চলচ্চিত্র আলোচনা- World Before Her

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 


মেয়েবাজের কনফেশন

প্রথমে কয়েকটা বোকাভ্যাবলা কনফেশন করে প্রমাণ করে ফেলা যাক লেখক নিতান্ত সত্যবাদী, আকন্ঠ সৎ, যুধিষ্ঠিরের লাইনে শেষ কথা ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি জীবনে সাতবার প্রেমে পড়েছি – সাতজন আলাদা আলাদা - মহিলার। এর মধ্যে দুখানা সাকসেস কিছুদিনের জন্য – শেষটা ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস। যাই হোক আঠাশ বছরে সাতখানা প্রেম মানে অন অ্যান অ্যাভারেজ প্রতি চারবছরে একটা। ব্যাপারটা যদিও অতো নীরস সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সির অঙ্ক নয় – কারণ ঘটনাটা শুরু হয়েছে ১৫-১৬ বছর বয়েস থেকে – তো ফ্রিকোয়েন্সিটা আরো বেশি। জনান্তিকে বলে রাখা দরকার, একটা সময় ছিলো যখন আমার বন্ধুদের মতে আমায় কোনো একটি মেয়েকে নিয়ে কয়েকদিন খ্যাপালে আমি নিপাট প্রেমে পড়ে যেতাম – যদিও এই কথাটায় আমি আজ পর্যন্ত সহমত নয়।
যাক সে কথা – মোদ্দা কথা যুধিষ্ঠির ভদ্রলোকটির আমার মতো ক্যাপা ছিলোনা – ভদ্রলোক কেঁদে কঁকিয়ে সারাজীবনে একবার মাত্র বিয়ে করেছিলেন তাও সেজো ভাইয়ের কেরদানিতে। আমাকে বরং কলির কেষ্ট, অবলীলায় অর্জুন ইত্যাদি বলা উচিৎ - হোয়েন ‘প্রেমে পড়া’ ইজ টু বি কনসিডারড।
সোজাসাপ্টা বলে ফেলা যাক – আমি নির্লজ্জ ‘মেয়ে’বাজ। ওই যেরকম লোককে নিয়ে মেয়ের বাবা মারা তটস্থ থাকে, ভালো মেয়েরা যাদের দেখে একটু দূরে থাকা সমীচীন মনে করে – আমি তাই। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভালো আমার যখন আঠেরো বছর বয়েস তখনো আমি এক বান্ধবীর বাড়ি গেলে তার মাতৃদেবী আমি যতক্ষণ মেয়েটার সাথে গল্প করতাম ঠায় বসে থাকতেন।
কি করবো বলুন – মেয়েদের আমার বড়ো ভাল্লাগে। না সেটায় নতুন কিছু নেই – সমস্ত বিষমকাম ছেলেরই লাগে। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ‘উফফ কি দারুণ দেখতে’র চেয়ে একটু এগিয়ে। আমার মেয়েদের কথা শুনলে ছেলেদের কথার চেয়ে ইন জেনারেল বেশি ভালো সময় কাটে, মেয়েদের সাথে আমি মন উজাড় করে বেশি কমফর্টেবলি ঘ্যানর ঘ্যানর করি, ছেলে বন্ধুদের দিনের পর দিন – ইগনোর মারি, কিন্তু ভালো মেয়ে বন্ধুদের ছেড়ে থাকতে পারিনা – আর ইয়ে মেয়েদের একটু বেশি সেনসিটিভ লাগে।
তাই কোথাও গিয়ে মনে হয় এই লেখাটা লেখার জন্য আমি বেশ ইয়ে মানে – এলিজিবল।কোথাও গিয়ে যুধিষ্ঠিরদের চেয়ে আমি মেয়েদের একটু বেশি চিনি।
অনেক গৌরচন্দ্রিকা হয়ে গেল। কাজের কথা শুরু করা যাক।

