কয়েকটি উত্তরাধিকার ও অভীকের গল্পেরা

আবেশ কুমার দাস

 


বাংলায় আর সেভাবে হাসির গল্প লেখা হচ্ছে না বলে যাঁরা হাহুতাশ করেন তাঁদের সঙ্গে অনেকাংশে একমত হয়েও একটি কথা বলতেই হয়। ভাষার কারিকুরিতে অনায়াস হাস্যরস উদ্রেকের যে মৌলিক শৈলীটি একদা গড়ে তুলেছিলেন শিবরাম তার দিন ফুরিয়েছে। সাহিত্যের অন্যান্য ধারার মতোই রসসাহিত্যও কোনও উৎকেন্দ্রিক বায়ুভূত পদার্থ নয়। জাতীয় জীবনের বাস্তবতা থেকেই হাসির অনুষঙ্গ উঠে আসে সেই জাতির সৃষ্ট সাহিত্যের পাতায়। শিবরাম চক্রবর্তী আর বিমল করের রসসাহিত্যের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যে ফারাক দুস্তর। কালের অনুষঙ্গ থেকেই এসেছিল এই প্রভেদ। নরনারীর প্রেম সম্পর্কের রসময়তা বিমল করের হাসির গল্পে এসেছে প্রায়শই। আজকের বাঙালির জাতীয় জীবনে যে এই রসময়তার ঘাটতি ঘটছে তা বলা যাবে না কোনও অর্থেই। তাহলে সাম্প্রতিকের কোনও বাঙালি কথা সাহিত্যিককে এই বিষয়টুকুকে উপজীব্য করে হাস্যরস সৃজনে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না কেন ? সুখের কথা, তরুণ গল্পকার অভীক দত্তর ‘কেউ কোথাও যাবে না’ গল্পগ্রন্থটির একাধিক গল্পে সেই প্রয়াসটুকু অন্তত চোখে পড়ে।
‘একটি টেডি বিয়ার আর একটি মেয়ের গল্প’, ‘একজন ব্যর্থ হিমু আর একটি অসমাপ্ত জার্নি’, ‘তারপর?’ বা ‘একটি সন্দেহের গল্প’-র মতো গল্পগুলিকে হয়ত বিশুদ্ধ রসসাহিত্যের গোত্রে ফেলা যায় না। দমফাটা হাসির হুল্লোড়ও বয়ে যায়নি কখনওই। কিন্তু আমাদের চেনা জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অগণ্য হাসি, কৌতুক আর মজার অনুষঙ্গ অবশ্যই আছে গল্পগুলিতে। অনেকটা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ঘরানার ছায়া যেন পরিস্ফুট হয়ে ওঠে অভীকের এই গল্পগুলিতে।
আর অভীকের গদ্যভাষা (যার নির্মেদ সপাট রীতি কখনও কখনও মনে পড়ায় বনফুলকে) তথা কাহিনি কথনের রীতিটিও এমনই অদ্ভুত সাবলীল আর ছিমছাম যাতে স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদের মতো বেদনাবিধুর অন্তরঙ্গটিও অবলীলায় হাস্যতরল হয়ে যায়। সাহানার গৃহত্যাগের অব্যবহিত পরেই অতীনের বাড়িতে আগমন ঘটে সাহানারই মাসতুতো বোন অন্তরার (শুধু যাওয়া আসা)। ইম্পোটেন্সির মতো একটি আপাদমস্তক গুরু গম্ভীর বিষয়কে নিয়েও রঙ্গ রসিকতায় ভরা হালকা চালের গল্প লিখতে পারার ক্ষমতাই বা ক’জন গল্পকারের করায়ত্ত (শেষের শুরু)! মেঠো ভাষায় যাকে ‘খোরাক’ বলে অবৈধ প্রণয় সম্পর্ককে প্রায় সেই স্তরে নামিয়ে এনে হাস্যরস সৃজনেও অভীকের পারদর্শিতা অনস্বীকার্য (কে কাহার)।
"যে সময়টা প্রেম কী বোঝার বয়স, সেই সময়েই পরকীয়া বুঝে গেলাম। মাঠের পাশের পুকুরের ধারে বসে দারিয়াবান্দা খেলা দেখতাম চার বন্ধুতে মিলে। আর কানে আসা কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে করতে কার্বাইড-পাকা হতাম।"
