মেঘদূত না হওয়ার কার্যকারণ সহ ব্যাখ্যা ইত্যাদি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

[কোলকাতা শহরটা নাকি একসময় বৃহত্তর সুন্দরবনের অংশ ছিলো। এও শোনা যায় ওয়ারেন হেস্টিংস নাকি সহস্তে বাঘ মেরেছেন কোলকাতায় – যেখানে সেখানে নয়, খোদ পার্ক স্ট্রীটে। তো ম্যানগ্রোভের জনশূন্যতা ছেড়ে টিপটপ তিলোত্তমার প্রাচুর্যে গড়িয়ে গড়িয়ে ফিরে আসার মধ্যে কোথাও একটা কোলকাতা হয়ে ওঠার ব্যাপার আছে, কোলকাতা হয়ে থাকার চেষ্টা আছে। এইসব বিজ্ঞের ড্যাশ মার্কা ভেবেই অধুনা সিরিজের চতুর্থ পর্ব। ।গল্পের সময়কাল ২০১৫। তো এটা শেষ গল্পটার প্রিকুয়েলই বলা যায়। কিছুদিন দেরি হয়ে গেল – গুস্তাখি মাফ। ভেবেছিলাম তিনেই শেষ। আপাতত চারে – শেষ হয়ে হইতে চাইছেনা শেষ।
প্রথম পর্ব:
দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব




        ‘যূথ ীবনে ওই হাওয়া করে শুধু আসা যাওয়া’
গানটা ল্যাপটপের ইউটিউবে শুনছিলো প্রান্তিক, শেষ হবার পর দেওয়ালের দিকে তাকালো।বিয়াসের সাথে যখন প্রথম দেখা হয় তখন ঘরের সবকটা দেওয়াল সাদাই ছিলো। কিন্তু প্রত্যেক মধ্যবিত্ত যখন মহীয়সীদের প্রেমে পড়ে – তখন কিছু দুর্লক্ষণ দেখা যায়।
প্রান্তিক নিজের ঘরের দুধ সাদা দেওয়ালগুলোতে পোস্টার লাগিয়েছিলো। একটায় সত্যজিৎ ক্যামেরার ওপর হামলে পড়ে নির্দেশ দিচ্ছেন। আরেকটায় চ্যাপলিন বেশ ভালো ছেলে সেজে দাঁড়িয়ে। মধ্যিখানে মহারাজ লিভারপুলের বিখ্যাত চতুর্ভুজ।
প্রান্তিক নিজের হোয়াটসঅ্যাপের দিকে তাকালো। লাস্ট সাড়ে তিনদিন বিয়াস একটাও মেসেজ করেনি। বিয়াসের লাস্ট সীনটাও অফ করা আছে। প্রান্তিকের হন্যে হয়ে থাকার বাস্তববোধটাও তাই।
বয়েসই যা বেড়েছে বছর দুই।
কোলকাতাতে বৃষ্টিও মিলিমিটারের বাধানিষেধ না মেনে শেষ কিছুদিন দন্তবিকশিত বেহায়ার মতো হত্যে দিয়ে পড়ছে, জমছে, প্রান্তিকের ঘরের জানলার সামনের কলাগাছের পাতায় থিতিয়ে জমছে একা লাগা।
বেহালায় এবছরের প্রথম জলজমা দেখতে দেখতে প্রান্তিকের বোরই লাগলো – এই গল্পটার নাম মেঘদূত নয়। প্রান্তিকের ডাকনামের ধারেকাছে যক্ষ শব্দটা নেই – আর ভরা শ্রাবণে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের সমাপতন হবেনা বলাই বাহুল্য।
বিয়াসকে নিজে থেকে মেসেজ করার জায়গায় নিয়ে যেতে ঠিক কতো কিলোগ্রাম মিস করানো দরকার? মিস করার এককটা কিলোগ্রামই হওয়া উচিৎ কারণ ওটা বুকের গোড়ায় চাপ হয়ে বসে।
প্রান্তিকের ঘরে আরেকটাও পোস্টার আছে – বুদ্ধের – লেখা আছে – তুমি যতো চুপচাপ থাকবে, ততো বেশি শুনতে পাবে।

                 ‘সমরাঘাত ে অমর করি রুদ্র নিঠুর স্নেহ, সেই তো তোমার স্নেহ’
