প্রসঙ্গ : বাঙালি নারীর কবিতা-সংগ্রহ

ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়

 

বিগত ছ’শো বছরের দুশো সত্তর জন কবির কবিতা সংকলনের নাম ‘দামিনী’। পৃষ্ঠাসংখ্যা সাড়ে পাঁচশোর কিছু বেশি। মনে হতেই পারে আবার একটা কবিতা-সংকলন কেন? এ-জাতীয় অভিধানপ্রতিম কবিতা-সংকলন প্রকাশ এবং কবিদের অর্থেই তার মুদ্রণ খরচ সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা একালে প্রায়শই দেখা যাচ্ছে। তাতে কিছু ভালো কবিতার পাশাপাশি অর্থমূল্যে মুখচেনাদের কবিতাকে প্রতিনিধিস্থানীয় বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রয়াস ঘটে থাকে। সেদিক থেকে বিচার করতে গেলে ‘দামিনী’ সু-সম্পাদিত সংকলন। তবে এর কবিরা লিঙ্গগত ভাবে মহিলা শ্রেণিভুক্ত। যদিও এই ‘মহিলা-কবি/সাহিত্যিক’ অভিধা মেয়েদের কাছে বিশেষ অসম্মানবাচক বলে ইদানীং মনে হচ্ছে, কারণ পুরুষ-কবি/সাহিত্যিক আমরা বলি না। এই পৃথকীকরণ তাঁদের কাছে সংকীর্ণ গোষ্ঠীবদ্ধ করে দেওয়ার প্রয়াস, হয়তো বা মেয়ে বলে দেগে দিয়ে সহানুভূতি দেখানোর প্রয়াস বলে মনে হচ্ছে। তবু নান্দীমুখ সংসদের আয়োজনে শ্রীমতী নমিতা চৌধুরী এবং অনিন্দিতা বসু সান্যাল সংকলনটিকে ‘মহিলা কবিদের বাংলা কবিতা সংকলন ১৪০০-২০০০’ বলতে দ্বিধান্বিত হননি। কারণ তাঁরা অনুভব করেছেন, এতে লিঙ্গ-রাজনীতি নেই বরং রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য থেকে মেয়েদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সংগ্রামকে সম্মানিত করার প্রচেষ্টা।

চতুর্দশ শতকের রামী রজকিনী থেকে একালের নব্বইয়ের কবি তানিয়া চক্রবর্তীর কবিতা এই সংকলনে স্থান পেয়েছে। প্রবেশক হিসেবে ড. সুমিতা চক্রবর্তীর অতীব তথ্যনিষ্ঠ পনেরো পাতার ভূমিকা সংযোজিত হয়েছে, ভূমিকার পৃথক শিরোনামও দেওয়া আছে : ‘বাংলার মেয়েদের কবিতা’। অধ্যাপিকা চক্রবর্তী এই সংকলনের প্রাসঙ্গিকতা বোঝাতে গিয়ে মেয়েদের কবিতা লেখার প্রয়াসের পরিচয় দিয়েছেন, কিছু উদ্ধৃতি সহযোগে উদাহরণ টেনেছেন। তবে চর্যাপদে মহিলা-কবি ছিল না এই অভিমত বিতর্কিত, কুক্কুরীপাদ-কে কোনো কোনো কবিতা-বিশেষজ্ঞ মহিলা কবি বলে থাকেন। একটি মহিলা কবিদের কবিতা সংকলনের সূচনা দেখেছি ঐ চর্যাকারকে দিয়েই। সেকাল থেকে একালে রক্ষণশীল পরিবার, মন্দির, নাটমঞ্চ, সঙ্গীতজগৎ নানা ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা মহিলা কবিদের কথাও তিনি আন্তরিকভাবে বলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয় কবিতা লেখান ব্যক্তিগত অনুভূতির ব্যাপার, সেকালের কবিরা যা বারে বারে প্রমাণ করেছেন। এই জাতীয় সংকলনের একটা সামগ্রিক পরিচায়িকা হিসেবে ভূমিকাটি উপযুক্ত, নানা তথ্যে সমৃদ্ধ। তবে রসগ্রাহী বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা থাকলে তা আরো সম্পূর্ণতা পেত।

রবীন্দ্রনাথের সাহসিনী নায়িকা ‘দামিনী’ এবং একালের অত্যাচারিতা ‘দামিনী’ – এই দুই-কে স্মরণে রেখে সংকলনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন গন্ধ ছেড়ে কিভাবে বাংলা কবিতার ভাষা যুগোপযোগী স্মার্ট হয়ে উঠেছে এই সংকলনটি মন দিয়ে পড়লে তা সহজেই বোঝা যায়। আমরা কয়েকটি উদাহরণ চয়ন করতে চাই :

