তিরিশ শতাংশ প্রেম, পাতাল, আঠেরো ভাঁটি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 


[যেকোনো প্রেমের গল্পের মাঝেরটা খুব বোরিং হয়, তাই এক কাজ করলাম, মাঝেরটা লিখলামই না। এটা একদম শেষেরদিকের গল্প – যেখান থেকে গল্পটা হয়তো পিচকিরির মতো ছিটকে বেরোবে, নাহলে ঝর্ণার মতো হঠাৎ - যাই হোক, মাঝে কি হলো , যে যার মতো ভেবে নেবেন – অতো বলতে পারিনা বাপ – বয়েস হচ্ছে]
আরো কিছু প্রারম্ভিক কচকচিঃ শেষ গল্পের সাথে এই গল্পের ব্যবধান সময়ের নিরিখে প্রায় সাত বছর। সদা প্রয়োজন ডিসক্লেইমার – বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই – থাকার কথাও নয় – ২০২০ সাল এখনো মা হুগলীর বুকে নিমজ্জিতা। জাস্ট একটা কথা এই গল্পটা লেখার আগে BEFORE SUNSET ছবিটাকে একটা স্যালুট না দিলে মারাত্মক অন্যায় হবে।

(১)
মিছিমিছি ভারতবর্ষের পিছনে মাতা জোড়ার ছ্যাবলামো করে নেশনমেকাররা মুখ বেঁকিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। নইলে যে দেশে প্রতিদিনের খবরের কাগজের জায়গা ভরার জন্য একটা করে রেপ, অথবা বধূহত্যা, অথবা ভ্রূণ ফুটুক না ফুটুক আজ কোতল করা হয় – যে দেশের স্বাভাবিক তামাটে রঙকে প্রবল অবজ্ঞায় মার্কেট শেয়ার বাড়িয়ে চলে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি – তাঁর নাম নাকি ভারতমাতা – সইত্য স্যালুকাস।
তবে ডারউইন তার আজানুলম্বিত দাড়ি চুলকে বিবর্তনবাদ হ্যানাত্যানা প্রচুর চাপের বিলিব্যবস্থা করেছেন বহুবছর আগে – এখনো মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা তার জন্য ডারউইনকে মনে মনে খুব একটা ভালো কথা শোনায়না। তো সেই বিবর্তন মানুষকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তনে বাধ্য করে। এখনো মেয়েরা ছেলেদের হাজার সদচেষ্টা সত্ত্বেও মানুষ হয়েই রয়ে গেছে – তাই আনফরচুনেটলি তারাও বিবর্তনের উর্ধ্বে নয়।
সেই বিবর্তনই বোধহয় ভারতীয় মেয়ে, মহিলা, মাসিমা সবাইকেই নিজেদের প্রেজেন্স নিয়ে একটু স্বাভাবিকের চেয়ে দু ডিগ্রি বেশি কশাস হতে শেখায় – বিশেষতঃ পাব্লিক প্লেসে।
বিয়াস প্রায় সাতবছর পর পাকাপাকি দেশে ফিরেছে মাস তিনেক হলো। মুম্বইয়ের যে কলেজে প্রফেসর পদটাকে উদ্ধার করবে স্বপ্ন নিয়ে শিকাগোতে আসর জমিয়েছিলো – সে স্বপ্নকে হঠাৎ রাত্তিরে বোবায় ধরেনি। তো অফিশিয়ালি ও এখন ডক্টর বিয়াস চ্যাটার্জী।
বিয়াস কোনোকালেই অ্যানিম্যাল কিংডম, ডিসকভারি চ্যানেল ইত্যাদির সাবস্ক্রাইব করেনি সেট টপ বক্সে। জন্তু জানোয়ারদের সাথে বিয়াস যতোটা মিশুকে – জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রী অবতারে বেঁচে থাকতে বোধহয় মহাকরণে অপেক্ষায়মান সাংবাদিকদের তার চেয়ে বেশি কাছে ঘেঁষতে দিতেন। জনান্তিকে বলে রাখা ভালো এক নির্বোধ বেড়াল একবার বিয়াসের পা মাড়িয়ে চলে গেছিল বলে বিয়াস রাস্তায় বমি করে ফেলেছিল – যদিও সাহসিনী অবতারে এসব কথা বাইরে প্রচার করেনি বিশেষ- কাউকে বলবেন না মাইরি।