উঠো গো ভারত+লক্ষী

১) আইটির পরিভাষায় পান-বিড়ি-চা-এগরোলের দোকানকে ঝুপস বলা হয়। দিনে অন্ততঃ দু’বার আইটি অফিসের প্রত্যেকে সেখানে যায়। ছেলেরা সিগ্রেট ধরায় এবং অনেকাংশেই মেয়েটা কেন সিগ্রেট ধরাচ্ছে সে নিয়ে আলোচনা শুরু করে। আমার দেখা একজন অন্যতম লিব্যারাল পুরুষও কিছুদিন আগে একই লাইনে কথা বলতেন – আমার বাবা।
২) আমার অতি ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবী, সারাজীবন প্রায় সব জায়গায় (এমবিএ অবধি) ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়েছে। জীবনে একটা ছেলেকে ভালোবেসে রেজিষ্ট্রি করেছিল বেশ কিছু বছর আগে। ছেলেটার কেরিয়ার প্রায় সমানুপাতিকভাবেই ভালো। কিন্তু যেহেতু বিয়েটা স্বেচ্ছায় তাই এখনো পর্যন্ত মেয়েটা বাড়িতে আসলে ওকে মোটামুটি অবিবাহিতা হিসেবে ট্রিট করা হয়।
৩) এই মেয়েটির ওপর আমার পার্সোনাল ক্রাশ বললে ভুল হবে, ‘ক্রাশ+ব্লাস্ট+এখনো কারো জীবিত থাকার খবর পাওয়া যায়নি’ ছিলো। যাই হোক মেয়েটি অফিসে চাকরি করার কিছুদিনের মধ্যেই প্রোজেক্ট ম্যানেজার ওকে বাড়িতে ড্রপ করার অফার দিতে শুরু করেন, কেন জানা নেই। ঘটনাটা একটু বাড়াবাড়ির দিকে যাওয়ায় মেয়েটা এইচ-আরের সাথে কথা বলতে যায়। তাকে বলা হয় ম্যানেজারের এগেইনস্টে না যেতে কেরিয়ারের শুরুতেই। এইচ-আরটি মহিলা ছিলেন।
৪) আমার মাকে মোটামুটি সারাজীবন হ্যাটা মেরে, শেষবয়সে মারা যাবার আগে দাদু মায়ের পারফরম্যান্স দেখে তবে স্বীকার করেছিলেন মা দাদুর চার নম্বর ‘ছেলে’। মা মেয়ে হয়ে এতো খাটতে পারে অ্যাকসেপ্ট করতে দাদুর সমস্যা ছিলো হয়তো। তবে যেহেতু ভদ্রলোক আমার দাদু আর ১৯১৩সালে তার জন্ম – তাই একটু বেনিফিট অফ ডাউট দিয়ে বলি, এই লেখাটা যারা পড়ছেন – তারা অনেকেই এরকম কথা বলেই থাকেন ‘আহা ছেলের মতো খাটছে’।
৫) আবার নেশার গল্পে ফেরা যাক – খুব খুব চেনা একটা মেয়ে গাঁজা খেতে গেলে তাকে বেশ কয়েকবার শুনতে হয়েছে ‘মেয়ে হয়ে গাঁজা?’ – একটা সরল প্রশ্ন, আমি ক্লাস টেনের পর বায়োলজি পড়িনি – তাই জিজ্ঞেস করছি – মেয়ে আর ছেলেদের ফুসফুসের গঠন কি আলাদা হয়?

৬) কিছুদিন আগে অবধি একটা ছয় বছরের ছেলের লিউকেমিয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে একটা ডোনেশান পেজ চালানো হচ্ছিলো। প্রত্যেকবার পোস্ট করার পর সাকুল্যে ৪-৫জন ডোনর জোগাড় হচ্ছিলো। শ্রীমতি সানি লিওনের একটা ছবি পোস্ট করা হলো। একরাতের মধ্যে ৪২টা লাইক পড়েছিলো।
৭) আমরা তিন বন্ধু এককালে নিয়ম করে মেয়ে দেখে রেটিং দিতাম। একবার মিনমিন করে বলেছিলাম ইন্ডিয়া ফ্রি সেক্স কান্ট্রি হলে কেমন হয়? উত্তরে আমায় শুনতে হয়েছিলে মেয়েরা উচ্ছন্নে যাবে! সমকাম সম্পর্ক ছাড়া সেক্সটা সম্ভবতঃ এক লিঙ্গের প্রাণী দিয়ে হয়না। মেয়েরা একাই উচ্ছন্নে যাওয়াটা কিরকম দাঁড়ালো?
৮) এতো কিছু যিনি লিখলেন তিনি ওয়ার্ল্ড বিফোর হারে মিস ইন্ডিয়া পেজেন্টের বিকিনি রাউন্ডের দৃশ্য চলাকালীন – যথেষ্ট মন দিয়ে একজন প্রতিযোগিনীর নিতম্বের স্ট্রেচ মার্কস দেখছিলেন।

