অধিবাস্তবের ইলিউশনঃ বাস্তবতার মৃগয়ায়

আবেশ কুমার দাস

 


“এই গোলাপি দেওয়ালটা আসলে একটা বিছানা—শুভ ভাবতে আরম্ভ করল—আর আমার পা যেখানে আটকে আছে সেটা মাটি নয়, হাওয়া... টলতে টলতে শুভ সোফাটাইয় এসে বসল। আহ! এটা ইলিউশান নয়। এটা জীবন। এই সমকৌণিক সোফাটাই আসলে জীবন।”

বাংলা কথাসাহিত্যে স্বপ্নদৃশ্য বিনির্মাণের ঐতিহ্য সেই ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র আমল থেকেই। কিন্তু জ্যামিতিক বোধের সম্পৃক্তিতে তাকে এমন সুতীব্র পরাবাস্তবিক উচ্চতায় কৃষ্ণেন্দু দত্তর আগে নিয়ে যেতে পেরেছেন খুব অল্প গল্পকারই। ফ্রয়েডের স্বপ্নতাত্ত্বিক গ্রন্থের নামে গল্পের নাম রাখতে পারার মতো বুকের পাটাও এই পেটরোগা জাতির ক’জন গল্পকারের আছে বলা মুশকিল। আর শুধু তো বাস্তব ও অধিবাস্তবের মুহূর্মুহূ স্থানাঙ্ক বদলই নয়—বাউল সাধনার লব্জ ‘আরশিনগর’ থেকে আবেগহীন প্রযুক্তির পরিভাষা ‘অ্যালগরিদম’—আপাত অন্তরঙ্গতাহীন এমন শব্দেরা বিনি সুতোর মালার এক একটি ফুলের মতো পরস্পরের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠতে পারে কৃষ্ণেন্দুর কলমেই। তার ‘ইন্টারপ্রিটেশান অফ আ ড্রিম’ গল্পটি শুরু হয় এইভাবে,
স্যুররিয়ালিজম যখন জীবনের অনেকাংশকে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছিল, টুঁটি পাকড়ে ঘোষণা করেছিল প্রতিদিনের আবহমানতার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, ঠিক তখনই, ঘড়ির দু’টো নির্ণায়ক কাঁটা পরস্পরে মিলে যাওয়ার ক্লিকের মতোই প্রশ্বাস-নিঃশ্বাসকে নতুন করে চিনে নিয়েছিল শুভময়।
অ্যাবস্ট্রাকশনের নামে বাংলা ছোটগল্পে যে চাতুরি, যে ক্যামোফ্লেজ বা যে গিমিকের রমরমা চলছে অনেকদিন থেকেই তাকে কান পাকড়ে বিমূর্তির গঠন কাঠামোর পাঠ শেখাতে হলে কৃষ্ণেন্দুর ‘ইলিউশন ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য।
‘ইলিউশন’ গল্পেই যেমন বিমূর্ততার সংশ্লেষে বাংলা ছোটগল্পে প্রায় সিনেমার স্কোয়ার ফ্রেমের প্রয়োগ মুগ্ধ করবে সচেতন পাঠককে। পাগল ছেলে পুতুল, পদাতিক মহিলা পুতুল বা গ্রীন অটোওয়ালা পুতুলদের পরস্পর অসংলগ্ন দৃশ্যকল্পের ভিড়ে পাঠক যখন দিশাহারা তখনই আচমকা অ্যাঙ্গেল ছোট হল ক্যামেরার। পাঠক বুঝল অসংলগ্ন দৃশ্যখণ্ডগুলি আসলে কৃষ্ণেন্দুর দেখা বাগবাজারের রাস্তার ঘটনা। এই উপলব্ধির পরক্ষণেই আবার জুম ইন। কৃষ্ণেন্দু আর মোহরও সুকুমার খাসনবিশের উপন্যাসের চরিত্র। অবিলম্বেই দেখা যায় সুকুমারবাবু আর অনিলবাবুরাও একটি শ্যুট হয়ে চলা বাংলা ছবির দুই চরিত্র। এবং খুব দ্রুত সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো এই গল্পের কাহিনি গিয়ে পড়ে স্পেস স্টেশনের মহল্লায়।
‘পার্কস্ট্রিট অথবা গোলগাথার ম্যানিফেষ্টো’ আসলে গল্পের ছলে যেন এক দীর্ঘ কবিতা অথবা কাব্যনাট্য। যীশুর প্রতি রবিঠাকুরের উক্তি চমকিত করতে বাধ্য পাঠককে,
গোলগাথায় সেদিন যখন ওরা, ক্রুশে দিচ্ছিল তোমায়, সেদিন সেই ভিড়ের মধ্যে আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম... তুমি চিৎকার করে বলেছিলে, ‘হে পিতা, তুমি এদের ক্ষমা কোর না।’