তবুও সুন্দরবন – তবুও সুধন্যখালি ওয়াচটাওয়ার – তবুও রয়্যাল বেঙ্গল হালুমের অপেক্ষা – কেন? বোধহয় এই মূহুর্তের জন্যই।
বিয়াসের মধ্যে তিরতিরে ভারতীয় মেয়ের সাবধানী ধারার প্রবাহ শুরু হলো – সেই ফিলিং অফ বিয়িং ওয়াচড। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলো ওয়াচটাওয়ারে একজোড়া চোখ ঠিক সেইসময় বাঘ দেখার জন্য সামনের খালি জমিটায় তাকিয়ে নেই। ক্লিক আওয়াজটায় কনফার্ম হলো।
বিয়াস যদি বছর সত্তর আগে পৃথিবীর কোল আলো করতো তখন কি হতো বলা যায়না – কিন্তু দুহাজার কুড়িতে দক্ষিণ কোলকাতা থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টা দূরে শিকাগোফেরৎ বিয়াসের অবলীলায় ছবি তুলে নিয়ে যাবে উটকো পুরুষ ক্যামেরা – বিয়াস তা সহ্য করবেই বা কেন।
ঘুরে তাকাতেই ক্যামেরার পঞ্চাশ মিলিমিটার লেন্সটা নীচে নেমে এলো – ভিউফাইন্ডারের পেছন থেকে উঁকি দিলো অতীত।
প্রান্তিক বললো – ‘জানতাম তুই খুব ফোটোজেনিক, বেকার এতোদিন ছবিটা তুলতে দিসনি’।
(২)
ছদ্মগাম্ভীর্য ততোক্ষণই ধরে রাখা যায় – যতক্ষণ না সুন্দরবনের লঞ্চে ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের মাঝে সার্ভ করা হয় কাজরী মাছ ভাজা। সম্ভবতঃ এটাকে টা টাইম বলা যেতে পারে।
‘খা’-প্রান্তিক একমুঠো নিয়ে বললো।
‘ইউ নো আই ডোন্ট লাইক ফিশ’ – বিয়াস পাল্টায়নি, অ্যাটলিস্ট মাছের ব্যাপারে।
‘খা’ – প্রান্তিক আরেক মুঠো নিলো।
বিয়াস বেশি ঝামেলা না বাড়িয়ে ঠিক তিনটে মাছ তুললো – খেলো।
‘কেমন?’ – জাতীয় একটা শব্দ বেরোলো প্রান্তিকের মাছ ভর্তি মুখ থেকে।
‘নট ব্যাড’ – বিয়াসের দায়সারা উত্তর - ‘এবারো কি সেই দাদার সাথে?’
‘তোর মনে আছে?’
‘থাকবেনা? প্রথমবার সুন্দরবন থেকে ফিরে প্রায় চোদ্দোদিন সেই দাদার গল্পই করে গিয়েছিলি’।
‘ছ’বার হয়ে গেল, বিজনদার সাথে আলাপ করবি? নীচে আছে, কিচেনে, কিসব একটা খাওয়াবে কই মাছের পাতুড়ি সেও নাকি আবার নিজের প্রিপারেশানে’।
‘চারদিকে ব্যাপারটা এতো মেছো কেন?’
‘হুমম, বিজনদা ইউজড টু বি আ ডাইহার্ড রেডমীট ফ্যান – নাও হি ইজ আ কমপ্লিট ফিশেটেরিয়ান’।
‘কি ভয়ঙ্কর – মাংস ছেড়ে মাছ!’ – বিয়াসের অবাক বিস্ময়।
‘হুমম – তো?’
‘তো কি?’
‘আফটার অল দিজ ইয়ার্স’।
‘হুমম – পাঁচ বছর না?’
‘সাড়ে পাঁচ’ – প্রান্তিক ঠিক করে দিলো – ‘সাড়ে পাঁচ বছর আগে রাসবিহারীর মোড়, আমি তোর একটা ছবি তুলতে গিয়েছিলাম, তখনো আমার প্রথম ডিএসএলআরটা হয়নি, তুই ছবিটা তুলতেও দিসনি’।
‘তুললে ভালো করতিস’।
‘কেন?’
‘এই রিঙ্কল পড়া হাফবুড়ির ছবি তুলতে হতোনা’।
‘যাগগে এই তিরিশভাগ পাকাচুল মাথার নীচে যে গলাটা আছে সেটায় এখন একটা সেভেন ডি ঝোলে’।
‘কবে কিনলি?’
