ভাদ্র, নিষাদ, মিশেল

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 


(১)
আশ্বিণের বাড়াবাড়ি গ্ল্যামারের চাপে ভাদ্র মাসটা প্রায় দেউলে হয়ে গেছে। তার ওপর সারমেয়দের বচ্ছরকালীন জীবনবৃত্তি মাসটাকে নেহাৎ আমজনতার কাছে হাসি ঠাট্টার খোরাক করে দিয়েছে।
বিদ্যাপতি বেশ কিছুদিন আগেই হাত-পা তুলে অমরত্ব অর্জন করে – নেহাৎ বেঁচে গেছেন। নইলে ‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর’ নিয়ে এই একবিংশ শতকীয় বাঁদুরে লাফঝাঁপ আবার করে দেখলে ভদ্রলোক হয়তো মৈথিলী ভুলে কাঁচা বাঙলায় খিস্তি মারতেন।
তবে বিদ্যাপতি আমার চেনাজানা সার্কেলে নেই – ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে তো নেইই – তাই তাঁর কি এলো গেল তাতে আমার – যাই হোক সেসব কথা। ভাদ্র মাসের একটা ভালো নাম হয়েছে – শেষ অগাস্ট।
বাঙলা ক্যালেন্ডারটা যে রিলুক এবং রিস্ট্রাকচার করা আশু প্রয়োজন সেটার কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে ফেলা যাক – বাঙলা ক্যালেন্ডারের মতো ঋতু এবং মাসের এরকম ভয়ঙ্কর ওভারল্যাপ আর নেওয়া যাচ্ছেনা – আকাশে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে গোটা ভাদ্দর জুড়ে – সেটা নাকি শরৎ - চারপাশে মোমপালিশ দেওয়া মেয়েলী চামড়ায় মেকআপ গলানো গরম – অথচ তার নাম নাকি শেষ বসন্ত – চৈত্র – রবি ঠাকুর হেব্বি বুদ্ধিমান লোক ছিলেন – তাই অনেক আগেই বিশেষণ দিতে গিয়ে সামনে একটা ‘রোদন ভরা’ লিখে দিয়েছিলেন।
অনেকগুলো নেম ড্রপিং হয়ে গেল – প্রথম কয়েকটা লাইনেই – এর বেশি করলে আপনারা ভেবে বসবেন – আমার কিছু লেখার নেই – ফালতু দেয়ালা করছি – তাই গল্পে ঢোকা যাক।
কথা হচ্ছিলো – ভাদ্র এবং অগাস্ট নিয়ে। অগাস্ট মাসটা খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে অগাস্টাস সিজারের নাম পেয়ে আহ্লাদে গদগদ হয় – এ পোড়া দেশে অবশ্য আমাদের কাছে ওটা ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’-এর জন্মমাস। তাই পনেরোতম দিনে গুনে গুনে মধ্যরাত্রির স্বাধীনতা – যখন ছেষট্টিটা জন্মদিন কাটিয়ে ফেললো – আবালবৃদ্ধবণিতা পাড়ায় পাড়ায় দড়িতে কাগজের তেরঙা ঝোলালো – বেশিরভাগ ক্লাব সবচেয়ে খিটকেল বুড়োদের দিয়ে পতাকা উত্তোলন করালো এবং অবশেষে সবাই মিলে এই পুজো আসছে পুজো আসছে মন নিয়ে ষোলো তারিখ অফিস জয়েন করলো – কোলকাতা, দেশ অথবা ২০১৩ জানতেও পারলোনা – ঠিক দু’দিন পর – আঠেরো তারিখ – একটা ঋতু পাল্টালো – যার শুরুটা আগমনীর মতো লেডলাইটিংয়ে জ্বলজ্বলে হলেও শেষটা কিন্তু বিজয়ার পিয়ানোগম্ভীর।
