"প্রোফেসর শঙ্কুর শেষ ডায়রি"- একটি আলোচনা

অভীক দত্ত

 


“শঙ্কু জনপ্রিয়তা তোমার বন্ধু।জনপ্রিয়তাই তোমার শত্রু!”
এ লেখার শুরুতে এক বৃদ্ধ গুহামানব স্বপ্নে এই কথাটি বলছে প্রোফেসর ( লেখার শুরুতেই লেখক জানিয়েছেন সত্যজিৎ রায় প্রোফেসর বানান লিখতেন, তাই তিনি সেটাই রেখেছেন এই বইতে) শঙ্কুকে, যে কথাটি বারবার ভাবাচ্ছে তাকে। আদতে এই বাক্যটিই যেন প্রোফেসর শঙ্কুকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া বিভিন্ন বিতর্ককে ব্যাখ্যা করে। বইটির প্রথম পর্বে প্রোফেসর শঙ্কুকে সম্পূর্ণ নতুন ভাবে আবিস্কার করবেন পাঠক,যেটার ভয় থাকে বারবার সেই তুলনা আসবে না একবারও মূল গল্পগুলির সাথে বরং বইটি পড়ার সময় ছোটবেলায় বারবার পড়ে আসা শঙ্কু কাহিনীগুলি আবার পড়তে ইচ্ছে করবে।বইটির দ্বিতীয় পর্বে সিধু জ্যাঠা এবং শেষ পর্বে ফেলুদার সংযোজনের মাধ্যমে একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রোফেসর শঙ্কুকে জানতে পারবেন পাঠক।
“প্রোফেসর শঙ্কুর শেষ ডায়েরি” পাঠকের মনে তৈরি হওয়া বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে; সত্যজিৎ প্রথম প্রথম শঙ্কুকে বেশ রগচটা চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত করেছিলেন, দু জায়গায় দুরকম জন্মদিন দেখিয়েছিলেন (১৬ই জুন এবং ১৬ই অক্টোবর), কুসংস্কার প্রোমোট করেছেন, যেখানে বলেছিলেন শঙ্কুর অতি অল্প বয়সেই টাক পড়ে যায় সেখানে অন্য এক গল্পে শঙ্কুর প্রায় মাথা ভর্তি টাক দেখিয়েছেন,তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা মানে একজায়গায় জানা যাচ্ছে আসলে তিনি পদার্থবিদ কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানে সব শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ, এটা কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। শঙ্কুর প্রতি তৈরি হওয়া বিশ্বাসের ভিত যেখান যেখান দিয়ে আলগা বেশ খুঁতখুঁতে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখক এই প্রশ্নগুলি তুলে ধরেছেন।

