কিল বিল, মার্টিনার চুমু, অথবা মেয়েদের কবিতা নিয়ে দু-চার কথা

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



খুব ছেলেবেলা থেকেই আমি বিশুদ্ধ আবেগ পছন্দ করি। আর, হিংসার মতো শুদ্ধতা কোনো আবেগে তো থাকে না, একমাত্র প্রতিহিংসা ছাড়া। ইন্দ্রজাল কমিকসের মাতাল পাঠক ছিলাম। একটা বিরাট সংগ্রহ ছিল। কোথায় হারিয়ে গেল... ভাবলেই এখনও মন খারাপ হয়। তারপর সিনেমা। অমিতাভ বচ্চনের ৭০ দশকীয় সিনেমাগুলো আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে। হিংস্র যদি হতে হয়, সিস্টেমের ভিতরে-বাইরে ওইভাবেই হতে হয়, ‘আমি যখন মারি, তখন ভিতরে ঢুকেই মারি’... একটি কিশোরের মনে সেই যে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল, আজও মনে হয় না আবছা হয়েছে। নিজে যখন গল্প-উপন্যাস লিখি, ২-৪টে বন্দুক-পিস্তল এসেই যায়, আমার পাঠক জানেন।
কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় অ্যাকশন মুভি কোনটা যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি একটু মুশকিলে পড়ে যাব। দুটো সিনেমার মধ্যে বেছে নিতে পারব না... ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ আর কোয়ান্টিন টারান্টিনো পরিচালিত ‘কিল বিল, ভল্যুম ১ ও ২’। ঘটনা হল, ব্রুস লি-র বিকল্প যে একজন নারী হতে পারে, এই ধারণাটা কোয়ান্টিন টারান্টিনোর মতো এক দিব্যোন্মাদ পরিচালকের মাথাতেই হয়তো আসতে পারে, ঠিক ওই স্তরের উন্মাদনা তাঁর মধ্যে আছে, ঠিক ওই স্তরের পারভার্সন তিনি যুদ্ধমোদী দর্শকের মধ্যে সঞ্চারিতও করতে পারেন।


ব্রুস লি অভিনীত 'বিগ বস' এবং উমা থুর্মান অভিনীত 'কিল বিল-১' ... পোশাকের ইচ্ছাকৃত মিল লক্ষ্য করুন

একটা মুহূর্তের জন্যও ‘কিল বিল’-এর প্রতিহিংসাকামী নায়িকা উমা থুর্মানকে একটুও বেমানান লাগে না, যখনই তিনি মহান ব্রুস লি-র পোশাক (‘বিগ বস’ সিনেমা-র) পরেন, তাঁর আত্মাকেও নিজের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করেন, সফল হন। এর মানে, হিংসার ক্ষেত্রে এক পুরুষের শিশ্ন ছাড়াই তাঁর আত্মাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন একজন রমণী। দেবী দুর্গা যেমন তাঁর অস্ত্র এবং তেজ এবং সবকিছুই পেয়েছিলেন দেবতা ও মহাদেবতাদের কাছে, কিন্তু হয়ে উঠেছিলেন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ দেবযোদ্ধা।
‘যোদ্ধা’-র কি স্ত্রীলিঙ্গ হয়? হলেও আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করছে না।
একজন নারীর কাছেই আমরা আশা করতে পারি তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণা হবেন। সে তাঁর নাম লক্ষ্ণীবাঈ হোক, বা জোয়ান অব আর্ক, বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। একজন নারীকে সেনাপতি হিসেবে আমার ঢের কাম্য মনে হয়। যে কোনো সংগঠন একটা আশ্চর্য জোর পায়, তার নেতা যদি হন এক নারী। অবশ্য সেই সংগঠনের গতিপ্রকৃতি তখন সকলে আর বুঝে উঠতে পারে না। তার সাফল্য, তার ব্যর্থতা... তখন অনেক জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভাবতে বেশ মজা লাগে, ‘কিল বিল’-এর নায়িকার ভূমিকায় যে অভিনেত্রী এসেছেন, তাঁর নাম উমা, উমা মন্ডল নয়, উমা ভট্টাচার্য নয়... উমা থুর্মান। এবং এই চরিত্র কিন্তু পুরুষালী নয়। সে একজন লগ্নভ্রষ্টা কনে, এক মা, এক প্রতারিতা প্রেমিকা। সে হারানো মেয়েকে পেয়ে কেঁদে ফেলে প্রায় বাংলা সিরিয়ালের নায়িকার মতোই, তাকে ঘুম পাড়ায় আশির দশকের বাংলা সিনেমার সন্ধ্যা রায়ের মতো, কিন্তু... সে এই পৃথিবীর অন্যতম এক কিলার। হত্যার জগতে সে এক মায়েস্ত্রো।
হিংসা গেল। এবার সেক্সের প্রসঙ্গে আসি। মেয়েদের সেক্স। পুরুষের সেক্স। লিবিডোর স্বাভাবিক গতিপথ। এই ছবিগুলো সম্প্রতি দেখলাম ইন্টারনেটে।