‘অনসাইট গিয়ে’।
‘অনসাইট? কোথায়?’
‘সাউথ ডাকোটা’।
‘ইউ-এস গেলি, বললি না একবারো?’
‘ওর চেয়ে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট কথাও তো বলিনি বিয়াস – এ ক’বছরে’।
এইসবসময় গল্পের নায়ক নায়িকারা কথা বলেনা। ওদের স্পেস দিতে হয়। ফিলার হিসেবে কিছু অন্য কথা বলা যাক – এইসময় অর্থাৎ শেষ জানুয়ারীতে সুন্দরবন বড়ো সুচারু থাকে। মাঝদুপুরে লঞ্চের মুখের কাছে বসে কলম্বাসকে নিজের ভাইবেরাদর ভাবতে ভালোবাসে প্রান্তিক বরাবরই। বছরের এই সময়টায়। ভাঁটায় জেগে ওঠে কাদার চরে অসংখ্য অসরলরেখা – জিওমেট্রি। শ্বাসমূল ঠেসমূল নিয়ে শীতের সালোকসংশ্লেষ চেনে ম্যানগ্রোভ। মাঝে মাঝে মাতলা থেকে গোমদিতে খেলা করে আদেখলে রোদের চিকচিক।
বিয়াসই কথা বললো – এতক্ষণ নদীর দিকেই ছিলো তাকিয়ে – বোধহয় নিজের সাথে গভীরতার পরিমাপ করছিল।
‘বিয়ে করলি?’
‘তুই?’
‘কেন তোর বিয়েটা আমার বিয়ের ওপর ডিপেন্ডেন্ট নাকি?’
‘ঝগড়া করবি নাকি? অ্যাদ্দিন পর’।
‘হ্যাঁ, প্রশ্নটা আমি আগে করেছি’।
‘করেছি’।
‘আমিও’।
‘বেশ’।
ইতিমধ্যে বিজনদা কিচেন থেকে বেরিয়ে এসেছে – বয়েস প্রায় পঞ্চাশ হতে চললো – কয়েকটা অ্যাডিশনাল পাকাচুল ঢেকে দিলে অবশ্য এখনো তিরিশোর্ধ্ব বললে আপত্তি হবেনা। সাধে হাবিদেশিনীরা ঝুপঝাপ প্রেমে পড়ে লোকটার – শুধু ফেসবুকে গল্প করে। অবশ্যি কারণও আছে – একটা লোক ইংরিজিতে গল্প লেখে, বাঙলায় জ্ঞান দেয়, আর বাকি সময়টা আগ্রাসী নগরায়ণকে এক থাবড়া মেরে সুন্দরবন চেনায়।
লঞ্চটা যেখানে ঢুকেছিল সেই খালটার নাম সড়কখালি – এক, টানা লম্বা শান্ত জল, ভাঁটায় নেহাৎ উচ্ছাসহীনা।
প্রান্তিক বিয়াসের সাথে আলাপ করিয়ে দিলো বিজনদার। বিজনদা হেসেটেসে কথাও বলছিলো। হঠাৎ চোখটা সরু হয়ে গেল।
‘বাবাই’ – প্রান্তিকের ডাকনাম।
‘কি?’
‘ডানদিকে পাঁচ নম্বর গাছটা দেখ, সত্তর-তিনশোটা লাগা – একটা ব্ল্যাকক্যাপ বসে আছে’।
‘ব্ল্যাকক্যাপ কিংফিশার – একটাইপের মাছরাঙা পাখি’ – প্রান্তিক বুঝিয়ে দিলো।
ছবিটা মন্দ তোলেনি প্রান্তিক।
(৩)
‘এবার আমার লঞ্চটাকে খুঁজতে হবে রে। ওরা বলেছিলো পাখিরালয়ে মীট করবে’।
পাখিরালয় জায়গাটায় চারপাশে শুধু লঞ্চ, ছোটো নৌকা, বড়ো নৌকা ইত্যাদি ইত্যাদির হাটবাজার। টপভিউ থেকে দেখলে ট্রয় সিনেমাটার সীন মনে হওয়া অসম্ভব নয়। টোটাল হাল্লা চলেছে যুদ্ধে – উইথ হাজার হাজার রণতরী।
বিয়াস পাখিরালয়ে ওর লঞ্চে ফিরে যাবার কথা বলেছিলো প্রান্তিককে সড়কখালি এক থেকে বেরিয়েই। সেইমতো দুপুর কাটানো ঝিমুনি বেয়ে ধীরেসুস্থে লঞ্চ ফিরছিলো পাখিরালয়ের দিকে, নদীতে জোয়ারও ফিরছিলো।
দুম করে বিয়াসই প্রশ্ন করলো – ‘তুই আমায় খামোখা ব্লক করে দিলি কেন? ফেসবুক থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে, লাইফ থেকে’।
‘ব্যাপারটা লুপে পড়ে যাচ্ছিলো তাই – তুই কোনোদিন আমার প্রেমে পড়তিস না – আমি বারবার তোর প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম’।
‘ঢং’।
‘চিঠিতে তো লিখেছিলাম বিয়াস’।
‘কোন চিঠি?’
