বই আলোচনা - ‘পাঁচটি নভেলা’ (সৃষ্টিসুখ)

সায়ন্তন মাইতি

 



এককালে শৌখিন পাঠকরা শুধুমাত্র নিজেদের সাড়ম্বর জীবনযাত্রার সাথে খাপ খাওয়াতে বই-এর উপর বেশ জমকালো রঙচঙে মলাট দিতেন। সেটাই হার্ডকভারের জন্মসূত্র। সব দেশেই। ফলে পেপারব্যাকের সাথে কৌলিন্যের একটা পুরানো ‘আড়ি’ বাই-ডিফল্ট তৈরী হয়ে আছে। বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে তো বটেই। যদিও ঐতিহ্যের ইতিহাস বলছে, একশো বছর আগেও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনার পাশাপাশি বিশ্বভারতী থেকেও পেপারব্যাকে বই বেরিয়েছে। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে সেসব কৌলিন্যের গ্রাসে চলে গিয়ে বিধিবদ্ধ হয়ে উঠল হার্ডকভার। তবে ইদানীং আবার জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে বাংলার অভ্যস্ত পাঠকদের মধ্যেও। ফ্লিপকার্ট, আমাজনে মোটা ছাড়ের দৌলতেই হোক আর কলকাতার বাজারে ইংরেজী ভাষার বেস্টসেলারের প্রাচুর্যেই হোক।
তবে বাংলা বইয়ের জগতে পেপারব্যাকের রমরমা দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা যে একঝাঁক নতুন বই উপহার দিল গত বইমেলায়, তা শুধু অভিনবই নয়, সাহসী পদক্ষেপও। আজকের আলোচ্য বই ‘পাঁচটি নভেলা’। যার ‘গেট-আপ’ মূলস্রোত থেকে আলাদা হলেও গল্পগুলো মূলস্রোতেরই। সৃষ্টিসুখের শুধু এই বইটা নয়, বাকীগুলোও পরিচিত ফর্মা থেকে আলাদা। হাতে ধরলে অনেকটা হারপার কলিন্স, ব্লুমসবারি বা পেঙ্গুইন ভিকিন্স-এর মত লাগে। শুধু পেপারব্যাক হওয়ার কারণে নয়, আরো অনেক ক্ষেত্রেই তার ছাপ দেখা যায়। ধবধবে সাদার পরিবর্তে হালকা ময়লাটে কাগজ কিংবা একদম শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে লেখক-পরিচিতি, সূচীপত্রর আগে বা পরে ‘preface’ ছাড়াই গল্প শুরু হয়ে গেছে – কোনোটাই চিরাচরিত বাংলা বইয়ের মত নয়। আর ‘সাহসী’ পদক্ষেপ চলে এসেছে লেখক-লেখিকা নির্বাচন অবধিও। সৃষ্টিসুখ জায়গা করে দিয়েছে অনেক উঠতি সাহিত্যিকদের। সবমিলিয়ে, এই প্রকাশনা অভিনবত্বের দ্যোতক। আর ‘পাঁচটি নভেলা’ মূলস্রোতের গল্প নিয়ে তৈরী হলেও অভিনবত্বেই তৈরী।
‘নভেলা’ বা ঔপন্যাসিকার ধারণাটাও বাংলা সাহিত্যে পুরানো নয়। ভাষাবিদ ও গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নভেলার অনেক গঠন বৈশিষ্ট্য আছে। তবে বিভিন্ন ভাষায় নভেলা লেখার সময় শুধু গল্পের কলেবরের দিকেই নজর দেওয়া হয়, অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সেভাবে কেউ মেনে চলেন না। মোটামুটি চল্লিশ হাজার শব্দের উপরে উঠলে তাকে ‘উপন্যাস’ বলা চলে। আর সতেরো হাজারের নিচে নামলে নভেলা হয়ে যায় নভেলেট। সেদিক থেকে ‘পাঁচটি নভেলা’র দ্বিতীয় গল্প ‘শেষ বিচার’ বাদে কোনোটাই কিন্তু নভেলা নয়, নভেলেট। তবে বর্তমানে কোনো কোনো ভাষার সাহিত্যিকদের মত নভেলেটকে যদি নভেলার অংশ ধরে নেওয়া যায় তাহলে পাঁচটাই ‘নভেলা’।
