অতল মনের ঘাতক

অভীক দত্ত

 

মন এমন একটা বস্তু যেটার তল পাওয়া ভার। জীব-বিজ্ঞানী থেকে মনোবিজ্ঞানী কেউই পারেন নি এর জটিল অভিসন্ধির ফাঁক ফোঁকর গুলি খুঁজে বার করতে। “মায়াকাঁচ” এ তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় মনোবিশ্লেষণ করার ব্যাপারে তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। “ঘাতক” তাঁকে যে এ ব্যাপারে আরও প্রতিষ্ঠা দিল সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়।
বইয়ের ব্যাক কভারে একটা ব্রিফিং দেওয়া আছে বইটি সম্পর্কে সেটা হুবহু তুলে দিলাম
“অরুণাভর অকালমৃত্যুতে বৈধব্য পাওয়া অহনার শোকস্তব্ধ জীবনে দীপ্তেশ নিয়ে আসে কথক। কিন্তু দীপ্তেশ আসার পরেই তার সঙ্গে এক আশ্চর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়ে সে। এ কি অধিকারবোধ? না গোপন প্রেমের সুতীব্র পাপবোধ? দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বে জন্ম নেয় এক আত্মনাশী ঘাতক”।
কি বলব এই প্লটটি সম্পর্কে? এ এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর প্লট। নিজের ভ্রাতুস্পুত্রের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রীর বিয়ের জন্য একদিকে যেমন অভিভাবক হিসেবে চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রবীণ ভদ্রলোক, অন্যদিকে তার মনের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে এক পাপ, অশক্ত শরীরে জন্ম নিচ্ছে কাম, যৌবনের জন্য হাহাকার। এ কি আমাদেরই বার্ধক্যের না বলা কাহিনী নয়? এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেছেন ঔপন্যাসিক এখানে। উত্তমপুরুষে লেখা উপন্যাসে কোথাও মূল চরিত্রের নাম পাওয়া যাবে না, যেন গোপন কোন জবানবন্দিতে বলা হয়ে গেল এক গা শিরশিরে আখ্যান।
উপন্যাসটা পড়া যায় না একবারে, একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করে মনের ভেতরে,খুব গভীর ভাবে মানব চরিত্র বিশ্লেষণ না করলে এভাবে লেখা যায় না, অনুজ লেখক হিসেবে অনেক কিছু শেখার আছে তমালবাবুর কাছে।
ঔপন্যাসিক যখন এই খাদটা তৈরী করেন পাঠকের জন্য তখন সেখানে পা দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না, আপনি ধীরে ধীরে চরিত্রগুলির মধ্যে প্রবেশ করবেন, একটা সময় চরিত্রটা যখন আপনার প্রিয় হয়ে উঠবে তখন তার অপরাধটাকেও দেখবেন কি আশ্চর্যভাবে ক্ষমা করে দিতে শুরু করেছেন...এইধরনের লেখা নেশার মত, আমি বেশ কয়েকবার পড়া বন্ধ করে অন্য কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মনঃসংযোগ করতে পারছি না, পড়ে ওঠার পর সেই রেশ যে এখনো থেকে গেছে তা বলাই বাহুল্য.
তমাল বন্দোপাধ্যায় অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক, "মায়াকাচ" চমকে দিয়েছিল, "ঘাতক" লেখককে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল... বাংলা সাহিত্য শেষ হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি না বলে যারা জল খান না তারা "ঘাতক" পড়ে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

.................

ঘাতক
আনন্দ পাবলিশার্স
দাম ১৫০ টাকা

আপনার মতামত জানান