‘শেষ চিঠিটায়, তোর জন্মদিনে পাঠিয়েছিলাম – তোর শিকাগোর অ্যাড্রেসে।‘
‘পাইনি। কোথায় পৃথিবী পাড়ি দিতে দিতে কোন দেশে হারিয়ে গেছে – সেখানে হয়তো কেউ বাঙলাই জানেনা’।
‘তোর কাছে তো আমার নাম্বার ছিলো’।
‘ছিলো’।
‘তা’লে কল করিসনি কেন একবারো অ্যাদ্দিন’।
‘আমায় এতোদিন চিনিস – তোর কি মনে হয় একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি কেউ আমাকে জাস্ট লাইফ থেকে উড়িয়ে দিয়েছে আমি তাকে নোবেল পিস প্রাইজ দেওয়া মেয়ে?’
বিয়াস খানিকক্ষণ সোজা তাকিয়ে থাকলো প্রান্তিকের দিকে।
প্রান্তিক নেহাৎ বাঙালি ছেলে – চোখের দিকে তাকানোর চেয়ে ভিউফাইন্ডারে বেশি স্বচ্ছন্দ – অন্ততঃ হাজারবার তোলা একটা লিটল এগ্রেটের ছবি তুললো একহাজারএকতমবার।
পাখিরালয়ে লঞ্চটা প্রায় ঢুকেই পড়েছিলো।
প্রান্তিক না বলে পারলো না – ‘শোন’।
‘কী?’
‘আজকে তো তোর এখানে লাস্টদিন, রাদার লাস্টরাত’।
‘হুঁ’।
‘আজকের রাতটা এই লঞ্চে থেকে যা না। বিজনদাকে আমি বলে দেবো – তোর কি ওই টুরিস্ট কোম্পানিকে দেওয়া পয়সাগুলো ওয়েস্ট হ’লে খুব লস হবে?’
পাখিরালয় এককালে বেশ কিছু ইমিগ্র্যান্ট এন-আর-আই পাখির নেস্টিংজোন ছিলো শীতকালে। এখন জায়গাটাকে সুন্দরবনের টাইগার হিল বলা যায় – গোল্লায় গেছে অর্থাৎ - সাড়ে চব্বিশ হাজার লোকের ভিড়ে। তবে প্রাক সন্ধেতে একটু দূর থেকে জায়গাটার চিকমিকি আলো দেখতে মন্দ লাগছিলো না প্রান্তিকের – বিয়াসের কেমন লাগছিলো বলেনি কেউ।
লঞ্চটা সেই সন্ধেতে আর পাখিরালয় অবধি যায়নি।
(৪)
কিছুক্ষণ আগেই একটা সদ্য পাকড়াও বনবিড়ালকে নিয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা লঞ্চ গেছে। বিজনদার খাঁচায় বনবিড়াল দেখে মন ভালো নেই। কয়েকদিন আগেই একটা ছানাকে বাঁচিয়েছে – জোকার কাছে পেয়েছিলো – কাকেরা প্রায় ঠুকরে মারতো – শেষ শীতেও মায়ের ওম পেতে সেই ছানা বিজনদার পশম জ্যাকেটে মুখ লোকাতো – এখন বড়ো হয়ে গেছে।
বিজনদা মনটা একটু ফ্রেশ করতে নিজেই লঞ্চ চালাচ্ছিলো।
রাত্তিরে লঞ্চ চালাবার একটা নিয়ম আছে, লঞ্চে সারেঙের কেবিনের সামনে কোনো আলো রাখতে নেই – কারণ অন্য লঞ্চরা আলো দিয়েই সিগনাল দেয়। প্রায় অন্ধকারেই বসেছিলো প্রান্তিক।
বিয়াস সদ্যস্নাতা মাধুরী নিয়ে উঠে এলো – প্রায় মধ্যতিরিশের শেষ যৌবনে বাঁচিয়ে রাখা বিভাটুকু নিয়ে – যা নিয়ে সমস্ত রূপকথারা শেষপর্যন্ত মেনোপজে পৌঁছায় – বিয়াস স্নান করবে বলে বিজনদা কিছুটা গরম জলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো।
বিয়াস এসে প্রান্তিকের পাশেই বসলো চৌকিটায়, লঞ্চের ডেকে।
‘তোর কাছে সিগ্রেট আছে?’ – প্রান্তিক জিজ্ঞেস করলো।
‘ তুই তো খেতিস না’ – বিয়াস বললো।
‘আমার কাছে আছে’ – লঞ্চ চালাতে চালাতেই একটা থাই সিগ্রেট এগিয়ে দিলো বিজনদা।
‘আমি এখন আর খাইনা প্রান্তিক – গানের গলাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো’।
‘গান গাস এখনো?’