পৃথিবীর সামনে সে, তার সামনে পৃথিবী

ওয়ার্ল্ড বিফোর হার সর্বসাকুল্যে একটি ডকুমেন্টারি। প্রবাসীনি ফিল্মমেকার নিশা পাহুজার ছবি। ভদ্রমহিলা কানাডায় থাকেন। এই ছবিটি ভারতে রিলিজ করার জন্য ক্রাউডফান্ডিং জোগাড় করতে হয়েছিল। নন্দিতা দাশ থেকে অনুরাগ কাশ্যপ অনেকেই নিজেদের এলেমের জোড়ে কয়েকটি শহরে ছবিটি রিলিজ করিয়েছেন গত সপ্তাহের শুক্রবার।ছবিটিকে এখনো পর্যন্ত ২০১৪ সালের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট ছবি বলা হচ্ছে।
ছবিটার গল্পটা দু’লাইনে বলতে গেলে পাশাপাশি দুটো প্যারালাল ট্র্যাক চলে – একটা মিস ইন্ডিয়া পেজেন্টের জন্য লড়াই করা প্রতিযোগিনীদের। একটা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুর্গা বাহিনীর জন্য নাম লেখানো মেয়েদের।
মৃণাল দেশাই আর ডেরেক রজারসের ক্যামেরা কাঁটছাঁটহীন রুখুসুখু। সম্ভবতঃ ক্যানন ফাইভ ডি অথবা সেভেন ডি জাতীয় কোনো ডিএসএলআর ব্যবহার হয়েছে।
ডেভিড কাজালার এডিটিংয়ে দুখানা প্যারালাল গল্পের মধ্যে জোড়টা লাগানো হয়েছে নিতান্ত নিপুণতায়। কোথাও কোনো খোঁচ বেরিয়ে থাকেনি।
আর বিশ্বাস করুন আমি ছবিটা দেখতে বসে টেকনিকাল কিছু দেখার কথা মনে রাখতে পারিনি।রাখা উচিৎ নয় বলেই মনে হয়।
গল্পটা আর একবিন্দু বলবো না। শুধু কয়েকটা জিনিস দেখার জন্য ছবিটা এই মেয়েবাজের কাছে ভারতীয় মেয়েদের নিয়ে করা সর্বকালীন ক্লাসিক হয়ে যেতে পারে মনে হচ্ছে।
১) পূজা চোপড়া, মিস ইন্ডিয়া ২০০৯কে জন্মের পর তার বাবা মেরে দিতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় কন্যা সন্তান বলে।
২) অঙ্কিতা শৌরি, মিস ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশানাল ২০১১ বিকিনি শটে কম্ফর্টেবল নয়। কিন্তু লিব্যারাল নতুন পৃথিবীর বিউটি পেজেন্টের তাতে কি এসে গেল?
৩) দুর্গা বাহিনীর স্কোয়াড লিডার প্রাচীকে তার বাবা ছোটোবেলা মিথ্যে বলার জন্য গরম লোহার রডের ছ্যাঁকা দিয়েছিলেন। হেমন্তবাবুর ভাষায় – মিথ্যে বলা উচিৎ নয় বোঝাবার জন্যই।
৪) একটি ১৭-১৮ বছরের মেয়ে আছে দুর্গা বাহিনীর ক্যাম্পে – সে ক্যাম্প থেকে ফিরেই সমস্ত মুসলিম বন্ধুকে পরিত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করলো – অন ক্যামেরা।
৫) ওদের সবার খুব ভয় করে।
সম্ভবতঃ আপনারা কেউই ছবিটা প্রেক্ষাগৃহে দেখার ঝামেলায় যাবেন না। কোলকাতা শহরে একটিমাত্র হলে সকাল দশটা আর রাত্তির সাড়ে আটটায় দুটো শো চলছে। সাকুল্যে জনাদশেক লোক এক একবারে ছবিটা দেখছে। এই শুক্রবার অর্থাৎ ১৩ই জুন,২০১৪ ছবিটা বাঙলার বুক থেকে বিদায় নিলেও বলার কিছু থাকবেনা।সোজাসাপ্টা আঁতেল ইগো ম্যাসাজ না করা এবং রিমিক্স রবীন্দ্রসঙ্গীতহীনা অফবিট ছবি হলে দেখার ঝক্কি নেয় আর কোন বং ইন্টেলেকচুয়াল?আর কোন বোকা প্রেক্ষাগৃহই বা সেটা বেশিদিন চালায়?
কোলকাতা শহরে নন্দন বলে একটা জায়গা ছিলো না?

