আমার সাগরিকা বোরদোলোই

দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়

 

প্রণব কুমার বর্মণের এই যুগান্তকারী কবিতাটির সঙ্গে পরিচয় হয় নভেম্বরের এক বিষণ্ণবিধুর সন্ধ্যায়, আমার সহপাঠী রূপম এবং আমি, দুজনেই সেমিস্টারের চাপে বিহ্বল হয়ে গঞ্জিকার শরণাপন্ন হয়েছিলাম। নেশা ঈষৎ চড়ার পর আমি ওকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়ে শুনিয়েছিলাম, ও আমাকে পড়ে শোনালো এই কবিতাটা। নব্বই দশকের মাঝামাঝি লেখা, লেখামাত্র তা সেই সময়ের বিক্ষুদ্ধ যুবসমাজের ম্যানিফেস্টো হয়ে অসমের কলেজে কলেজে হোস্টেলে হোস্টেলে ছড়িয়ে পড়ে। রূপম আমাকে মূল অহমীয়া তো বটেই, ওর বন্ধু তন্ময় শর্মা কৃত ইংরিজি অনুবাদটিও পড়ে শুনিয়েছিল, এবং শোনামাত্র আমার যা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বলে বোঝাতে পারবো না। ছিটকে গিয়েছিলাম।
আমাদের বিজয়নগর ডবল স্টোরির ছোট ঘরে সে সন্ধ্যায় ঢুকে পড়েছিল বিপ্লবের দিন গুনতে থাকা পানবাজার, কারফিউ আক্রান্ত দিঘলিপুখুরীর পার, জালুকবারীর পাগলামো আর হান্দিকৈ কলেজের একটা মেয়ে, যার পরনে সাদা ধবধবে সালওয়ার এবং একটা লাল টুকটুকে ওড়না। ওটাই হান্দিকৈ কলেজের ইউনিফর্ম, সপ্তাহের কোনো দুপুরে আপনি যদি গুয়াহাটির অন্যতম পুরোনো রেস্টোরেন্ত সানফ্লাওয়ারে ‘সাগলীর মাংখ’ কিম্বা ‘মাসোর ট্যাঙ্গা’ গিলতে যান, দেখবেন ও রকম পোশাক পড়ে বহু মেয়ে তাদের কটন কলেজের প্রেমিকদের সঙ্গে বসে লিম্বু পানি খাচ্ছে। তবে তারা কেউ সাগরিকা বোরদোলোই নয়। কিম্বা ওরা প্রত্যেকেই ওদের ‘প্রেমিক সরাই’এর একান্ত ‘হাগরিকা’।


দিঘলিপুখুরীপার, পেছনে হান্দিকৈ কলেজ


যা হোক, প্রসঙ্গে ফিরি। কবিতাটা যখন পড়েছিলাম তখনও গুয়াহাটি যাইনি, তবে সে মুহূর্তে ভীষণ ইচ্ছে করছিল যাওয়ার। ইচ্ছে করছিল পানবাজার, দিঘলিপুখুরীর পারে হান্দিকৈ কলেজের সামনের ফুটপাথে একা একা একটু হেঁটে আসি। ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়, তিনমাস পর গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরিজি বিভাগ আয়োজিত থোমাস হার্ডির ওপর একটি জাতীয় আলোচনাসভায় আমার গবেষণাপত্র পাঠ করার সুযোগ আসে, অ্যাবস্ট্র্যাক্ট মনোনীত হবার পর লাফিয়ে উঠেছিলাম। ওরাই যাতায়াত ভাড়া এবং দু’দিনের থাকা-খাওয়া দেবে। জালুকবারী, পানবাজার, দিঘলিপুখুরী সব দেখা হবে, হয়ত সাগরিকার সঙ্গেও... এমন সুবর্ণ সুযোগ জীবনে ক’বার আসে?


সন্দিকৈ কলেজ

বেশী ভাটকি মেরে লাভ নেই, মনের অন্দরে টহল দিয়ে ফিরছিল আমার ব্যক্তিগত সাগরিকা বোরদোলোইয়ের মানসপ্রতিমা, যে হয়ত বি বরুয়া কলেজে পড়ে, সন্ধ্যার দিকে হেন্দ্রিক্স ক্যাফেতে বসে বিয়ার খায়, তার কবির সঙ্গে লম্বা-লম্বা প্রেমপত্র বিনিময় করে আর কোনো এক ফাগুনের বুয়া বেলাতে শুধুমাত্র আমার অনুরোধ রাখতে চাদরমেখলা পরে এসে সকাল এগারোটায় পানবাজার বাসস্টপে একমনে অপেক্ষা করে, আবার দুপুরের অবাধ্যতায় সেই চাদরমেখলা খুলে মাদুরবিহীন মাটিতে সোহাগশয্যাও পেতে দেয়... কবিতাটা এর আগে একবার অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম, তবে নিজের কাজে খুব একটা খুশী হইনি, কি মনে হল ফেরার সময় ল্যাপটপ খুলে লোকপ্রিয় গোপীনাথ বোরদোলোই হাওয়াই আড্ডার স্মোকিং লাউঞ্জে বসে একটার পর একটা চারমিনার ফুঁকতে ফুঁকতে আবার ঘসামাজা করলাম। এখন মনে হচ্ছে প্রণবের ‘হাগরিকা’কে অনুবাদের অজুহাতে হাইজ্যাক করে নিজের সাগরিকা করে নিতে পেরেছি।

হান্দিকৈ কলেজের সাগরিকা বোরদোলোই, কুশলে আছো তো?

