প্রচেত গুপ্তর ‘সাগর হইতে সাবধান’….

সায়ন্তন মাইতি

 


সিস্টেমের বিরোধী কে নয় বলুন তো? আজকাল তো এঘর ওঘর থেকে প্রতিবাদী জন্মেই চলেছে। আবার, যারা প্রতিবাদের প্রতিবাদ করছে, বলছে “এদের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?” তারাও প্রতিবাদী। একটু ভেবে দেখুন তো, এতজন প্রতিবাদীর মধ্যে কজন সুখে থাকে?

সাগর কিন্তু সুখে আছে। একদম সুখবিলাসী প্রাণী। আর হ্যাঁ, সাগর একজন প্রতিবাদীও। প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদী। প্রতিবাদী শুনলেই কেমন লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার কথা মনে হয়। কিন্তু না, সাগর তেমন নয়। অথচ পরতে পরতে বিরুদ্ধাচরণ করে চলেছে বিভিন্ন কূপমণ্ডুকতার। কখনো গতানুগতিকতা, কখনো অর্থলিপ্সা, কখনো দেখনদারি, কখনো কলকব্জাময় কর্মব্যস্ততার বিরুদ্ধে ।

কেমন করে সেটা সম্ভব? জানতে গেলে আপনাকে পড়তে হবে সাগর-এর গল্প। ‘আমার যা আছে’, ‘চাঁদ পড়ে আছে’, ‘এক যে আছে সাগর’-এর পর প্রচেত গুপ্ত-র হাত ধরে সাগরের প্রত্যাবর্তন। নতুন গল্প সংকলন ‘সাগর হইতে সাবধান’ (অভিযান পাবলিশার্স, দাম ২০০ টাকা)। সেই অলস, বেকার ছেলেটা, বন্ধুর টাকায়, বাড়িভাড়া বাকি রেখে, ধারে ভাতের হোটেলে খেয়ে দিব্যি জীবন কেটে যায়, সে এবার বিপজ্জনক।

একের পর এক চমক জমা হচ্ছে, না? শুধু প্রতিবাদীই নয়, বিপজ্জনক! কী এমন আছে এই গল্পগুলোয় যা তক্তপোশ ছেড়ে নড়তে-না-পারা বেকার মানুষটাকে ‘বিপজ্জনক’ করে তুলল?

সেখানেই গল্পের মজা। সাগর এখানে সব্বাইকে দিয়ে কঠিন এক একটা কাজ করিয়েছে। কোনোটা তার উপকারের জন্য, কোনোটা তাকে দিয়ে অন্য কারোর উপকারের জন্য। আবার নিজেও স্রোতের বিরুদ্ধে হেঁটে অনেক কঠিন কাজ করেছে, কাউকে আচ্ছা করে জব্দ করার জন্য। এত কিছুর চালিকাশক্তি একটাই, সেটা হল সাগর পরোপকারী। পরোপকারের জন্য পারে না এমন কিছু নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তির বশে সেটা করেই ছাড়বে।

ধনী কিপটে মামাকে দিয়ে সাগর ফুটপাতবাসী বাচ্চাদের মিষ্টি খাইয়েছে, শুধু তাই নয় ‘রাজার অসুখ’এর মত সেই মামার অসুখকেও সারিয়ে দিয়েছে। অন্যের উপকার করে যে অনাবিল আনন্দের স্বাদ পাওয়া যায়, সেটা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। আরেক কিপটে পিসেমশাই আমেরিকা থেকে ফিরে নিজের গ্রামে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে সাগর তাকে হাড়-কাঁপা শীতের মধ্যে ভাঙা গাড়িতে উঠিয়ে যাচ্ছেতাইরকম নাকানি-চোবানি খাইয়েছে। বড়লোকের ডমিনেটিং মেয়ের সাথে তারই মত অপদার্থ ছেলের বাগদান করে দিয়েছে। তেমনি, অফিসকাছারিতে রিসেপশনিস্টের ভূমিকায় যে মহিলারা থাকেন, তাঁদের অতিরিক্ত সাজপোশাক নিয়ে চরম খিল্লি করেছে। বন্ধুর সন্দেহবাতিকগ্রস্ত প্রেমিকাকে সন্দেহ করিয়েই আরো চটিয়ে দিয়েছে এবং সেইভাবেই তাদের ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লেগেছে। যারা সাগরের কাছে দরকার নিয়ে এসেছে, সবাইকেই সে পথ দেখিয়েছে নতুন কিছু করার, নতুনভানে বাঁচার।