মার্টিনা এবং তাঁর বান্ধবী


কে নারী ? কে পুরুষ ? বলা কি বাহুল্য নয় ?

মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা সম্প্রতি বিবাহ প্রস্তাব দিলেন তাঁর গার্লফ্রেন্ড জুলিয়া লেমিগোভাকে। দস্তুরমতো হাঁটু মুড়ে বসলেন, আংটি পরালেন, বিগলিতা বান্ধবীকে সকাম চুম্বন করলেন। তাঁর পরনের পোশাক ছিল সাদা এবং পুরুষসুলভ। এই উপলক্ষে মার্টিনা যদি জুলিয়ার উদ্দেশে একটি শুদ্ধ প্রেমের কবিতা লিখতেন, আমার জানতে ইচ্ছে করছে কোনো কবিতা পত্রিকার নারী-সংখ্যায় তার স্থান সংকুলান নিয়ে কোনো সমস্যা হত কিনা। আশা করছি, হত না, যদি না আনাড়ি হাতের লেখা হয়।
সত্যিই আমি আজ অবধি নিশ্চিত হতে পারলাম না মেয়ে কাদের বলে। যাদের যোনি আছে, স্তন আছে, সন্তানধারণের জন্য শ্রোণীদেশ বেশ প্রশস্ত, নিতম্ব অনেক স্ফীত, যারা শৃঙ্গারকে সঙ্গমের চেয়ে পছন্দ করেন, দেহে স্নেহপদার্থের পরিমাণ বেশি, তাঁরাই কি নারী? মানে, দেহের দিক থেকেই কি নারীত্ব নিরূপিত হয়? নাকি, যাদের মনে প্রেম-স্নেহ-দয়া-করুণা অনেক বেশি, সহজেই যারা কেঁদে ফেলেন, অকারণেই হেসে ওঠেন, কন্ঠস্বরে কাচ চুরমার হয়, মাসে এক প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনেন, কিছুতেই যাদের মেজাজের গতি বোঝা যায় না, তাঁরাই নারী? মানে, মনের দিক থেকেই কি নারীত্ব নিরূপিত হয়? অথবা, এইভাবে কি ভাবব যে, যে মানুষেরা পুং জাতীয় (?) মানুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন, এবং মৈথুনের সময় প্যাসিভ ভূমিকা নেন, তাঁরা হলেন নারী? নাকি শুধু শাড়ি-ব্লাউজ, চুড়িদার, ঘাগরা, চোলি, স্কার্ট, বিকিনি, অথবা ব্রা-প্যান্টি দেখে বা না দেখেই বুঝে নেব ইনি হলেন নারী?
নারী-পুরুষ কি মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নাকি!
মিঠুন চক্রবর্তী একবার জানিয়েছিলেন বোম্বেতে তাঁর স্ট্রাগল পিরিয়ডে যখন দীর্ঘ রাতগুলো তাঁকে রাস্তায় কাটাতে হত, একজন পুলিশ তাঁকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। ভাবুন! আর এই মিঠুন আমাদের অনেক মাচো মাস্তানের ম্যাটিনি আইডল, স্বপ্নের বীরপুরুষ!