চলে আসছি গল্পের কথায়। হেডিং-এ ‘রিভিউ’ লিখেছি ঠিকই, কিন্তু আমি যেটুকু বলব একজন সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমার ধারণা, বইয়ের টার্গেট অডিয়্যান্স এই সাধারণ পাঠকরাই।
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের ‘বেদনার রঙ’ এমন একটা বিষয় নিয়ে লেখা, যেটা বহুদিন ধরেই জীর্ণ লোকাচারের মত সমাজে চলে আসছে, অথচ কাহিনীর ‘মুখ্য বিষয়’ হিসেবে সাহিত্যে তার উপস্থিতি কম। কালেভদ্রে থাকলেও তার ব্যাপ্তি আর্থিকভাবে পঙ্গু মানুষদের মধ্যে। শহরের ‘অভিজাত’ পল্লীতে উচ্চবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পে গায়ের রঙ ‘কী-রোল’ প্লে করছে, এমনটা নজরে পড়েছে কী? আমার তো মনে পড়ছে না। অথচ ‘এলিট’ বর্গের মধ্যেই গাত্রবর্ণ-ছুৎমার্গতা দেখা যায় বেশি, আর তার শিকার হন মেয়েরাই। এমন একটা পটভূমি থেকে স্পর্শকাতর কাহিনী তুলে এনে লেখক জেগে-অন্ধ-থাকা সমাজকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে আমরা সরব। অথচ মনের ভিতর থেকে আমরা ফর্সা আর কালোকে এক আসনে বসাতে পারি নি। এই মানসিকতার শিকড় গ্রোথিত রয়েছে মনস্তত্ত্বের অনেক গভীরে। কিছুদিন আগেই ফেসবুক পোস্ট পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটায় মনে পড়ল, বুনিয়াদী শিক্ষাস্তরে ছবির মাধ্যমে বিপরীত শব্দ শেখানোর পদ্ধতিতে আমরা ফর্সা-কালো মহিলার ছবির মাধ্যমে ‘beautiful’ আর ‘ugly’ চিনতে শিখেছি। লেখকও একইভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন ছেলেভুলানো রূপকথার গল্পে আমরা অবুঝ বয়স থেকেই শুনে এসেছি, ডাইনীবুড়ি কালো আর রাজকুমারী ফর্সা।
‘বেদনার রঙ’এর আরো একটা দিক খুব ভালো লাগল, কোনো জায়গায় গল্প অতিনাটকীয়তার আশ্রয় নেয় নি। অনাবিল আর ঝিনুকের মধ্যে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে দোটানা তৈরী হলেও “সত্যিই কি পলা আমাদের মধ্যে এসে দাঁড়ালো?” –এই অবধি এসেই থেমে গেছে, আর এগোয় নি। কিংবা পলার বাল্য বয়সের ভালোবাসা শুভেন্দু বস্তুত একজন প্রতারক। গল্পকে বাণিজ্যিক করার প্রয়োজনে এইসব ক্ষেত্রে আমরা প্রায়শই বাল্যপ্রেমের