হেলমেট

বিশ্বজিৎ রায়

 



এক দেশে এক বাড়ি ছিল । সেই বড়িতে থাকত একজন ছেলে আর একজন মেয়ে । তাদের নাম ছিল – মানুষের নাম থাকে । পশুদের নাম থাকে কি না বলা মুশকিল । তবে মানুষ তাদের নাম দেয় । একদিন সেই ছেলে আর মেয়ের ময়দা মিশে তৈরি হল আর একটা ছেলে । তারা সেই নতুন মানুষের নাম রাখল বাবুই । বাবুই বালিশের সমান লম্বা । শীতকালে দিব্যি কাঁথা চাপা দিয়ে একটা বালিশে শুইয়ে দুপাশে দুটো পাশবালিশ দিয়ে বেড়া দেওয়া যেত । বাবুই আরাম করে ফুস-ফুসিয়ে নিঃশ্বাস নিত আর ঘুমোত । মাঝে মাঝে দেখে যেতে হত হাগু-হিসু করেছে কি না । করলে কাঁথা বদলে দিতে হত । নইলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে । যতই হোক মানুষের বাচ্চা , পক্ষী শাবক তো আর নয় ।
কালে দিনে বাবুইয়ের বোল ফুটল । বাবুই এবার নাম দেওয়ার সুযোগ পেল । সে ছেলেটাকে বলল ভাল্লুক, মেয়েটাকে বলল পিকক । প্রথম থেকেই পিকক আর ভাল্লুক বলত তা নয় – তবে মোটামুটি ভাবে মানুষের মতো হওয়ার পর থেকেই এই নামে ডাকাডাকি শুরু করে দিল । জিগ্যেস করল, ‘সে কোথা থেকে এল ?’ তখন পিকক বলল, ‘ভাল্লুকের ময়দা আর পিককের ময়দা দিয়ে সে তৈরি।’ তাদের বাড়িতে যে রান্না করত বাবুই তার নাম দিয়েছিল হাঁসু । সে ময়দা মাখছিল, লেচি কাটছিল । পিকক একদিন দুটো বড়ো লেচি নিল । তারপর সেই দুটো লেচি থেকে একটু একটু করে ময়দা নিয়ে ছোটো একটা বাবুই লেচি বানাল ।
বাবুই খুব খুশি । বাবুই অবশ্য পিকককে বেশি ভালোবাসে । পিককের প্রতি গভীর পক্ষপাত । ভাল্লুক কানে একটু কম শোনে, চোখে কম দেখে, গায়ে পচা ঘেমো গন্ধ । তা ভাল্লুকের তো এমন হতেই পারে । তাছাড়া বাবুই আর পিকক পক্ষীজাতীয় – ভাল্লুক স্তন্যপায়ী । গোত্র আলাদা । যাই হোক বাবুই, পিকক আর ভাল্লুক মোটের ওপর সহাবস্থান করত । এর মধ্যে ভাল্লুকের আবার একটু ‘স’-এর দোষ ছিল, গানের গলাও ছিল বেসুরো । ফলে সব মিলিয়ে বাবুই জানত ভাল্লুক কিছু জানে না ।
সকালে ভাল্লুক বাবুইকে স্কুটি চাপিয়ে ইস্কুল নিয়ে যেত । কিন্তু তাদের হেলমেট ছিল না । আলসেমি করে কেনেনি । যে শহরে তারা এখন থাকে সেখানে হেলমেটের জন্য পুলিশ খুব একটা চাপাচাপি করত না । শুধু পুজোর আগে পুলিশরা জেগে উঠত । তাদেরও তো জামা-কাপড় কিনতে হবে । তখন হেলমেট ছাড়া মাথা দেখলেই ফাইন করত । পুরো ফাইন না দিলেও চলত । অল্প অল্প ফাইন জমে তাদের জামা জুতো মোজা হয়ে যেত । তবে পুলিশকে সেই জামা-জুতো-মোজা পরে পুজোর প্যান্ডেলে কেউ দেখেনি । একবার তাদের শহরে একখানা ব্রিজ গেল ভেঙে । ফলে বাবুইয়ের ইস্কুল যাওয়ার রাস্তা দিয়ে ঘুরে ঘুরে যেতে লাগল বড়ো বড়ো বাস । তখন তারা প্রথমে দুটো হেলমেট কিনল ।
স্কুটি কেনার সময় দোকান থেকে তাদের একটা ফ্রি হেলমেট দেওয়া হয়েছিল । সেই হেলমেটটা খুব জমকালো নয়, পরা আর না পরা । তাই হেলমেটটা না পরে সেটাকে দুধভাত হিসেবে ঘরে সাজিয়ে রেখেছিল । ভাল্লুক যখন ছোটো ছিল তখন তাদের খেলায় দুধভাত বলে একটা বিষয় ছিল । যে ভালো খেলতে পারে না অথচ যাকে খেলাতে নিতেই হয় তাকে বলা হত দুধভাত । দুধভাত ব্যাট করত, বল করত কিন্তু তার বল-ব্যাট কাউন্ট করা হত না । ফ্রি হেলমেটটাও তেমন দুধভাত । তবে দুটো নতুন হেলমেট কেনার পর বাবুই বায়না ধরল সে দুধভাত হেলমেটটাই পরবে । কী আর করা যাবে । তাই সই । তবে সেই দুধভাত হেলমেটটা হারিয়ে ফেলল ভাল্লুক । বাবুইকে ইস্কুলে পৌঁছে বাড়ি ফেরার সময় সে দুধভাত হেলমেটকে পেছনে আটকে রেখেছিল -- কখন কোথায় হেলমেট পড়ে গেল সে টেরই পেল না । ঘরের একদিকে যখন পড়েছিল তখন পাত্তাই দেয়নি, হারিয়ে যাওয়ার পর দুধভাত হেলমেটের জন্য ভাল্লুকের মন খারাপ হল । বাবুইয়ের শুনে কী হাসি । ভাল্লুক যে হেলমেট হারাবেই সে তো জানা কথা । যাই হোক তখন তিনজনের তিনখানা মাথায় তিনখানা হেলমেট থাকবে স্থির হল । দুটো কালো একটা লাল – বাবুই বলল, ‘সে লালটা নেবে।’