আবার, গল্পের বাইরের চরিত্রদেরও সাগর আচ্ছা করে জব্দ করেছে। সবাই এখন একটু ব্যতিক্রমী পথে হেঁটে নতুনত্বের ধ্বজাধারী হতে চায়। নতুন সাজার সেই নতুনত্বহীন মুখোশগুলোকে সাগর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ‘যেমন খুশি রবীন্দ্রনাথ’এ। সমকালীন ফেসবুক-সার জীবনযাত্রা ও ফেসবুককে হাতিয়ার করে আত্মপ্রচারকে উপহাস করেছে ‘রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত ফেসবুক’এ। এই গল্পদুটো যিনি সত্যিকারের আধুনিক, এখনো আধুনিকতম, সেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি সাগরের শ্রদ্ধার পরিচয় দেয়। ‘নবপিসি’তেও ফেসবুক যে আসলে পরনিন্দা-পরচর্চার সবথেকে বড় আখড়া সেই জলজ্যান্ত সত্যিটা সাগর দেখিয়ে দিল চরমভাবে। ‘বৃষ্টিভেজার একডজন’ গল্পের শুরুতেই বিভিন্ন শ্রেণীর পণ্ডিতদের তালিকা দেওয়ার পর সাগর গোটা গল্পে বৃষ্টিভেজার নির্দেশিকার মধ্যে দিয়ে তাদের চরমভাবে উপহাস করেছে। ছাড় পায় নি ট্রেনে-বাসে বিক্রি হওয়া চটি বইগুলোও।

এসব ছাড়াও, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে সাগরের বিভিন্ন illusion-এর মধ্যে দিয়ে প্রচেত গুপ্ত পারিপার্শ্বিকতাকে বিদ্রূপ করেছেন। স্বপ্নে্র মধ্যে দিয়ে সাগর চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন দুঁদে অধ্যাপকের কাছে ইণ্টারভিউ দিতে। সেই স্বপ্নের মধ্যেই ছোটবেলার সাগর তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এই ধরনের ইণ্টারভিউতে পক্ষপাতিত্ব ছাড়া আর কিছুই হয় না। কখনো স্বপ্নে সাগরকে পৃথিবী এসে জানায় ক্রমবর্ধমান হিংসা-বিদ্বষের কথা, আবার কখনো দুশ্চিন্তাকে হালকা ছলে মদত দেয় পরিবারসুদ্ধু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে। তেমনি বারান্দার সাথে সাগরের ছোট্ট কথোপকথন পড়লেই বোঝা যায়, যুবক-যুবতীদের ছোটখাটো ঝগড়াঝাঁটি থেকে সম্পর্কছেদ নিয়ে একটু মশকরা রয়েছে, তাও সেটা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। শীতের সাথে সাগরের কথা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে চারদিকে ঘটে চলা নিত্যনতুন উৎসবের প্রতিও একটু ব্যঙ্গের স্পর্শ পাওয়া যায়। আর সব জায়গাতেই সোজাসাপ্টা অথচ তীব্র শ্লেষোক্তি (শ্লেষ মানেই সাধারণত বক্রোক্তি হয়), যা উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি বিপজ্জনক। যেই কেউ বুঝতে পারবে, সাগর আসলে তাঁরই মত মানুষদের ‘ঠুকেছে’, তাহলে আত্মসম্মানের কাছা খুলতে বাধ্য।

আর.... সবশেষে যদি বলি, সাগর পাঠকদেরও বিপদে ফেলেছে? হ্যাঁ, তাও আছে। সাগর একটা গল্পে বিপদে ফেলেছে আমাকে, যারা পড়েছে সব্বাইকে। ‘শিমূলতলায় সাগর’ গল্পে। সাগর যন্ত্রনির্ভর জীবনযাত্রার বিরুদ্ধাচারী। তাই হাঁফ-ধরা শহুরে যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে আপনাকে নিয়ে যাবে বিহারের মালভূমি ঘেরা ছোট্ট একটা গ্রামের ধূলিকণার মধ্যে। তাহলে বিপদটা কোথায়? বিপদ গল্পের শেষে। পড়তে পড়তে মনে হতেও পারে এই বুঝি আরেকটা ‘আরণ্যক’ বা ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ শুরু হতে চলেছে। কিন্তুউউউ... নাহহহ!! বাজেরকম ভাবে ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড়িয়ে যাবে আর আপনি পপাত চ। এমন একটা জায়গায় ভ্রমণবুভুক্ষু রেখে গল্পটা শেষ হয়ে গেছে যে, প্রচেত গুপ্তকে ‘ধাপ্পাবাজ’ বলে গালিও হয়তো দিয়ে ফেলবেন। শহুরে কলকথা থেকে মুক্তির আস্বাদ পাইয়ে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া – এরপর আপনি সহজে ফিরতে পারবেন তারপর ব্যস্ত জীবনের ওঠাবসায়? তারপর ধরুন ‘সাগর পড়েছে বিপদে’। আমাদের অর্থের পিছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পর এ হেন গল্পের সন্ধান পেলে নিজের ওপর রাগই হবে, মনে হবে কেন জীবনের শান্তি এইভাবে নষ্ট করছি! আর, এরকম সরল সত্যি চোখে আঙুল দিয়ে যে দেখিয়ে দিতে পারে, তার থেকে সাবধান থাকাই ভালো। সাগরের সঙ্গ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, অভ্যাসের পদে পদে প্রশ্নচিহ্ন তুলবে, আমাদের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে মেট্রোপলিটন লাইফস্টাইলে ব্যাগড়া দেবেই।