রবিঠাকুরের (তথা যীশুর) মুখে এমন মন্তব্য আরোপের মধ্যে সাহস যতটা লাগে ঠিক ততটাই লাগে কল্পনাশক্তির ইন্ধন।
কৃষ্ণেন্দুর গল্প যাঁরা এখনও পড়েননি এবং আমার লেখাটি এই অবধি পড়লেন মনে মনে নিশ্চিত একটি ধারণা ছকে নিয়েছেন এই তরুণ গল্পকারের শৈলীর বিষয়ে। এবং মারাত্মক ভুলটা করলেন এখানেই। এমন দুরূহ পরীক্ষামূলক গদ্যভাষা যার করায়ত্ত সেই গল্পকারের লেখনীই আবার জন্ম দিতে পারে সাবেক রীতির সেই নিটোল কাহিনিনির্ভর বৃত্তের মতো এক একটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য ছোটগল্পের। একাধারে গ্রস রিয়ালিটি আবার অ্যাবস্ট্রাকশন—দুই ধারাতেই উচ্চাঙ্গের দক্ষতাসম্পন্ন এমন বিরল প্রজাতির ছোটগল্পকার বাংলা সাহিত্যে ইতিপূর্বে আর কতজন এসেছেন আমার জানা নেই।
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঝুমুরের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে এক শীতের ভোরে কলকাতা থেকে নোয়াদার ঢালে এসে নামে ঋতবান। গল্পের নাম ‘মৃগয়া’ কেন জানতে পাঠককে অপেক্ষা করতেই হবে এই দীর্ঘায়িত কাহিনির শেষ পঙক্তিটুকু অবধি। অথচ একবারও একঘেয়েমি আসবে না তার। অমিতাভ গুপ্তর কবিতা পাঠ থেকে বোলপুরের পৌষমেলার আসরে টুসুগানের আবহ তাকে মাতোয়ারা করে রাখবে আগাগোড়া। কাহিনির এই পরিমণ্ডল নির্মাণ তথা গল্পের চরিত্রদের বাস্তবানুগ অনুভূতির জারণই গল্পকার কৃষ্ণেন্দুর পরিণত জীবনদৃষ্টিকে চিনিয়ে দেয়।
ফলহীন দাম্পত্য প্রিয়াংশুকে করে তুলেছিল বিমুখ। রুচিরাও আকৃষ্ট হয়েছিল অন্যগামীতায়। অপরাজিতা চারার পরিচর্যার মতো তুচ্ছ ঘটনা প্রাণ ফিরিয়ে আনে জং ধরা দাম্পত্যে। বৃষ্টি নামে নাগরিক কলকাতায় (গাছ)। লোকের মুখে মুখে ভোডাফোন বনে যাওয়া অটোচালক বিতান দাস—টুয়েলভের পর জীবিকার তাড়নায় পড়াশুনো আর হয়নি যার—সেই একদিন তার অটোর সওয়ারি মন্দিরার প্রেরণায় জীবনরস খুঁজেছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে। শেষে মন্দিরার পাশে তার কলেজের কমলদাকে দেখে সে আবার ফিরে যায় তার পুরনো বিবর্ণ জীবনে। যেখানে সাহিত্য নেই। নেই কোনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (খুচরো)। পুরীর মনোরম সামুদ্রিক প্রেক্ষাপটে পুরনো প্রেম এবং নতুন সম্পর্কের টানাপোড়েনে শেষ অবধি রাণার ‘আনন্দময়’ হয়ে ওঠার কাহিনিটুকুও অত্যন্ত মনোগ্রাহী (লাল কাঁকড়া)। কোথাও মিলন, কোথাও বিচ্ছেদ আবার কোথাও পুনর্মিলন বুঁদ করে তুলবে পাঠককে।
জানিয়ে রাখি এই গ্রন্থের উৎসর্গপত্রের ভাষাটুকুও মুগ্ধ করেছে আমায়। নিজের প্রথম বইটি ভুবনেশ্বরের মেঘালী দুপুর বা কোলকাতার অলিগলির রোদ্দুরের মতো অনুষঙ্গদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছে কৃষ্ণেন্দু। বইয়ের প্রচ্ছদটিও তারই। যা তার সাহিত্যমনের সঙ্গে মানানসই।

ইলিউশন ও অন্যান্য গল্প/ কৃষ্ণেন্দু দত্ত/ হাওয়াকল/ বিনিময়ঃ ১০০ টাকা

আপনার মতামত জানান