বিয়াস হাসলো।
‘আমি কিন্তু খুব অবাক হয়েছি জানিস বিয়াস’।
‘কেন?’
‘তুই এইসময় – তাও সুন্দরবনে’।
‘দিস ইজ নট দি ফার্স্ট টাইম আই হ্যাভ কাম টু সুন্দরবন’।
‘আই নো – আগে একবার এসেছিলি, বলেছিলি বাজে জায়গা’।
‘হ্যাঁ’।
‘তো?’
‘তো? মানুষ বদলায় না? তুই বদলাস নি? আর বাজে জায়গায় দু’বার যাওয়া যাবেনা কোথাও লেখা আছে?’
লঞ্চটা নোঙর করার আওয়াজে খেয়াল হলো প্রায় দশ মিনিট ওরা কোনো কথা বলেনি। বিজনদা একটু টায়ার্ড ছিলো – চোখে কিম্বা স্কিনে বয়েস না ধরা পড়লেও বয়েস হচ্ছে। নীচে নেমে গেল।
বিয়াসই বললো – ‘অদ্ভূত লোক তোর বিজনদা’।
‘বৌদিকে তো দেখিসনি, পুরো মা দুগগা, বিজনদার সাথে লাদাখে ট্রেক করতে যায়, এদিকে বাকি সময় নিজেও ভোগে আবার ভোগা লোককে টানেও’।
‘কি করেন বৌদি?’
‘একটা এনজিওর সাথে আছে – এককালে আবৃত্তি করতো খুব সুন্দর’।
‘হ্যাপী কাপল না? ছেলেপিলে নেই?’
‘আছে তো – সময়ের সাথে সাথে পালটে যায়’।
‘মানে?’
‘এই ক’দিন আগে অবধি বনবিড়ালটা ছিলো বিজনদার ছেলে’।
‘অ’।
‘তুই বুঝবিনা’।
‘কেন বুঝব না? যখন গান গাই তখন জন্ম দিই না আমি?’
‘কনসিভ করিসনি কেন?’
‘বর লাগে একটা, মিনিমাম একটা লাইফ পার্টনার’।
‘বিয়ে করেছিস বললি যে’।
‘মিথ্যে বলেছিলাম – সে তো তুইও বললি’।
‘মানে?’
‘প্রায় দশঘন্টা তোর বউকে না তুই ফোন করলি না সে তোকে করলো – এতো মহীয়সী ইনডিফারেন্ট মেয়ে পেলি কোথায় বাপ?’
‘এখন সত্যি বলছিস যে?’
‘ওয়েল পুরো মিথ্যে বলিনি কিন্তু – তোর সাথে ছাড়াছাড়ি – আই মীন তুই আমায় ব্লক করার পর একটা ইউক্রেনের ছেলের সাথে আলাপ হয়েছিলো – লিভ ইনও করেছি দু’বছর’।
‘সো?’
‘টিকল না। তোর মেয়ে জোটেনি কেন?’
‘বিয়ে হয়েছিলো’।
‘যাহ তারপর?’
‘ডিভোর্স’।
‘কেন?’
