গুচ্ছ কবিতা

সার্থক মজুমদার

 



১।
রসদ
একটা অহেতুক জীবন কাটানোর জন্য,
কিছু অহেতুক রসদ চাই।
রাত বাড়লেই মীরাক্কেল,
শীত পড়লেই দু-চারটে পিকনিক
গুঁজে দাও এখানে-ওখানে।

টি ভি জুড়ে জোকারদের
মহোৎসব চলে বছরভর।
হরদম মশা মাছি মরে
(মাঝে মাঝে আরশোলাও)।
আঙুলের ছোঁয়ায় বাতাসে ভাসে
টাটকা গুড়ের মতো প্রগাঢ় খিল্লি।
এছাড়াও! ওফ কী ভীষণ,
ক্রিকেট দিয়েছেন ভগবান!

একটা স্বাভাবিক জীবন
কেটেকুটে যায় যাতে, রক্ত না পড়ে।


২।
গোপালপুর অন সি
সাগর উত্তাল আজ দোল লাগে ধমনী, শিরাতে,
সারারাত অবিরত ঢেউয়ের গর্জন ভেসে আসে।
শূন্য বালুচর জুড়ে হু হু হাওয়া খেলা করে যায়,
মাঝরাতে একফালি চাঁদ জাগে পূবের আকাশে।
এসকল দিনকাল পুরনো অট্টালিকা জানে,
কঙ্কাল আজ তার অনেক সুদিন গেছে চলে,
কিছু কুকুরের ভিটে, জেলেদের গুপ্ত অভিসার
পাঁজরের হাড় সার, আভিজাত্য তবু কথা বলে।
এখানে ওখানে কিছু এক-আধমুঠো আশা পড়ে,
ঝিনুক খোলের মতো ঝাঁপবন্ধ চায়ের গুমটি,
ভোরের প্রতীক্ষা করে, কিছু উষ্ণতার বিকিকিনি
উষ্ণতা বেচে কত মানুষই যে পেতে দুটি রুটি।
এদিকে রাত্রি জুড়ে সমুদ্র উতরোল হয়,
মাতলামি বাড়ে রাতে চাঁদের পরশ যদি লাগে।
শহর ঘুমোয় চুপ নিঃশঙ্ক চাদর জড়িয়ে,
ভয়ে ভয়ে রাত জুড়ে একাকী আলোকস্তম্ভ জাগে।




৩।
যেমনটি চেয়েছিলে...

যেমনটি চেয়েছিলে,
তেমনই এনেছি দেখো রাত,
উপগ্রহহীন,
নিবিড় কৃষ্ণাকাশে
শুধু শত ছিন্ন তারা,
মায়াময় আলোকসজ্জায়,
বসন্ত নয় তবু,
হাওয়া বয়, উহাই দক্ষিণ।
সামনে একাকী মাঠ,
নির্লিপ্ত দিগন্তবিলীন ।
যেমনটি চেয়েছিলে তেমনই এনেছি,
এসো এই মগ্নক্ষণে,
আমাদের ঘিরে আছে
যত তারারাশি,
সবার সমুখে যেন আমরাই
প্রাণের প্রবাহ,
সকলের ইঙ্গিতে
এসো মোরা হারাই দুজনে,
প্রকৃতির মাঝে
শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসা
ও তারপর স্নিগ্ধ মরণে।



৪।
একাকী

সব কথা শেষ হয়ে গেছে,
সব গান,
যার যা গাওয়ার ছিল,
ভেসে গেছে,
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে,
দূর কোন আধজাগা গাঁয়ে।
এখন সবাই চুপ,
ফুরিয়েছে সব কথা।
নিভেছে আগুন।
আলোহীন কৃষ্ণকায় রাতে,
মাথা জুড়ে তারাদের ভিড়ে,
হৃদয় ক্রমশ জাগে।
কয়টি শরীর,
নিভন্ত আগুন ঘিরে,
এদিকে ওদিকে,
একে অপরকে ছুঁয়ে,
মনে হয় যেন আজ প্রার্থনায় রত।
এমন আড়ালহীন রাতে,
দূর তারাদের কোন গোপন ইঙ্গিতে,
জেগে থাকে সকলেই,
শান্ত, স্থির নিজের মুখোমুখি।
হৃদয় অতল থেকে,
জাগে যে আদিম ভয়,
তারাদের দেখে,
অনুচ্চারে মনে হয়,
বেঁধে বেঁধে থাকলেও,
আমরা তো সবাই একাকী।


