জুঁই

অনির্বাণ গুহ

 


অলংকরণ তৌসিফ হক

রোজ সকালে অটোটাকে চান করাতে করাতে ভোর দেখতে হেভী ভাল লাগে।গঙ্গার উপরে আকাশটা অন্ধকার তো কখনই থাকে না। হাল্কা অন্ধকারের ব্যাকড্রপে হ্যালোজেনটা শুধু সূ্য্যি হয়ে যায়। ঝাড়া একঘন্টা ধরে আগে-পিছে-উপর-নীচে ঝাপটা মারতে থাকে, যতক্ষণ না “মায়ের আশীর্বাদ” এর চোখগুলো জ্বলজ্বল করে ওঠে।ততক্ষণে ভোলাদা এসে যায়।মন্তর পড়ে, মালা চড়িয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে, সিঁদূর লাগাতে লাগাতে বাপির চান কমপ্লিট।সীটে বসে চায়ে চুমুক মারতে না মারতেই ফার্স্ট স্টীমার লেগে যায়। এসময় সব কলেজ পাবলিক। এই সাত সকালেও মেয়েগুলো এরকম মেক-আপ করার টাইম কখন পায় কে জানে? অনেকেরই মুখ চেনা হয়ে গেছে। ওদের পড়াশুনোর ব্যাপার। তাই ফুল না হলেও অনেক সময়ই বাপি অটো ছেড়ে দেয়। ছাড়েনা জেটিতে “ক্যাটরিনা”- কে দেখতে পেলে।
কিছু কিছু মুখ আছে যেগুলো জ্যামিতি হলেও উগ্র নয়, কিছু কিছু চোখ আছে যেগুলো সুন্দর হলেও মেকি নয়। কোথাও যেন একটা কি আছে!আটকে গিয়েছিল বাপি।অনেকবার নিজেকে বুঝিয়েছে। অটো ড্রাইভার। নিজের অটোও নয়। আহিরীটোলা – উল্টোডাঙ্গা। শাহরুখ, সলমন, রেডিও মির্চি, বুলাদি। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা। ডিম-ভাত, তড়কা-রুটির সংসারে, কলেজে পড়া মেয়ে! কি স্বপ্ন! না, স্বপ্ন বাপি দেখে না তা নয়। যেদিন থেকে বাবুদা বলেছে, আর টানতে পারছে না, অটো বেচে দেবে, বাপি যদি চায় এক লাখেই দেবে বাপিকে, সেদিন থেকে স্বপ্ন দেখছে বাপি। আশীষদা বলেছে একটা ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু, তার জন্য কিছু ব্যাঙ্ক ব্যালান্স দরকার। একটা অ্যাকাউন্ট খুলে, তাতে ফি হপ্তায় টাকা ভরে আসে বাপি। হাজার পনেরো জমে গেছে অ্যাকাউন্টে। একটা এ-টি-এম কার্ডও হয়েছে। আশীষদা একটা প্যানকার্ড ও করে দেবে বলেছে। কিন্তু তাই বলে এই? সত্যি না হোক, স্বপ্ন না হোক, একটা ঘোর তো বটেই।