এই তোমার জন্যেই আমার দু হাত বেয়ে দীর্ঘশ্বাসের চারাগাছ ওঠে
তুমি সন্ধ্যের দিকে আর পানবাজার যেয়ো না
দিঘলিপুখুরীর পার দখল করে নিয়েছে কারফিউ
এ মুহূর্তে নক্ষত্রমালাও অসভ্য অশ্লীল হতে পারে
আর ততটাই অবাধ্য এই হাওয়া, শান্তির সন্ধিপ্রস্তাব

সাগরিকা, তুমি জানো, আমি একটা প্রেমিক কোকিল
শুষে নিচ্ছি নদী নদী তোমার অভিমান, তার থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ দোরিকানা মাছ ধরে এনে
অ্যাকুয়ারিয়ামে পুষবো, না, আমি দোরিকানা মাছ ধরতে চাই না
আমি তোমার দুঃখের পোশাকের একমাত্র ধোপা হয়ে গেছি

তা তুমি গরমকালে কি বেশী পছন্দ করো? সিত্রা, পেপসি, মিরিন্ডা না থাম্পস আপ?
আমেরিকা আমাদের কাছে ঘৃণ্য একটি শব্দে দাঁড়িয়েছে
কলেরায় মাতাল হয়ে কাদা জলে পড়ে কাঁদছে আমার লক্ষ্য বুভুক্ষু শৈশব
তা তোমার কাকে ভাল্লাগে? ম্যাদোনা না মাইকেল জ্যাকসন?
তুমি আমাকে কালা করে দেবে সাগরিকা,
আমি আর এই এত নিপীড়িতের আর্তি নিতে পারছি না
আশির দশক ধরে যারা হেঁটে গেছে, তুমি
তাদের যে কাউকে জিজ্ঞেস করো চাবকানোর অর্থ ঠিক কি
তোমার মায়েদের কাছে জানতে চেয়ো কতবার ধর্ষিত তারা
আমি শার্টের বুকপকেটে গোলাপি রঙের একটা খাম নিয়ে
যখন ঘুরে বেড়াই, বন্ধুরা ইয়ার্কি মেরে বলে, কোথায় যাচ্ছ রেশন কার্ড নিয়ে?
আমি ওদের বোঝাতে পারিনা এর ওপরেই লেখা আছে
বসন্তের প্রেমের ঠিকানা

তুমি সিসিফাসের গল্প শুনেছ সাগরিকা? কিম্বা স্পার্টাকাসের?
কিভাবে বায়রন সাহেব ছাগলের মাথা হাতে ফিরেছিল দাওয়াত খাওয়াতে?
কৃষিজীবী কিটস টিবিতে মরে গেল, নিখোঁজ উন্মাদ ওই শেলি
মহানাগরিক বুদ্ধের নিস্তব্ধতা, প্রাণহীন ক্রুশবিদ্ধ যিশু
তুমি কোনোদিন নাজিম হিকমতের কাছে তার দুটো হাত ভিক্ষে চেয়েছ?
লোরকা, নেরুদার কাছে?

পান করবে সাগরিকা? আমার হৃদয়ের রাশিয়ার ভদকা?
কে জানে, একটা টুথপিকও হাসবে এইবার

হ্যাঁ, আমি ধূমপান করি, এ আমার নেশা
তুমি একটি গানের সিগারেট
কোনোদিন দেখা হলে আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা কোরো
তার পাগলামি ধান ক্ষেতের সবুজের মতো, তার ট্র্যাজেডি অরণ্যের নীল
প্রতিনিয়ত অবদমনে সে এখন কুঁজো হয়ে গেছে
সাগরিকা, এখানে একটাও যদি বিষণ্ণতার অরণ্য না থাকে
কোথায় জিরোবে তবে আনন্দের উচ্ছ্বাসের পাখি?
সাগরিকা আমার হৃদয়ের জবা দিয়ে পুষ্পাঞ্জলি সেরে
একদিন তুমিও জালুকবাড়িতে চলে যাবে
কিন্তু এই এত দুর্দশার ঝড়েও দ্যাখো
দুঃসাহসে উড়ছে কেমন তোমার অট্টহাস্যের নিশান
ও আমার আং সাং স্যু চি
তুমি শুধু আমার কলমে কালির রক্ত ভরতে ভরতে
বারুদের ইস্তেহার লিখো

তুমি সাগরিকা বোরদোলোই, এই তুমি? কুশলে আছো তো?



কবি-পরিচিতি
দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায় (জন্ম- ১৯৯১) বর্তমানে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজি সাহিত্যের ছাত্র। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে দেবায়ুধ কলকাতার পাট চুকিয়ে রাজধানীতে কেটে পড়েন,পাকাপাকিভাবে ফেরার চান্স নেই বললেই চলে। এ যাবত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ‘ভোর রাতের এইট-বি’ (যাপনচিত্র/২০১২) শূন্যের পাঁচ [সম্মিলিত] (কৃতিকারিগর/২০১৪) রং ভাঙার শব্দ [সম্মিলিত] (ধানসিঁড়ি/২০১৫)

আপনার মতামত জানান