অপেক্ষার বড়দিন... আসে আর যায়

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

শীতকাল শুনলে পাতা ঝড়ে যাওয়া ন্যাড়া গাছগুলোর কথা মনে পড়ে তোমার? অপেক্ষা করো শীতকালের? বার বার একে ওকে জিজ্ঞেস করো - 'জড়িয়ে' থাকার ওই ঋতু কবে আসবে… আবার কোথাও দুপুরের রোদ্দুর, কোথাও কুয়াশা আর কোথাও শাদা বরফ নিয়ে? কেন করো? কি হবে আবার একটা শীতকাল এলে? নতুন করে আর কীই বা চিনবে শীতে... যা বিগত পঁচিশ শীতেও তোমার জানলার কার্নিশের কাক হয়ে এসেছে, আর ডানা ঝাপটিয়ে চলে গেছে?
ওহ্... তোমাদের বাড়ির ছাত... তোমার এখনকার ফ্ল্যাটে সাজানো দুপুরের রোদ... কোলেস্টেরল সামলে বানানো তোমার হাতের বড়দিনের কেক... সবুজ ঘাসে প্লাস্টিক ছড়ানো পিকনিক... আর ছেলের হাতের বুড়ির মাথার পাকা চুল। আসবে তো শীতকাল... এসেই গেছে আবার, যেমন আগের বছর এসেছিল... পরের বছরেও আসবে... তোমার কর্তার স্যালারি ইনক্রিমেন্টের মত।

আমি? আমি এখনও ২৪ ডিসেম্বারের রাতে লাল, সবুজ, নীল বড় বড় প্লাস্টিকের তারা আর বেলুনের আলো দেখতে বেরোই। ক্যামেরা মোবাইলে সব কিছুর ছবি তুলতে ইচ্ছে করে না। কত কিছু আর অ্যালবামে ধরে রাখতে পারবে এই যন্ত্র? সে কি শুরু থেকে ছিল? প্রথম ফুঁ দেওয়া রঙিন বেলুন। প্রথম ময়দানের ধূলো বাতাসে বনবন করে ঘোরা রঙিন কাগজের চাকা, প্রথম ভিক্টোরিয়ার সবুজ, আর সবুজের মাঝে উঁকি দেওয়া নাবালক কৌতূহল। ধোঁয়ার বদলে এক রাশ বুদবুদ উড়ে যেতে দেখেছি আকাশে… হাতের নাগালে পেলেই মুঠো করে ধরতে গিয়ে দেখেছি কিচ্ছু নেই। একটার পর একটা প্যারাস্যুট উড়ে যেতো আকাশে, আর নেমে আসত। ক’টা কিনে দেওয়া হয়েছিল? একবার… কি দু’বার হয়ত। আমি পারতাম না, ঠিক সুতো ছিঁড়ে যেতো প্যারাস্যুটের। প্যারাস্যুট না ভাসতে পারলে, ঐ পরিচয়হীন প্লাস্টিকের পুতুলটাও কোনও কাজের নয়। তার কথা কি আর অ্যাদ্দিন পর কেউ মনে রাখে? বলো?
এই যে এতো গুলো প্রথম... একের পর এক বড়দিনে ধাপে ধাপে ‘প্রথম’ দের সঙ্গে পরিচয়... তা কার কাছে রয়ে গেল?

