ভেসে যাচ্ছে ভাঙা কথা

অরিত্র সান্যাল

 

ঘুম নামের পাহাড়
আষিক
প্রকাশকঃ সৃষ্টিসুখ
মূল্যঃ ৭০ টাকা

প্রথমে ভাবা গিয়েছিল প্রস্তাবনাটি নিদ্রাহীনতার। ইনসমনিয়ার। সত্যি তো, না থাকলে ঘুমকে তো বুকে চেপে বসা এক পাহাড়ই মনে হয়। অতিশয় দুটো চোখ। স্ফীত তলদেশে পড়ে গেছে লন্ঠনের অলীক গ্রামীণ কালি। তার মধ্যে হয়তো চাপা আছে অকথ্য শ্যামাপোকা পুড়ে যাওয়ার অপরাধবোধ। নিদ্রাহীনতার রক্তক্ষরণে মনের কোনও না কোনও তন্তু ভিজে যাচ্ছে। “হাওয়ায় ভাসছে কিছু/ ছোটো হয়ে আসা ঘরবাড়ি/ জুড়ে থাকা রাস্তায় দেশলাই বাক্সের মতো গাড়ি/ বারুদের শহরে তোমার ভূমিকা আজ শেষ।/ সামনে অনেক পথ অনেক না-ছুঁতে-পারা দেশ।” এই ভেসে থাকা, খানিক আবছা হয়ে যাওয়া, ধবল পাহাড় থেকে পাহাড় পেরিয়ে মসৃণ চলে যাওয়া, হতে পারত এটা একটা সিনেমার শুরুর দৃশ্য। হতে পারত তার নাম ‘ইনসমনিয়া’। আর তারপর অতিশয় দুটো চোখ। তাতে মেঘের ঝাঁকুনি। যে কোনও কিছুই হতে পারতো, যে কোনও কিছুই। সুতরাং উলটোটাও ভাবা যেতে পারে, এটা একটা স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের সংকরের ঘোর, সম্পর্কের তন্দ্রাচ্ছন্ন পৃষ্ঠা পর পৃষ্ঠায় কোনও বিভাজন যে নেই, তা তো এক ঘুম থেকে আরেক ঘুমে যাওয়ার পথেরই রূপক। বয়স তো জাগরণের বাড়ে। কিন্তু যখন ঘুমিয়ে আছি, তখন সারাজীবন বিস্তৃত সেই একটাই দিন। সমস্যা, হানাবাড়ি আর সুখ হয়তো পরিবর্তিত হতে থাকে। শুধু ভেসে যাওয়াটি থাকে। “ঘুম জানে।/ গভীর স্বপ্নের দিন, তবু মিথ্যে আগলে রাখতে হয়।/ সদ্য ভালোলাগাটির বয়েস/ বেশি নয়। বহু বর্ষা আগে –/ ধ্বসে রাস্তা ভেঙেছে এখানে।/ নরম গোড়ালি যাকে ছুঁয়ে দিতে পারে কোনও কারণ ছাড়াই/ পাহাড়ী প্রতীক্ষার নাম রাস্তা-সারাই”।

