অপ্রেম, হলদে সিগনাল আর মিউজিক ক্যাফে

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 



‘কোলকাতা শহরটার রং কি বল তো?’
‘ব্ল্যাক’।
‘ইয়েলো’।
‘এই আলোগুলোর জন্য?’
...
বিয়াস আর প্রান্তিককে ঠিক দারুণ বন্ধু বলা যায়না। এক কলেজে পড়তো – অনেকদিন মাঝে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি – ফেসবুকে কথাবার্তা ছিলো যদিও। প্রান্তিক বেশ কিছুদিন পর কোলকাতা ফিরেছে – কিন্তু বিয়াস তার আগেই ‘পাতা’ ফেলে দিয়েছে। পড়তে টড়তে যাবে। তার আগে একটা গুড বাই ফেয়ারওয়েল টাইপ সব জায়গায় ভিজিট করবে ঠিক করেছে।
বিকেলের সেক্টর ফাইভের আকাশ দেখছিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রান্তিক। এমন কিছু রোম্যান্টিক ব্যাপার নয় – বিয়াস আসবে বলে দাঁড় করিয়ে রেখে দিয়েছে – ‘কিছু একটা করতে হবে তো’ ( বুঝতেই পারছেন প্রান্তিক বাঙলা সিনেমা দেখে এটা এই এক ডায়লগে এস্ট্যাব্লিশড হয়ে গেলো। হুঁ হুঁ বাবা ইকনোমি অফ ওয়ার্ডস – আমিও বুঝি)।
সেক্টর ফাইভের আকাশে স্কাইরাইজার আর ইলেক্ট্রিকের তারগুলো মিলেমিশে কয়েকটা অদ্ভুত জিওমেট্রিক শেপ নেয়। ছোটোবেলা প্রান্তিকের ডায়মন্ড কমিক্স পড়ার খুব শখ ছিলো – সেখানে স্পাইডার ম্যান পড়ে রোপ বয় বলে একটা ক্যারাক্টার বানিয়েছিলো নিজের– সে এরম তারে তারে বিচরণ করে বেড়াতো – টোটাল সুপারহিরোইক ব্যাপারস্যাপার। যাই হোক এখন প্রান্তিক সেসব দেখছিলো না – দেখছিলো সেই তার টার ছাড়িয়ে পেছনের কয়েকটা মেঘের মধ্যে একটা মেঘ কিরকম একটা কালো রঙের বর্ডার দিয়ে আলাদা করা রয়েছে – আচ্ছা আকাশে তো কেউ ফোটোশপ ইউজ করেনা - মেঘের চারপাশে এরম নিখুঁত বার্ন এফেক্টটা কিভাবে এলো।
এসব মহাজাগতিক চিন্তাভাবনা ভেঙে গেল অবশ্য শিগগিরি।
‘ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কতক্ষণ ধরে?’
বিয়াস একটা আনারকলি পড়ে এসেছিলো – মাথায় খুলে দেওয়া চুল – হাল্কা রং করা – চোখে বেশ মোটা একটা ফ্রেমের চশমা।
‘খানিকক্ষণ – তোর চোখের নীচে ডার্ক সার্কেলস পড়ে গেছে’।
বিয়াস হাল্কা শ্রাগ করল – ‘কি আর হবে?’
‘কলেজে ছেলে পটবেনা’।
‘অ্যাদ্দিন যখন পটেনি এম্নিই পটবেনা’।
...
‘আজকের মতো ছেড়ে দে – রোববার ঠিক দেখা করবো’।
প্রান্তিক নাছোড়বান্দা – ‘দেখ আজকে তোর সাথে ঘুরে বেড়াবো বলে আমি ম্যানেজারকে গুল মেরেছি’।
‘কিন্তু এই শেষ কদিন ঠিকঠাক টাইমে বাড়ি না ফিরলে বাড়িতে খুব ঝামেলা করছে’ – বিয়াস কাঁদোকাঁদো।
‘সে তো করবেই, বাড়িতে তো সবারই ঝামেলা হয়’- প্রান্তিক টু দি পয়েন্ট।
‘কিন্তু’
‘আরে তুই তো এখানে অফিসের কাজ সারতেই এসেছিলি – বলে দে দেরী হয়ে যাচ্ছে - দেখ তুই তো এখানে অফিসের কাজ সারতেও এসেছিলি বলে দে আটকে গেছিস’।
‘কিন্তু বাবা একটা লোককে আসতে বলে দিয়েছে – বুঝতে পারছিস না – বাবা প্রচুর চাপ দিচ্ছে’।
‘আরে আমিও বাড়ির বাইরে গেছি –বুঝতে পারছি বাড়িতে ভীষণ চাপ দেয় – কিন্তু ওই ক্যাফেটায় চ – দেখ সব চাপ কম্পেনসেট হয়ে যাবে’।
‘লোভ দেখাস না’।
‘দেখাচ্ছি’।
‘কোথায় জায়গাটা?’