রথ হয়ে গেছে। দুর্গাপুজোর বাঁশ পড়তে শুরু করে দিয়েছে। আহিরীটোলা ঘাট থেকে হাতিবাগান, প্রায় মাসখানেক হল পিছনে জায়গা থাকলেও ক্যাটরিনা আজকাল ওর পাশেই বসে। ও সাধারণতঃ খুব একটা সাজে না। লিপস্টিক আর হাল্কা মেক-আপ। টিপও পড়েনা রোজ। সালয়ার বা কুর্তি। আজ একটু বেলা করে এল। লাল টপ আর ব্লু জিন্সে আজ যেন আরেকটু ভাল লাগছে।
- কি ব্যাপার? ক্লাস নেই?
- না। আজ ফেস্ট।
- আরিব্বাস! কে আসছে?
- আজ তেমন কেউ আসছে না। লাস্টডে তে উদিত নারায়ণ।
লাস্ট দিনে বাসন্তী রঙের শাড়ীতে শুধু বাপি কেন, সেদিন বোধহয় উদিত নারায়ণ ও উড়ে গিয়েছিল। ইচ্ছে ছিল জিজ্ঞেস করবে কেমন গেল। ও শুনেছে গান শোনা আর সামনে থেকে দেখায় নাকি অনেক ফারাক। কিন্তু পরদিন সকালে ক্যাটরিনাকে দেখে উদিতের কথা ভুলে গেল বাপি।
- একি? মুখের কাছটা ফোলা কেন? কি হয়েছে?
- কাল উদিতের গানের পরে পরেই অন্য কলেজের লোক ঢুকে পড়েছিল। ঝামেলা মারপিট। মেয়েদেরকেও বাদ দেয়নি ওরা।
- পুলিশ ছিল না?
- শেষ অবধি পুলিশই এসে লাঠিচার্জ করে সামলেছে।
- কোন কলেজ থেকে এসেছিল?
- জানিনা। বোধহয় শিয়ালদার দিকের কোন কলেজ।
- ডাক্তার দেখিয়েছ?
- না। ব্যথা নেই।
ক্যাটরিনা ছাড়া কোন প্যাসেঞ্জার নেই আজ। তবু ও আজও পাশেই বসেছে। অটো ছেড়ে দিল বাপি।
- আজ আপনার জন্য একটা জিনিস এনেছি। এই নিন।
গ্রে-স্ট্রীট এসে যাওয়ায় সাইড করল গাড়িটা।
- এটা কি?
- জুঁইয়ের মালা। খুব মিষ্টি গন্ধ। আপনি রোজ গাঁদার মালা লাগান কেন? ঠাকুর দেবতারও গন্ধ ভাল লাগে।
মেট্রোর প্যাসেঞ্জারেরা গাড়িতে বসতে শুরু করেছে। বাপি অটো চালিয়ে দিল। আজ আর হাতিবাগানে থামতে ইচ্ছে করছিল না। সিগন্যালও খোলা ছিল। সিগন্যালটা ক্রস করতেই ক্যাটরিনা ওর দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে শক্ত করে ধরে নিল রডটা। উল্টোডাঙ্গা স্ট্যান্ডেও বসে রইল পাশে। আজ আর মুখ বাড়িয়ে “আহিরীটোলা-আহিরীটোলা- ান্না-হাতিবাগান--” ডাকার ক্ষমতা ছিল না বাপির। উল্টোডাঙ্গা থেকে ইচ্ছেটা অনেকবার উপর নীচে করে, হাতিবাগানে পয়সা দিতে গেলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, চোখ নীচের দিকে।
- আজ থাক না।
এক সেকেন্ড, দু সেকেন্ড।
- আজ দুপুরে কোথাও যাবে।
টাকাটা রেখে হাঁটা দিল ক্যাটরিনা। রিয়্যারভিউতে – ওকি ডানচোখটা মুছল?
চমকে দিয়ে বেজে উঠল মোবাইলটা। বাবুদার ফোন। আজ দুপুরে অটো চাই। আজ বাপির ছুটি। ভালই হল। আজ আর মুড আসছিল না এমনিতেও। দুপুরে ভাত খেয়ে গাড়িটা দিয়ে এল। আশার সময় কি মনে হল, তুলে নিল – জুঁইয়ের মালা।
ঘুমটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল দুপুরে। কালুর ডাকে ধড়ফড় করে উঠে দেখল চতুর্দিক অন্ধকার।
- কি হল?
- শিগগির চল।
- কোথায়? কি হয়েছে?
- তোর অটো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
- কি!
- আজ শিয়ালদার ওখানে কলেজে কলেজে হেভি কেলাকেলি। বাড়তে বাড়তে বিরাট বাওয়াল হয়ে গেছে। বোম পড়েছে, বাস জ্বলেছে, গাড়ি জ্বলেছে। লখা খবর দিয়ে গেল। পার্টির ছেলেরা নাকি বাবুদার কাছ থেকে তোর অটোটা নিয়ে গিয়েছিল। খালি কঙ্কাল পড়ে আছে। কাকে ফোন করছিস?
- বাবুদা।
- হ্যাঁ বাপি বল।
- দাদা কি শুনছি!
- ঠিকই শুনেছিস। আমার সর্বনাশ হয়ে গেল রে।
- আমি যাব?
- আমাকে এদিকটা একটু সামলে নিতে দে। তুই দুটো দিন পড়ে আয়।
ফোনটা রেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল কালুর দিকে। কালু ওকে ঘর থেকে টেনে বার করল।কালু আশীষদাকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করল-
- শুনেছ?
- শুনেছি। সব ওর মালিকের চাল।
- কি বলছ কি? কিসের চাল? সবতো শেষ হয়ে গেল দাদা!
- তোরা ওই ভাবনায় থাক। পুরোনো অটো। যা হাল ছিল এক লাখও পেত কি না সন্দেহ। বাপিতো তাতেও রাজি ছিল। কিন্তু মালটা দেখলো এই সুযোগ। পুরো গাড়ি জ্বালিয়ে দিলে আর কি পড়ে থাকবে। চ্যানেল খাটিয়ে ইন্সিওরেন্স থেকে ও সালা ঠিক মাল খিঁচে নেবে। মাঝখান থেকে বাপিটাই চুলকে গেল। তবে ভাবিস না আমি ঠিক তোর একটা সেটিং করে দেব।
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না বাপি। বস্তিতে থাকতেও অসহ্য লাগছিল। দুজনে দুটো বোতল তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কালুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে কানে এল – কিবে? আসবি নাকি?
খেয়ালই করেনি কখন ওরা “পাড়ায়” চলে এসেছে।
- কি বে? কি দেখছিস? দেখলে হবে, খরচা আছে।
- কালু দর কর।
- কি?
- দর কর।
- আবে কি বলছিস কি তুই?
- বলছি দর কর।
বাপির রক্তচক্ষু দেখে কালু আর কথা বাড়াল না।
বাপিকে টানতে টানতে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। চল্লিশ ওয়াটের আলোয় বাপি দেখল – লাল টপ, ব্লু জিন্স আর রক্তশূন্য দুটো চোখ। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার আগে, ওর নাকে এলো - হাল্কা মিষ্টি একটা গন্ধ।


আপনার মতামত জানান