৫।

তারার কথা
রূপকথার সন্ধানেতে,
অনেককাল স্বপ্নহারা
এখনও জানি পাওনা খুঁজে
কোন তারাটি সন্ধ্যাতারা।

চারদিকেতে গোলকধাঁধা
হাজার পথ আগলে দাঁড়ায়,
ছোটবেলার কোন তারাটি
আজো তোমায় চক্ষে হারায়!!

এটা, না, ওই ওই তারাটা,
না ওপাশে ছোট্ট সে নীল,
মামারবাড়ি মাঠের ধারে
আকাশজুড়ে তারার মিছিল।

তারা চেনার উপায় সোজা,
কিন্তু তাতে গলদ ভারী!
উফ! গালেতে লাগলো খোঁচা
কি যে তোমার উটকো দাড়ি!!

তারারা সব ঘুরতে থাকে
চক্রাকারে, উল্টো, সোজা,
ইশকুলে যায় দুই বিনুনি
তখন তাকে যায় না বোঝা।

নবম শ্রেণী ভূগোল পড়ে
বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে ও কী!!
বসন্ত থাক মাঠের পারে
হঠাৎ কেন ডাকল কোকিল!

তবুও তারা সাবধানী হয়
মনেতে যদি কু-ডাক ডাকে
ধরা পরতে পারে ভেবেই
লুকিয়ে পরে মেঘের ফাঁকে।
মেঘের জানি দম্ভ ভারী,
আড়াল রাখে তারার পানে
চাতক পাখি বুঝেও তবু
আচমকাই বজ্র হানে।

বজ্র জানে ভস্ম করা
ভস্ম থেকে মাটির দেশে
অনেক বারি সিঞ্চনেতে
অঙ্কুরটি জাগলো শেষে।

সে ভুলেছে তারার কথা,
সে ভুলে রয় মাটির ঘ্রাণে
মেঘ দেখলে ভয় পায় সে
আর যায়না মাঠের পানে।

দুই বিনুনি বাড়তে থাকে,
কলেজ থেকে শ্বশুরবাড়ি!
তারার দেশ হারিয়ে গেলেও
অনায়াসেই জমায় পাড়ি।

কেবল আজো একলা ছাদে
সাঁঝ আকাশে আপনহারা,
বুঝতে পারে হয়নি চেনা,
কোনটি ছিল সন্ধ্যাতারা!



৬।
জীবন যখন শুকায়ে যায়...

বহু ঊষর মরু,
হাজার হাজার মাইল উজানে,
বুঝি আছে ওয়েসিস!
সহস্র বাতিল উপত্যকা,
নষ্ট আর প্রাণহীন
নাভির গভীরতায়,
ধূসর রাজ্য জুড়ে,
এক খণ্ড মেঘের চলন,
তাকেও কি আশা বলে?
সব কিছু উদ্দেশ্য বিধেয়,
টাইম বোমার যত টিক টিক টিক!
সব বুঝি সিনেমায় মানায়।

নয়তো নেহাত কিছু
বৃশ্চিকদংশন,
বালিতে মৃত্তিকাচিহ্ন
ক্ষরণ কি শরীরী প্রবাদ!
শরীরে মানায় সবই,
ধূসর উপত্যকা
প্রাণহীন, রোমাঞ্চবিহীন,
দিবাস্বপ্নে ছায়াঘেরা ওয়েসিস
ব্যর্থ চলন।


৭।
অপেক্ষাতে

কয়েকটা দিন ঠিক কেটে যায় তোমার সাথে,
মাসের শেষে রোববারেতে পাওনা বাকি,
পাওনা কিসে ওসব কথার ধার ধারিনে!
হঠাৎ তোমায় দেখতে পেলে হাতটা পাতি।