ফেয়ারার সেক্সের প্রতি

গতকাল ফেয়ারনেস নিয়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছে এদেশে – তার আগে অবধি ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনে দিয়ে দায়িত্ববান স্বামী সেজেছি। মাঝেসাঝে নিজের রোজগারে তুমি নিজেই কিনেছো – তখন তুমি নিজের হলে ইচ্ছেয় অনিচ্ছেয় জাপটেছি – পরের হলে তোমার কথা ভেবে রাত্তিরে আশ মিটিয়েছি একান্তে।
তুমি ভার্জিন নয় খবর পেয়ে দুই বামপন্থী বন্ধু মিলে বসে বলেছি – ‘সে কিরে মেয়েটা ভার্জিন নয়?’ নিজে ভার্জিন হওয়ায় শুনেছি – ‘সে কি তুই এখনো ভার্জিন?’
আমাকে নিয়ে যখন তোমার আর তোমার মধ্যে ঝগড়া লেগেছে ইগো ম্যাসাজ করতে করতে খবরের কাগজে মন দিয়েছি।
তোমার ট্যালেন্ট থাকলে বলেছি – ‘মেয়ে তো একটু সুবিধে থাকেই’। নিজের থাকলে বলেছি –‘এটা আমার সহজাত’। নিজের না থাকলে বলেছি – ‘কপালের দোষ’। তোমার না থাকলে বলেছি – ‘শুধু জিনিস থাকলেই কি হয়?’
তোমাকে না বুঝতে পেরে তোমাকেই ইমোশনাল বলেছি। আর তোমাকে না বোঝাতে পেরে নিজেকে লজিকাল থিঙ্কার ভেবেছি।

আজ অবধি বিয়ে করার সময় মানতে পারিনি তুমি আমার চেয়ে বয়েসে বড়ো অথবা কিছুটা বেশি রোজগার করো। অথচ নির্ভয়ার জন্য মিছিলে হেঁটেছি, ফেসবুকে চেক ইন করতে ভুলিনি।
তোমার জন্য দিস্তে দিস্তে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলেছি। তারপর তুমি নাকি হেসে বলেছো ক্রিয়েটিভরা একটু মেয়েদের বেশি ইয়ে করে। আর এই লেখার শুরুতে শ্যালো কনফেশনটা পড়ে তুমি বোধহয় অনেস্ট ভাবছো আমাকে। বিশ্বাস করো সবাই পান-বিড়ি-গান - কবিতা - সফটওয়্যার বিক্রি করে – সেই বাজারে আমার কিলো দরে অনেস্টি বিক্রির দোকান আছে। তুমিও ভূতে পাওয়ার মতো সেখানে ঘুরে ঘুরে আসো।
‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’। এখনো নিজেকে মানুষ ভাবার জেল্লায় তুমি এতো ডগোমগো দেখে মাঝে সাঝে বেজায় আহ্লাদ হয় – সত্যি তোমার আশাবাদের শেষ নেই।
পারোও বটে তুমি!!!

মেয়েবাজের এপিলগ

বিশ্বাস করুন নারীবাদ কিম্বাকে নারীকে বাদ দেওয়ার কোনোটাতেই আমার বিশেষ আগ্রহ নেই। আমি ওই মেয়েবাজ হয়েই আজি হতে আরো বছর চল্লিশেক বাঁচতে চাই।

আপনার মতামত জানান