তাহলে মোটের ওপর কী মনে হচ্ছে? এতজনকে এত অসুবিধায় ফেলা বইটা কি পড়ে দেখার মত?

সেটা আপনারাই ঠিক করবেন। আমি কিন্তু নিশ্চিন্তে বলতে পারি, এ বই আপনার প্রতিবাদী সত্তাটাতেও শান দেবে, আবার দেবে কয়েক পশলা নির্মল আনন্দ। একদিকে দেখতে পাবেন সমাজের উচ্চবর্গীয় কাউকে তোয়াক্কা না করার অনমনীয়তা, অন্যদিকে এসব পড়ে আপনার রক্ত গরম না হয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আপনি রগ ফুলিয়ে, চোয়াল শক্ত করে রণভূমিতে অবতীর্ণ হওয়ার বাসনা ছেড়ে সমস্ত গতে-বাঁধা নিয়মকে হেলায় অবজ্ঞা করে ভাঙতে পারবেন।

আর এমন ছত্রখানের হোতাটাকে ভালো না বেসে পারবেন না। ঠিক যেমন মুন্নাভাই একজন গুণ্ডা হলেও আপনি তাকে খুব ভালোবাসেন। এই সাগরও তাই। একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন, তার মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত সংমিশ্রণ। চিন্তাভাবনা আর মোটিভেশনের মধ্যে রয়েছে নবারুণের ‘ফ্যাতাড়ু’, চিন্তাভাবনার বাস্তবায়নের জন্যও সে তৎপর, আবার কর্মক্ষেত্রে রাজু ইরানির ‘মুন্নাভাই’। তাই ‘দশটা ভুল করা’র ছাড়পত্র পেয়ে দুর্বল টিমকে কঠিন প্রতিপক্ষর বিরুদ্ধে জিতিয়ে দিলেও তার ওপর রাগ করতে পারবেন না, যেমন বাড়িভাড়া বাকি রাখলেও বাড়িওয়ালা সাগরকে ভালোবাসেন। আসলে সাগর মানেই আনঅর্থোডক্স ইউটোপিয়া, সাগর মানেই পানশে পড়ে যাওয়া ভালোবাসাকে পুনরুজ্জীবিত করা, সাগর মানেই লোকের কথায় কান না দিয়ে আপন ভেলায় চড়ে মনের সাগরে ভেসে চলা। তাই তো অফিস-পরিবারের মাঝে চিপিটকপিষ্ট বন্ধুকে পরামর্শ দেয় ক্রেডিট কার্ড এবং যাবতীয় ইলেকট্রনিক্স গুডস ফেলে দিয়ে শুধু ‘নিজেকে নিয়ে’ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার। নিজের মন আর নিজেকে অভিন্ন করার এটাই কি একমাত্র উপায় নয়? (কিছুটা বেয়ার গ্রীলসের উপাদানও হয়তো পেয়ে যাবেন।)

সমস্ত ইউটোপিয়াকে সত্যি ধরে নিলেও গোটা বই জুড়ে একজন কাল্পনিক চরিত্র রয়েছে, তার কথা না হয় না-ই বললাম। প্রচেত গুপ্ত-র একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছি, সাগরকে নাকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীললোহিত’এর সাথে তুলনা করা হয়। সেই মনে হওয়াটার জন্য এই কাল্পনিক চরিত্রটা দায়ী, যার নাম ‘রেবা’। এ থাকার জন্যই সাগরকে পাওয়া গেছে রোম্যাণ্টিক অবতারে। কিন্তু ঐ যে বললাম, আদতে চরিত্রটা কাল্পনিক। আসলে, সাগরের প্রেমের ভাগীদার তার নিজের মনেই তৈরী একটা ছায়াবয়ব, যার সাথে ‘মনফোন’ ছাড়া সে যোগাযোগ করতে পারে না। অথচ সাগর নিজে বিপদে পড়লে সে-ই তাকে পথ দেখায়। আর তার মধ্যে দিয়ে সাগর পথ দেখায় আমাদের।

আপনার মতামত জানান