অতিনাটকীয় দারোগা দাওয়াই

সরোজ দরবার

 


ছবি- বঙ্কু বাবু
পরিচালক - অনিন্দ্য বিকাশ দত্ত
অভিনয় - শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, লাবনি সরকার, অর্জুন চক্রবর্তী, অরুণিমা ঘোষ।
সংগীত - দেবজ্যোতি মিশ্র


পেটরোগা বাঙালির মজলিসে দারোগার দল চেহারায় না হোক চেয়ারের জোরে খানিকটা সম্ভ্রম আদায় করে নেন। অবসরপ্রাপ্ত দারোগা বঙ্কিমচন্দ্র চৌধুরীর নামখানা ছোট করে ‘বঙ্কু’ করলেও, পরিচালক অনিন্দ্য বিকাশ দত্ত বাঙালি স্বভাবেই তার পাশে একখানা ‘বাবু’ বসিয়েছেন। অর্থাৎ বঙ্কু দারোগা হলেন বঙ্কুবাবু। এবং তাঁর সঙ্গেই বেশ খানিকটা সময় কাটানোর অবকাশ রচনা করে দিয়েছেন পরিচালক।

বঙ্কুর ঘর বাড়ি

সে এক আজব বাড়ি মশাই। বাড়ির মানুষগুলো ভালোই, কিন্তু ওই একটু পাগল পাগল গোছের। দুই ছেলে, দুই বউমা, নাতি, মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে বঙ্কুবাবুর ভরা সংসার। যৌথ পরিবার। ইদানিং বাংলা ছবিতে যা কমই দেখা যায়। তো এই পরিবারের অবিসংবাদিত কর্তা বঙ্কু। তাঁর হাঁক ডাকে বাঘে গরুতে প্রায় একঘাটে জল খাওয়ার সমান। বঙ্কুর চরিত্রের মধ্যে খানিকটা কমল মিত্র সুলভ জেদ পাবেন, কখনও আবার তিনি ছবি বিশ্বাসসুলভ গম্ভীর। বঙ্কু নিজে অবশ্য রাজেশ খান্নার ফ্যান। তো গল্প এগোয় কখনো বঙ্কুর বাড়ির লোককে কেন্দ্র করে, কখনও আবার খোদ বাড়িটাকে কেন্দ্র করে। সকালে ফুলগাছের টবে জল দেওয়া, আর সন্ধ্যেয় শাঁখ উলু দেওয়া বাড়িটাকে দেখতে মন্দ লাগে না। কিন্তু সমস্যা একটাই, বাড়ির অনেকগুলো ঘরের মতোই গপ্পো কখনো এ কক্ষে কখনো কক্ষে ঢুকে পড়ে, শেষমেশ বসার জায়গা না পেয়ে পার্কে কিংবা রাস্তায় গড়িয়ে গেছে। যৌথ পরিবারের অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা তো থাকবেই, অতীতে বাংলা ছবি তার সুচারু বিন্যাসের সাক্ষীও থেকেছে। পরিচালক বঙ্কুবাবুর ঘর সংসারটিকে আর একটু গুছিয়ে দিতে পারতেন।