পথ-চেয়ে-বসে-থাকা কোনো ত্যাগী পুরুষকে দেখতে পাই। কিন্তু লেখক তেমন ছবি আঁকেন নি। পলার মানসিক রোগের ‘আসল শত্রু’ কে সেই রহস্য উন্মোচনের সময়ও বাংলা ছায়াছবিমার্কা ফ্যাণ্টাসি বানানোর সুযোগ অনেক ছিল। কিন্তু লেখক বাস্তববাদী, তাই কোনো জায়গাতেই বাস্তবের সীমা লঙ্ঘন করেন নি। তবে ডাক্তার ব্যানার্জীর চেম্বারে বসে থাকা জনা কুড়ি তরুণ-তরুণীর প্রত্যেকেই কল-সেণ্টার বা বিপিওর নীচুতলার কর্মী – এই ব্যাপারটা একটু একপেশে শোনাল। এটা গল্পকথক অনাবিলের ধারণা হলেও পাঠকদের কাছে এই ধারণাটাই সংশয়াতীতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে এবং প্রকাশভঙ্গি অনুযায়ী পাঠকরা এটাকে ‘খণ্ডচিত্র’ না ভেবে অন্যান্য চেম্বারের ‘summary’ ভেবে নিলেও ভুল করবেন না। কিন্তু বাস্তবে এদের বাইরেও সাইকোথেরাপি-অভিলাষী অন্য মানুষ এতই থাকেন যে, শুধু এরা খুব কম শতাংশই। একাধিক মনস্তত্ত্ববিদ ও মনোবিশ্লেষকের সাথে আলাপ থাকার কারণে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের ‘শেষ বিচার’ প্রকৃত অর্থে আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের একটা অসামান্য দলিল। শুধু তাই নয়, কল্পবিজ্ঞান তৈরীর পাথেয়ও। বর্তমানে কল্পবিজ্ঞানের অপ্রতুলতা বাংলা সাহিত্যে চোখে পড়ার মত একটা অভাব। আবার গত এক দশক ধরেই পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস অনুসন্ধানে বিশ্ব টালমাটাল। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সুচিন্তিতভাবে কয়েক শতাব্দী পরের চিত্রের অবতারণা করে লেখক বর্তমান পৃথিবীর অনেকগুলো অধ্যায়কে রূপকে দেখিয়েছেন। উপন্যাসটার কাহিনী সম্বন্ধে এক লাইনও বলতে চাইছি না। কারণ, প্রত্যেকটা ঘটনাক্রম এমনভাবে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে, যে কোনো একটা অংশ সম্বন্ধে বিস্তারিত না বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আর একটু বিস্তারিত বললেই পাঠকের আগ্রহে আঘাত করা হবে। এই উপন্যাস যেমন রোমহর্ষক, তেমনি ভাবনাবহুল। ব্যক্তিগতভাবে আমার সব ভাবনা যে লেখকের সাথে মিলেছে, তা নয়। কিন্তু এই উপন্যাস যে কোনো মননশীল পাঠকের কাছে মস্তিষ্ক অনুশীলনের একটা মাধ্যম সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা কথা মনে হয় উপন্যাস পড়তে পড়তে সবারই কম-বেশি মনে হবে। আমরাও তাহলে আদতে আমাদের চেয়ে বহুগুণ উন্নত কোনো গ্রহের প্রজাতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি না তো? যাকে আমরা ঈশ্বর বলে মানি?