প্রান্তিক জানলো কিন্তু – প্রথমবার বাঙলার ঋতুপরিবর্তনকে সচেতন ভাবে জানলো কারণ ১৮ই অগাস্টের মন কেমন করিয়ে সেই দিন – বিয়াস চলে গেল এমন একটা দূরত্বে যেখানে ক্যালেন্ডারমতে কোনো ভাদ্র মাস নেই।
আসলে তো পৃথিবীর প্রত্যেকটা প্রেম এক একটা সাবেকী বদভ্যেস – যা’তে পড়তে নেই – কারণ পড়লে মাঝেসাঝে উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছে এবং জোর চলে আসে – অহেতুকী সাহসেরা ভিড় করে – পৃথিবীকে গানের মতো সময়ের সাথে সাথে ভিন্ন ভিন্ন রাগে ভেঙে ফেলে দিতে হয় – নিয়মদের বাড়ি অধিগ্রহণ করে গোলাপী লাল আবীর মাখিয়ে চান করাতে ইচ্ছে করে জানা অজানা প্রত্যেক বৃন্দাবনে – চলাচল পেট্রলের ধার ধারেনা।
প্রেমে যে পড়েই গেছে সেটা অবশ্য শেষ শ্রাবণেই মার্কার পেনে আন্ডারলাইন্ড হয়ে গেছিলো। যখন সেই রাসবিহারী রোডের প্রত্যেকটা দোকানের সাইনবোর্ডের নীচের দুটো লাইনে সেই পার্টিকুলার জায়গাটায় বিয়াস আর প্রান্তিক কি কথা বলেছিলো লিখে ফেলা বাধ্যতামূলক করে দিলো সংবিধান। দেখেননি বোধহয় – আপনাদের না দেখাই স্বভাব।
প্রান্তিক অবশ্য এখনো দেখতে পায়।
(২)
মিশেল গানটার গল্প জানতে গেলে দুটো প্যারালাল ট্র্যাক পাওয়া যায়। বিটলসের রাবার সোল অ্যালবামের গান।
বিটলসের অন্যতম জীবনীকার (আসলে অ্যানথ্রোলজিকার) ফিলিপ নরম্যানের মতে গানটা পল ম্যাকার্টনি একদম মাখো মাখো মুডে লিখেছিলেন – তখন চুটিয়ে প্রেম করছেন – জেন অ্যাশারের সাথে – তো অ্যাশার পরিবার বেশ ফরাসী ভাবান্বিত ছিলো – তাদেরই ইমপ্রেস করতে লেখা। অবশ্য পরে জেন দেবীর সাথে পল বাবুর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় – তাতে কি আর এসে গেলো।
স্বয়ং ম্যাকার্টনির গপ্পোটা যদিও আরেকটু গোলমেলে। ম্যাকার্টনি বলতে নেই – ছোটোবেলা এবং যথেষ্ট বড়োবেলা অবধি ভয়ানক বাঁদর ছিলেন – সম্ভবতঃ হ্যারিসন বাদে বাকি বিটলরা অল্পবিস্তর তাই ছিলেন সবাই। তো ম্যাকার্টনি লিভারপুলে একটা আর্ট স্টুডেন্টদের পার্টিতে গিয়ে এর কাছাকাছি একটা আসল ফ্রেঞ্চ গান শুনেছিলেন। স্বভাববশতঃ শিগগিরি সেটার একটা নকল বেরিয়ে পড়লো – কিন্তু সেটায় কোনো কথা ছিলোনা শুধু কয়েকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রেঞ্চ শুনতে আওয়াজ ছিলো। রাবার সোল অ্যালবামটা রিলিজ হয় – ১৯৬৫তে – তখন জন লেননের পরামর্শে ওই গোঁ গোঁ আওয়াজটা একটা গানের রূপ পায়।
পল ম্যাকার্টনি নিজে খুব ভালো ফ্রেঞ্চ জানতেন না – ওঁনার একজন ফ্রেঞ্চ টীচার বন্ধু ছিলেন ইভান ভন বলে – তো দু’য়ে মিলে যেটা দাঁড়ালো সেটা এ’রকম –
