যোজন

শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

 

প্রতীক আজ থেকে ডায়েরি লিখবে, রোজ। বাড়ি ফিরে চান সেরে নিজের স্টাডিতে বসল ও, মৃদু টেবিল ল্যাম্পের আলো একটা ছোট বৃত্তে উজ্জ্বল। এসিটা অন করে দিল ও।

কি ভেবে আবার উঠে বাইরের মেন ডোর পুরো লক করে দিল, যেমন করে শুতে যাবার আগে। কলিং বেলের সাউন্ড অফ করে দিল ভিতর থেকে, কেউ বাজালেও বাজবে না ওটা এখন। নিশ্ছিদ্র নীরবতায় মুড়ে নিতে চাইছে প্রতীক, নিজেকে। একটা পেগ বানিয়ে ফ্রিজ থেকে তিন টুকরো বরফ ফেলল তাতে। এসে বসল টেবিলের সামনে।

ফেসবুক মেসেঞ্জারে আবার পড়ল তমসার মেসেজ। মেসেজটা লকড, প্রতীক পেয়েছিল তিন বছর আগে, আজকের দিনে। তখন একটা ছোটখাট মিটিং হচ্ছিল ওর আগের অফিসে, ওদের ডিভিশনাল হেডের কেবিনে। সেখান থেকেই বাইরে বেরিয়ে কল করেছিল তমসাকে, না, তমসা কথা বলেনি ওর সঙ্গে। সেদিন তার পরেও অন্তত আট-দশবার ফোন করেছিল প্রতীক, রিং হয়ে গেছিল প্রতিবারে। এগারোটা এসএমএস একতরফা, জবাবহীন। মেসেঞ্জারেও চেষ্টা করেছিল যোগাযোগ করতে, ওর সাতটা মেসেজের একটাও পড়ে দেখেনি তমসা, এখনও পর্যন্ত, মাঝে চলে গেছে পুরো তিনটি বছর। অফিস থেকে সেই দিন ছুটির খানিক আগে বেরিয়ে তমসার অফিসে গিয়েওছিল ও, “তমসা ছুটি নিয়েছে পনেরো দিন, আজকে বেরিয়ে গেছে লাঞ্চ ব্রেকের পরেই। আপনি এলে এই খামটা দিতে বলে গেছে”, ওদের রিসেপশনের মেয়েটি জানিয়েছিল। খামে একটা পাতলা কাগজ, তাতে একই কথা লেখা, মেসেঞ্জারের মেসেজেও এ-ই ছিল। এমনটা না হতেও পারত, কিন্তু হল, সম্পর্কটা কীভাবে যেন ফিকে হয়ে আসছিল দু’তিন মাস ধরে।

সম্পর্ক। হ্যাঁ, তা ছিল প্রায় পাঁচ বছরের বেশি। দুজনেরই প্রথম প্রেম বলা যায়। প্রতীকের মনে পড়ছিল শুরুর সেই দিনগুলোর কথা। হাওড়া জেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম থেকে তমসার এই শহরে আসা, কলেজে ভর্তির পরে পরেই মেস খুঁজে থাকা, কোচিং, কম্পিউটারের একটা ছোট কোর্স, একটা-দুটো টিউশনি করে কিছু পকেটমানির সংস্থান, একটা ছোট নাটকের দলে যোগ দেওয়া, সেখান থেকে আরেক দলে যাওয়া... প্রতীক কীভাবে জড়িয়ে গেছিল সবকিছুতেই, ক্রমে। বন্ধুতা, ঘনিষ্ঠতা, প্রেম এসেছিল হাত ধরাধরি করেই। এবং কালের নিয়মে এসেছিল আরও কিছু, একটি প্রাণ। তমসার গর্ভে। ততদিনে দুজনেই চাকরিজীবনে ঢুকে পড়েছে। দু’বাড়িতে ওদের এই মেলামেশা নিয়ে কোনও আপত্তি ছিল না, মানে বিয়ে করে নিলে সামলে নেওয়া যেত সব। কিন্তু আপত্তি ছিল তমসার, প্রবল। এক্ষুণি নয়, পরে। গুছিয়ে নিতে হবে আরও।

প্রতীক বোঝাতে গেছিল, “এসে যখন গেছেই...”, সপাটে থামিয়ে তমসা বলেছিল, “তার জন্য দায়ী কে? ব্লাডি ইররেসপনসিবল, কোনও কন্ট্রোল নেই!”