‘গড়িয়াহাট’।
‘ওখান থেকে আমার বাড়ি যদিও বেশ কাছেই’।
‘ভালো কথা বলছি বাড়িতে ফোন কর’।
‘তুই কেন বেকার বেকার অফিসটা কাটালি?’
‘তুই কেন দেখা করতে এলি?’
...
‘হ্যালো হ্যাঁ বাবা – শোনো না একটু আটকে গেছি – কালকে লোকটাকে আসতে বলতে পারবে – হ্যাঁ কালকে উইল বি ফাইন – না – না মানে এরকম কেনো করছো – আচ্ছা – প্লিজ মেক ইট আটটা – না তার আগে হবেনা’।
বিয়াস ফোনটা রাখলো।
‘দেখেছিস তো’
‘চাপ নিসনা নর্মাল কেস – তোর দিদি এখন কেমন আছে?’
‘ভালোই তবে দুবার অ্যামেরিকার ভিসা রিজেক্ট হয়েছে’।
‘কেন রে?’
‘ও এরোস্পেসে কাজ করে তো। ইউনাইটেড স্টেটস ভাবছে ও স্পাইং করবে’।
সায়েন্স সিটিতে লম্বা জ্যাম – হাতে সময় রয়েছে ঘন্টা দেড়েক – তারপর বিয়াসকে বাড়ি ফিরতে হবে।
‘তোর দিদির নাম যেনো কি ছিলো?’
‘রূপসা’।
‘বাবা দুই বোনেরই নদীর নামে নাম?’
‘হ্যাঁ’।
‘টোটাল বহতা কেস’।
...
‘তোর গলাটা তো বেশ মিষ্টি ‘।
বিয়াস হাসলো।
‘না সিরিয়াসলি কথা বলার গলাটা শুনলে বোঝা যায়না’।
‘হ্যাঁ কথা বলার গলাটা বড্ডো কর্কশ’।
‘গলাটা কর্কশ না তুই বেশী খ্যাঁচখ্যাঁচ করিস সেটা জানিনা’।
রুবির মোড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত আজকাল প্রায়ই শোনা যায় তবে সেটা ট্রাফিক সিগনালে – বিয়াসের গানের সাথে সেটার কোনো সম্পর্ক নেই। বিয়াস অনেক ছোটোবেলা থেকেই গান শেখে – ক্লাসিকাল আর রবীন্দ্রসঙ্গীত – যদিও প্রান্তিক সেটা জানতো না।
হঠাৎ করে ভি-আই-পি বাজার পার হবার পর প্রান্তিক বললো – ‘বিয়াস’।
‘কি?’
‘একটা গান গা’।
‘মানে?’
‘মানে তোকে দেখে মনে হচ্ছে এই সন্ধে নামবো নামবো করছে এই সময় বেশ ভালো একটা গান ধরতে পারবি’।
‘সিরিয়াসলি গাইবো?’
‘সিরিয়াসলি গা’।
‘আমি কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই শুধু – তোদের মতো ঝিঙ্কু গান না’।
‘রবীন্দ্রসঙ্গীত ইজ অলওয়েজ ঝিঙ্কু’।
‘খুব ন্যাকা ন্যাকা কিন্তু’।
‘রবীন্দ্রসঙ্গীত ইজ নেভার ন্যাকা ন্যাকা’।
ট্যাক্সিড্রাইভারটা একটা রেয়ার ভিউ মিররে কেসটা বুঝে নিলো – বিয়াস ‘যদি প্রেম দিলেনা প্রাণে গাইতে শুরু করলো’ – রুবি হসপিটালের কাঁচের দেওয়ালে তখন লাল লাল মেঘগুলো আস্তে আস্তে কালো হয়ে আসছে।
...
‘আই অ্যাম নট আ কমিউনিস্ট বিয়াস’।
‘সো হোয়াট আর ইউ?’
