অনুপম কিছু পুনরাধুনিক আখ্যান

আবেশ কুমার দাস

 

অনুপম মুখোপাধ্যায়ের পরিচিতি মূলত কবি হিসেবেই। সমসাময়িক বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ‘স্বনির্মিত’ (বা স্বচিহ্নিত) পুনরাধুনিক শৈলীর চরিত্র প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য—অধুনান্তিক সংসর্গকে অতিক্রম করে (কখনও কখনও অধুনান্তিকের কিছু কিছু অস্পষ্ট জলছাপকে বহন করেও) কোনও সাহিত্যবস্তুর নব্যতর ভঙ্গিমায় আধুনিকতাপ্রাপ্তিই পুনরাধুনিক পরিণতি। এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন আদরের নৌকা থেকে সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত এই কবির প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘বৃষ্টিকে কেউ চিঠি লেখে না’-তে সংকলিত হয় ‘তেল’, ‘অগ্নিভ হালদারের কান্না’ বা ‘শ্রীমন্ত সাউয়ের শোক’-এর মতো গল্পগুলি। যেখানে হাস্যরসের তিলমাত্র অনুষঙ্গবর্জিত আখ্যানকেও আপাদমস্তক শাণিত ব্যঙ্গের জারণরসে পুনঃনির্মাণ করেন লেখক। পরিণামে শিবু ভটচাজের লিঙ্গযাতনা থেকে শাসনের বাইরে চলে যাওয়া শিশুর দুরন্তপনা অথবা মৃতদার শ্রীমন্তর কামাতুরতার মতো বিষয়গুলির গাম্ভীর্যও জলছাপের মতো অস্পষ্ট হয়ে যায় কাহিনির সরস আবহ থেকে।
রাতে আর আনন্দ আশ্রমের উত্তমকুমার হয়ে থাকতে পারে না শ্রীমন্ত। নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটের প্রতিটা আসবাবকে যোষিৎ প্রত্যঙ্গের আলোয় যেন সে দেখতে পায়, যে কোনও কিছুকে টিপে ধরতে ইচ্ছে করে, কামড়াতে ইচ্ছে করে, চুষতে-চাটতে ইচ্ছে করে, যেন হন্যে হয়ে ওঠে কোনও না কোনও একটা কোমল পিচ্ছিল গর্তের জন্য।
মৃত্যুশোককেও এভাবেই অতিক্রম করে ফেলে শ্রীমন্তর কামেচ্ছার তীব্রতা তথা গল্পকারের গদ্যভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য।
সমকালীন গভীর বিষয়গুলিকে নিয়ে আসলে অতি সহজেই খিল্লি করতে অভ্যস্ত এই গল্পকার। যৌনতাকে নিয়ে নিজস্ব সাহিত্যযাপনে আমরা গভীর চিন্তাশীল হতে পারি। চপল হতে পারি না। সেই অর্থে বাংলায় হাসির গল্প আর লেখা হচ্ছে না ভেবে হাহুতাশ করি আমরা। আসলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী-আম আদমি নির্বিশেষে আজকের বাঙালি তার প্রাত্যহিকের জীবনে যে বিষয়গুলির প্রসঙ্গে সচরাচর রসিকতায় মাতে সেই সেক্স কমেডির ধারাটিকে সাহিত্যে অপাঙক্তেয়ই মনে করি আমরা। যার পরিণামে রসসাহিত্যের এক অতি মূল্যবান সমসাময়িক রসদই অব্যবহার্য রয়ে যায় আমাদের কথাসাহিত্যে। আধুনিক, অধুনান্তিক যাপনকে অতিক্রম করে এই কারণেই স্রষ্টা অনুপম মুখোপাধ্যায়কে পুনরাধুনিক বলা যাবে—যে উপাদানগুলি সমকালীন অবশিষ্ট নিরানব্বইজন গল্পকারের কাছেই নিশ্চিতভাবে পরিগণিত হত সিরিয়াস সাহিত্যের আকর হিসেবে—তিনি তাদেরই পরিণত করেছেন রসসাহিত্যের আখরে। ‘এল দোরাদো’-র মতো গল্পেই যার চরম প্রকাশ।
রহস্য সৃজনেও এই গল্পকারের স্বাভাবিক দক্ষতার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় মেলে ‘শত্রু’ গল্পে। এবং এই ক্ষেত্রেও তিনি বজায় করে চলেন আপন স্বাতন্ত্র্য। তাঁর কলমে রহস্য ঘনিয়েছে। কিন্তু নিয়ম মেনে কোনও গোয়েন্দা চরিত্রের আগমন ঘটেনি। কোনও মীমাংসাও পাওয়া যায়নি শেষাবধি। রহস্যের ডালপালা ছড়িয়ে রহস্যময়তাতেই সমাপ্ত হয় তাঁর কাহিনি। মীমাংসা থাকতেই হবে কে বলল?
‘মাধুরী দীক্ষিতের বর’, ‘নিম্নচাপ’ বা ‘বৃষ্টিকে কেউ চিঠি লেখে না’-র মতো গল্পে যৌনতাকে কেন্দ্র করে গল্পকারের স্বকীয় লঘুচালের ভঙ্গি এবং প্রথাগত সিরিয়াস পর্যবেক্ষণমূলক মনোভঙ্গি উভয়েরই প্রকাশ ঘটে একাধারে।
সম্ভবত গল্প রচনায় তত মনোযোগী নন অনুপম মুখোপাধ্যায়। সেই কারণেই একজন প্রথাগত গল্পকারের ফর্মূলায় বাঁধা পর্যবেক্ষণ ছাপিয়ে সহজাত সাবলীল হতে পেরেছে তাঁর দৃষ্টি। তবে তাঁর গদ্যভাষা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাহিনির গতিকে করে তুলেছে প্রেডিকটিভ। বলা যায় বিভিন্ন পত্রিকায় স্বতন্ত্র্যভাবে প্রকাশিত গল্প হিসেবে তারা সার্থক। তবে যখন বেশ কিছু গল্প একসূত্রে গ্রন্থিত হল তখন অত্যন্ত মনোযোগী পাঠকের কাছে কোনও কোনও কাহিনি প্রেডিকটিভ হয়ে উঠতে পারে।
তৌসিফ হকের প্রচ্ছদটি চলনসই।


বৃষ্টিকে কেউ চিঠি লেখে না/অনুপম মুখোপাধ্যায়/আদরের নৌকা/ মূল্য: ৯৯ টাকা

আপনার মতামত জানান