লাইটহাউস আর অনেক রঙের আলো

আবেশ কুমার দাস

 


অশোকনগর থেকে প্রকাশিত ‘বাতিঘর’ (সম্পাদনাঃ রাতুল চন্দরায়, অনির্বাণ দাস) সাময়িকীর সাম্প্রতিক বইমেলা ২০১৫ সংখ্যাটি হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়বে রাতুল চন্দরায়কৃত প্রচ্ছদটি। সাদা প্রচ্ছদপটে একগুচ্ছ মৌলিক রঙের চলমান কোলাজ। এদিক ওদিক ছিটকে যেতে যেতে সেই তরল রঙেরা যেন আচমকা কেলাসিত হয়ে উঠেছে। পাতা উল্টে পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প, কবিতা এবং গদ্যগুলিতে চোখ বুলোতে গেলেই এরপর মনোজ্ঞ পাঠকের নজরে পড়ে যাবে প্রচ্ছদের সেই রংবাহারই যেন ফল্গুর মতো অন্তর্লীনা হয়েছে বিভিন্ন রচনাগুলিতে।
সাম্প্রতিক অতীতের ‘হোক কলরব’ পর্বকে উপজীব্য করে আমাদের জীবনভরের কলরবের এক অন্য তথা অনন্য গল্প শুনিয়েছেন পিয়াল ভট্টাচার্য। প্রাইমারির ক্লাস থেকে পিচরাস্তায় ক্রিকেট খেলার দিনগুলি হয়ে দেবদাসপনার অধ্যায় পেরিয়ে যে কলরব চলতেই থাকে কলেজ ক্যান্টিনে টেবিল বাজিয়ে গানের দিনগুলিতেও। বা আরও পরবর্তীতে বইমেলার মাঠে লিটিল ম্যাগের সময়পর্বেও থেকে যায় সেই কলরব। এই কলরবই একদিন মুখ খোলে কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে। ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপের জমানাতেও সঙ্গী থেকে যায় সে। পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক অনির্বাণ দাস তাঁর মনোগ্রাহী গদ্যে তুলে এনেছেন অশোকনগরের বিভিন্ন চায়ের দোকানের অনুষঙ্গকে। ভোলাদার চায়ের দোকান যেন এক মহাপৃথিবী—যেখানে আসে গায়ক থেকে মুরগিওয়ালা, উঠতি অভিনেতা থেকে প্রাক্তন নকশাল। বাসুকাকার চায়ের দোকান আবার জন্ম মৃত্যু বিয়ে অন্নপ্রাশনের এক চলমান মহাফেজখানা। স্বপনদা দিনভর চা বানিয়ে আর নাগাড়ে খিস্তি ঢেলে রাত ন’টায় বাংলা চড়িয়ে কুকুরদের বিস্কুট খাইয়ে বাড়ির পথ ধরে।
ক্রিকেট আর জীবন জুড়ে যায় রাতুল চন্দরায়ের কবিতায়। ব্যাট বলের সংঘাত আর শুধু সংঘাতই এই খেলার নিয়তি। তাই, ‘প্রতি বলে... প্রতি ওভারে... দিনের শেষে/ স্কোর বোর্ড জুড়ে আঘাতই তো জমা হয়!’ নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেছেন কবি অরিত্র সান্যাল। ‘যা যা কিছু ভেঙে দেখবার মতো—যেমন মানুষ, বা একটা সহজ বাড়ি/ মনে হয় ভিতরে কুসুম ঠাসা আছে/ মনে হয়’ অথবা ‘যেন খামের ভেতরে খাম খামের ভেতরে খাম তারও ভেতর খাম/ শুধু এই খাম খুলে ফেলবার ক্রিয়াটুকু মানুষের আত্মা চেনায়।’ প্রেম, যৌনতা বা মানবিক অনুভূতির সংশ্লেষে কবিতায় নিহিত ‘বীজ’-এর রসায়নকে ধরেন অরিত্র। জয়ন্তজয় চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে আদিমতার গন্ধ। ‘আমরা নিভৃতে বসি, মেলেছি শরীর.../ হুইস্কির গ্লাসে টলে বেপরোয়া চাঁদ’—নিঃসন্দেহে পাঠককে নিবিষ্ট করে পঙক্তিগুলি।