‘আই অ্যাম অ্যান ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট – আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেকটা ইন্ডিভিজুয়াল একটা নিজস্ব বিপ্লব - ভাল বাঙলায় বললে যাপন করে’।
‘ট্রু, কিন্তু তুই একটা কথা ভুলে যাচ্ছিস – কিছু লোক স্টিল থাকবে যারা শুধু মিছিলেই হাঁটবে –সেটাই তাদের ওয়ে অফ প্রোটেস্ট’।
‘হ্যাঁ – না কিন্তু সেটা তো একটা গভর্নড প্রোটেস্ট – গভর্নড বাই সাম থার্ড পার্টি – হাউ ক্যান দ্যাট বি ইওর ওন?’
‘তুই আজ পর্যন্ত একটা মিছিলেও হেঁটেছিস?’
‘না’।
‘আমি হেঁটেছি – দিল্লী রেপ কেস নিয়ে যে বড়ো মিছিলটা হয়েছিলো কোলকাতায় সেটায় – আমি রবীন্দ্রসদনে গেছিলাম – ভাবতে পারবিনা একটা মিছিল কিভাবে ফর্ম করলো – চারদিক থেকে আস্তে আস্তে অফিস ফেরতা লোক, সিনেমা ফেরতা মেয়ে, পার্ক ফেরতা কাপল মিলে একটা মিছিল তৈরী হয়ে গেল – এই ম্যাজিকটা প্রতিবাদ নয়?’
‘কিন্তু সেটাও তো তাদের ইন্ডিভিজুয়াল প্রতিবাদ’।
‘সবকটা ইন্ডিভিজুয়াল যদি একরকম ভাবে তা’লেই তো একটা কালেক্টিভ প্রতিবাদ তৈরী হয়ে যায়’।
‘দাদা সামনে থেকে বাঁদিকে’।
...
ক্যাফেটায় ওরা যখন ঢুকলো তখন ক্যাফেটা একদম ফাঁকা – ক্যাফেটার মালিক প্রান্তিকের বন্ধু – নাম শিরিশ – ওরা কয়েকজন মিলে এই ক্যাফেটাকে একটা ইন্টারঅ্যাকটিভ আড্ডার ঠেক বানাতে চায়।

বিয়াসের মুখ দেখে বোঝা গেল ক্যাফেটাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। প্রান্তিক শিরিষকে ফোন করলো – শিরিষ কোন্নগরে – এখন আসতে পারবেনা।
ক্যাফেটায় একটা ডিম লাইটে বিয়াসের চোখের তলার ডার্ক সার্কেলস গুলো বোঝা যাচ্ছিলো না।
প্রান্তিক বললো – ‘তোকে এখানে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে’।
‘জানি – তুই আমার কাছে একশো টাকা পাবি – ট্যাক্সি ভাড়াটা আমি দেবো – তুই এখানে খাওয়াবি’।
‘যাহ তারা – শোননা এখান থেকে রাসবিহারী অটো নিয়ে যাবোনা – হেঁটে যাবো’।
‘পাগল! বাবা আমার একটা হাড়ও আস্ত রাখবেনা’।
‘আরে না রাখলে না রাখবে – চল না – বেশীক্ষণ লাগবেনা’।
‘ধুর’।
‘চল না’।
...