মহুয়া মল্লিকের সামাজিক গল্প ‘শূন্য গর্ভ’ সজীব বিষাদগাথায় পরিপূর্ণ। গল্পের প্রথম থেকে শেষ অবধি বিভিন্ন বাঁকের মধ্যেও যেটা অটূটভাবে রয়ে গেছে সেটা হল বিষণ্ণতা। কখনো সেটা অর্থাভাব ও বেকারত্বের, কখনো বিরহের, আবার কখনো বঞ্চনার। একজন মহিলার প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করার গল্প হলেও এটাকে কোনোভাবেই ‘ফেমিনিস্ট স্টোরি’ মনে হবে না। বরং বর্তমান সমাজের রূঢ় বাস্তবের খণ্ডচিত্র এই বেদনাঋদ্ধ কাহিনীর সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে রয়েছে, সেই সাথে লেখিকা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এক একটা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব। দুর্নীতিগ্রস্ত চিটফাণ্ডের এজেণ্টের সর্বস্ব খুইয়ে ফেলা থেকে গল্পের শুরু। তারপর প্রতি পদক্ষেপে আমরা পেয়েছি নৈতিকতার সাথে অনৈতিকতার দ্বন্দ্ব। এজেণ্টের স্ত্রী মিতালি সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার ভাগীদার। সমাজের যাবতীয় আবর্জনার নিক্ষেপস্থল হিসেবে লেখিকা এই মুখ্য চরিত্রকে বানিয়েছেন। স্বামীর কৃতকর্মের জন্য কথাও শুনতে হয় তাকে, পড়শি-আত্মীয়দের কটূ্কথা থেকে সন্তানদের আগলে রাখতে হয়ও তাকে, আবার সংসারের সুদিন ফিরিয়ে আনতে মারাত্মক ঝুঁকি নিতে হয়ও তাকেই। তার জীবন সংগ্রামের উপর বারবার আঘাত হেনেছে কারোর না কারোর অমানবিকতা। এসবের মধ্যেও কিভাবে মিতালি এগিয়ে চলল, তার মধ্যেই রয়েছে গল্পের প্রাণরস। আরেকটা দিক দেখে ভালো লেগেছে, লেখিকা তিনটে চরিত্রকে দ্বৈত ভূমিকায় দেখিয়েছেন। পলা, তমোঘ্ন, এমন কী ইন্দ্রর এক এক ক্ষেত্রে এক একরকম আচরণ। সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে একটার সাথে আরেকটার সাজুয্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, এক মানুষের মধ্যে যে দুই সত্তাই রয়েছে সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। তবু লেখিকা তেমনটাই দেখিয়েছেন, কারণ বাস্তব মানুষ ঠিক এরকমই স্ববিরোধী। তাই তাঁর কলমের আঁচড়ে গল্প হয়ে উঠেছে বাস্তবের স্পষ্ট দলিল। গল্পের শেষটা বড্ড বেশিই পূর্বানুমেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার একটু অপ্রয়োজনীয়ই মনে হয়েছে। তবে এই মতামত পাঠক থেকে পাঠক আলাদা হতে পারে। এই অংশটুকু ধরে নিয়েও বলব, গল্পটা সুখপাঠ্য। এবং এর সার্থকতা জোরালো সামাজিক আবেদন তৈরীতে।
‘শূন্য গর্ভ\\\'র ঠিক বিপরীত মেরুতে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নিভৃতে যতনে’। বেশ কিছু প্রশ্ন, অনিশ্চয়তার মধ্যেও গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাপৃত রয়েছে নির্মল হাস্যরস। গল্পের প্রথমেই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন, এর পটভূমি আজ থেকে অনেক বছর আগে একটা গ্রামে। কেন্দ্রীয় চরিত্র তাপস কলকাতার কলেজে পড়ে শহুরে আদবকায়দার সাথে ধাতস্থ, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ কারণে ও বাবার কঠোর শাসনের চাপে সে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে