ছায়া থেকে অন্ধকার নামে

বিশ্বদীপ দে

 



একটি কবিতার বই হাতে নিলে প্রথমেই যারা তার নামটা নিয়ে মাথা ঘামায়, আমি তাদের দলে নই। বরং পাতা উলটে এলোমেলো পায়চারি করতেই ইচ্ছে যায়। পংক্তি থেকে পংক্তি, এমনকী যতিচিহ্ন অবধি ঘুরে বেড়াতে থাকি। অল্প সময় এমন করতে করতেই আমি বুঝে যাই, এই বইয়ের সঙ্গে আমার পটবে কিনা। ঠিক যেভাবে কোনও মানুষের সঙ্গে সদ্য পরিচয় হলে করি। দু-চার কথায় তার ভিতর জমে থাকা যাপনকে নেড়ে ঘেঁটে তাকে বুঝতে চেষ্টা করি।

‘যা কিছু গোপন, সেই দিকে/ ত্যারচা হয়ে থাকে পৃথিবী’। একটি কবিতার বই খুলেই প্রথমে চোখে পড়ল লাইনটা। থমকালাম। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন-‘শুধু তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত’।সেই পংক্তিরই এক উত্তর পর্ব যেন নির্মিত হয়েছে এই লাইনে। আজকের পৃথিবীতে সমস্ত ‘ব্যক্তিগত’-ই এক দুনিয়াব্যাপী সিসিটিভির পাল্লায় পড়ে আক্রান্ত। ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘গোপন’ যা কিছু সেই দিকেই ত্যারচা হয়ে আছে আমাদের চারপাশ। পবিত্রতার মগ্ন আকাশ তাই মেঘে ঢাকা। সেই মেঘের কথা ভাবতে ভাবতে আবার পাতা ওলটাই। দেখি-‘কাছের কথাগুলো কাঁপছে।/ দূর থেকে দেখছি তোমার চলে যাওয়া/ কথার আঁচড়/ আমি কি আর ডুবন্ত মানুষের মতো/ ভেসে উঠবো কোনওদিন, অন্য কোনও স্বপ্নে?/ নাকি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে থাকাকে/ মেঘ বলে ভুল হবে আবার…’অন্য মানুষের স্বপ্নে ভেসে ওঠা, সেই ঝাপসা ছায়াকে ঘিরে মেঘ নামে বইয়ের পাতায়। আমি খানিক কনভিন্সড হয়ে অন্য পাতায় যাই। চোখে পড়ে-‘কেন মলমের গন্ধে,/ ব্যথারা ঘুমিয়ে পড়ে এখানেই?’ প্রশ্নচিহ্নটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি এবার একটু স্থিতিশীল হতে চাই। যেভাবে নিরালা অবসরে প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চলে, সেভাবেই ভালো লেগে যাওয়া বইটার সঙ্গে আমি আলাপ জমাতে চাই জমিয়ে।

আর তখনই চোখে পড়ে বইয়ের মলাটটা। বইয়ের নাম ছায়া থেকে অন্ধকার নামে। লেখকের নাম দেবব্রত কর বিশ্বাস। এ সবই আমি আগে থেকে জানি। যেমন এও জানি, দেবব্রতর প্রথম বই ‘শ্রীগোপাল মল্লিক লেন’। শুধু বই নয়, বইয়ের নামে যে রাস্তার খোঁজ, সে রাস্তাতেও হেঁটেছি বিস্তর। অথচ হাঁটতে হাঁটতে কোনওদিন ভাবিনি এই গলি, এই অন্ধকার, আবছায়া হ্যালোজেনের মধ্যে পড়ে রয়েছে আশ্চর্য পংক্তিমালা! কেউ এসে তুলে নেবে, আর একটা বইয়ের পাতার ফরফর শব্দ উঠবে গলিময়। ব্যক্তিগত আলাপ থেকে জানি, কবি কেমন করে ধীরে ধীরে একটি বই থেকে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েছে অন্য আরেকটি নতুন কাব্যগ্রন্থে। সে কথা এ লেখায় অপ্রয়োজনীয়। কেননা, কবিতার মুখোমুখি হতে পারে কেবল পাঠক। আর কারও, আর কোনও কিছুরই সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। হতে পারে, এই বইয়ের কবিতাগুলির ভেতর অনেকগুলিই আমার আগে পড়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুই মলাটের মধ্যে যুক্ত হয়ে, একটি নির্দিষ্ট পারম্পর্য মেনে যখন তারা একে একে ভেসে উঠতে থাকে তখন সব মিলিয়ে যা তৈরি হয় তা একেবারেই নতুন… একেবারেই ভার্জিন এক অস্ত্বিত্ব। খোদ কবিও বোধহয় তার কাছে কেউ নয়!
আসলে কবিতা ও পাঠকের মধ্যে তো কোনও স্পেস থাকে না, যে অন্য কেউ ঢুকে পড়বে। যেমন দিগন্তের কাছে এসে আকাশ ও মাটির মধ্যে কোনও স্পেস থাকে না, ঠিক সেরকম। আর সেই কারণেই মুখোমুখি হওয়ার আগে খুচরো আলাপে একবার তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। তারপর আলাপ জমে উঠলে… শুরু হয় সংলাপ…সেই সংলাপের দু-চার টুকরো হাইলাইটসের মতো ধরে নেওয়া যেতে পারে এই লেখাকে।