টারান্টিনো পরিচালিত 'পাল্প ফিকশন'। এই দানবতুল্য পুরুষটি ধর্ষিত হন ওই সিনেমায়।

ধর্ষণ তো যৌন অপরাধ নয়। ওটা কাম নয়, একমাত্র ক্রোধ এবং হীনমন্যতা থেকে ঘটে। এমন ‘পুরুষ’ তো আছেনই, যাদের কাছে মনিকা বেলুচির যোনির চেয়ে এন্টোনিও ব্যান্ডারাসের পায়ু অনেক লোভনীয়। এক সমর্থ শক্তপোক্ত পুরুষ শরীর উপভোগ করতে পারলে তাঁরা আর কিছুই চান না। ওটা তাঁদের কাম নয় অহংকে তৃপ্ত করে। তাঁরা সমকামী কি? সম্ভবত না। কাম ব্যাপারটাই এখানে গৌন।
কাম আছে অন্যখানে। কাম থাকে অন্যখানে।
অভিনব সামন্ত তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি ভিডিও পার্লারে ব্লু-ফিল্ম দেখতে গিয়েছিল। পর্দায় যখন দুজন স্তন ও যোনিসমেত মানুষ তাঁদের লেসবিয়ান কামকেলীর চরমে পৌছেছেন, অভিনব সামন্ত অবাক হয়ে দেখল পাশের একজন মধ্যবয়সী ও বিষন্ন মানুষ তার জিনসের জিপে হাত দিয়েছেন। অভিনব স্থানু হয়ে গেল। বাধা দিতে পারল না। অচেনা মানুষটি ধীর হাতে নিঃশব্দে জিপ টেনে শক্ত হয়ে থাকা শিশ্নটি সস্নেহে বাহির করলেন। কোমল হাতে চটকাতে শুরু করলেন। অভিনব বাধা দিতে পারল না, তার অসম্ভব পুলক হচ্ছিল। মানুষটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার বীর্যপাত করে দিলেন।
অভিনব কিন্তু সমকামী নয়। ওই ঘটনার আগে অথবা পরে সে ওরকম কোনো ঘটনার অভিজ্ঞতা পায়নি জীবনে। তাহলে এটা কী হল? ওই মানুষটি কি পুরুষ, নাকি নারী? অভিনব সামন্ত কি আর পুরুষ রইল না? অবশ্যই সে তার প্রেমিকা বা ভবিষ্যতের বৌকে ওই ঘটনা জানাবে না। কেউ জানবে না ওই দুজন ছাড়া। বন্ধুরাও টের পায়নি।
এবং, অভিনব কবিতা লেখে না।
কিন্তু ওই লোকটি?
প্রায় একইরকম ঘটনা ঘটতে পারত রূপালী মাইতির জীবনে। সে চাকরি পেয়ে নতুন শহরে এসেছে। গার্লস হোস্টেলে প্রথম দিনের মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে রূপালী আবিষ্কার করল পাশের বেডের সদ্যপরিচিতা সদাহাস্যময়ী সোমাদি তার নাইটি তুলে সন্তর্পনে কিছু করার চেষ্টা করছেন। সে আঁতকে উঠে ছিটকিনি নামিয়ে বাইরে পালাল। পরের দিন তার ঘর বদলে দেওয়া হল।
সোমা কি কবিতা-টবিতা লেখেন? তিনি কি রূপে ভোলেন, নাকি ভালোবাসায়?
এখানে কি কোনো পুরুষ রয়ে গেলেন? রূপালী নাহয় বিশুদ্ধ মেয়ে ধরেই নেওয়া গেল, তার মধ্যে কোনো পুরুষ নেই, কিন্তু সোমার মাপকাঠির কী হবে? আর, হোস্টেল সুপার দীপিকা রায় কি সব জেনেই রূপালীকে ওই ঘর দিয়েছিলেন?
এই নামগুলো কাল্পনিক। কিন্তু আমরা নাম থেকে কত সুন্দরভাবে বুঝে নিতে চাই কে নারী, আর কে পুরুষ! যেমন একটি নাম Sudipta Ghosh । বলুন তো এটি এক মেয়ের নাম, না এক ছেলের? ইংরেজিতে লিখে বিপাকে ফেলছি ভাবছেন... আচ্ছা, এই নামটা কেমন হবে... ‘মধু সামন্ত’?
আমি তো বুঝতে পারি না।