Michelle, Ma Belle, These are words that go together well
এটা ম্যাকার্টনির লেখা। এর প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ -
Michelle, Ma belle, Sont des mots qui vont très bien ensemble
এটা ইভান ভনের লেখা।
১৯৬৭-তে গানটা গ্র্যামি পায় – ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার ‘স্ট্রেঞ্জারস ইন দা নাইট’ও ছিলো সেই লাইনে।
(৩)
রোসো বাপু রোসো – গল্পটা নিয্যস পল ম্যাকার্টনির নয় – প্রান্তিক আর বিয়াস সাক্ষী।
বিয়াস – কোলকাতা থেকে ঠিক সাড়ে দশ ঘন্টা দূরত্বে থাকে – সেন্ট্রাল টাইমজোনে – শিকাগোতে।
কোলকাতা এয়ারপোর্টে বিয়াসকে দেখা দিতে যাওয়ার জন্য প্রান্তিক প্রায় একটা হঠাৎ সিনেমা হঠাৎ সিনেমা কাজ করে ফেলছিলো। কিন্তু এস-এম-এস চালাচালির পর ব্যাপারটা এ’রম দাঁড়ালো।
প্রান্তিকের স্মার্টফোন আনস্মার্ট আর্জি - ‘শোননা আসি এয়ারপোর্টে? তোকে সি অফ করে দি?’
বিয়াসের নট সো স্মার্টফোন, চূড়ান্ত চোখা এবং স্মার্ট রিজেকশন – ‘না চেনা কেউ এলেই মন খারাপ হয়ে যাবে’।
প্রান্তিক – ‘আসিনা প্লিজ’।
বিয়াস – ‘না প্লিজ’।
সমস্যাটা হচ্ছে নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দর আর হাওড়া স্টেশনের মধ্যে কয়েকটা এলিমেন্টারি ডিফারেন্স আছে – এয়ারপোর্টে প্ল্যাটফর্ম টিকিট পাওয়া যায়না, বোর্ডে ট্রেনের আর প্ল্যাটফর্মের নাম দেখায় না, ট্রেনের কাছে দৌড়ে যাওয়া যায়না – গিয়ে রিজার্ভেশান লিস্ট মিলিয়ে বিয়াসেরা কোন সিটে বসে আছে – প্রান্তিকেরা খুঁজে পেতে দেখতে পায়না।
কি দাঁড়ালো – বিয়াসদের কক্ষণো হাওড়া স্টেশন ছাড়া অন্য কোথাও বিজয়ার গান বাজানো শোভা পায়না – আদিত্য চোপড়া সাধে ট্রেন ট্রেন করে একটা গোটা মাস্টারপিস ধরে শাহরুখ-কাজলকে ছুটিয়ে গেলেন? হুঁ হুঁ বাবা।
টানা চারদিন – বিয়াস আর প্রান্তিকের কথা হয়নি – মুম্বইতে হপিং ছিলো বিয়াসের – প্রান্তিক আন্দাজ মতো একটা এস-এম-এস পাঠিয়েছিলো – রিপ্লাই আসেনি। কিন্তু মেয়েটা তো বেসিক্যালি ভালো – আমেরিকাতে ওর দিদি ওর জন্য যে নাম্বারটা নিয়ে রেখেছিলো সেটা কেন জানা যায়নি কোলকাতাতেই প্রান্তিককে দিয়ে গেছিলো।
তো দিন চারেক প্রান্তিক রাস্তায় হঠাৎ আছাড় খেলো, একটা গাড়ি কখন ব্যাক করে পায়ের কাছে চলে এলো খেয়াল করলো না – আরও বিভিন্ন কাজ করলো যা জানলে শরৎবাবু দেবদাস লিখে এতো হীনমন্যতাগ্রস্ত হতেন না।
চারদিন পর – বিয়াসের লোকেশন চেঞ্জ হয়ে ডাউনটাউন শিকাগো হলো।
কথামতো বিয়াস আনস্মার্ট কোলকাত্তাইয়া ফোন ছেড়ে অ্যানড্রয়েডে এলো।
