সেলুলয়েডে ফুটল ‘রামধনু’

সরোজ দরবার

 

বলুন তো, আকাশে ওড়ে যন্ত্রও নয়, জীবন্তও নয় এমন কী জিনিস আছে?
কেউ বলবেন ঘুড়ি, কেউবা বলবেন সিগারেটের ধোঁয়া।
ঋষি দত্ত তার কচি গলায় সঠিক উত্তরটি দেবে- মেঘ।
ঋষি, যার ডাকনাম গোগোল, সে আকাশ দেখতে ভালবাসে। এরোপ্লেন ওড়ার শব্দ পেলে পড়া ফেলে একছুট। দাদুর সঙ্গে মাছ ধরা দেখে।
ও হ্যাঁ ঋষি দত্তের(আকাশনীল মিত্র) সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। তার বাবা লাল্টু দত্ত(শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)। ‘মেডিসিন শপ’ চালান। বাঙ্গলা মিডিয়ামে পড়াশোনা। কথায় একটু ‘স’-এর দোষ আছে। বউকে বলেছেন বি কম, পাশ করেছেন বলেননি।ঋষির মা মিতালী দত্ত(গার্গী রায়চৌধুরী)।গৃহবধূ। আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করার।
বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তিই এ ছবির ভরকেন্দ্র। সেই কবে সুমন লিখেছিলেন, স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী, আমরা কি তা বইতে পারি? কিন্তু এ ছবির কাহিনি তারও আগের ধাপে। অর্থাৎ স্কুলের ব্যাগটা পিঠে তোলার প্রাক পর্বের ইতিবৃত্ত। দত্তের ছেলেও এবিসিডি, ওয়ান টু জানে, আগরওয়ালের ছেলেও জানে। দর্জি সিংহানিয়া(খরাজ মুখোপাধ্যায়) খুব সঙ্গতভাবেই তাই প্রশ্ন করেন, তফাৎটা কীসে হবে? এদিকে ভগবান যে প্রসাদ খান তাও যেমন কেউ চোখে দেখেননি, তেমনই ডোনেশন যে নেওয়া হয়, তাও কেবল শোনা যায়, দেখা যায় না। সুতরাং এই গোলোকধাঁধা থেকে বেরোতে বাবা-মায়েরা যে নাজেহাল হবেন তা বলাই বাহুল্য। ঠিক যেমন ছবিতে লাল্টু-মিতালী হয়েছেন।
তবে এই স্কুল অ্যাডমিশনের তলে অন্য একটি বক্তব্যের ফল্গুধারাও খুব সঙ্গোপনে বইয়ে দিয়েছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ পরিচালক জুটি। তা হল ল্যাঙ্গুয়েজ ইমপিরিয়ালিজমের কথা। লাল্টুর সমস্যা যতটা না ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করার তার থেকেও বেশি তিনি নিজে বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র হওয়ায়। মিতালীর বিদেশিনী বউদি (সুজান বার্ণার্ট) কিন্তু বাঙ্গলা ভাষা শিখতে চান। এদিকে লাল্টু ‘সিবলিং রাইভালরি’ কে যখন ইভিনিং লাইব্রেরি ভাবেন, কিংবা বাড়ি ফিরে বউয়ের মুখ ঝামটা খেয়েও বড়জোর শিবলিঙ্গ লাইব্রেরি ভাবেন, দর্শকরা হেসে কুটোপাটি হন। লাল্টুর দুরবস্থা দেখে হাসি পায়, কিন্তু হাসি না পাওয়াই হয়তো উচিত ছিল।
এই উপচে ওঠা হাসির মাশুল দিতেই বাবা-মাকেও তাই ভর্তি হতে হয় গ্রুমিং স্কুলে। ম্যাডামের (রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়) গ্রুমিংয়ে হীনমন্যতার মেঘ হয়তো একটু কাটে। কিন্তু সত্যিই কি আর বাঙ্গালির জীবন থেকে সে মেঘ কাটে? মিতালী দত্ত তাই মধ্যবিত্তের আকাশে স্বপ্ন আর লাল্টু দত্ত সে আকাশের মেঘ হয়ে আমাদের সামনে ভাসতে থাকেন। সেখানে রামধনু অবশ্যই ঋষি। যে নিজেই একদিন প্রমাণ করে দেবে বাবার চেয়ারে বসতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া নয়, এই প্রকৃতির পাঠশালা, তার কাছের মানুষদের থেকে যে শিক্ষা সে আহরণ করেছে তাই দিয়েই বড় স্কুলের চৌকাঠ পেরনো যায়। নাহ, ভাড়া করা বাবাও লাগে না, ডোনেশনও লাগে না।
প্র
কৃত শিক্ষা আর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেকার যোজন ফারাকটার দিকেই এ ছবি আরও একবার আঙ্গুল তুলেছে।তবে সে আঙুল তোলা ঠিক রাজা তোর কাপড় কোথায় ধরনের নয়। বরং ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির প্রবাদটি আগাগোড়া প্রহসনের মতো ছবিতে ঝুলতে থাকে।
এ ছবিতে প্রায় প্রত্যেকেই পোড় খাওয়া অভিনেতা-অভিনেত্রী। তা না হলে অবশ্য একজনের সামনে অন্যজন চাপা পড়ে যেতেন। তবু আলাদা করে বলতে হবে গার্গী-শিবপ্রসাদের কথা। তাঁদের করা বাঙালি মধ্যবিত্তের এই হরগৌরি কথা বাঙ্গলা ছবি বহুদিন মনে রাখবে, এমনটা আশা করা যায়।
ছবি দেখতে দেখতে কখনও মনে হবে দৈর্ঘ্যে আর একটু সংক্ষিপ্ত করতেই পারতেন পরিচালক। আর একটু আঁটোসাটো। শিবপ্রসাদ যে তারে নিজের অভিনয় বেঁধেছেন, তা কোথাও কোথাও একটু কম হলে মন্দ হত না। শেষ দৃশ্যে কাঙ্ক্ষিত মন ভরে যাওয়ায় হয়তো একটু কম থেকে যাবে। দর্শকভেদে আরও নানা জিনিসে বাড়তি কমতি মনে হতেই পারে। আর সিনেমা তো সমাজ বদলাতে পারে না, বড়জোর একটা বার্তা দিতে পারে। বড়জোর একটু নাড়া দিতে পারে। সুচিত্রা ভট্টাচার্জের যে উপন্যাস(রামধনুর রঙ)অবলম্বনে এ ছবির নির্মাণ, তা প্রকাশের পরেও যেমন অ্যাডমিশন সিস্টেমের তফাৎ হয়নি, এ ছবি মুক্তির পরও হয়তো তা হবেন। হয়তো চোস্ত ইংরেজি বলেই বাবা-মায়েরা সন্তানকে বড় স্কুলে ভর্তি করাবেন, কিংবা নিজেরা গ্রুমিং স্কুলে ভর্তি হবেন।
তবু ছবিটি অবশ্যই দেখবেন। কেন? কতদিন তো রামধনু দেখেননি, না হয় সেলুলয়েডেই একবার দেখলেন। একটু অন্যরকমের একটা রামধনু। শুধু চোখের দেখা নয়, না হয় মননেই মাখলেন একটু রামধনুর রঙ।

ছবি- রামধনু
পরিচালনা-নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ে- গার্গী রায়চৌধুরী,শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, খরাজ মুখোপাধ্যায়, আকাশনীল মিত্র।

আপনার মতামত জানান