মতি নন্দীর বিজলীবালার মুক্তি

সৌমি চৌধুরী

 

-কি বই?
-বিজলীবালার মুক্তি।
-দেখি দেখি... ও মতি নন্দী... স্টপার লিখেছে না?
আর কেউ- কোনি ও লিখেছেন।
-এটাও কি খেলা নিয়ে না কি?
-না বোধ হয়... মলাট দেখে তো সেরকমটা মনে হল না।
-মলাটটা গনেশ পাইন চিত্রিত!
-বইটা কেনার ওটাও একটা কারণ...
-ভেতরে দেখছি ২টো গল্প!
-তাই নাকি! আকার দেখে আমি তো ভাবলাম একটাই উপন্যাস...ও তার মানে ২টো বড়গল্প...
ওপাশ থেকে-পড়েছেন নাকি? কেমন?
অন্য ক্রেতা-২টোই ভাল...তবে কেন যে বইটার নাম শুধু ১ম গল্পটার নামে...এই প্রথম খেলা ছাড়া একদম অন্যরকম সাংসারিক গল্প পড়লাম...বিজলীবালার মুক্তি আর বুড়ো লোকটি...
২টোই ২বয়স্ক মানুষের জীবন...একদিকে বিজলীবালানিঃসন্তান, অন্যদিকে কাশীনাথ নাতির ঘরে পুতির মুখ দেখেছেন...বিজলীবালার ঘরে টিভি নেই, খবরের কাগজ আসে না, ফোন নেই...সংসার চলে বাড়ি ভাড়া আর পৈতৃক জমির ফসলের আয়ের ভাগে...দাদা আছেন একমাত্র আত্মীয়...কিন্তু আপনার লোক বলতে পাড়ার সবাই আর ভাড়াটে...বিজলীবালা নিজেই এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে জনসংযোগ করেন...
-আর কাশীনাথ?
-কাশীনাথের কোনও জনসংযোগ নেই...এক সাদা কালো টিভি ছাড়া...মিতব্যয়ী রেলের গার্ড কাশীনাথ সারা জীবন নিজের সংসারেই থেকেছেন। ২কামরার ভাড়ার ফ্ল্যাট।নিজেই ভাড়া গোনেন।বাইরে বেড়োনো বলতে বাজার-দোকান...তাও একবার রাস্তায় পড়ে গিয়ে সেটাও বন্ধ...শুধু ছেলের সংসারে টাকা জোগানো নিজের পেনশনের টাকায়...
-২টো অন্যরকম চরিত্র!
-তাই তো...বিজলীবালা ঠাকুর বিশ্বাসী...হিন্দু ঘরের নিয়ম মানেন...কিন্তু মানবিকতার দাসী...ঘরের ভাড়াটে বউ মারা গেলে ঘুঁটের আগুন খোঁজেন... আর সেই বউয়ের ২বছরের ছেলের গলায় চাবি ঝোলাতে দেন না কারণ বাচ্চামানুষচুষতে গিয়ে চাবি খেয়ে ফেললে কি হবে ভেবে...ছায়াসঙ্গী কাজের মেয়েকে দিয়ে ঠাকুরের আসন ছোঁয়ান না নীচু জাত বলে... আর যে দিন জানতে পারেন যাকে বিশ্বাস করে বামুন ভেবে বেস্পতিবারের পাঁচালী পড়িয়েছিলেন সে আসলে মুসলমানের বেটি...মরার পড়ে গয়ায় পিণ্ড দানে যার মুক্তি সেই বিজলীবালাখুজতে থাকে মুক্তির অন্যমানে।
-ওদিকে কাশীনাথ? তার মুক্তি?
-সে আর মুক্তি চাইলোকই?সে তো নাতির সংসারেও টাকা দিয়ে আধিপত্য রাখতে চেয়েছিল...তার এই টাকার জোরেই গলার জোর...কথার জোর। না রোজগেরে বরকে আগলে রেখে কাশীনাথের বুদ্ধিমতীবউমা সংসার পাতল, সংসার করলো, ছেলে মানুষ করলো, শাশুড়ী হল, ঠাকুমাহল– সব শ্বশুরকে সামনে রেখেই। কাশীনাথ কিন্তু পুতি হবার আনন্দে মিষ্টিমুখ করেন নি শুধুমাত্র বংশের নিয়ম মেনে প্রথম সন্তান নাতবৌয়ের বাড়ি থেকে হয় নি বলে। কাশীনাথ শুধু জানেন টাকা তার, তাই শেষ কথাও তার। কাশীনাথের মৃত্যুর পর তার সৎকারও উদ্ধার হয় তারই জমানো টাকায়। বুড়ো লোকটা যে অহঙ্কারে বাঁচত তাই ই ধরে রাখলো তার মৃত্যুর পরেও।
-এই যে শুরু করলে ২জন বুড়োমানুষের গল্প দিয়ে এতো দেখি একদম এ আলাদা... কোনো মিল নেই...
-আছে...আবার নেই ও...
বিজলীবালার মুক্তি হল সেদিন যেদিন সে অবোধ শিশুর ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে মৃত ভাড়াটে বউএর মুসলমান বাপকে ঘরে আসতে জানাল...আর সেদিনই হিন্দু বামুনের ছেলে হয়েও নাদান শিশুটিঠাকুরের আসন করলোওলটপালট...নিতান্ত বালখিল্যতাই..
বিজলীবালার নিঃসঙ্গ জীবনের কিছু বিশ্বাস চটে গেলো মানবিকতার দায়ে...কেমন যেন নিজেকে ছড়িয়ে ফেলে মুক্তি পেল সে...
ওদিকে ”কোথাও মানবিকতার লেশ নেই” কাশীনাথ শেষ পর্যন্ত মানবিক হয়ে ওঠে তার মরণোত্তর ভাগ বাটোয়ারায়।নিঃসঙ্গ কাশীনাথের ছড়িয়ে যাওয়া সংসারী জীবনের যবনিকা-ই বাকী চরিত্রগুলির সাথে তাকে জুড়ে দেয়...
-পড়তে হচ্ছে বইটা...
-নিশ্চয়ই...তবে একটা কথা মনে রাখার..। বইটার ১ম সংস্করন ২০০২...পটভূমি তার আগেরই...তাই ৯০এর দশক যারা কাটিয়েছে তারা বেশ সহজেই রিলেট করতে পারবে। ঘরে ঘরে টিভি নেই... থাকলেও সাদা-কালো। নতুন টেলিফোনের নম্বর পাবার আনন্দ...নতুন কেবল লাইন...পাড়া কালচার...সব এ ধরা পড়েছে।
গল্পের বই এর পোকারা সংগ্রহে রাখতেও পারে।

আপনার মতামত জানান