স্যান্টা ক্লজ চিনেছি অনেক পরে... ওই সাদা পড়চুলা দেখেও বুড়ির মাথার পাকা চুল মনে হ’ত। সারিবদ্ধ দাঁড়িওয়ালা মুখোশ আর লাল টুপি। আর ছোট ছোট জড়ির কাগজ বসানো হ্যাট, কত দাম মনে নেই। একটা টুপি আমিও কিনেছিলাম... মানে কিনে দেওয়া হয়েছিল আর কি। তারপর এক সময় বুঝতে শিখলাম, আমার আনন্দ এই টুপি ঘিরে যেমনই থাকুক... বাইরের জগতে ওটা ‘সং’-এর টুপি। স্যান্টা ক্লজ হওয়ার চেষ্টা করতে দেখি অনেক-কে... আর কেউ কেউ নাবালক আনন্দের খেয়ালেই সং-সাজে হাতে খড়ি পেয়ে যায়।
এখন স্যান্টাদের দেখি... শপিং মল থেকে শুরু করে পেট্রল পাম্প অবধি। ওই দৃষ্টি আকর্ষণ করা সাজ আর অঙ্গভঙ্গি... তার নিচের লড়াইটা, এই একটা দিনই বোধহয় চাপা পড়ে যায়, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ‘মেরি ক্রিস্‌মাস্‌’-দের কল্লোলে। আসল স্যাণ্টা, সেই লক্ষ্মী ছেলে-মেয়েদের জন্য মোজার মধ্যে উপহার রেখে যাওয়া ভাল মানুষ বৃদ্ধর কথা জানি না। কিন্তু এই যে এতো এতো স্যান্টা, লড়াইয়ের ওপরের মুখোশ... এরাও কি সং নয়? আর যারা দেখতে দেখতে যাচ্ছে? শুধু বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে গুলোর নির্মল নিষ্পাপ হাসি ছাড়া কিই বা আসল রয়ে গেছে চার পাশে?

একবার এক বিদেশিনীকে দেখেছিলাম, পরম মমতা এবং বাৎসল্যের সঙ্গে গড়ের মাঠে কিছু পথ শিশুর সঙ্গে জমিয়ে আলাপ জুড়েছেন। বেশ লাগছিল দেখতে। উনি ইংরেজীতে কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন... আর বুকের বোতাম খোলা, সেফ্‌টিপিন দিয়ে প্যান্ট আর ফ্রক আটকানো ছেলে-মেয়েগুলো নিজের মত করে কিছু উত্তর দিচ্ছে, ইঙ্গিত করছে... মাথায় শুকনো ঘাস ফেলে দিচ্ছে,ঘাসে ডিগবাজী খাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর দেখলুম উনি ওনার বুকের ক্রুশটা ধরে দেখাচ্ছেন, বেশ বড় মাপের কাঠের খোদাই করা ক্রুশ। বুঝলাম, এই বার পরমপিতা যীশুকে চিনতে শিখবে এরা। আমি বোধহয় খুব একটা উদার নই, তাই সেদিন ওখানে দাঁড়িয়ে আমার আর কোনও আলোকদর্শন হ’ল না। সেও শীতকাল, সেখানেও সাদা-গোলাপী-হলুদ মিষ্টি তুলোগুলো খাওয়ার ভিড়। তবে জানতে ইচ্ছে হয় সেদিন কে কাকে কতটা চিনল? বিদেশিনী... ওই ছেলে-মেয়েগুলো... আর পরমপিতা?
একটা সময়ে অনেক শুনেছি... এই যে এত শিশু শ্রমিক, এত পথশিশু, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর বাচ্চা বাচ্চা আহত মন গুলো, অনাথ আশ্রমগুলোর প্রত্যাশা ভরা চোখগুলো... আরও কত... এদের কাছে বছরের কোন দিনটা সব থেকে বড়? এদের কাল্পনিক মোজাগুলো ভর্তি করার দায়িত্ব কে নেয়? প্রশ্নগুলো যেন টেবিল টেনিসের বল... এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক... ব্যাক হ্যান্ড, স্ম্যাশ, স্পিন... ধুস! আমি আর এসব নিয়ে বেশি ভাবি না। স্বার্থঃপর হওয়া অভ্যেস করছি... করে ফেলেওছি অনেকটা। এতরকম গোলমাল, এ তো লেগেই আছে... একটু স্বার্থঃপর না হ’লে চলে বলো?