এবং এই প্রশ্নগুলির উত্তরের সন্ধানে পাঠক খুঁজে পাবেন এক সোনার খনি, এ কথাটা নিঃসন্দেহ হয়ে বলা যায়। প্রোফেসর শঙ্কুর ডায়েরী একদিকে অনেক অজানা কথা জানাচ্ছে, অন্যদিকে বইয়ের পরের অংশেই যুক্ত হয়েছে সিধু জ্যাঠার টিপ্পনি, তোপসের জবানি।
বইটির ব্যাক কভারে কি লেখা আছে একবার পড়া যাক
“’জটিল যন্ত্র তৈরির ব্যাপারে এখনও প্রকৃতির ধারে কাছেও পৌঁছতে পারেনি মানুষ’।
‘মানুষের সব জেনে ফেলার লোভের একটা সীমা থাকা উচিত’।
সত্যজিতের শঙ্কুর এসব কথা কি আমরা মনে রাখি, নাকি মনে রাখতে চাই না!
বইতে তারই আলোচনা করেছেন সিধুজ্যাঠা আর ফেলুদা”।
এই বইতে উল্লেখ আছে সৌমেন পাল আর প্রসেনজিত দাশগুপ্তের “অন্য প্রমা”(২০১১) পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ “সাবধান প্রফেসর শঙ্কু”র কথা যেখানে প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনীতে বিভিন্ন ভুল এবং অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা আছে। শঙ্কুর শেষ ডায়েরীতে তাঁকে লক্ষ্য করে যে গোলাগুলি বর্ষিত হয়েছিল তার সব উত্তর দিয়ে যান নি শঙ্কু বরং বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে দেখা গেল তাঁর হয়ে ব্যাট ধরেছেন সিধু জ্যাঠা।সুকুমার সৃষ্ট চরিত্র নিধিরামের সাথে প্রচুর মিল পাওয়া শঙ্কুর কাজ কর্ম কতটা সিরিয়াসলি নেওয়া হবে আর কতটা নিতান্তই গল্পের খাতিরে, অবতারণা আছে সে প্রসঙ্গেরও। এক সম্পূর্ণ কাল্পনিক চরিত্রকে অসামান্য মুনশিয়ানার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
সিধুজ্যাঠার জবানিতে
“... সুকুমারের প্রসঙ্গ সত্যজিতের গল্পে বিস্তার পাচ্ছে। পিরামিড, ডুবোজাহাজ, পতঙ্গখেকো গাছ এসব নিয়ে সুকুমার প্রবন্ধ লিখেছেন, সত্যজিৎ গল্প। তবে সুকুমারের লেখার মধ্যে তথ্য পরিবেশনের নির্লিপ্ততা থাকে, এই নির্লিপ্ততা শঙ্কুর নেই। থাকার কথাও নয়- কারণ গল্প তো আর প্রবন্ধ নয়”।
সুকুমার এবং সত্যজিতের বিভিন্ন কাহিনীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ যেমন আছে, একইভাবে শঙ্কুকাহিনীর সমসাময়িক কল্পবিজ্ঞান কাহিনীগুলির সম্পর্কেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে এই গ্রন্থে, এবং সিধুজ্যাঠার জবানিতে আছে সেই অমোঘ উপসংহার
“তবে শেষে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দেওয়া দরকার। বাঙালিরা তো জাত অলস, বাক্যবাগীশ। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা শুনলেই পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকতে পারে। অপবিজ্ঞান, কুসংস্কার এসবের বিরুদ্ধে গণবিজ্ঞান মঞ্চ বা অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলি যে প্রচারকার্য চালান সেগুলি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানেরও যখন সীমাবদ্ধতা আছে তখন আর বিজ্ঞানের কথা ভেবে কী হবে! একথা যারা বলবেন তাঁরা কিন্তু সত্যি সত্যি গণশত্রু। শঙ্কু আর যাই হোক অলস নন, গণশত্রুও নন। বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের ঘর থেকে বাইরে আনতে, রুদ্ধশ্বাস অ্যাডভেঞ্চারে যোগ দিতে, সদা-কৌতূহলী মন জাগিয়ে রাখতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন এই মানুষটি। শঙ্কুর কাহিনি চোখ গোল-গোল করে পড়ে বাঙালি পাঠক। “গরুর গাড়ি ও উপগ্রহ”, “আমাদের এই পৃথিবী”, “মহাবিশ্বে ভ্রমণ” জাতীয় রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সংস্থা থেকে ছাপা সহজে বিজ্ঞানচর্চার বই লেখা কিন্তু শঙ্কু আর সত্যজিতের উদ্দেশ্য ছিল না”।

এবং বইয়ের শেষটায় মাষ্টারস্ট্রোক হিসেবে এসেছে ফেলুমিত্তিরের সংযোজন।যার মাধ্যমে বিজ্ঞানের সবজান্তাপনা বা scientism কে অত্যন্ত সরলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।
শেষে বলা যায় এ বই কোন নতুন গল্প বলে নি আবার বলেছেও। পাঠকের মনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর যেমন পাওয়া যাবে,তার থেকে অনেক বেশি পাওয়া যাবে বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সুকুমার এবং সত্যজিতের বিজ্ঞানচর্চা এবং ভাবনা সম্পর্কিত একটা তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি এই বইয়ের আরেক প্রাপ্তি পাতায় পাতায় সত্যজিতের বিভিন্ন সময়ে করা নানা রকম ইলাস্ট্রেশন।প্রোফেসর শঙ্কুপ্রিয় এবং সত্যজিৎপ্রেমী/ বিদ্বেষী পাঠকের এ বই অবশ্যপাঠ্য এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
----------------------------------------------------
বই "প্রোফেসর শঙ্কুর শেষ ডায়রি", লেখক- বিশ্বজিৎ রায়, প্রকাশক- লালমাটি

অনলাইন ঠিকানাঃ বইটি কিনুন এখান থেকে

আপনার মতামত জানান