আসলে সহজ বিষয়কেও জটিল করে তোলার যে বদভ্যাস বাঙালি সাহিত্যিকদের প্রায় জন্মগত, অভীকের অবস্থান সেই বৈশিষ্ট্যের ঠিক একশো আশি ডিগ্রি বিপ্রতীপে।
এই একটি কারণেই তার কল্পবিজ্ঞান (অতঃপর অসমাপ্ত), দার্শনিক বোধ (বিমলবাবুর একদিন) বা জীবনের রূঢ়তায় (শুভর গল্প) ভরা একেবারে অন্য স্বাদের গল্পগুলিও অবিকল একই ভাষায় লেখা হয়েও মনকে ছুঁয়ে যায় অনায়াসে। নিজের স্মৃতি পরিবর্তন করা বা একেবারে মুছে ফেলার প্রযুক্তিও ২০৫৫ সালের মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। তবুও কি স্ত্রীর প্রাক্তন স্বামীর পাতের পাশে খানিকটা মিষ্টি দইয়ের উপস্থিতি আনমনা করে তুলবে না তাকে! অথবা লাল সাইকেলের পরিণতি যেখানে ভাঙা লোহালক্কড় বা পূর্বতন প্রিয়তমার অন্তিম পরিণতিও যেখানে স্রেফ একখানা কঙ্কালের বেশি কিছু নয় সেখানে যতকাল আছি জীবনটাকে উপভোগ করে যাওয়াই যে ভাল এই বোধও অভীকের গল্পে আসে অত্যন্ত সহজাত প্রতিবর্তের মতো। জটিল উপলব্ধিকে সহজে বলতে পারার এই পারঙ্গমতার মধ্যেই নিহিত থাকে গল্পকার অভীকের উত্তরণ।
হুমায়ূন আহমেদ যে অভীকের প্রিয় কথাকার তার পরিচয় এই সংকলনের একাধিক গল্পে পাওয়া গেছে। তবে জানি না, ভাস্কর চক্রবর্তী অভীকের পছন্দের কবি কিনা। কেবল ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ নামে একটি গল্প লিখেই ক্ষান্ত হয়নি অভীক। ‘শেষের শুরু’ গল্পের নায়কের স্ত্রীর নামও সুপর্ণা। কোনও একটি বিশেষ নামের প্রতি লেখক বা কবির মোহের নজির বাংলা সাহিত্যে এই সেদিন অবধিও বিদ্যমান ছিল। বনফুলের সপাট গদ্যভাষা বা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ঘরানার উত্তরাধিকার যে গল্পকারের গদ্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য—জানি না ‘সুপর্ণা’-র মাধ্যমে সেই সাবেক ট্রেণ্ডটুকুকেও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অভীকের অভিপ্রায় কিনা।
শেষ বিচারে অভীকের এই গল্পগুলিকে তুলনা করা যায় শাম্মি কাপুরের সেই নৃত্যগীতবহুল জনপ্রিয় ছবিগুলির সঙ্গে। বহুমাত্রিক বৌদ্ধিক জটিলতা নয় একমাত্রিক নির্মল বিনোদনেই যার সার্থকতা। এই জটিল সময়ে মনকে মাঝে মাঝে উধাও হাওয়ায় কোন সুদূরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে অভীকের এই গল্পগুলির জুড়ি নেই। বইটির নামটিও তাই একেবারে যথাযথ অর্থে নির্বাচিত। একবার এই বইটি হাতে নিলে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে কারও কোথাও যাওয়া সত্যিই মুশকিল। সৃষ্টিসুখকে ধন্যবাদ তরুণ গল্পকারের তেরোটি গল্প নিয়ে এই সংকলনটি প্রকাশে সাহস দেখানোয়। রোহণ কুদ্দুসের প্রচ্ছদটিও বেশ নজরকাড়া।

কেউ কোথাও যাবে না/ অভীক দত্ত/ সৃষ্টিসুখ/ খেসারতঃ ৭৯ টাকা

বইটি কিনুন এখান থেকে

আপনার মতামত জানান