বরফ পড়েছে, পাতা ঝড়েছে অনেকদিন ধরে। অ্যানিমেশন মুভিগুলো না থাকলে জানতেই পারতাম না বরফের গুঁড়োগুলো কাছ থেকে এত সুন্দর লাগে। আর সেই পুরু বরফ, ঘাস চাপা বরফ... তার ওপর দিয়েই রূপকের স্লেজ ঘষে বড়দিন। জেরুজালেমে কি বরফ পড়ত কোনও দিন? আর আফ্রিকায়? কিলিমাঞ্জারোর চূড়োয় হয়ত বেশ ঘটা করে বড়দিন পালন হয়... কি জানি! একজন মনস্তত্ত্ববিদের আত্মজীবনীতে আছে, ‘বড়দিনে আবার দেশে ফিরতে পারবে’ কেবল এই স্বপ্নটা পূরণ হয়নি বলে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের একাধিক বন্দী আর নতুন বছর দেখতে চায়নি। কোনও এক বড়দিনেই আরও ক’টা বরফ খোঁড়া কবর তৈরী হয়েছিল। স্যান্টাআআআআ... শুনতে পাচ্ছো? ‘স্ট্রাইপ্‌ড পাজামাদের কি গিফ্‌ট দিয়েছিলে’ জিজ্ঞেস করলে হয়ত বড় বিব্রত করা হবে এই বুড়ো মানুষটিকে। আমার বিব্রত হ’তে ভাল লাগে না... তাই অন্য কাউকে বিব্রত করতেও ভাল লাগে না আর। স্যান্টা তাঁর কর্তব্য করছেন... হয়ত... এখনও। আজ আমি অনেকগুলো লাল পোশাক, সাদা দাঁড়ি কে দেখেছি তাদের কর্তব্য করতে। সে ভারী মজার দৃশ্য, সে ভারী জটিল ব্যাপার। তোমার লাল পোশাক শুনলে রেড আর্মির কথা মনে পড়ে? বরফে ঢাকা মস্কো শহরে রেড আর্মি? স্ট্যালিনগ্রাড? অনেক অনেক বড়দিন পার হয়ে গেছে সেখানে... সাইবেরিয়াতেও।

আমি ভারতের একটা বড়দিনে দেখলাম... চারদিকে মসজিদ দিয়ে ঘেরা অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে শহরের প্রাচীনতম গীর্জা। ওদের কেউ জোর করে সেকিউলারিজ্‌মের পাঠ পড়ায়নি। স্থানীয় মন্দিরের মত সবাই গাঁদাফুল আর মোমবাতী নিয়ে লাইন দিয়ে ঢুকছে ভেতরে। দেখে মনে হ’ল... দিনটা ঠিক এইখানে এসে অনেকটা বড় হয়ে গেল। দেশের সব সাংসদ আর বিধায়কদের ঘাড় ধরে দেখাতে ইচ্ছে করছিল। সংসদের অধিবেশন শুরুর আগে প্রতিদিন একেবার এমন ভিডিও তাদের দেখা উচিৎ, জাতীয় সঙ্গীতে কষ্ট করে উঠে দাঁড়ানোর থেকে তা খুব একটা কম প্রয়োজনীয় নয়! দেখো, এমন বড়দিনগুলো যদি তোমারও আশেপাশে বছরের এক একটা দিন এদিক ওদিক ফুলের মত ফুটে উঠতে দেখা যায়। ছোট ছোট মনগুলো একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচুক। এমন কিছু বড়দিন আসুক, যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পৃথিবীর সব কটা মানুষ বোমা তৈরীর পদ্ধতি বেমালুম ভুলে যাবে। মেয়েগুলো আর নিজের ছায়া দেখে ভয় পাবে না একলা ঘরে। পড়ে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেওয়ার আগে তোমার মনে পড়বে সেই গর্ভবতী বেড়ালটার কথা, যার গায়ে তুমি সকালবেলা জল ছুঁড়েছিলে। আর আমি? শীতকাল... বিশেষ দিন... বড় দিন... প্লাম কেক... আলোর চেন... মেরি মেরি মেরি ক্রিসমাস্‌... এর থেকেও বেশি ভাল থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি... সারা বছর জুড়ে বড়দিন দেখবো বলে।

আপনার মতামত জানান