নি। একটা ভয়ের আবরণ তাকে ঘিরে রেখেছে পরিণত বয়স অবধিও। গল্পের পটভূমি ও নায়কের এই বনিয়াদ থেকে লেখক এক মুহূর্তের জন্যও সরে আসেন নি। তাপসের ‘ব্যালান্স’ করে চলার চিত্র সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। গল্পে কমেডির আবরণে মোড়া ছোট্ট কয়েকটা রহস্য আছে, সদ্য দাম্পত্যের মিষ্টি রোম্যান্স আছে, বাল্যবন্ধুত্বের অটূট বন্ধন আছে। তবে গল্পের মাঝে অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে ঘটনাপ্রবাহ মজে-যাওয়া নদীর মত শুকিয়ে যাচ্ছে। মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, আমার একটু একঘেয়ে লেগেছে। বেশ কিছু অংশে মনে হচ্ছিল, বহু চরিত্রকে প্রণিধানে আনতে গল্পের গতি খেই হারিয়ে ফেলছে, সিনেমার ভাষায় ‘স্ক্রিপ্ট ঝুলে যাচ্ছে’ বলতে যা বোঝায়। সুনিপুণ দক্ষতায় চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুললেও বেশ কিছু অধ্যায়ে প্রকাশভঙ্গি ভালো লাগে নি। ঠিক কেন ভালো লাগে নি, সেটা বলা বিশেষজ্ঞের কাজ। আমি সেসব ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে চাইছি না, কারণ প্রথমেই বলে দিয়েছি সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে যা বলার বলব। আর সেই স্ট্যাণ্ডপয়েণ্ট থেকে একটা কথা স্বীকার করতেই হচ্ছে, গল্পের চমকপ্রদ পরিসমাপ্তি অনেক অভিযোগ পুষিয়ে দিয়েছে। সত্যি বলতে কি, এইরকম উপসংহার পড়লে মনটা ঝরঝরে হয়ে যায়। নেহাৎ রিভিউ লেখার প্রয়োজনে কেঁচেগণ্ডুষ করতে হল বলে পুরানো কয়েকটা অপ্রিয় কথা বললাম। ‘নিভৃতে যতনে’ নিয়ে ভাবতে গেলেই আমার সবার আগে মনে পড়ে, গল্পের শেষে একজন রক্ষণশীল বাবার উপলব্ধি, বুড়ো বয়সে ছোটদের ব্যাপারে নাক গলানো তার উচিত হয় নি। শুধু এইটুকুর জন্যই আমি অনেককে এই গল্পটা রেফার করেছি।
সবশেষে অভীক দত্তর ‘শুরুয়াৎ’। এই গল্পটা আদ্যোপান্ত প্রথা-মেনে-লেখা ছোটগল্পের ফর্ম্যাটে তৈরি। একটা প্রবহমান নদীর মধ্যে থেকে হঠাৎ তুলে নেওয়া এক আঁজলা জলের মত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলা বিভিন্ন অধ্যায়কে টুকরো টুকরো করে ছুঁয়ে কয়েক পাতার একটা ঘটনাপঞ্জি। এইটুকু অংশের মধ্যে দিনলিপির মত অনেক কিছু ধরা আছে। লাভ-কাম-অ্যারেঞ্জেড, অ্যারেঞ্জেড-কাম-লাভ দুই ধরনের বিয়ে, অফিস-কাছারির চিত্র, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ থেকে অপ্রাকৃত ঘটনা – সব। কিন্তু কোনো একটা বা দুটো ‘বিষয়’কে উপলক্ষ্য করে কিংবা কোনো চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত নয়। অর্থাৎ গল্পের ‘উপজীব্য’ বলে কিছু নেই, কোনো বিশেষ ঘরানার মধ্যে এই গল্পকে ফেলা যায় না। প্রত্যেক মুহূর্তেই গল্পের মোড় পরিবর্তিত হয়েছে, অথচ ‘ট্যুইস্ট’ বলতে যেরকম চোখ-ধাঁধানো চমক বোঝায়, তার কিছুই নেই। এখানেই অন্যান্য গল্পের সাথে এর পার্থক্য। লেখকের অসাধারণ বর্ণনার গুণে নিস্তরঙ্গ গল্পের প্রত্যেকটা অনুচ্ছেদের পরেই প্রশ্ন জাগে, ‘এরপর কী হল?’... এবং এইভাবে চলতে চলতে হঠাৎ করে গল্পটা শেষও হয়ে গেছে। একটা জায়গাতেও অতিরঞ্জিত হয় নি। প্রেমের মাঝে ঈর্ষাও যেমন আর পাঁচটা ঘটনার মত হালকাভাবে এসেছে, তেমনি এসেছে বিদেহী আত্মার উপস্থিতি। আর এতকিছুর সংমিশ্রণ হয়েছে বলেই গল্পের ছোটোখাটো চড়াই-উৎরাইগুলোও বেশ উপভোগ্য। আলাদা অনুচ্ছেদে ‘ভালোই আছি...’ দিয়ে গল্প শেষ করাটাও বেশ সুন্দর লাগল।