‘ছাড়না বিয়াস’।
‘না বল’।
‘আমি প্রথমদিকেই একটা সত্যি কথা বলে ফেলেছিলাম, প্রথমে সেটা খুব স্পোর্টিংলি নিলো তার পর কেমন জানি সব গুলিয়ে গেলো’।
‘কি বলেছিলি?’
‘বাদ দে’।
‘বল – বলতেই হবে’।
‘তোর কথা – তোকে লেখে চিঠিগুলোর কথা – আমাদের কিছু না হওয়ার কথা’।
থাপ্পড়টা খাবার পর প্রান্তিক যখন সম্বিৎ ফিরে পেলো তখন বিয়াস লঞ্চের পিছন দিকে চলে গেছে।
প্রান্তিক কাছে যেতে ছিটকে গেলো – শীতঘুম ভেঙে ওঠা ঠান্ডা রক্তদের মতো – পার্থক্য একটাই সরীসৃপেরা সম্ভবতঃ চোখে জল আনতে পারেনা।
‘বিয়াস’ – প্রান্তিক আবার একটা চেষ্টা করলো।
‘কেন বলতো? কেন? আমার নিজের ওপর কন্ট্রোলটা এতো কম কেন? তুই যখন আজকে লঞ্চে থেকে যেতে বললি ইজিলি না করতে পারতাম – আই ওয়াজ অ্যাভয়ডিং দিস সিচুয়েশান ফর লাস্ট ফাইভ অ্যান্ড আ হাফ ইয়ারস – আজকে পারতেই পারতাম – কেন ইনসিস্ট করলি’।
‘শোন বিয়াস, প্লিজ রাগ করিস না’।
‘আবার সেই একই কথা?’
এর ঘণ্টাদুয়েক পরে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে – প্রান্তিক বিচ্ছিরি নাক ডাকছে – কইমাছের পাতুড়িটা বিজন দা ছাড়া আর কেউ বিশেষ এনজয় করেনি। বিয়াস নিজের পার্স থেকে চিরকুটটা বের করলো। এতোদিন থেকে থেকে কাগজটা হলদেটে স্মৃতিছাপ হয়ে গেছে।
------------------------------------------------------------ --------------------------------------
বিয়াস,
সতীর শরীরের মতো শতধা কুচিকুচি করে ফেলছি তোর আমার গল্পটাকে, প্রেমের রয়েছে বাকি আর ৩০%। তারপর ফানেল দিয়ে ফেলে আসছি মহাজাতি সদনের সামনে, কালীঘাট মেট্রোর পাশে, আমার বাড়ির রাস্তাতেও। কোথাও পড়ছে নাক চোখ, কোথাও যোনি। দেখবি এই প্রত্যেকটা জায়গায় একদিন পূর্বরাগ তীর্থ হবে।
তদ্দিন পৃথিবীটা খুব একটা ভালো নেই। আমার হিরোশিমা অবসেশনের কথা তো জানিস – কাউকে ইমোশনাল টর্চার করতে হলেই আমি হিরোশিমা ভিকটিমদের ছবি পাঠাই – তোর সাথেও হয়েছে সে ঘটনা। হিরোশিমায় নাকি বোমাটা পড়ার পর কিস্যু ছিলোনা – জাস্ট একটা কালো গভীর গর্ত – এইচএসে ইংলিশ টেক্সটবুকে একটা লেখায় পড়েছিলাম।
আরামের এই পৃথিবীটায় একশো অদৃশ্য এনোলা গে রোজ আসছে, টুপটাপ পড়ছে জগাখিচুড়ি মাসকিলিং রেডিওঅ্যাকটিভ ওয়েপন্স। সবকিছু আরম্ভ হচ্ছে, শেষ হচ্ছেনা। জন্মাচ্ছে, বড়ো হচ্ছেনা অনুভুতিরা। ধান মেপে দিতে দিতে ঝেঁপে বৃষ্টি আসার সম্ভাবনাহীনতায় ভুগছে সমকাল।
বিয়াস – চোখ খুলে দেখ – বন্যা হয়ে ওঠ প্রাণ থেকে – এই ৩০% বুকে নিয়ে আমি চারাগাছ পুঁতে যেতে পারি একহাতে অন্যহাতে তোর বানভাসি অববাহিকাকে গ্রিন সিগনাল দেখাতে পারি। রাস্তা ভাঙ, পান-বিড়ি-চায়ের দোকান ভাঙ – না শেখা গিটারে আমি একমাত্র চেনা কর্ড ই-মাইনর বাজিয়ে দেবো আবহে।
জন্মদিনে ভালো থাকিস। রিটার্ন গিফট তো চেয়েই নিলাম, রাগ করিসনা প্লিজ।