১) কি কহিব বঁধু হে বলিতে না ফুরায়
কাঁদিয়া কহিতে পোড়া মুখে হাসি পায়।
অনামুখু মিন্‌সেগুলোর কিবা বুকের পাটা।
দেবীপূজা বন্ধ করে কুলে দেয় কাঁটা।। (রামী রজকিনী)
২) সুখের পরশে শুধু
শুকাইবে দলগুলি,
সমীর ফিরিয়া যা রে
মরণ-সোহাগ ভুলি! (স্বর্ণকুমারী দেবী)
৩) নাম ধরে ডেকেছিলে
বসন্ত প্রভাতে ফুলের মালঞ্চতলে কবে অকস্মাৎ
নাম ধ’রে ডেকেছিলে আমারে তুমিও। (বাণী রায়)
৪) ভাঙা আয়না, কুচ্ছিৎ মুখ টুকরো টুকরো
নিরপরাধ আমার মুখ কৈশোরের
স্বর্গছবি, গুপ্তবিষ, গুপ্তবিষ
একশৃঙ্গ পুরুষ তোমার মৃত্যু হোক। (অর্চনা আচার্যচৌধুরী)
৫) জিন্‌স্‌ পরা ছেড়ে দেওয়া যায়
সহজেই; নদী হতে পেলে ...
সাঁতার জানো তো তুমি, ছেলে? (মন্দাক্রান্তা সেন)
৬) আমি শ্যাম রাখি না শ্যাম্পু রাখি, কুল রাখি না দুল
আমি ঠোঁটের রেখা আঁকতে গিয়ে ডুবিয়েছি বিলকুল (পৌলোমী সেনগুপ্ত)

ভাষার বাঁকবদলের পাশাপাশি মেয়েলি স্বর বিভিন্ন উপমা, চিত্রকল্প আর অনুভবের দ্যোতনায় নিজস্বতা পায়। নারীর কামাতুর মন, স্বামী-সংসার-সন্তান নিয়ে সুখী গৃহকোণ কিংবা চিরন্তন বিরহবেদনা নানা রঙে নারীর কলমে চিত্রিত হয় যায়। উনিশ শতকে অন্নদাসুন্দরী ঘোষ যেখানে পিতা-মাতা-পরিজন পরিত্যক্ত জীবনে হাহাকার করে অশ্রুকাতর কবিতা লেখেন সেখানে বিশের কবি রঞ্জনা মিত্রকে লিখতে দেখি রঙচটা তোরঙ্গ আর বেনারসীর ভাঁজের মতো ফেঁসে যাওয়া জীবনের নিঃসঙ্গতার গল্প। অশ্রুকাতর আবেগ একালে সংহত আর রূপকায়িত। সেবন্তী ঘোষের ‘বিবাহিত মেয়েদের সমস্যা’ যেন চমৎকার ঠাট্টা। চেনা অচেনা বহু নতুন পুরাতন কবির একাধিক ভালো কবিতার সংকলন এই বই। কবিতা সিংহ, কৃষ্ণা বসু, মল্লিকা সেনগুপ্ত, যশোধরা, পৌলোমী, মন্দাক্রান্তারাও যেমন রয়েছেন তেমনি কবি হিসেবে স্বল্পখ্যাত অথচ প্রতিভাময়ীদের সুযোগ করে দিয়ে সম্পাদকেরা কবিতা পাঠকদের ধন্যবাদের পাত্র। বইয়ের শেষে সেকালের কবিদের শাদাকালো ছবির অ্যালবাম, সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি এবং শোভন প্রচ্ছদে সুপ্রস্তুত ‘দামিনী’-কে সংগ্রহযোগ্য সংকলন করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মহিলা কবিদের বাংলা কবিতার এই সংকলনের পরিপূরক বাংলাদেশের এ-জাতীয় কবিতা সংকলন (যদিও তসলিমার কবিতা সংকলিত হয়েছে) প্রকাশের যে-প্রতিশ্রুতি সম্পাদকদ্বয় এখানে দিয়েছেন, তার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষাতুর থাকলাম।।


 দামিনী (মহিলা কবিদের বাংলা কবিতা সংকলন : ১৪০০-২০০০) । সম্পাদনা : নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতা বসু সান্যাল। নান্দীমুখ সংসদ। কলকাতা। বইমেলা ২০১৩। ৪০০ টাকা।

আপনার মতামত জানান