‘শুরুয়াৎ’এর আরেকটা দিক দেখে খুব ভালো লাগল, লেখক ইচ্ছে করেই অনেক প্রশ্ন অজ্ঞাত রেখে দিয়েছেন। তাতে অপূর্ণ তো মনে হয়ই নি, বরং গল্পের ভিত আরো আটোঁসাটো এবং নিশ্ছিদ্র লেগেছে। ভূত-বাংলোতে মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে মায়ের খুঁতখুঁতানি কাটল কিনা, অর্জুন আর হিয়ার মাঝে ইন্দ্রর নাম বারবার আসবে কিনা, ধর সাহেবের মৃত্যুর জন্য তাঁর জামাই কোনো শাস্তি পেল কিনা, কোথাও স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। লেখক এক জায়গায় সরাসরি বলেও দিয়েছেন, ‘কোন কোন ব্যাপার পুরো না বোঝাই ভালো’ (সম্বিত-উৎসার সম্পর্ক প্রসঙ্গে)। জীবনটা যেমন অনেক না-বোঝার মধ্যে দিয়েও চলে যায়, গল্পও তেমনি। সব উত্তর, সব সমাধান ছাড়াই জীবন এগিয়ে চলে তার আপন গতিতে।
তাহলে মোটের উপর বুঝতেই পারছেন, এই বইয়ের পাতা থেকে বিভিন্ন দৃশ্যপট উঠে এসেছে। প্রায়-প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আমেরিকার রাস্তা – সবই আছে। প্রকৃতির কোলে অফিস বাংলোও আছে, আবার কাল্পনিক পৃথিবীর রোমাঞ্চিত বাগানও আছে। মানুষের মধ্যেও বৈচিত্র্য ভরা। নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে অতিরিক্ত স্বচ্ছল পরিবার – কেউ বাদ পড়ে নি। আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে মানসিকতা – সর্বত্রই বিভিন্ন রঙের মিশেল। তাহলে আর দেরি নয়। অনলাইন অর্ডার করে ফেলুন। বিশদ জানতে চোখ রাখুন http://www.sristisukh.com/ ওয়েবসাইটে। এখন তো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অন্যান্য প্রকাশনার সাথে পাল্লা দিয়ে সৃষ্টিসুখের বিজ্ঞাপনও চোখে পড়ছে। নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, কলকাতায় ৩০এ, সীতারাম ঘোষ স্ট্রীটে সৃষ্টিসুখের বুক আউটলেট। কিনে নিন, পড়তে থাকুন। পুরো বইটা শেষ করার পর বুঝবেন, কেন শেষ মলাটে সম্পাদক রোহন কুদ্দুস লিখেছেন, ‘বর্তমান অস্থির সময়ের নিশ্চিত প্রাণলক্ষ্মণ লেখাগুলোতে সুস্পষ্টভাবে বর্তমান।’ এই প্রাণচঞ্চলতা, প্রাচুর্য-বিবিধতা পাঁচটি নভেলার রক্তে মিশে আছে। বইকে বাণিজ্যিক করতে গেলে গুণগত মান যেমন লাগে, তেমনি কোথাও একটা গিয়ে ‘individuality’-র পাশাপাশি ‘whole approach’-এর কথাও ভাবতে হয়। এমনভাবে গল্পগুলোকে বৈচিত্র্য দিয়ে ‘well-connected’ রাখতে হবে, যাতে পাঠক মননশীল কিংবা অভ্যস্ত না হলেও এক পাতের মেনুর মত করে সব খাবার খেয়ে নেন। আমার মনে হয়, রোহন কুদ্দুস সবদিক মাথায় রেখেই গল্পগুলোকে এক মলাটের তলায় গেঁথেছেন। আর সেই কারণেই ১৪৯ টাকার বিনিময়ে বইটা কিনে পাঠক ঠকবেন না। পরিচিত পরিসরের ভিতর থেকেও অভিনবত্বে মোড়া কাহিনীগুলো অবসর বিনোদনের সুন্দর মাধ্যম হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত জানান