প্রান্তিক হোয়াটসঅ্যাপে বিয়াসকে অনলাইন দেখতে পেলো।
কথা হলো।
(৪)
প্রেম নিয়ে মোটামুটি যা থিসিস বের করার বৈষ্ণব কবিরা অনেকদিন আগেই করে গেছেন – বেশি পেঁয়াজি না করে একটাই কথা বলা যায় – এই পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার এই তিনটে স্টেজের মধ্যে একটা বড়ো হার্ডল থাকে – সেটা মাঝেসাঝে উভয়পক্ষের সম্মতিতে অনুরাগের সাথে সিনোনিমাস হয়ে যায় – কখনো অভিসারটা ব্লক করে রাখে – কখনো কি যে হয় কিছুই বোঝা যায়না।
প্রোপোজ করার কথা হচ্ছে মশাই – আপনারা সকলেই করেছেন – যারা করেননি তারা কেন বেঁচে আছেন নিজেদের প্রশ্ন করুন।
কিন্তু ব্যাপারটা বেশ চাপের – বেসিক্যালি মানুষ তো একটা হাড় হারামজাদা জাত – পশুপাখিরা বিন্দাস আছে ইনস্টিংকটিভ ব্যাপারস্যাপার – ‘আমি মদ্দা শোর তুই মাদী শোর, চল চামেলি চম্পাবনে’ টাইপ স্ট্রেটকাট ব্যাপার।
মানুষের মাইরি একশো ছেনালি – কি না ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’।
তা ভাই সে ভালোবাসা কি দ্রব্য – খেলে হজম হয় না জোয়ানের আরক লাগে? নোনতা না টকটক? দেবা না জানন্তি – সব কথার শেষ কথা – ‘যার খেলা হয় সে জানে’ – বোঝো – নিতান্ত আইসপাইস খেলারও তো একটা রুলবুক থাকে রে বাপ – কে শোনে কার কথা?
যাই হোক প্রান্তিক খেললো এবং জানলো – বিয়াস বেশ মানে বেএএএএএশ বুদ্ধিমতী মেয়ে – বলতে নেই প্রান্তিককে বোধহয় প্রান্তিকেরও আগেই বুঝে গেছিলো যে মাল টসকেছে।
তাই যাওয়ার আগে উড়ু উড়ু কথার মধ্যে একবার বলেই ফেলেছিলো – ‘প্রেমটা হচ্ছেনা বল – বেঁচে গেলি?’
প্রান্তিক সটান সেলফ কনশাস হয়ে গেছিলো মূহুর্তের জন্য তবে সেটা হয়ে কে আর কবে বড়োলোক হয়েছে।
প্রান্তিকের তখন ‘তোমায় কিছু দেবো বলে চায় যে আমার মন’ স্টেট - মানে দেবোই দেবো দিতেই হবে জমানা – তখন বিয়াস বেচারাকে বিশেষ আশা, ভোঁসলে কিছুই দেখায় নি।
আমেরিকাতে গিয়ে এম-এসের উত্তাল চাপে একটু মিইয়েও গেছিলো – রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ‘রেয়না বিৎ যায়ে’র হাত ছাড়েনি যদিও – তিন-চারখানা পোলাপান ‘নতুন মেয়ে তুলতে হবে, নতুন মেয়ে তুলতে হবে’ বলে প্রোপোজ করলো – রিজেক্টেড হলো – উইথ অ্যান অদ্ভুত অ্যাশিওরেন্স – ‘ আমি তোদের মেয়ে খুঁজে দেবো’।
বেসিক্যালি এটা কিন্তু বিয়াস করতো – যখনই কোনো অপছন্দের ছেলে – কিন্তু পছন্দের বন্ধু ওকে প্রোপোজ করতো তাকে একটা মেয়ে খুঁজে দিতো – প্রান্তিক একবার জিজ্ঞেস করেছিলো – ‘এটা কি বিয়াস ম্যাট্রিমোনিয়াল সার্ভিস? মেয়ে না জুটলে তোকে প্রোপোজ করলেই কাজ হয়ে যাবে?’