না পাওয়া অবধি অপেক্ষা করবো।
~প্রান্তিক
------------------------------------------------------------ --------------------------------------
সতীর দেহের মতোই শেষবারের মতো মরে গেলো চিঠিটা – একশো টুকরো হয়ে, গোমদির জলে।
হাত বাড়িয়ে ফেলে দেবার আগে এতোদিন সযত্নে রাখা যৌবনকে বিয়াস কিছু বলেছিল কিনা – তার কোনো রেকর্ড নেই।
(৫)
হেলিকপ্টার শট নিলে সুন্দরবনকে নাকি একটা পাতার মতো লাগে – তাই ওর প্রাচীন নাম পত্রতল। সেই নাম থেকেই নাকি পুরাণ বর্ণিত পাতাল – পাতাল নাগদের ধাত্রী, সুন্দরবনের প্রাচীন অধিপতিরাও নাকি ছিলেন নাগবংশীয়।
এই সুন্দরবনের চলতি লোকগীতি বনবিবির পালায় একে নাম দেওয়া হয় আঠেরো ভাঁটির দেশ – পুরো জোনটা কভার করতে দাঁড় বেয়ে ঠিক আঠেরো ভাঁটা অর্থাৎ ন’দিন লাগতো বলে। আগ্রাসী ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিশেষ প্রভাব পড়েনি এই সোকল্ড পাতালে। তাই বনের দেবতা হিন্দু দক্ষিণরায় এখানে জনজাতির দেবী মুসলিম বনবিবির সাথে সদ্ভাব রেখেই চলেন – সম্ভবতঃ তাদের মর্টাল কাউন্টারপার্টদের কাছে উদাহরণ রেখেই।
লঞ্চটা শেষ মূহুর্তে দেহ রাখলো। আমলামেথি বলে কাছের একটা ঘাটে নিয়ে এলো মোটরচালিত ছোটোনৌকো – নৌকোচালকের নাম এ-টি-এম, মজাটা মারতে চাইলে পুরোটাই শুনে নিন আবু তাহের মোল্লা।
আমলামেথির ঘাটটা একান্তই সুন্দরবনোচিত, গদখালি-সুধন্যখালির মতো নাগরিকী শান বাঁধানো নয়। নেহাৎ কয়েকটা বড়ো ইঁট, আর জায়গায় জায়গায় দুটো বাঁশ ফেলা – ভাঁটার সময় প্রায় একশো মিটার হেঁটে পেরোতে হয়।
বিজনদা আর এটিএম প্রান্তিক বিয়াসের মাল নিয়ে আগেই চলে গেছিলো। বেশ কয়েকবার এসে প্রান্তিকের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল ঘাটটার।
আরো একটা দুপুর পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে পশ্চিমে – যেখানে বিয়াস প্রবাহিতা হতে চায়নি কোনোদিন – বাঁধে আটকে ছিলো ভাগ্যের ফেরে।
আরো একটা রোদ চিকচিকে মায়ায় সুন্দরবন প্রাত্যহিকী যাপন করতে করতে বুঝতে পারছিলো না – সে কিন্তু বিয়াসের লাভ অ্যাট সেকেন্ড সাইট হয়ে রইলো।
আরো একটা নৌকোর আশায় পাড়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হচ্ছিলো টাইমের নৌকোর জনতা – প্রত্যেক অটোর লাইনে দাঁড়ানো রোজকার কোলকাতার মতোই।
কিন্তু আরো একটা ভাঁটা – সুন্দরবনের বিখ্যাত আঠেরো ভাঁটাকে ম্লান করে – নিজেকে জোয়ার ভাবতে ভালো লাগাচ্ছিলো।
কাদায়, পাঁকে, বিচিত্র জ্যামিতিতে আবর্তিত কলেবরে বনবিবি, দক্ষিণরায়ের ষড়যন্ত্রে কখন একছটাক লাল-গোলাপী মিশেল হয়ে গেছে – আসবো আসবো সূর্যাস্ত ছাড়া কেউ তার হিসেব রাখেনি।
বিয়াস প্রান্তিককে বললো – ‘ আমি একা পারবো না পাড় অবধি যেতে এই রাস্তায়। একটু ধরবি?’

আপনার মতামত জানান