কোনও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেই। সূচিপত্রও। অর্থাৎ, ক্রম নামক বস্তুটিকে খুব নরমভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুরুর কবিতা ‘ঘুম নামের পাহাড়’-এর অংশ থেকে অংশও পৃথক রয়েছে কোনও আঙ্কিক হিসেবে নয়, একটি নির্দিষ্ট সাংকেতিক বিভাজিকায়। অর্থাৎ এটা একটি দীর্ঘকবিতা, না সিরিজ তা নিয়ে একটা আলগা দোলাচল থেকে গেল। অল্প থেমে থেমে কেউ কিছু বলে যাচ্ছে, দৃশ্য থেকে দৃশ্য, বদলে যাচ্ছে এবং খুব একটা নাছোড় আচ্ছন্নতার মধ্যে থেকে, সেই ভেসে থাকা। এই ওজনহীন আচ্ছন্নতার পিছু পিছু অনেকভাবে যাওয়া যায়। অনেকদিকেও। তার আগে ভেবে নেওয়া যাক কবির অবস্থানটিকে নিয়ে। বইয়ের নাম ‘ঘুম নামের পাহাড়’। কবির নাম আষিক। আর সবার ওপরে একটা ক্যামেরা প্রায় টপ-ভিউ থেকে ধরা আছে। একজন বিমান আরোহীর কাছে মেঘ দেখা তো আর ওপরে তাকানো নয়। বরং নীচে তাকিয়ে দেখা যায় মানচিত্র বা খেলনার মতো জল-স্থল-স্তন বিভাজিকাময় পৃথিবীর ছবি। এক দেশ থেকে এক দেশ, এক মহাদেশ থেকে আরেকে ভেসে চলে আসার ঘোরটাই অনেকটা মেটাফরের মতো কাজ করেছে সম্পূর্ণ ঘুম নামের পাহাড়-এ। যে কোনও ভ্রমণ, পরিস্থিতিতে এই সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থানটিই পাঠকের সব প্রথমে চোখে পড়ে। এই বহুজাতিক বিশ্বায়নের পৃথিবী, কত বড় আর কত ছোট, এবং প্রায় ঘুমঘোর ভেঙে যাওয়া কিছু ক্রাইসিস। “নেমে আসছি আমি/ কলকাতা বড় হতে হতে/ এখন হারিয়ে যাওয়ার মতো বড়/ ছাদের ওপর ভাঙা পুতুলের রঙ-জ্বলা জামা/ এগারো তলার জানলা দিয়ে হাউজদ্যাট অ্যাপিল/ আমাকে সময় এবং সচেতনতা দিচ্ছে/ দোজখ, এবারে অভ্যর্থনা দাও”। ‘দোজখ, বেহেশ্‌ত ও কিছু কাল্পনিক দালাল’ কবিতার তৃতীয় অংশ। খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন একটা ক্যামেরা ওপর থেকে দেখতে দেখতে নেমে আসছে, অতঃপর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ‘হারিয়ে যাওয়ার মতো বড়’তেই লুকিয়ে আছে এক বিচ্ছিন্নতার ভূত, যা সচরাচর এই আধুনিক জীবনে মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়, কবিকেও করেছে সারা কাব্যগ্রন্থ জুড়ে। আর একটি উদ্ধৃতিতে তা স্পষ্ট হয় – “বিয়াল্লিশ হাজার ফিটে ভেসে আছি।/ ভেসে আছে আমারই মতন একটা আদ্যোপান্ত যাত্রীবাহী প্লেন।/ এত অব্দি দৃশ্যপট তোমার, আমার, আর বাকিদেরও ভয়ানক চেনা/ তাজ্জব ব্যাপার শুধু এত ভেসে থাকাও/ ভেঙে যাওয়া টুকরোগুলো ভাসাতে পারছে না”। (ভেসে যাওয়ার দিন) এই নিজের থেকে নিজের ভেঙে যাওয়া টুকরোগুলোর একা ধাওয়া করেছে কবিকে ভ্রমণে, প্রেমে, পরকীয়ায় এবং আরও সমস্ত কবিতায়। ঘুমের প্রলেপের তলায় বইতে থাকা এই বিচ্ছিন্নতাবোধটুকুই কবিতা। আমরা সবাই তো হারিয়েই যাই, কবি শুধু সেটুকু দেখতে পেয়ে যান। তারপর পীড়া। তারপর ক্ষয়। “... জার্নির সঙ্গে “যার নেই” শব্দবন্ধের ধ্বনিগত মিল/ তোমাকে ভাবিয়ে তোলে –/ পুষে রাখা প্রতিধ্বনি, ইনায়াত, পর্বত সপ্তাহ/ শীত হয়ে শুয়ে থাকে অনাবিল বরফের পাশে/ আমরা সাধারণ – তা ক্রমশ প্রকট হয়ে আসে...”