বঙ্কুর বাড়াবাড়ি

‘আতঙ্ক’ ছবির মাস্টারমশাইকে মনে আছে? বঙ্কুবাবু আর তাঁর বয়স প্রায় কাছাকাছি। দুজনের চেহারাতেও যেন বেশ কিছু মিল আছে। খেয়াল করলে চোখে পড়বে, বলিউডের ধুম টু বা ভূতনাথ রিটার্নসের মেকআপম্যান ধনঞ্জয় প্রজাপতি যেভাবে বঙ্কুবাবুর চোয়ালের দুপাশ একটু ঝুলিয়ে দিয়েছেন, ঐ মাস্টারমশাইয়েরও তাই ছিল। (পড়েছিলাম,মুখের মধ্যে সুপারি পুরেই নাকি সে কাজ সমাধা হয়েছিল, এবং তাঁর পারফেকশন নিয়ে বাঙালির মনে কোনও সন্দেহ নেই।)মাস্টারমশাই এবং বঙ্কুবাবু দুজনকেই দেখা যাবে লাঠি দিয়ে গুন্ডা ঠ্যাঙাতে। তবু আকাশে ও পাতালে কখনই দেখা হবে না। কখনই বঙ্কুবাবুর কাজকর্ম সেই অভিঘাত বয়ে আনবে না, যা মাস্টারমশাই এনেছিলেন। তুলনাটা এঁদের দুজনের মধ্যে নয়, তুলনাটা দুই ধরনের বাংলা সিনেমার মধ্যে। বঙ্কুবাবুর সব কাজেই পরিচালক স্বেচ্ছায় একটু বাড়াবাড়ি মিশিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ বঙ্কুবাবু পুরোমাত্রায় মেলোড্রামাটিক। ছবিতে মেলোড্রামার ব্যবহার অবান্তর নয়। যে সিনেমা ব্যবস্থায় স্টার ফাংশন আছে সেখানে অবধারিত ভাবে মেলোড্রামা আসতে বাধ্য। কারণ সেখানে সেই চরিত্রইরাই থাকবে, যাদের সম্পর্কে বলা হয়, ‘who can be guaranteed to think, speak and act exactly as you would expect’. রবি বাসুদেভন তাঁর ‘দ্য মেলোড্রামাটিক পিপল’ বইখানায় আরও বিস্তারিত ভাবে বুঝিয়ে দেন, ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার এবং এক্সপ্রেসিভ ফর্ম হিসেবে মেলোড্রামার গুরুত্ব। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক যোগসূত্র ঘটানোর সংযোজক হিসেবে এই ফর্মের ব্যবহারও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু অনিন্দ্যবাবুর কি সত্যিই সেরকম কিছু প্রয়োজন ছিল? বঙ্কুবাবুর গল্পের ভিতর দিয়ে ওল্ড এজ ক্রাইসিস, যৌথ পরিবারের নবদম্পতির সমস্যা কিংবা বসত বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট ওঠা গোত্রীয় যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো মেলোড্রামা ছাড়াও হয়তো তিনি বলতে পারতেন। অন্তত তাঁর অতীত পরিচালকরা এহেন সমস্যার কথা বলেননি যে তা নয়। অযথা বঙ্কুবাবুকে লার্জার দ্যান লাইফ না করে তুলে শুধু লাইফে রাখলেও বঙ্কুবাবুর জয় এনজয় করতেন দর্শকরা। ফর্মের ব্যবহারে পরিচালকের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিয়েও মনে হয়, ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির আগেই সত্যজিৎ তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধে বাংলা ছবির শরীরে অতিনাটকীয়তার দাগুগুলিকে চিহ্নিত করেছিলেন। বলা যায় সেই চিন্তাভাবনা থেকেই বাংলা ছবি নতুন ভাবে বলার ভাষা ও আঙ্গিক পেয়েছিল। ওদিকে ঋত্বিককুমার ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় মেলোড্রামার ব্যবহার নিয়েও একদা সরব হয়েছিলেন তাঁরই এক সমসাময়িক পরিচালক। সে ব্যবহার এখনও সিনেপ্রেমীদের বিতর্কে মাতিয়ে দেয়। এবং হ্যাঁ মেলোড্রামা যদি হয়েও থাকে, তবু ঋত্বিকের ব্যবহারকুশলতা তাকে শিল্পের আসন ছেড়ে দিয়েছিল, এবং ঋত্বিক প্রমাণ করেছিলেন সেই ব্যবহার কতখানি সার্থক। আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে আবার যখন অতিনাটকীয়তার দিকেই সামনেই হলভর্তি দর্শককে তাকিয়ে থাকতে হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে বাংলা ছবির গতিপথের পুর্ণমূল্যায়ণ কি অতিমাত্রায় জরুরী হয়ে উঠেছে? নাকি বাংলা ছবির জাতিস্মর হওয়ার দায় নেই, বরং দাবাং পথে পা বাড়ানোটাই তার নিয়তি?


বাকিটা ব্যক্তিগত

শুধু ভালোবাসার ভিতরেই নয়, সিনেমার ভিতরেও একটা মিথ্যে থাকে। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা জানেন সেই মিথ্যেটাকেই ভীষণ ভালো বাসছে সবাই। তিনি তাই পুরোমাত্রায় বঙ্কুবাবুর মিথ্যেগুলোকে সত্যি করে তুলেছেন। পরিচালক এদিকে ১০০ শতাংশ নির্ভুল। শাশ্বত ছাড়া বঙ্কুবাবু সম্ভব হত না।আর রজতাভ দত্ত। যখন পরদায় এসেছেন জানিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি কোন মানের অভিনেতা। অর্জুন-অরুণিমার জুটিটা দর্শক টানার জন্যেই তৈরি। লাবনি সরকারকে আগেও আপনি ভালো অভিনয় করতে দেখেছেন, এখানেও তাইই দেখবেন।ছবিতে ড্রিম সিকোয়েন্সে দেবজ্যোতি মিশ্রর সুরে তুলতুলি একখানা আইটেম সংও ঢোকানো আছে। সংলাপে দেদার মজা পাবেন। তেতুলপাতায় ন’জন থাকার বার্তা পাবেন। আবার শীতকালে একা বঙ্কুবাবুকে সোয়েটার পরে, বাকিদের বেশিরভাগ সময় স্রেফ শাড়ি কিংবা জামাতেই দেখতে পাবেন। আবার কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমোতেও দেখবেন। বাংলা ছবির এমনিতেই বাঙালি প্রযোজক হাতে গোণা, তবু অবাঙালি প্রযোজকের পয়সায় বঙ্কুবাবুকে ব্যাংককে ঘুরতে যেতেও দেখবেন। আনোয়ার শাহ থেকে অর্জুনকে গড়িয়া-বিবাদীবাগের বাস(চলে কি আদৌ,যদি চলে ভুল মার্জনা করবেন) ধরতে দেখবেন। ঝাঁটা হস্তেনও সংস্থিতা বউমা দেখবেন। দাবাং দারোগাও দেখতে পাবেন। কিন্তু অভিনেতা থেকে সংলাপ- সব উপকরণ গুলোই খাঁটি ছিল। কেবল মাত্রার হেরফেরে রান্নাটা একটু চড়া ঝাল-নুন হয়ে গেল। তাহলে ছবিটা কি দেখবেন?এটুকু বলা যায় বেশ কিছু জিনিস আপনি না চাইলেও দেখতে পাবেন, বাকিটা ব্যক্তিগত।



আপনার মতামত জানান