উত্তর আসেনি।
একটা আর্জি এসেছিলো – ‘আমায় জয় গোস্বামীর মা নিষাদ কবিতাটা খুঁজে দিবি প্রান্তিক?’
(৫)
কোলকাতাকে যারা কবিতার শহর বলে তারা নেহাত আদেখলে রোমান্টিক – কোনো বড়ো শহর – বড়ো রাস্তা কবিতার হতে পারেনা – কবিতারা অতো শস্তা নয় – তারা আদতে অভিযানসাপেক্ষ এবং অসম্ভব অবাস্তবতা।
প্রান্তিক অবাস্তবতার সাথে হাত ধরেছে সেই ১৮ই অগাস্টেই এবং সত্যি কথা বলতে গেলে ‘মা নিষাদ’ বিয়াসের প্রথম কিছু চাওয়া।
ইন্টারনেট আজকাল কবিতাদের সহজলভ্য করে দিচ্ছে – প্রেমকে এখনো সফট কপিতে পাওয়া যায়না – ভাগ্যিস।
অগত্যা – অফিসে একজন মরা মেসোকে মারতে হলো প্রান্তিককে – প্রান্তিকের জয়প্রেমিকা এক দিদি আছে – সে ইনফো দিলো কবিতাটা জয় গোস্বামীর কবিতাসংগ্রহের তৃতীয় খন্ডে চুপচাপ জমা আছে।
অগত্যা – মরা মেসোকে মেরে অফিস ডুব – সকাল সকাল টাইম কাটাতে স্বভূমিতে সিনেমা – তারপর দোকান খোলার টাইম হলে ট্যাক্সিতে গড়িয়াহাট – আনন্দ পাবলিশার্সের দোকান – কবিতার বই – কবিতা পাশের সাইবার ক্যাফে থেকে স্ক্যান – এবং ফেসবুকে যথাস্থানে প্রেরণ।
এতো সবকিছু কবিতা অভিযান শেষ হলে সেই মিউজিক ক্যাফেতে গেলো প্রান্তিক – কবিতাটা পড়লো – মিউজিক ক্যাফের মালিক শিরিষ সেদিন আর আউট অফ স্টেশন ছিলোনা – কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ঢুকলো।
মধ্যিখানে দম নিলো দক্ষিণ কোলকাতা – সিগনালে কিছুক্ষণ বেশি টাইম খেলো বাস, ট্যাক্সি, মোটরবাইক – শুধু অ্যাম্বুলেন্সদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়া হলো – অফিস ফেরতা ভিড়ের ঘরে ফেরার চঞ্চলতাকে এক থাবড়া মেরে যোদ্ধাসময়ের মা-বাবা এক করলেন জয় –
‘পুরুষের বীজে বিষ এসে মিশে যায়
নারী ও শস্য ক্ষয়ে যায় পিঠোপিঠি
হেলিকপ্টার পাক মেরে গর্জায়
একতিলও নেই রেডিও অ্যাকটিভিটি’।
(৬)
শিকাগোতে ধর্মমহাসম্মেলন ছাড়া বাঙালিরা কোনোদিনই বেশি ইন্টারেস্ট দেখায়নি। সেই শহরে বাঙলার মেয়ে কেমন ছিলো – সেটা জানতে চিঠিগুলোই সম্বল – সৌভাগ্যক্রমে যার কয়েকটা ইমেল শব্দগুলোকে গৌরবান্বিত করে প্রান্তিকের ইনবক্সে জমা হচ্ছিলো - মহালয়া আসছিলো – ভালো থাকা আসছিলো না বিয়াসের।
