হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্প এবং তার চরিত্রেরা

অভীক দত্ত

 

হুমায়ূন আহমেদের সাথে প্রথম পরিচয় আমার শারদীয়া “দেশ” এর মাধ্যমে। ওনার “নীল মানুষ” উপন্যাসটি পড়ে বেশ চমকে গিয়েছিলাম। আসলে কখন যে শুরু করেছিলাম পড়তে আর কখন যে শেষ হয়ে গেছিল নিজেই বুঝতে পারি নি। হুমায়ূন আহমেদ পড়ার সময় এক অদ্ভুত আনন্দ পাই। তরতরিয়ে চলা নদীর মত ভাষা, সহজ সরল গদ্যে পাঠককে আকৃষ্ট করার এক অন্য রকম ক্ষমতা আছে ভদ্রলোকের। ঠিক যে গদ্যের ভাষা টেনে রেখেছে ওনার পাঠকদের। অকারণ হেঁয়ালি নেই, ন্যাকামি নেই, টানটান পাঠ অভিজ্ঞতা।
তারপর থেকে যেটা আমি করলাম সেটা হল পাগলের মত হুমায়ূন আহমেদ পড়া শুরু করলাম। বাড়িতে বেশ কিছু বই ছিল, সেগুলি গোগ্রাসে শেষ হল, তারপর কলকাতা বইমেলার জন্য শুরু হল টাকা জমানো। দুটো দুটো করে সমগ্র কেনা, তারপর একে একে যেখানে যা লিখে ফেলেছেন তা গোগ্রাসে গিলে ফেলা।
প্রচুর লেখার ফলে কখনও একই প্রসঙ্গ ওনার অজান্তেই তাঁর লেখায় ঘুরে ফিরে এসেছে, আশ্চর্যজনকভাবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলনও পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু তিনি এমনভাবে পাঠককে তাঁর লেখার সাথে জড়িয়ে নিতে জানতেন যে পাঠক কখনোই সেটাকে খুঁজে বেড়ায়নি। বরং চেয়েছে আরও বেশি করে তাঁর লেখা পড়তে। এই সৌভাগ্য সব লেখকের হয় না, এ এক বিরল গুণ।
হুমায়ূন আহমেদের লেখনী নিয়ে বিশেষ করে হিমু আর মিসির আলী নিয়ে লিখেছি এর আগে। আমার মনে হয় এবার ওনার ছোটগল্প নিয়ে লেখা দরকার। এমন নির্লিপ্ত ভাবে, নিজের মত পাঠকের উপর না চাপিয়ে, স্বল্প পরিসরে জাদু সৃষ্টি করা ছোটগল্পগুলি এক অদ্ভুত আমেজ এনে দেয়। গল্পগুলি পড়ার পরেও মনে অনেকক্ষণ রেশ থেকে যায়।
তাঁর ছোটগল্পগুলি তিনি শুরু করছেন সাদা ক্যানভাসে খুব অবহেলাভরে রঙ দিয়ে, যেন ইচ্ছা নেই, তারপর ধীরে ধীরে ছবিটা যত পরিষ্কার হচ্ছে, তত গল্পের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে পাঠক। গল্পের প্লটের বৈচিত্র্য অভাবনীয়। ছোট ছোট ব্যাপারগুলিকে নিয়ে যে এমন সব গল্প লেখা যায় না পড়লে কে জানত!
“খেলা”গল্পটিই যেমন, “খায়রেন্নুসা গার্লস হাই স্কুলের থার্ড স্যার, বাবু নলিনি রঞ্জন, একদিন দুপুরে দাবা খেলা শিখে ফেললেন। এই খেলাটি তিনি দু’চোখে দেখতে পারতেন না। দু’জন লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা বোর্ডের দিকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকবে – মানে হয় কোন? তবু তাঁকে খেলাটা শিখতে হল। জালাল সাহেব জিওগ্রাফী স্যার, তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু। জালাল সাহেবের কথা ফেলতে পারলেন না। টিফিন টাইমে তিনি শিখলেন বড়ে কিভাবে চলে, ঘোড়া কি করে আড়াই ঘরের লাফ দেয়, গজ শুঁড় উঁচু করে কোণাকুণি দাঁড়িয়ে থাকে। জালাল সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, ব্রেইনের খেলা বুঝলে পণ্ডিত? বুদ্ধির চর্চা হয়”।