এর কোনও উত্তর হয় না। চিড় ধরার সেই সূচনা। তমসা গর্ভপাত করে।

ওই যে, গুছিয়ে নিতে হবে, সে গোছানোর পালা চলেছিল আরও বছর দেড়েক বা তার কিছু বেশি। একটার পর একটা ছবি ভেসে ওঠে প্রতীকের। কত খবর, কত গসিপ, কত রিউমার, কত পেজ থ্রি ছবি। তারপর এক সময় জানা যায়, প্রমিসিং মডেল-কাম-আরজে-কাম-টিভি- ্যাঙ্কর তমসা লাহিড়ি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছেন বিশিষ্ট উদ্যোগপতি এবং সম্প্রতি সাংসদ কপিল খৈতানের এক-লতা বেটা মুকুন্দ খৈতানের সঙ্গে।

এলোমেলো ভাবনাগুলো মাথায় এসে ভিড় করে। কিন্তু দিশা হারায় না আজ প্রতীকের। এই তিন বছর ও নিজেকে স্থিত করেছে। এই অভিযোজন পর্বে ও নিষ্ঠার সঙ্গে ধনুকে তীর যোজন শিখেছে, ভেঙেছে নিজেকে, লেখার জন্য তৈরি করেছে নিজেকে। প্রতীক শুরু করে...



বাণ
পাতিলেবু গাছটায় ঝেঁপে লেবু হত। আমাদের বাড়ির উত্তর-পুবে পোঁতা হয়েছিল, ওইটুকু বেঁটে গাছ হলে কি, লেবুতে লেবুতে যেন নুয়ে আসত একেবারে। বাবার তো রোজ চাই, ভাতের পাতে। এমনও হয়েছে, খেতে বসে খেয়াল পড়েছে লেবু নেওয়া হয়নি, ব্রাক্ষ্মন মানুষ, খেতে খেতে উঠতে নেই, আমিই তখন মুশকিল আসান।

তারপর হঠাৎ ফলন বন্ধ হয়ে গেল। প্রথমে দিনে মোটে গোটা পাঁচ-ছয়, এক সপ্তার মধ্যে সংখ্যাটা নেমে দুই-তিন হয়ে একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। পাতা ঝরে যেতে লাগল অমন ডাগর গাছটার, মাস পুরলো না, গাছটা শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেল।

লোকে বলাবলি করত, গাছে বাণ মেরেছে নিশ্চয় কেউ।

“বাণ মারাটা কী গো বাপি?”, জিগেস করাতে বাবা ব্যাপারটা বলেছিল। তখন মাথায় ঢোকেনি তেমন। জীবনের অলিগলি পাকস্থলী তখন কিছুই দেখিনি, জানি না।

তাই আমার আবার প্রশ্ন, “গাছকে বাণ মেরে কী লাভ হল বাপি? তীর ধনুক নিয়ে এসে বাণ মেরেছিল? কই আমরা দেখতে পেলুম না তো!”

“আরে বোকা ছেলে”, বাবার ব্যাখ্যা, “যে এমন বিদ্যে শিখল, সে নিজেকে একবার যাচাই করবে না, তার বিদ্যে ফলছে কি না? হুট করে মানুষের ওপর পরখ করা যায় না কি? তাই তো গাছ, ফলন্ত গাছ”।

প্রতীক পরে, একটু বড় হয়ে জেনেছিল গিনিপিগের কথা। বেচারা গিনিপিগ, কেন ওদের ওপরেই সব পরীক্ষা করতে হবে, মরেও তো যায় কত... ভেবে একদিন বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফিরে চুপিচুপি ছাদের ঘরে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল খুব ও, একা একা।

যেমন তুমি। দেখে, বুঝে ঘর বাঁধলে। তার আগে পূরণ করলে নিজের লক্ষ্য, বাজিয়ে নিলে তৈরি করা মঞ্চ কতটা চাপ নিতে সক্ষম, সাথে সাথে প্রখর করে তুললে নিজের স্কিল, ধারালো করলে টেকনিক, পজিশান, স্টান্স।

আর ফিরেও তাকালে না।

ভালোবাসা প্রেম এসব বড় প্রাচীন শব্দ, ক্লিশে। ব্যবহার নেই-ই তেমন।

আপনার মতামত জানান