প্রান্তিকের অনেক সিউডো ইন্টেলেকচুয়াল ছ্যাঁচড়ামির মধ্যে একটা হচ্ছে ও প্রেমে পড়লেই বিটলস শোনে – প্রসঙ্গত এর আগে বার তিনেক পড়েছে। বিটলসের সাথে ইন্ট্রোটা ওর অবশ্য খুব একটা গম্ভীর গম্ভীর আবহে নয় – প্রান্তিক যখন কলেজে ঢোকে ওর শোনা একমাত্র ইংরিজি গান তখন ‘হার্ট উইল গো অন’। নেহাৎ বাঙলা মিডিয়াম হস্টেল থেকে পেন ড্রাইভে পানু নিতে গিয়েছিলো – যার কাছে গিয়েছিলো সে নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে কিছুটা মেমোরি ফাঁকা থাকায় কয়েকটা গান দিয়ে দেয় – তারই মধ্যে এক ফোল্ডার জন-পল-জর্জ-রিঙ্গো ছিলো। আর একটা ব্যাপার ছিলো একমাত্র ‘টুইস্ট অ্যান্ড শাউট’ বাদে সব গানের ক্ষেত্রেই ফাইলনেম গুলো উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে হয়ে গেছে।
তবে বয়েসটা তখন উনিশ – সম্ভবতঃ বিটলস শোনার পক্ষে একদম ঠিকঠাক বয়েস – ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘হাইড ইওর লাভ অ্যাওয়ে’ এগুলো বেশ আমার কথা বলছে আমার কথা বলছে মনে হচ্ছিলো।
তাই বিটলসটা কাল্ট ক্লাসিকের জায়গায় কিশোরকুমারের মতো অনেকটা ঘরের লোক হয়েই ছিলো মনে – কাজের কাজ হয়েছিলো।
‘মিশেল’টাও শুনেছে প্রান্তিক তখন – মন দিয়ে শোনেনি।
এবার প্রেমের নিয়মমাফিক বিটলস যাপন করতে করতে শুনলো।
বিয়াস তখন অ্যাসাইনমেন্টের চাপে, প্রেজেন্টশানের চাপে, ঘোড়া-গাড়ি-প্রকৃতির চাপে আস্তে আস্তে রাতে ঘুমোচ্ছেনা – প্রান্তিকও জেগে যাচ্ছে, কোনো চাপ ছাড়াই – হোয়াটসঅ্যাপ সব দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে – দু’জনেই দু’জনকে অনলাইন দেখে – কিন্তু নিজের থেকে কথা বলা যায়? রামোঃ – বিয়াস যেহেতু নদীনাম্নী তাই গভীরতাটা ওকে মানায় – ইদানীংকালের একটা রেলস্টেশানের নামে নাম একটা ছেলেকে সেই ছাড়পত্র দেবার কারণ নেই – তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংযমটা প্রান্তিকই ভাঙতো।
প্রান্তিক চিঠিটা লেখা শুরু করলো।
চিঠিটা লিখতে সময় লাগল ঝাড়া পাঁচ দিন – ভেবে রাখলো পয়লা জানুয়ারী পাঠাবে – কারণ ডিসেম্বর অবধি বিয়াসের চাপটা চলবে – উইন্টার সেম শুরু না হওয়া অবধি।
চিঠিটা লেখা হলো কম্পিউটারে, ল্যাপটপে এবং মোবাইলে। মোবাইলের পার্টটা বেশিরভাগই অফিসের বাথরুমে বসে – ইংরিজি ফন্টে টাইপ করে।
যাতে গুলিয়ে না যায় – তাতে জাতে টেকনোক্র্যাট তালে ঠিক প্রান্তিক প্রোগ্রামিংয়ের মতো দুটো কমেন্ট মারতো – মোবাইল থেকে টাইপ করা পার্টে –
শুরুতে
/* Typed from mobile */
শেষে
/* End of Typed from mobile section */