গল্পটা শুরু হল এইভাবে। খুব সাদামাটা, নির্লিপ্তভাবে। এরপরে নলিনিবাবুকে নিয়ে গল্পটা যখন এগিয়ে চলল, তাঁর সম্মোহন শক্তি দিয়ে পাঠককে অনায়াসে আকৃষ্ট করে ফেললেন। এক সাদামাটা স্কুল শিক্ষক নলিনিবাবু যখন দাবা বোর্ডের সামনে বসতেন তখন বাঘে পরিণত হতেন, অথচ তিনি সেই গ্রামের চৌহদ্দি ছেড়ে কোথায় খেলতে যান না, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিখ্যাত দাবাড়ুরা, এমনকি এক বিদেশিও তাঁর কাছে দাবা খেলতে এসে পরাজিত হল। দাবা খেলে কিংবদন্তী পর্যায়ে যাওয়া এই স্কুল শিক্ষকের শেষ জীবনটা বড়ই কষ্টে। গল্পের শেষ মোচরটাও মোক্ষম। পনেরো হাজার টাকা পুরস্কার মূল্য ছিল যিনি নলিনিবাবুকে হারাবেন তাঁর জন্য। ঠিক হল, চিকিৎসার টাকা জোগাতে নলিনিবাবু খেলাটি হারবেন। কিন্তু বোর্ডের সামনে আসতে অন্য মূর্তি। বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও নলিনিবাবু শেষ পর্যন্ত অপরাজেয় থেকে গেলেন।
এই খুব সাধারন এক স্কুল শিক্ষক, কিংবা খুব সাধারন গৃহবধূ, বাড়ির কোন ছোট ঘটনাকে অসাধারনভাবে উপস্থাপিত করার অনন্য ক্ষমতা ছিল হুমায়ূন আহমেদের।
একই ভাবে গল্পের মধ্যে আধিভৌতিক এবং কল্পবিজ্ঞানের ব্যাপারস্যাপারও অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপিত করেছেন তিনি। “পিঁপড়া” গল্পটাই যেমন। ডাক্তার নূরুল আফসারের কাছে এক আজব রুগি আসে। সে নাকি যেখানেই যায় তাকে পিঁপড়া এসে ঘিরে ধরে। এই জ্বালায় সে কোথাও যেতে পারে না।বিভিন্ন পন্থাও সে আবিস্কার করেছে পিঁপড়ে আটকাবার কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নি। সারাশরীরে গুঁড় মেখে বসেও ছিল একবার। তাতে নাকি পাঁচদিন কোন পিঁপড়ে আসে নি। বিষে বিষক্ষয়। ছদিনের দিন থেকে আবার পিঁপড়ের জ্বালাতন শুরু হয়ে যায়। আরেকবার নদীর মাঝখানে নৌকা নিয়ে বসেছিল। তিনদিন গিয়ে চারদিনের দিন থেকে আবার নৌকাতেই পিঁপড়ে হানা দিল। আর এই গল্পের ভেতরে গল্প খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, রুগীর চরিত্রের কদর্যতম দিকের কথা। খুব হালকা ভাবে গল্পটা শুনিয়েছেন গল্পকার অথচ পড়ার সময়ে গা শিউরে উঠবেই পাঠকের।
একইভাবে, “অচিন বৃক্ষ”, “ওইজা বোর্ড”, “ভয়” , “জিন-কফিল”, “নিজাম সাহেবের ভূত”, “মৃত্যুগন্ধ”, “নিমধ্যমা”, “যন্ত্র” ইত্যাদি গল্পে খুঁজে পাওয়া যাবে এক অদ্ভুত প্লট, প্রথম জীবনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একা একা ঘুরে বেড়াতেন লেখক, এই গল্পগুলির কনসেপ্ট সম্ভবত সেই সময়েরই ফসল।
তাঁর বহু উপন্যাসে যেমন বাঙালি নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত জীবনের এক বিরাট অংশ উন্মোচিত হয়, ছোটগল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। ছোট ছোট দুঃখ সুখগুলি নিয়েই তাঁর গল্প। “জুয়া” গল্পটিতে এক স্কুল শিক্ষক প্রণববাবু লটারির প্রথম পুরস্কার জিতলেন। তিন মাস ধরে ঠিক ঠাক মাইনে না পাওয়া প্রনববাবুর স্কুলের সবাই তাকে অভিনন্দন জানালেও পুরস্কার জিতে কোনভাবেই উল্লসিত বা আনন্দিত হতে পারলেন না তিনি।দু লক্ষটাকা লটারি জিতেও বিষণ্ণ হয়ে থাকলেন। কেন? তা নিয়েই মন ছুঁয়ে যাওয়া এই গল্প।
“জীবন যাপন” গল্পে লেখক কথকের মুখ দিয়ে এক ‘খবিস’ দুলাভাইয়ের গল্প বলেন যার বয়স তার দিদির থেকে অনেক বেশি,প্রতি বৃহস্পতিবার স্নানের সময় মাথায় কলপ করেন এবং অসম্ভব কৃপণ। অনেকে সন্দেহ করেন তিনি তার প্রথম পক্ষকে মেরে দ্বিতীয় পক্ষকে ঘরে আনেন। এদিকে কথকের দিদি যদিও স্বামী ছাড়া কিছু বোঝে না। যেরকম স্বামী মুগ্ধ স্ত্রী স্বামীর হাজার লাথি ঝাঁটা খেয়েও হাসিমুখে স্বামীর সেবা করে যায়, মাঝে মাঝে স্বামীর হাতে দু চার ঘা খেয়েও রা কাড়ে না তেমন স্ত্রী। শালাকে নিজের কাছে এনে রাখার পিছনেও কারণ বোঝা যায়, ঘরের ফাইফরমাশ, বাজার ইত্যাদি করার জন্য তাকে এনে রাখা হয়। দুদিন পরে জানা যায় বাড়ির কাজের মেয়েটির সাথে দুলাভাইয়ের অন্যরকম সম্পর্ক ছিল। দুদিন পর তার আসল চেহারা বেরোয়। স্ত্রীকে মারেন আরও কতকিছু। মনখারাপ করা এই গল্প পড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না পাঠকের। বাঙালি সমাজের খুব কঠিন এক চিত্র চোখের সামনে তুলে ধরেছেন হুমায়ূন।