‘নেশা চড়তে চড়তে কবে যে সমে উঠবো…/ আর চুপ করে থাকার মতো/ সোচ্চার হতে শিখবো কি?’ রাগ, অসহায়তা আর বিরক্তি এইটুকু লাইনের ভিতর একেবারে উপচে পড়ছে যেন। পাশাপাশি সমে ওঠার অনুসঙ্গ থেকে একটা গানের কথাও মনে আসে। ঠিক স্পষ্ট নয়। গুনগুন করে গাওয়া গান। যে গানের ভেতর থেকে অন্যমনস্কতা ঝরে পড়তে থাকে। যেন নিজের বুকের মধ্যে যে শহর, সেখানে শান্ত রাত নেমে এসেছে। আর গভীর রাতে পথ হাঁটছে কেউ।
অন্য আরেকটা কবিতায় দেখা যায় ‘দেওয়ালগুলো নড়তে নড়তে দরজা খুলে দিচ্ছে…’, যদিও ‘বাইরে যাওয়ার রাস্তা মানেই/ বেরোনোর রাস্তা নয়’। তাই শেষমেশ গন্তব্য বদলে যায়।‘এদিক সেদিক হেঁটে যে রাস্তাটা ভিতরে ঢুকছে/ আমি তার দিকে যাই’। সেই রাস্তার পাশেই রয়েছে নদী। ‘যে নদী নিজেকে সামলে নিতে পারে,/ তার পাশেই সভ্যতা তৈরি হয়’। এই অমোঘ পংক্তির কথা মাথায় রেখে কবিতার সেই নদীর পাশে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে চাই। তার শান্ত, টলটলে জলে ছায়া পড়ে জীবনের।
দেবব্রতর কবিতায় সর্বত্র কিন্তু এমন স্থিতি নেই। বরং একটা অস্থিরতা আর অসহায়তা চাপা শব্দের মতো অশান্তি তৈরি করে। কিন্তু তারপরই মানুষ যেমন মেনে নেয়, তেমন করে একটা আপাত শান্ত পংক্তি লেখা হয়। আসলে এই মেনে নেওয়া কিন্তু কোনও আপোশ নয়। কোনও সমঝোতা নয়। বরং তা যেন এক রণকৌশল বলে মনে হয়। যেন কোনও তীব্র বিস্ফোরণে ফেটে পড়বার আগের নিস্তব্ধতা। ‘আমিও তেমন, মনোযোগী একা, বসে আছি/ কথা ও সুরের মাঝে উচ্চারণহীন…’।
কবিকে শেষমেশ ফিরতেই হয়। ‘যেভাবে বন্যার কাছে বারবার/ গৃহস্থ ফিরে আসে’। ‘ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ানো শয়তান’ কবির অজানা নয় ‘ধ্বংসের বীজে মৌমাছি বসে না’। তবু ধ্বংসের পরে, বন্যায় সব ভেসে যাওয়ার পরে নতুন বসতি গড়তে যেভাবে ফিরে আসে গৃহস্থ, সেভাবে কবিও নরম পলির ভেতর বহতা জীবনের ওম খুঁজে পায়। তবে ক্ষত কি সেরে যেতে পারে পুরোপুরি? না… আসলে ‘শুশ্রূষায়/ মানুষ কি কখনও বাঁচে?/ বড়জোর নিরাময় হয়…’
পাতায় পাতায় শুশ্রূষা, নিরাময়, মলমের সাহচর্যে ব্যথার থেকে দূরে সরে বা না সরে যাওয়া পংক্তিরা এভাবেই মুখোমুখি জেগে থাকে পাঠকের। শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের শীর্ণ গলিতে ছায়া থেকে অন্ধকার নামে। পাঠ শেষেও সেই আবছায়া মাথায় থেকে যায়।




ছায়া থেকে অন্ধকার নামে, দেবব্রত কর বিশ্বাস / সপ্তর্ষি প্রকাশন

আপনার মতামত জানান