তবে গোটা পত্রিকাটির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে এবারের গল্প বিভাগটি। জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়, কৌস্তভ ভট্টাচার্য বা অনুপম মুখোপাধ্যায়দের কলমে আধুনিক থেকে পুনরাধুনিক, ধ্রুপদী থেকে অধুনান্তিক—বিভিন্ন ধারার গল্প মূর্ত হয়ে উঠেছে পরের পর। জীবনভরের তিল তিল ব্যর্থতার পদচিহ্ন থেকে ত্রিদিবের ক্রমশ মৃত্যুর অনিবার্য পদশব্দ শুনতে পাওয়ার আখ্যান অত্যন্ত নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয় অর্ণব সাহার ‘মৃত্যুর গন্ধ’ গল্পটিতে। অর্ণবের গদ্যভাষা যেমন বলিষ্ঠ তেমনই সমসাময়িক তাঁর মনোভঙ্গি তথা দেখবার চোখ। ‘আমি সারাজীবন স্বীকৃতির অন্বেষণে ধীরে ধীরে সমাপ্তি ঘটলো যে কাহিনীটির তারও উৎসমুখ জ্যেষ্ঠা’—কৌস্তভ ভট্টাচার্যর ‘তৃতীয় আশ্রম’ গল্পের বাণপ্রস্থগতা কুন্তী বলেন গান্ধারীকে। সমকালীন বাঙালির মহাভারত চর্চ্চার এক উজ্জ্বল নমুনা হিসেবে থেকে যাবে গল্পটি। রাজনৈতিক হুমকির ভয়কে নিয়ে অক্লেশে কৌতূকের অবতারণা করেছেন রাণা রায়চৌধুরী তাঁর ‘ভয়’ গল্পে। হাসির গল্প—যা কিনা দিন দিন বিলুপ্তপ্রায় হয়ে আসছে বাংলায়—সেই ধারাটির পুনরুজ্জীবনের যাবতীয় সম্ভাবনা আছে এই লেখকের লেখনীতে। সেই সম্ভাবনা আছে সীমান্ত গুহঠাকুরতা এবং অনুপম মুখোপাধ্যায়েরও। তবে একটু অন্য কথা বলতেই হয় অনুপমবাবুর ‘অগ্নিভ হালদারের কান্নাঃ একটি পুনরাধুনিক আখ্যান’ প্রসঙ্গে। গল্প আধুনিক নাকি পুনরাধুনিক নাকি অধুনান্তিক সেই বিচারের ভার সমালোচকের। নামের মাধ্যমে নিজের গল্পের গায়ে সেই লেবেল সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা গল্পকারকে মানায় না।
পত্রিকার এই সংখ্যার লেখকসূচিতে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের মধ্যে অনেককেই সম্ভাবনাময় বা বেশ পরিচিত হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও একেবারে প্রথম সারির প্রতিষ্ঠিত লেখক বা কবি বলা যাবে না কাউকেই। কিন্তু তাতে লেখার গুণগত মানের ঘাটতি পড়েনি কোথাও একটুও। আজকের বাজারে প্রকাশিত হুদো হুদো লিটিল ম্যাগাজিনের জঙ্গলে দিনকে দিন লিটিল ম্যাগের নিজস্ব চরিত্রটুকুই লোপ পেতে বসেছে। কিন্তু ‘বাতিঘর’-এর এই সংখ্যাটি দেখে আশ্বস্ত হওয়া যায় পত্রিকাটি সত্যিই তার চারিত্রিক ধর্মকে অক্ষুণ্ন রেখে লাইটহাউসের কাজ করবে ভবিষ্যতে।

বাতিঘরঃ বইমেলা ২০১৫/ সম্পাদনাঃ রাতুল চন্দরায়, অনির্বাণ দাস/ হাতবদলঃ ৫০ টাকা

আপনার মতামত জানান