পরকীয়া নামক দীর্ঘ-কবিতার শেষে বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব শুরু। এবং নিয়মমতো তারও কোনও নাম নেই, শুধু একটা প্রবেশক। ধরা যাক সেখান থেকেই শুরু হলো ঘুম নামের পাহাড়-এর দ্বিতীয় পর্ব। দুটি সিরিজ কবিতা –ডোভার লেন আর মরবিড। মরবিড সিরিজের ভিড় কবিতাটা। যে উপদ্রবহীন ক্রাইসিসের কথা বলা হচ্ছে, তার হয়তো সরলতম উদাহরণ। “অনেক দিন ধরেই আমি একটা ভিড় খুঁজছি.../ এমন একটা ভিড় – যেখানে কেউ কাউকে/ অতিক্রম করে না –/ লুডোর ছকের মতো হলে দুজন,/ দাবার ছকের মতো হলে আটজন,/ আমায় না চিনলেই/ অদৃশ্য হওয়া সম্ভব।/ অনেকদিন ধরেই আমি একটা ভিড় খুঁজছি...” ‘হারিয়ে যাওয়ার মতো বড়’ এক্সপ্রেশনে অপচয়জনিত বিষাদ উঁকি মারছিল। আর এখানে বিপন্নতা কবির কাছে হারিয়ে যাওয়াকেই আশ্রয় করে তুলছে। “মরবিড কোনও শহরের নাম নয়। / অথচ, শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতে এ নামটাই প্রথম মনে আসে।/ ঝলমলে রোদ, রাস্তা পার হই –/ সে নাম আমার পিছু ছাড়ে না/ “কোথায় থাকেন?” হঠাৎ প্রশ্নে/ ভেবে উত্তর দিই...” (গোড়ার কথা, মরবিড) কোনও নির্দিষ্ট সুরে জোর করে কোনও কাব্যগ্রন্থকে বেঁধে ফেলা সমীচীন নয় বটে, তবে কোথাও না কোথাও একটা সূত্র তো থেকেই যায়। এত ক’টা কবিতার সহাবস্থানের কোনও একটা হেতু হিসেবে। সেই আয়নায় বাকি কবিতাগুলোকে কী কী ভাবে দেখা যায়, একটু দেখা যাক। “এখানে অটোর ঝাঁক/ প্রায়ই পায় সমুদ্র-সওয়ারী/ হাওয়ার মধ্যে শুধু/ ফিরে যাওয়া, ফিরে আসা লেখা/ যেটুকু চাকার দাগ বালি হয়ে থেকে গেল/ তাও যদি মুছে দিতে পারি/ তাহলে তোমাকে ভাবছি জানাব না আর/ কতটা সমুদ্র হল দেখা...” (পন্ডিচেরি)। এই ‘তুমি’-কে নিয়ে প্রশ্ন বরং থাক, বরং ভাবা যাক এই না-জানানোর সংকল্পটাকে নিয়ে। বিচ্ছিন্নতা। এবার আসুক সরল এক অভিমানের কথাও। অভিমান। “এখানে অনেক কথা চুপিসাড়ে ঘাসে নেমে আসে।/ তোমরা বৃষ্টি বলে ভুল কর/ এ কথা আমাকে/ বলেছে যে মেয়ে/ সে শুধু চেয়েছিল আমি যেন তাকে ভুল বুঝি...” (সন্ধ্যা-গান) অভিমান। “...শুধু আমি একা আর পৃথিবীর সব ছবি আশ্চর্য তফাতে/ আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কতটা আকাশ হয়ে উড়ি –/ আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে/ ভেসে থাকা কতটা জরুরি”। (লং উইকেন্ড)
শেষ পর্বের নাম- শেষের কথা। তলায় ছোট হরফে লেখা ‘মরবি-(জিজ্ঞাসা চিহ্নটা উলটো)’। এলোমেলো অনেক উদ্ধৃতিতে উঠে এসেছে ভেসে যাওয়ার দিন-এর প্রসঙ্গ। মরবিড থেকেই কিছু পঙক্তি তোলা যাক। “সেদিন, কাকে কী লিখতে গিয়ে খেয়াল হল/ হাতের লেখা খারাপ হয়ে গেছে।/ .../ কাগজ কলম নিয়ে বসি। প্রথমে লিখি নিজের নাম।/ তারপর পুরনো প্রেমিকাদের.../ যা কিছু লিখবার মতো ফুরিয়ে গেলে কাগজে ‘মরবিড’ লিখি।/ শিরশিরানি লাগে –/ ‘ড’-এর ওপর হাত চাপা দিয়ে ভাবতে থাকি/ কী বলছে এই শব্দ?” (হাতের লেখা)

আষিকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুম নামের পাহাড়’-এর বিভিন্ন কবিতা পঙক্তি তুলে ধরার পর আর কোনও চলিত ভাষার পুরানো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ার কথা নয় এই বোঝাতে যে এই গ্রন্থ আসলে কতটা! কিছুটা পাঠকের বিচারের জন্য ছাড়া থাকল, যারা কবিতায় ঢুকে অর্থ-উৎপাদন করে থাকেন। যে টুকরো-টাকরা বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা গেল তার সম্পূর্ণটাই যে নৈর্ব্যক্তিক, সে দাবী করা অমূলক। তবে পাঠকের উদ্দেশ্যে এটুকুই বলা যায়, ভেসে যাওয়ার দিন কবিতার প্রথম অংশ (যা ব্যাক কভারেও রয়েছে) থেকে নিয়ে যে “এই বই সমুদ্রঘুড়ি তোমাকে সঙ্গ দেয় প্লেনে/ যেখানে যাচ্ছ আজ সেখানে যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই আকাশ ছাড়া/ সময় পালটে যায়, তোমারও নিজস্ব কিছু/ ‘ভিনপাড়া’ নাম নিয়ে ফেলে/ তুমি তাকে চিনতে পারো না, বইটি তো চেনে...”

-----

বইটি এখান থেকে অর্ডার দেওয়া যাবে।

আপনার মতামত জানান