শুধু এটুকু বুঝি, ক্লিটোরিস বেশ একটু লম্বা হয়ে গেলেই বালকের শিশ্নের মতো দেখায়। আমার পাড়ার এক বৃদ্ধের বক্ষদেশ আজ বৃদ্ধাসুলভ স্তনশোভা ধারণ করেছে। খালি গায়ে থাকলে অচেনা লোকেরা তাঁকে ‘ঠাকুমা’ বলে ফেলে। অনেক রূপসী মেয়ের মুখ হাল্কা দাড়ি-গোঁফের আমেজে আমার দুর্দান্ত লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রিয় বান্ধবীর সেটা ছিল।
হরমোন! হরমোন! তোমার ডি এন এ নাই কুসুম?
আর, আমি নিজের মেয়ের নাম রেখেছি ভোর মুখোপাধ্যায়। ‘ভোর’ তো পুংলিঙ্গ, তাই না?
এবার আসা যাক আসল প্রসঙ্গে। মেয়েদের কবিতা। অল্প কথায় সেরে ফেলি। নাহ! সাফোর নাম এখানে করব না। শেকসপীয়ারের সনেটের প্রসঙ্গও টানব না। সরলভাবেই বলি।
আমার কাছে এক ব্যক্তির নারীত্বের একমাত্র মাপকাঠি (?) হল, তাঁর অগম্যতা। যেকোনো থার্মোমিটার সেখানে খাটো হয়ে যায়। একজন মানুষকে যখন আমি তাঁর ঊষ্ণতায় কিছুতেই নির্ণয় করতে পারি না, তিনি আমার কাছে মোহময়তার সেই সীমায় পৌঁছে যান, যেখানে একজন নারী। আমি শরীর দেখে নারী বিচার করি না। নারীর শরীর আমার কাছে একটা মৈথুনের চেয়ে জরুরি কিছু নয়। একটা অভ্যাস। বিছানাতেই সেটা ফুরিয়ে যায় আমার। নারী হলেন সেই মানুষ যিনি আমাকে আশ্রয় দেওয়ার সাধ্য রাখেন, কিন্তু যে কোনো মুহূর্তে আমাকে চ্যুতির সামনে অসহায় করে দিতে পারেন। আমার ‘আমি’ স্খলিত হতে পারে, এই ভয় জাগে তাঁর ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হলে। তাঁর কবিতার মুখোমুখি হলে। তিনি কবিতা লেখেন, এই সংবাদ সত্যিই সাংঘাতিক। তাঁর কবিতা আমাকে আকর্ষণ করে, হাতছানি দেয়, আবার শিহরিত ও ত্রস্ত করে, আমি নিজেকে সংবরণ করতে ব্যস্ত হই। পারি না। তাঁর কবিতায় আছে এক অতল অসীম ঘন সবুজ ডানামেলা হাতছানি, আবার ডাকিনীর টুপি, ঝাঁটা, নাক, থুতু ও থুতনির আদল।
আমার চোখে একটি সার্থক কবিতা, যার লেখককে আমি অব্যর্থভাবে নারী হিসেবে চিনে নিতে পারি, হল এটা-

Esential Oils Are wrung

Esential Oils – are wrung –
The Attar from the Rose
Be not expressed by Suns – alone –
It is the gift of Screws

The General Rose – decay
But this – in Lady’s Drawer
Make Summer – When the Lady lie
In ceaseless Rosemary –
এই কবিতার কবি এমিলি ডিকিনসন। আমার প্রিয়তম (আকার দিলাম না) নারী-কবি। ওঁর কবিতা, আবার বলি, আমাকে আকর্ষণ করে, হাতছানি দেয়, আবার ত্রস্ত করে, আমি নিজেকে সংবরণ করতে ব্যস্ত হই। তাঁর কবিতায় আছে অতল ঘন সবুজ ডানামেলা হাতছানি, আবার ডাকিনীর টুপি, ঝাঁটা, নাক ও থুতনির আদল। ঠিক যেমন প্রকৃতি, তার নিসর্গ নিয়ে।
সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি কি ঢেউ গুনবেন, নাকি ‘আমি’ সামলাবেন, পুরুষ ?
অসীমার গুণ আপনি কিছুই কি বুঝেছেন?
আমাদের বাংলা ভাষায় একজন কবির মধ্যেই এই গুণ পাই।
তিনি... শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পুরুষ-প্রকৃতির অমন অভেদ লেখালেখির ভুবনে আর কোথায় হয়েছে, বলুন। আর একটা নাম বলুন।
আর, বৃহন্নলাদের জন্য কোনো টয়লেট আজও হল না আমাদের এখানে। অনেক ভীষ্মের পতনের পরে হয়তো সেটা হবে। কিংবা, কোনোদিনই কি হবে না?

আপনার মতামত জানান