এতোদিনে মোটামুটি ধ্রুবসত্য প্রায় প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার এই গল্পটায় রবি ঠাকুর বেশ ভালোরকম পার্শ্বচরিত্র। বিয়াস রবি ঠাকুরকে বলতো ‘আমার ইটারনাল অর্গাজমের কারণ’। প্রান্তিক সেন্সরের ভয়ে বলতো ‘ভদ্রলোক হেব্বি লাভ লেটার লিখতেন’ – বলে ‘রবিবার’ গপ্পোটার শেষের চিঠিটা একবার পড়ে ফেলতো।
বিয়াস রবীন্দ্রসঙ্গীতই শুনছিলো। ওর সদ্য কেনা অ্যান্ড্রয়েডে।
প্যারিস শহরটার সাথে বিয়াস এতোদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেসব শহরে থেকেছে তাদের একটা মোক্ষম পার্থক্য আছে। এই শহরটায় চারতলার ওপরে বাড়ির সংখ্যা কিঞ্চিৎ কম। তার মানে এই নয় যে হাইরাইজার নেই। বিলক্ষণ আছে। কিন্তু সংখ্যায় কম।
বাড়িগুলো বেশিরভাগই বেশ পুরোনো। ফ্রান্স দেশটা পুরোনো নিয়ে একটু সম্পৃক্ত এবং সেটা শুধুমাত্র ওয়াইনে নয়। এখানে কাউকে যদি বলা হয় – ‘বাব্বা আপনার বাড়ি ষাট বছরের পুরোনো!’ সে বলবে ‘এ আর এমন কী? আমার বন্ধুর বাড়ি তো আড়াইশো ছাড়ালো’।
প্যারিসে কনফারেন্সটায় এসে বিয়াস ইউনিভার্সিটিতেই থাকতে পারতো। কিন্তু অ্যালিস স্টেটসে ওর ইউনিভার্সিটির খুব ভালো বন্ধু। অ্যালিস আসলে ঠিক প্যারিসের মেয়ে নয়। ভূমধ্যসাগরকে চুমু খাওয়া ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাতে অন্তেঁব বলে একটা ছোট্টো জায়গা আছে – যেটাকে এরা বলে প্রভিন্স। সেখানেই ওর বাড়ি।
প্যারিসে কিম্বা এদের ভাষায় পারীতে অ্যালিস নিজের গ্র্যাজুয়েশানের সময় থাকতো বাড়ি ভাড়া। সেই বাড়িরই মালকিনের আমন্ত্রণে দুই বন্ধু সেই বাড়িতেই রয়েছে। এর কাছের মেট্রো স্টেশন ধরলে জায়গাটার নাম লঁমিয়ের।
আজ কনফারেন্সের শেষদিন ছিলো। কাল শার্ল দ্যু গল এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট বিয়াসের। দেশে ফিরছে। সারপ্রাইজ সফরে।
বাড়িতে বাবা-মা, এখন কানাডাতে থাকা দিদি, কেউ জানেনা – প্রান্তিকও না।
প্রান্তিক শিকাগো ছাড়ার সময় থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে টুকটাক পিং করেছে। বিয়াস দেখেশুনে মুচকি হেসে লাস্ট সীন টা অফ করে দিয়েছে।
প্যারিসে এই সময়টা অনেকখানি অবধি দিনের আলো থাকে। এখন গোধূলি।
পড়ন্ত ফরাসী সূর্য না বিয়াসের মুখে বাড়ির কথা মনে পড়া উদাস হাসি – কোনটার গুরুত্ব সে মূহুর্তে বেশি সাররিয়াল – সেটার হিসেব দেওয়ার কাজ এই অপাংক্তেয় গল্পের নয়।
কারণ, প্যারিসে আষাঢ় আসেনা। আর এই গল্পটার নাম, আবার বলছি – মেঘদূত নয়।
           ‘Sunday we were divine, Monday my heart was mine’
বাসটা রাজারহাটে ঢুকে গেছে। প্রান্তিকের অফিস সেক্টর ফাইভ ছেড়ে এখন বহুদিনই পূর্বতর কোলকাতায়।
প্রান্তিক যে ইংরিজি গানটা শুনছিলো সেটা পিটার ক্যাট রেকর্ডিং কোং বলে একটা ব্যান্ডের গাওয়া। গানটার নাম পারিকুয়েল, অ্যালবামের নাম Sinema।
দিবাকর ব্যানার্জী কিছুদিন আগে হিন্দিতে যে ব্যোমকেশ বানালেন – সেখানে এই গানটার হিন্দি রিমিক্স ব্যবহার হয়েছে। হিন্দিটার নাম জানাম। বলরুম ওয়ালটজের মতো সুর গানটার।