ওরা হাঁটলো।
বুকে হেঁটে হেঁটে কোলকাতা শহর তখন চলে, দৌড়ে পৌঁছচ্ছে বাড়ি – দেশপ্রিয় পার্কের রাস্তা থেকে খাবার তুলে নিয়ে মুখে পুরছে কিছু ফুটপাথ জীবন।
শহর কোলকাতায় একটা আস্তো সন্ধে নামছে – ভিড় বাসে একফোঁটা খাঁচা খুঁজে নিতে নিতে আচম্বিতে জেব্রা ক্রসিঙের সাবলীলতা আবিষ্কার করছে কিছু বেবাক মানুষ। বোকা রাজনীতিবিদ লেক মার্কেটের মোড়ে সামনে রাখা মাইকটাকে ভুলে গিয়ে চিল চিৎকার করে যাচ্ছে – শহর কান দিচ্ছে, প্রাণ দিচ্ছেনা।
অটোওয়ালা গুলো বেহিসেবী টেঁরাবেঁকা সাবলীলতায় টপকে যাচ্ছে একের পর এক বাস – মেলোডিতে সিডি কিনে বাড়ি ফিরে জর্জ বিশ্বাস যাপন করছে পুরোনো সময়। রোলের দোকানগুলো শুধু খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে – কিন্তু এখন চাউমিনের টেস্ট পালটে যাচ্ছে – আর আজিনামোটো দেওয়া হয়না।
এসবের মাঝে ট্রাফিক সিগনালে শহরকে লালবাতি চেনাচ্ছেন একা রবীন্দ্রনাথ।
ওরা হাঁটলো।
ভলভো বাসের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। প্রান্তিকের বন্ধুরা একটা দুটো করে গাড়ি কিনে ফেলছে – বিবাহিত নিঃসঙ্গতা যাপন করছে কেউ কেউ – মাঝে মাঝে বাবায়িতও হয়ে পড়ছে।
বোকা বোকা রাশটানাটানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্মার্টফোনে ঢুকে যাচ্ছে পর্ণোগ্রাফি – যার ডিউরেশান – বিয়াসের ভাষায় ‘ইলেভেন মিনিটস’ – প্রান্তিকের কাছে – আজন্মকাল।
ওরা হাঁটলো।
শহর স্বাধীনতা চিনলো – মুক্তাঙ্গনের পিছনের গলিটার আলো গেল কমে – কারণ তখনই বিয়াস প্রান্তিককে জিজ্ঞেস করলো – ‘কাফকা পড়েছিস?’
...
‘কোলকাতা শহরটার রং কি বল তো?’
‘ব্ল্যাক’।
‘ইয়েলো’।
‘এই আলোগুলোর জন্য?’
‘জানিনা’।
‘তুই কিন্তু এবার সোজা বেহালার অটো নিবি প্রান্তিক’।
‘কেনো?’
‘আমি অন প্রিন্সিপাল কাউকে অটোর লাইনে দাঁড়াতে দিই না’।
‘মানে?’
‘বাড়ি পৌঁছতে বেশ দেরী হয়ে যাবে’।
‘বাবা বকবে?’
‘ক্যাফেটায় একটা কবিতার বই দেখালি না – বাবা মাকে উৎসর্গ করা’।
‘হ্যাঁ বাবা মার জন্য সমস্ত ব্যার্থ প্রেম ভুলে থাকা যায়’।
‘কারেক্ট’।
...
সেকুলারিজম, কমিউনাল হারমোনি, অ্যান্টিরেসিজম – মেখে রোজ ঘুমোতে যায় গোটা দেশ – ভারত।
আর সকাল সকাল উঠে রোজ বলে ‘আমরা কসমোপলিটান – আমরা বাঙালি আর ওরা মুসলিম’।
এই চরম বৈচিত্র আর চরম অনৈক্য প্রত্যেকটা সন্ধেকে ভাষায় – প্রান্তিক জানে কোনো মিথ্যে মিথ্যে সন্ধে মায়া লাগিয়ে যাবে এরকমই। সস্তার চীনা মালে দাগানো চশমায় সব নারীতে মধুবালাভ্রম হবে – খাটে, বিছানায় সাদাকালো চাদর হয়ে পড়ে থাকবে দাম্পত্য অসুখ।
কিন্তু সন্ধেরা থাকবে – কারণ সন্ধেদের থাকতে হয় – চরম ডিসিপ্লিন্ড সেকটর ফাইভ থেকে অফিস বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে যাতে কোলকাতা আবার কার্নিভাল হয়ে উঠতে পারে।
তাই সন্ধেরা থাকবে – কারণ সন্ধেদের থাকতে হয় – সন্ধেবেলাগুলোতেই বিয়াসকে অটো লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রান্তিক রাসবিহারী বেহালার অটো ধরে – আর এইসব দেখতে দেখতে – খুন হয়ে যাওয়া ট্রাম লাইন, মেট্রোর নিয়ন, চায়ের দোকানের সিগারেট ধরাবার পুরোনো দড়ি বুকে করে কোলকাতার সব দাম্পত্য, সব বন্ধুত্ব, সব অপত্যস্নেহ আবার কসমোপলিটান হয়ে ওঠে।
সেদিন কিছুক্ষণের জন্য হলেও ট্রাফিক সিগনালে কান্ট্রি মিউজিক বেজেছিলো-

‘I come from Alabama with my banjo on my knee, I\'m going to Louisiana, my true love for to see. It rained all night the day I left, the weather it was dry the sun so hot I froze to death, Susanna, don\'t you cry.’

আপনার মতামত জানান