ভবঘুরে আশপাশেতেই সামলে চলো,
জামার নিচে সাইনবোর্ডে স্পষ্ট লেখা,
দেখছে কে আর খেয়াল করে, পরলে ফাঁদে
পতন এবং মূর্ছা জুড়ে বাঁচতে শেখা।

আমার তবে এই সবই থাক জগত জোড়া
রোদ, ঝড়, জল, বুকের পালক, আলতো তুলি
হঠাৎ লোকে রাস্তাঘাটে করলে ছি ছি,
সামলে নিও তুমিই সেসব অস্ত্রগুলি।

মস্ত বড় ভরসা আছে নদীর ওপার,
এপারেতে কাশের উঠোন বুঝতে নারি,
সামলে ফসল পার হলে দিন আসবে কবে
ভবঘুরের দিন কাটে অপেক্ষা তারই।।


৮।

শান্তি
সকলেই আগে চলে গেছে,
ফেলে রেখে পিছুটান,
সারিগান,
অকারণ আলাপচারিতা।
এখন সময় হল,
রৌদ্রের আভাস ম্লান,
বাদল ঘনায়,
চারদিকে কারেও দেখিনা,
অকারণ কোলাহলে
শালিখ চড়াই কিছু
আমারি হাতের থেকে
হেলায় ছড়িয়ে পড়া
চাল খুঁটে খায়।
কালো মেঘে ভরসা রয়েছে,
হে মহাপ্রাণ,
আমারে আড়াল করো
জগৎ সংসার হতে,
ত্রিভুবন হতে।
আপন সমীপে শুধু
দগ্ধ নয়, শান্ত হতে দাও।



৯।
বিদায়

বিদায় নেওয়ার আগে,
ক\'টি মুহূর্ত শুধু
সযতনে বেঁচে নেব,
সকলের সাথে একাকারে।
কিছু ছবি এঁকে নেব,
তুলিটা ডুবিয়ে নিয়ে,
সেইসব রঙিন সময়ে,
কিছু দিন রোদ ঝলমল
আকাশটা ভালবাসা নীল,
সকলের মুখে হাসি
কান্না থাকলে থাক অন্তলীন।
এমনই সবুজ কিছু
ছবি ফ্রেমে ভরে নিয়ে
তারপর পাড়ি দেব দূরে।
কিছু মুহূর্ত শুধু
থমকে দাঁড়িয়ে রবে
বালুকাবেলায়,
আকাশ সমুদ্র সব,
সোনালী ঢেউয়ে মিশে,
বলে যাবে,
এইভাবে চলে যাওয়া যায়।


১০।
চলন


দিন পর দিন যায়,
অবিরাম ছন্দহীন স্রোতে।
সপ্তাহ, বছর, মাস
নতুনকে জীর্ণ করে তোলে।
অকারণ পর্যটনে
অর্ধেক জীবন কেটে গেল,
যেটুকু রয়েছে বাকি
তাকে ঘিরে বিষণ্ণতা জাগে।
পৃথিবীর সাথে সাথে
আমরাও চক্রাকার পথে,
যন্ত্রের নিয়ম মেনে
দিবারাত্র ঘুরেই চলেছি,
অনেক পরিক্রমা
শেষে আজ জাগে বিস্ময়,
পথ কিছু কমেছে কি?
সামনে তো একইভাবে বাকি!
বৃথা পর্যটন তরে
জীবনের অপচয় দেখে,
আজ মনে পড়ে সেই
বিজ্ঞানের অমোঘ সূত্র।
চক্রাকার পথে তুমি
যত কেন ঘুরে ফিরে আসো,
আখেরে সায়ংকালে
দেখা যাবে কার্য শূন্য।


১১।
রবিবার

কিছু হতভাগা ছাড়া,
সকলেই ভালবাসে,
আপনজনের সাথে
বসে দুটি ডাল ভাত খেতে।।


১২।
খিদে

রোববার দিন খুব খিদে পায় বারবার...

ভাতের টানেতে স্কুলে যাওয়া ওই ছেলেটার।

আপনার মতামত জানান