প্রান্তিক গানটা বন্ধ করে, অফিসের ট্যাগটা পরে নিলো।
বিয়াসের বিশ্বভ্রমণের মধ্যে প্রান্তিকের কাজের কিন্তু খুব একটা রকমফের হয়নি। একই প্রজেক্টে একই কাজ করে যাচ্ছে শেষ দু’বছর।
বয়েস বাড়ছে। তাই প্রাক-মিড-লাইফ-ক্রাইসি সজনিত কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে প্রান্তিকের মধ্যে। আজকাল বিয়াসের সাথে কিছুদিন কথা না হলে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা আসে যেটা আগে আসতো না। মানুষ বয়েস বাড়ার সাথে সাথে বেশি ইনসিকিওরড আর বেশি পজেসিভ হয়ে যায়।
তাই কাজে সামান্য হলেও গাফিলতি হচ্ছে। ধৈর্য্য ধরে বসা আর না বসার অনুপাতে প্রথমটার দিকে হেলে থাকছে দাঁড়িপাল্লা।
এমন কি বিয়াসকে অনেকদিন চিঠিও লেখেনি প্রান্তিক।
তাই আজ যখন অশোকদা – প্রান্তিকের ম্যানেজার ডেকে পাঠালো অন্যদিন হলে ঘাবড়েই যেতো প্রান্তিক।
আজ জানতো কি কারণে ডেকেছে তাই চিন্তার কারণ দেখলো না।
        ‘অভা গার অভাবে জেনো শুধু নয়’
বিয়াস কান থেকে হেডফোনটা খুললো এয়ারহোস্টেস মিল নিয়ে আসায়।
শার্ল দ্যু গল এয়ারপোর্ট থেকে এই এয়ারবাস ২৮০ নামক গলিয়াথটা টেক অফ করার পরেই ফ্রান্সের ওপরে ভালো লাগাটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠেছিলো বিয়াসের।
এয়ারপোর্টের বাইরে যা যতোটা দেখা যায় – পুরো সবুজ। এটা সত্যিই যে দেশটা কিঞ্চিৎ সাদা ঘেঁষা। কাস্টমসের সময় অ্যালিসকে এক বাক্যে ছেড়ে দিলো। বিয়াসকে গুছিয়ে প্রশ্ন করলো। ইমিগ্রেন্টস সমস্যাতেও জেরবার। এই কিছুদিন আগেই আইফেল টাওয়ারের নীচে এতো পকেটমারি হচ্ছিলো যে আইফেল টাওয়ার বন্ধ ছিলো।
তবে হুঁ হুঁ বাবা – ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড – ভালো দিকও আছে। শহরটার ট্রেন নেটওয়ার্কটা অদ্ভুত।
তিনটে টাইপের চলে প্যারিসে মেইনলি। মেট্রো – পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ড – যেটায় করে বিয়াস লঁমিয়ের থেকে প্যারিসের বিখ্যাত গার দ্যু নর স্টেশনে এলো। গার দ্যু নর জংশন স্টেশনগুলোর একটা – যেখান থেকে তিনরকম ট্রেন ছাড়ে – মেট্রো, আরইআর ট্রেন (বলা যায় সাবার্ব ট্রেন, আমাদের ভাষায় লোকাল) এবং এক্সপ্রেস ট্রেন (বা টিজিভি, এটা পুরো ইউরো জোনে চলে)।
তো ব্যাপারটা দাঁড়ালো – লঁমিয়ের থেকে মেট্রোতে গার দ্যু নর। গার দ্যু নর থেকে আরইআর ধরে শার্ল দ্যু গল। কোনো ট্যাক্সি ধরতে হলোনা। মূল শহরে বেরোতে হলোনা। টুক করে এয়ারপোর্টে এসে যাওয়া গেলো।
ফ্রান্স আর কোলকাতার টাইমজোনের দূরত্ব মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টার। ভালো লাগার বেশি কারণ সেটাও হতে পারে।
ফ্লাই এমিরেটস দূর পাল্লার প্লেনগুলোতে বহুদেশী ওয়াইন এবং বহুভাষী সিনেমা রাখে। বিয়াসের দুটোর কোনোটাতেই অরুচি দেখাবার কোনো কারণ ঘটেনি।