হেলমেট পরলেই মাথা চুলকোয় । যেই পরে অমনি চুলগুলো কেমন চুলকোচ্ছে চুলকোচ্ছে ভাব হয় । খুললে আর চুলকোয় না । এদিকে হেলমেট পরে মাথা চুলকোনো যায় না । পিকক বলল, ‘তখন হেলমেট চুলকে নিতে হয়।’ বাবুই বলল, ‘বাজে কথা।’ হেলমেট চুলকোনো যায় না, তবে হেলমেটে হেলমেটে খুব ঠোকাঠুকি লাগে । বিশেষ করে বাবুই আর ভাল্লুকের । বাবুই সামনে বসলে বাবুইয়ের হেলমেটের পেছনের সঙ্গে ভাল্লুকের হেলমেটের সামনে ঠুকে যায় আর বাবুই পিছনে বসলে বাবুইয়ের হেলমেটের সামনের সঙ্গে ভাল্লুকের হেলমেটের পেছন ঠুকে যায় – বেশ শব্দ হয় । আবার মজাও লাগে ।
বৃষ্টি হলে হেলমেটের ওপর বেশ বাজনা বাজে । সামনের কাচে জল জমে না – জল ঝরে যায় । তাছাড়া হেলমেট পরা অবস্থায় যখন খুব স্পিডে স্কুটি চালায় ভাল্লুক তখন কানের কাছে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ । সব মিলিয়ে হেলমেট পরে মাথা চুলকোনো না গেলেও বেশ কিছু মজাও হয় । ভাল্লুক মনে মনে আর একটা কথা ভাবে । সেটা কাউকে জিগ্যেস করতে পারে না । ছোটোবেলায় তারা যখন স্কুলে ডিউজ বলে ক্রিকেট খেলতে শুরু করল তখন প্যাড, গ্লাভস, গার্ড পরেছে কিন্তু হেলমেট পরেনি । টেস্ট ক্রিকেটাররা হেলমেট পরত । গাভাসকার স্কাল ক্যাপ, বাকিরা হেলমেট । মাঠে ঢুকেই কায়দা করে হেলমেট পরা আর মাঠ থেকে আউট হয়ে ফেরার সময় হেলমেট খুলে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আসা । হতাশায় অনেকে গ্লাভস খুলে হেলমেটে রাখত । এই ভঙ্গিটা তারা স্কুলে ম্যাচ খেলার সময় করতে পারত না । করতে ইচ্ছে করত । কিন্তু তাদের হেলমেট ছিল না । ক্রিকেটের হেলমেট আর স্কুটির হেলমেট কি এক ! কাকে জিগ্যেস করবে ? বড়োদের জিগ্যেস করলে হাসবে, ছোটোদের জিগ্যেস করলে বলতে পারবে না । এখন অবশ্য হেলমেট পরে মাঠে ক্রিকেট খেলতে নামার উপায় নেই । ভাল্লুক ভাবে তবু হেলমেট তো পরা হল ।
হেলমেট দিয়ে চারপাশ দেখতে বেশ অন্যরকম লাগে । একদিন বাবুই আর ভাল্লুক ইস্কুল থেকে ফিরছিল । বর্ষা ঘনিয়েছে । বৃষ্টি পড়ল, বৃষ্টি থামল । আসতে আসতে তারা দেখল একটা কালো লেজকাটা কুকুর ডন দিচ্ছে । বডি স্ট্রেচ করছে । পিকক আজকাল ‘যোগা’ করে । বাবুইদের পচা আর ভালো পিটি টিচার ‘যোগা’ করায় । বাবুই ‘যোগা’ জানে । বাবুই বলল, ‘দেখ কুকুরটা ‘যোগা’ করছে।’ ভাল্লুক বলল , ‘ঠিক’ । বাবুই অবাক । বলল, ‘কী ব্যাপার একবার বলাতেই যে বড়ো শুনতে পেলি ! কানটা কী ভালো হয়ে গেল নাকি ! চোখেও দেখতে পেলি কুকুরটা ‘যোগা’ করছে । তোর চোখ-কান কি ভালো হয়ে গেল?’ ভাল্লুক হাসল । বলল ‘হেলমেটে হেলমেটে ঠোকাঠুকি লেগে চোখ কান ঠিক হয়ে গেছে।’ বাবুই খুব খুশি । ইচ্ছে করে হেলমেটে হেলমেট লাগিয়ে ঠুকঠাক করতে লাগল । এভাবেই তারা সেদিন বাড়ি ফিরল ।
এখন মেঘ নেই । ভাল্লুকের মনে হল সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলিং-এর সামনে হেলমেট পরে ব্যাট হাতে ছয় মারল । পিকক দেখল এখন বাবুই আর ভাল্লুক হেলমেটে হেলমেটে ঠোকাঠুকি করে আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে ।

আপনার মতামত জানান