চলচ্চিত্র আলোচনা-চার

সরোজ দরবার

 


একটা ছবি। চারটে গল্প। পরিচালক সন্দীপ রায়।
অবধারিত ভাবেই মনে পড়ে যাবে ‘যেখানে ভূতের ভয়’ ছবির কথা।
কিন্তু কাহিনিকারের নাম আর বেশ কয়েকজন অভিনেতা ছাড়া ‘চার’-এর সঙ্গে তার কোনও মিল পাওয়া যাবে না। তা বলে এ ছবিতে ভূত নেই তা নয়, কিন্তু ভূতকে থিম করে ছবি আবর্তিত নয়। ঠিক এই জায়গাতেই একই ধরনের আগের ছবি থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন পরিচালক সন্দীপ রায়।
ছবিটির ভিতরে চারটে আলাদা ছবি আছে। প্রথমটি পরশুরামের কাহিনি নিয়ে ‘বটেশ্বরের অবদান’। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি সত্যজিৎ রায়ের কাহিনি নিয়ে যথাক্রমে ‘দুই বন্ধু’ ও ‘কাগতাড়ুয়া’। এবং শেষটি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনিতে ‘পরীক্ষা’। (আগের ছবির সঙ্গে এখানে একটা মিল আছে যে, সন্দীপ ‘যেখানে ভূতের ভয়’ও শেষ করেছিলেন শরদিন্দুর কাহিনি দিয়েই।)
ছোটগল্প নিয়ে আলাদা আলাদা করে ছবি করার ট্র্যাডিশন নতুন তো নয়ই, বরং হলি, বলি ছেড়ে দিন, টলিপাড়াতেও এই ফর্মের ছবি হয়েছে। কখনও একজন পরিচালক, কখনও আবার বেশ কয়েকজন পরিচালক মিলে। ‘তিনকন্যা’ ‘একমুঠো ছবি’ থেকে শুরু করে সন্দীপেরই ‘যেখানে ভূতের ভয়’, কিংবা ‘ল্যাপটপ’ বা ‘পেন্ডুলাম’ ছবিগুলোতেই একটা সিনেমার মধ্যেই একাধিক গল্পের খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রত্যেকটিতেই গল্পগুলো আলাদা হলেও কোনও না কোন ভাবে তাদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। কোনটায় আবার একটা থিমকে ঘিরেই কিছু গল্প ঘোরাফেরা করে(‘তিনকন্যা’, ‘যেখানে ভূতের ভয়’, ‘একমুঠো ছবি’)। কোনটায় আবার একটি বস্তু(‘ল্যাপটপ’) বা কোন একটা ঘটনা(‘পেন্ডুলাম’) গোটা ছবির ন্যারেটিভে বিনি সুতি মালা হয়ে ওঠে।
কিন্তু সন্দীপের চার এই প্রথাগত প্যাকেজ ফিল্ম বা অ্যান্থলজি ফিল্মের পথে হাঁটেনি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট করে কোন একটা থিমে তিনি এ ছবিকে বেঁধে দেননি। আবার এ ছবি হাইপারলিঙ্ক সিনেমাও নয়। অর্থাৎ সময় আর স্পেস নিয়ে খেলা, তাতে চরিত্রদের আনাগোনা, কিংবা এক ঘটনা থেকে আর এক ঘটনার অন্তর্বুনন এসবও নেই। বরং অনেকাটাই কমপোজিট ফিল্ম বলা চলে।আসলে এ ছবির মেজাজটা যেন অলস বিকেলে একখানা ছোটগল্পের বই হাতে নিয়ে বসে পড়ার মতো। তারপর পাতার পর পাতা উলটে যাওয়া আর আলাদা গল্পের স্বাদ পাওয়া। আর সে বই যদি আবার হয়, সংকলন তবে তো গল্পের নির্মাণশৈলিতেও আলাদা আলাদা বৈচিত্রের খোঁজ। সন্দীপের এ ছবি যেন হালকা মেজাজে সেলুলয়েডে বই পড়া।
যে চারটি ছোটগল্প পরিচালক বেছে নিয়েছেন, সেগুলো নিজগুণে বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম সেরা কিছু ছোটগল্পের মধ্যে পড়বে। অন্তত কাজের চাপে যাঁরা বইমুখো হতে পারে না, আর যে প্রজন্ম এমনিই বইমুখো নন, তাঁরা এ ছবি দেখতে দেখতে বাংলা ছোটগল্পের ঐতিহ্য নিজেদের ধমনীর রক্তচাপে টের পাবেন। দ্বিতীয়ত প্রচন্ড বৌদ্ধিক দীপ্তি ছড়িয়ে যে সব সিনেমা হয়, কিংবা হাস্যরসের আড়াল থেকে অন্তর্লীন বার্তাখানি খুঁজে পেতে পেতে হাসির দায়ে মগজ বিক্রি হয়ে যায়- এ ছবি তার ধারকাছ মাড়ায়নি। চলচ্চিত্রের ভাষায় বলা কিছু গল্প দেখতে ভালো লাগে তাদের উপস্থাপনার সারল্যের জন্যেই।
সন্দীপ সেই সমস্ত অভিনেতাদেরই নিয়েছেন সঠিক চরিত্র পেলে যাঁরা বলে বলে চার মারতে পারেন। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় তো একই ছবিতে দুটো আলাদা গল্পে। ‘কাগতাড়ুয়ায়’ অনেকটা সময় কোন সংলাপ ছাড়াই শুধু অভিব্যক্তিতে অভিনয় করেছেন। আদতে বব বিশ্বাস তো, সুধু অভিনয় দিয়েই...। অন্যদিকে যেমন আবীর তেমন রজতাভ। যেমন শ্রীলেখা, তেমনই সুদীপ্তা। কোয়েল মল্লিককে চল্লিশের দশকের প্রেক্ষাপটে দেখা যাবে। এ ছবির সঙ্গে তিনি আপ্রাণ মানিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর হ্যাঁ পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছবির কিছু দৃশ্যে তাঁর অভিনয় দেখে মনে হতে বাধ্য যে বাংলা ছবির অনেক মনি মুক্তোই এখনও অবশিষ্ট আছে।
তবে এ ছবির অনেকটা কৃতিত্ব নিয়ে চলে যাবে বাংলা ছোটগল্প। সিনেমা সাহিত্যের কাঁধে কতখানি হাতখানি হাত রাখবে, আর কতটা নিজের পায়ে চলবে-সে নিয়ে অতীতে বহু আলোচনা হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে নির্মিত একটা ছবির সিংহভাগ প্রশংসা যদি সাহিত্যের ঘরে জমা হয়, তাহলে সিনেমার অন্দরমহলে আবার টানাটানি পড়ে যাবে না তো? যদি পড়ে সে দায় অবশ্যই পরিচালককে নিতে হবে।
তাহলে ছবিটা কি দেখতে যাবেন? বাংলা ছবি দেখতে কি ভালোবাসেন? ছোটগল্পের অন্তিম মোচড় কি আপনাকে টানে? তাহলে ফুটবলের এই ভরা মরসুমে, এরকম সোজা সাপটা একটা ‘চার’ দেখতে পেলে মন্দ কী বলুন!
ছবি- চার
কাহিনি- পরশুরাম, সত্যজিৎ রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিনয়- শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত,আবির চট্টোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র, সুদীপ্তা চক্রবর্তী।
পরিচালনা-সন্দীপ রায়


আপনার মতামত জানান