একটি অসাধারন ছোটগল্প “খাদক”। যেখানে মতি মিয়া এক বিখ্যাত খাইয়ে, সে গ্রামের গর্ব, যা দেওয়া হয় সে তাই খেয়ে নেয় এদিকে তার বাচ্চারা না খেয়ে থাকে। যে বৈপরীত্যের ছবি এঁকেছেন তাকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই।
“অংক শ্লোক” গল্পে অঙ্কের শিক্ষক জালালুদ্দিন ছাত্রদের শ্লোকের মাধ্যমে অঙ্ক শেখান। অঙ্কগুলিকে ছড়ায় পরিণত করে প্রশ্ন করেন, যেমন
“ চৌবাচ্চা ছিল এক প্রকান্ড বিশাল
দুই নলে পানি আসে সকাল, বিকাল।
এক নলে পূর্ণ হতে কুড়ি মিনিট লাগে
অন্য নলে পূর্ণ হয় না আধঘণ্টার আগে।।
চৌবাচ্চা পূর্ণের সময় করহ নির্ণন।
দুই নল খুলে দিলে লাগবে কতক্ষণ?”
তিনি তিন হাজার ছয়শো এগারোটা শ্লোক লিখেছেন এবং ইচ্ছা আছে দশহাজার এরকম শ্লোক লেখার। পরে জানা যায়, তার কন্যার অঙ্ক ভীতির ফলে মৃত্যু হয় যার জন্য তিনি পরবর্তীকালে এই ভাবে ছড়ার মাধ্যমে অঙ্ক শেখান যাতে ছোট ছেলে মেয়েদের বুঝতে কোন অসুবিধা না হয়।
রুপেশ্বর নিউ মডেল স্কুলের সায়েন্স টিচার অমর বাবুর আবার সমস্যা অন্য। তিনি সারাজীবন বিজ্ঞান মেনে এসে হঠাৎ একদিন দেখলেন তিনি মাটির থেকে শূন্যে ভেসে উঠেছেন। “নিউটনের ভুল সূত্র” নামে এই গল্পটি জাদু বাস্তবতার এক চমৎকার নিদর্শন। গল্পটি পড়ার পরেও তার রেশ থেকে যায় অনেকক্ষণ।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পে চমৎকার ভাবে সময়কে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। রাজনীতিবিদদের ব্যঙ্গ করে লেখা “মন্ত্রীর হেলিকপ্টার” এবং “ফজলুল করিম সাহেবের ত্রানকার্য গল্পদুটি দুই মন্ত্রী মশাইকে নিয়ে লেখা যারা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। মানবচরিত্র বিশ্লেষণ এবং চোখে আঙুল দিয়ে ভন্ড রাজনীতিকদের ভুয়ো কাজকর্ম দেখার জন্য এই ছোট্ট গল্পটিই অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে।
“নিশিকাব্য” হুমায়ূনের নিঃসন্দেহে সেরা গল্পগুলির মধ্যে পড়বে। দুটি গল্পই সাধারন মধ্যবিত্ত সুখ দুঃখের গল্প। “নিশিকাব্যে” বাড়ির ছেলে আনিস একরাতের জন্য বাড়ি ফিরেছে, তাকে ঘিরে বাড়ির হইচই, তার স্ত্রীর সাথে তার কথোপকথন গল্পে যেন ম্যাজিক সৃষ্টি করেছে। এক রাতের মধ্যেই বাড়ির ছেলের বাড়ি ফেরা কি কি ঘটাতে পারে তার এত চমৎকার বিশ্লেষণের টুপি খুলতেই হয়। শেষে যখন আনিস আবার ভোর হতেই কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায় তখন বাড়ির সবার সাথে পাঠকের চোখের কোণেও যেন জল চলে আসে।

হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলি ছোটগল্পের মধ্যে মাত্র এই ক’টি নিয়ে আলোচনা করলাম, সবগুলি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভবও ছিল না এই স্বল্প পরিসরে। তবে তাঁর ছোটগল্পে তিনি যেভাবে পাঠক হিসেবে ভাবিয়েছেন, পাঠকের মনে আবেগের সৃষ্টি করেছেন, গল্পের বিষয়ে বৈচিত্র দেখিয়েছেন তা বিস্ময়কর। একজন ছোটগল্পকার হিসেবে যে বুলস আই তিনি হিট করেছেন, সেটা আর কিছুই না, পাঠকের হৃদয়। বাংলা সাহিত্যের পাঠক হিসেবে তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব এই কারণে।

প্রকাশিত হয়েছে এই সাইটে http://www.banglamail24.com/news/2014/07/19/id/47289/

আপনার মতামত জানান