেন এই তো আপনার মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, হাওয়া পাচ্ছেন না ?
কিন্তু সে তো ঘরের বাইরে । ঘরের মধ্যে ? ওখানে শুয়ে ঘুমোন কী করে ?
এই প্রশ্নের জবাব মানে আবারও একটা হাসি । সেই হাসির অনেক মানে হয় । অনেক নামকরণ করা যায় ওই হাসির । সর্বজনীন ।

আপনার মতামত জানান