অস্ট্রেলিয় লাল সুরায় বাদামী ঠোঁট লাগিয়ে, সামনে রাখা টিভিটায় সিনেমা সার্চ করতে করতে গুপি গাইন বাঘা বাইন পেলো।
বাড়ি ফেরাটা খুব বেশি দূর নয়।
             ‘Well you know that it’s a fool who plays it cool
             by making his world a little colder’
পৌঁছতে খানিক দেরী হয়ে গেছে।
বর্ষার জন্য ভিআইপি রোডে জল জমে ছিলো একগাদা। কোনোরকমে শেষমূহুর্তে প্রায় পৌঁছোনো গেছে ইন্টারন্যাশনালে।
আজ রবিবার কোলকাতায়।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের পর লাউঞ্জে বসে ছিলো অনেকক্ষণ। বর্ষার জন্য ফ্লাইটও খানিক লেট।
কল করা শুরু হয়েছে। তাই মোবাইলে গানটা বন্ধ হলো মাঝপথেই।
        ‘শাল পিয়ালে তাল তমালে নিবিড় কুসুমঘনকুঞ্জ’
ফ্লাই এমিরেটসের যেকোনো ফ্লাইট নিয়মমাফিক যেরকম দুবাইতে নামে বিয়াসের ফ্লাইটও নেমেছিলো।
কোলকাতার জন্য পরের ফ্লাইট লোকাল সময় সাড়ে তিনটেতে। দুবাইয়ের ডিউটি ফ্রিতে বোধহয় হাতি, ঘোড়া, চন্দ্রযান সবই ট্যাক্স ছাড় দিয়ে পাওয়া যায়।
বিয়াস লক্ষী মেয়ের মতোই বেশ কয়েকটা বোতল, চকোলেট ইত্যাদি কিনে ফেললো পটাপট। সানগ্লাসের দোকানে খানিক আটকে গেছিলো। প্রান্তিকের একটা ওয়েফেরার সানগ্লাসের বড়ো শখ বরাবরই। ভাবলো কিনবে। তারপর কি ভেবে আর কেনেনি।
বর্ষার জন্য ফ্লাইট আরো দেড় ঘন্টা লেট ছিলো। তাই ভোর পাঁচটা অবধি কি করবে না বুঝতে পেরে পন্ডিত যশরাজের গাওয়া ভানুসিংহীটাই লুপে শুনে শুনে কাটিয়ে দিলো।
ফ্লাইট দমদমে নামলো এখানকার সময় প্রায় সকাল এগারোটায়।
মালপত্র নিয়ে, কাস্টমস পেরিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় সোয়া বারোটা বেজে গেছে – কোলকাতার এবং বিয়াসের। বাবা-মাকে একদম বাড়িতে গিয়েই জানাবে ঠিক করলো বিয়াস।
তবে প্রান্তিককে সারপ্রাইজটা দেওয়াই যায়। ফোন করলো বিয়াস।
...
এই গল্পটা মেঘদূত হতে পারেনি। হওয়ার চেষ্টাও ছিলো না কোনো। প্রান্তিকের সাধারণী প্রেমে যক্ষের বিরহধারণ প্রায় ম্যাজিকসাধনা সমতুল্য দুরাশা।
আর এই শহুরে মেঘেরা – প্রতিদিন আবহাওয়া দপ্তরের কথা শুনে আটচল্লিশ ঘন্টা ভারী বর্ষণ ঘটিয়ে যদি বা ফেলে – তবুও গল্প চালাচালির ব্যাপারে তাদের আজকাল বিশেষ সুনাম নেই।
আর এটা আষাঢ়ের প্রথম দিন নয়। শ্রাবণের কোন দিন বিয়াস প্রান্তিক কেউই জানেনা। বাঙলা ক্যালেন্ডার দেখা হয়নি বেশ কয়েক যুগ।
বিয়াসের ফোনটা প্রান্তিক আর পায়নি। ওর জাপানে যাওয়ার ফ্লাইট ততক্ষণে ট্যাক্সি শুরু করে দিয়েছে কোলকাতার রানওয়েতে।অফিসের কাজে আগামী ছ’মাসের জন্য প্রান্তিকের প্রথম বিদেশী মহড়া।
ফ্লাইট ট্যাক্সি করছিল নির্বিবাদে, সেখানে কোনো গান, কোনো হেডফোন, কোনো ক্লাউড মেসেঞ্জারের অনুপ্রবেশ নিষেধ।
এই গল্পটা তাই ইথারিয়ান চাওয়া পাওয়ারই হিসেব মেলাতে পারেনি – মেঘদূত দূরস্থান।



আপনার মতামত জানান