তারপর বাড়ি ফিরে ওই পার্টটা বাংলায় টাইপ হতো।


(৭)
বিয়াস,
Gershwin Prize for Popular Song বলে একটা প্রাইজ দেওয়া হয় জানিস? হোয়াইট হাউসে – তোর প্রবাসে প্রেসিডেন্ট সহস্তে দেন।
দোসরা জুন, ২০১০ প্রাইজটা পল ম্যাকার্টনি পান। তার সাথে একটা প্রোগ্রামও করেন। স্টেজ শোতে ভদ্রলোক এখন আর আগের মতো মিচকি মিচকি হাসেন না – ‘বয়েস বেড়েছে ঢের নরনারীদের’।
কিন্তু হাজার হোক আসল বিটল – তাই মিচকেমিটা রয়ে গেছে – বেশ কয়েকটা গান গেয়ে তারপর ‘মিশেল’টা ধরলেন। ধরার আগে বললেন – ‘হোয়াইট হাউসে এই গানটা গাওয়ার জন্য উসখুস করছিলাম, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আশা করি লটকে দেবেন না’।
চেতাবনির কারণ? প্রেসিডেন্টের পাশে ফার্স্ট লেডি বসে ছিলেন।
অবশ্য কোনো চেতাবনি অপ্রয়োজনীয় ছিলো – বুড়ো ম্যাকার্টনি গাইতে শুরু করলেন – পিছনে হামিং আওয়াজটা করলো কয়েকজন - আগের মতোই – ম্যাকার্টনির ছেলেমানুষ মেলোডিয়াস গলাটায় একটা অদ্ভুত হাস্কিনেস এসেছে এই বয়েসে – এই গানটা মানিয়েও যাচ্ছিলো।
ম্যাজিকটা অন্য – দেখা গেলো সামনে যারা বসে আছেন তাঁরা আদৌ প্রেসিডেন্ট-ফার্স্ট লেডি নয় – বারাক পুরো গানটা মিশেলের দিকে তাকিয়ে লিপ সিঙ্ক করে গেলেন।
এখানেই প্রশ্নটা তুলে দেন পল ম্যাকার্টনিরা, রবীন্দ্রনাথেরা, জয় গোস্বামীরা, পৃথিবীর সৎ মানুষেরা – যাঁরা ঘটনাচক্রে শিল্পী।
দেখ এই বয়েসেও ম্যাকার্টনি একটা এমন গান গাইতে পারেন – যেটায় মর্ষকামী দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর মানুষ – স্বেচ্ছায় লিপসিঙ্ক করেন। যতোই ‘ইয়েস উই ক্যান’ বলুন – প্রেসিডেন্ট ওবামাকে একশো নোবেলেও এমন একটা ভাষণ দিতে পারবেনা যেটায় ম্যাকার্টনি লিপ সিঙ্ক করবেন।
গানটা কিন্তু আসলে প্রেমের গান – লিরিক্সটা দেখ – আমি তোমাকে ভালোবাসি – আমি জানি যে তুমি বোঝো – কিন্তু তোমাকে তো বলতেই হবে – যদ্দিন না বলে ফেলছি তদ্দিন অপেক্ষা করবো তোমার বুঝে যাবার জন্য।
মিশেল, আমার সুন্দরী, এই দুটো শব্দগুচ্ছ একসাথে খুব ভালো শোনায়।
বিয়াস, যদ্দিন না বলে ফেলছি, তদ্দিন অপেক্ষা করতে চাইলে খুব আপত্তি করবি?
নাকি বলেই ফেললাম?
~প্রান্তিক
বিঃদ্রঃ প্রান্তিক এই চিঠিটা পাঠায়নি। বিয়াসও তাই এই চিঠিটা পায়নি। কি হয়েছিলো? কবে? কেন? ম্যাকার্টনিকে বলতে পারি – আপনাকে বলবো কেন?

আপনার মতামত জানান