পুরোনো বোতল, নতুন মদ...

কৌশিক মজুমদার

 

এইমাত্র শেষ ক'রে উঠলাম অ্যাসটেরিক্সের নতুন অভিযান "Asterix and the Pictes "। গত বছর অক্টোবরে প্রকাশিত হওয়া বইটি হাতে পেতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে গেলেও পড়া হ'য়ে বেশ একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ১৯৭৭ এ গোচিনির মৃত্যুর প'র এতদিন ইউদেরজো একাই আমাদের ব'লে গেছেন নাম না জানা সেই পা"গল" গ্রামের গল্প। কিন্তু যতই নষ্টালজিক হই না কেন, স্বীকার করতে বাধা নেই, শেষের দিকে জমেনি একেবারেই। হতাশ ইউদেরজো ঠিক করেছিলেন "Asterix and the Falling Sky" দিয়েই শেষ হবে অ্যাসটেরিক্সের অভিযান। কিন্তু হাল ছাড়েন নি অ্যান গোচিনি, রেনে গোচিনির মেয়ে। তিনি ইউদেরজোকে বোঝালেন "We got a good thing going, and we want to keep it going for a long while”।


জঁ ফেরি আর সাথে কনরাদ

তাই এবার অ্যাসটেরিক্সের খোল-নলচে বদলে গেলো পুরোটাই। লিখলেন জঁ ফেরি আর সাথে ছবি আঁকার দায়িত্ব পেলেন ইউদেরজোর শিষ্য কনরাদ। প্রথমে একটু অবিশ্বাস থাকলেও তা মুছে গেল প্রথম ড্রাফট দেখার পর। খুশি ইউদেরজো জানালেন "এবার আমি নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারি। Thanks to them, the Gaulish village created with my friend Rene Goscinny can go on having new adventures to delight readers of the series" রেনের স্বপ্ন শেষ হলো না মাত্র ৩৪ টি অভিযানে। Alea jacta est ( The Die is Cast).


প্রথম পাতা

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই শুরু হচ্ছে অ্যাসটেরিক্সের এই অভিযান। গল গ্রামকে এই রূপে আগে কখনো দেখিনি আমরা। "সেবার ফেব্রুয়ারী মাসে দারুণ বরফ পড়েছিল। গোটা গ্রাম ঢেকে গেছিল বরফের আস্তরণে..." এমনভাবেই এই কাহিনি শুরু করতে বলেছিলেন ইউদেরজো। বাকিটা লেখকদের হাতে। ছোট করে গল্পটা বলেই দেই, অ্যাসটেরিক্সের গ্রামে নদীতে ভেসে আসে বরফে জমা এক মানুষ। গেটাফিক্সের জাদু পাণীয়তে চাঙ্গা হয়ে আস্তে আস্তে তার স্মৃতি ফিরে আসে। সে জানায় তার নাম ম্যাকআরুন। সে সূদূর ক্যালেডোনিয়া ( এখন স্কটল্যান্ড) থেকে আসছে। তাকে বন্দি ক'রে জলে ফেলে দিয়েছে দুষ্টু সর্দার ম্যাককেবাস। রোমানেদের সাথে হাত মিলিয়ে সে চায় বুড়ো রাজার সিংহাসন দখল করতে আর বিয়ে করতে রাজকন্যা ক্যামোমিলাকে। রাজকন্যা আবার ম্যাকআরুনকে ভালোবাসতো দেখে তাকে মেরে ফেলার জন্য জলে ডুবিয়ে দিয়েছে। ফলে ওবেলিক্স আর অ্যাসটেরিক্সের দায়িত্ব পরে ম্যাকআরুনকে দেশে ফিরিয়ে দুষ্টু সর্দার ম্যাককেবাস আর রোমানদের জব্দ করতে। এই হ'ল মোদ্দা গল্প।
এবার আসি আসল কথায়। এতো বছর অপেক্ষার শেষে এই কাহিনি থেকে আমরা কি পেলাম আর কি পেলাম না।


ম্যাকআরুন

পাওয়ার তালিকাটা বেশ বড়-
১। আমরা নিশ্চিন্ত হ'লাম টিনটিনের মত অ্যাসটেরিক্সের অভিযান হঠাৎ থেমে যাবে না।
২। কনরাদের মত একজন আঁকিয়ে পেলাম। না বলে দিলে কে বলবে ইনি ইউদেরজো নন !!!!!
৩। বহুদিন বাদে আবার অ্যাসটেরিক্সকে ব্রিটিশ আইল্যান্ডে দেখা গেল। সেই Asterix in Britain এর পর।
৪। টানটান কাহিনি । শেষ না ক'রে ছাড়া যাবে না কিছুতেই। আছে স্কটল্যান্ড ভ্রমণের মজা, লক নেসের দানবের কীর্তি আর জলদস্যু রেড বেয়ার্ড।
কিন্তু পাশেই না পাওয়াটাও নেহাত কম না। এক এক করে বরং বলি-

১। গোচিনিকে বড্ড মনে পড়ছিল বারবার। অ্যাসটেরিক্সের কাহিনির যে অন্তর্লীন হাস্যরস, সেটা প্রায় উধাও। অ্যাসটেরিক্স বেশ কাঠ খোট্টা। মজার ধার ধারে না। হাসির কিছু মুহুর্ত তৈরি হতে হতেও কেমন যেন উধাও হয়ে যায়। কোথাও কোথাও তো বেশ জোর ক'রে হাসতে হচ্ছে (অ্যাসটেরিক্সে হাসব না!! এই ভেবে)
২। গল্প পুরো ছকে ফেলা। সেই গ্রাম দিয়ে শুরু, অচেনা অতিথি, অভিযান...কিন্তু আগে তার মধ্যেই যে twist টা আসতো , সেটা আসে নি।
৩। রোমানদের যেন রাখাত জন্যই রাখা হয়েছে। না থাকলেও কাহিনিতে কোন পার্থক্য হত না। যেমন হত না Limitednumbus নামের আদম সুমারির লোকটি না থাকলে।
৪। ডিজনির প্রভাব এই প্রথম অ্যাসটেরিক্সে দেখলাম। রাজকন্যা ক্যামোমিলার সাথে ডিজনির Brave এর প্রচুর মিল। লক নেসের দানব যেন ডিজনি কমিক্স থেকে উঠে এসেছে।
তাই অ্যাসটেরিক্সের এই অভিযান যেন পুরোনো বোতলে রাখা নতুন মদ। আমরা যারা অ্যাসটেরিক্সের অন্ধ ভক্ত তারা সেই পুরোনো মদের স্বাদ পেতে অধীর আগ্রহে ব'সেছিলাম। যা পেলাম তার বহিরঙ্গ আগের মত হলেও ভিতরে অনেক কিছু বদলে গেছে।

লক নেসের দানব

আমার বরং বইয়ের মলাট খুব তাৎপর্যপূর্ন লাগলো। এটা এঁকেছেন ইউদেরজো নিজে। ছবিতে ওবেলিক্স এক কাঠের caber ছুঁড়ে দিচ্ছে। এ যেন অ্যাসটেরিক্সের কমিক্স আঁকার গুরুদায়িত্ব তিনি দিয়ে দিলেন কনরাদকে। পাশে বসে চোখ মেরে, বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যাসটেরিক্স যেন বলতে চাইছে সঠিক হাতেই ন্যস্ত হয়েছে এই ভার।

বেচারা অ্যাসটেরিক্স। তার তো কোন গোচিনি নেই। আজও.....

আপনার মতামত জানান