শেষ বলে কিছু নেই

সরোজ দরবার

 

সেই তো শেষবেলায় গানের কনসার্ট। অ্যালবাম প্রকাশ। যার অ্যালবাম প্রকাশ সে বিখ্যাত হয়ে যাবে। আর যার দৌলতে অ্যালবাম তিনি শেষ সিনে হাওয়া হয়ে যাবেন। তাহলে ‘শেষ বলে কিছু নেই’ আর ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’র মধ্যে তফাৎ কোথায়? তফাৎটা আসলে আক্ষরিক অর্থেই দত্ত ভার্সেস দত্ত। যে অঞ্জন দত্ত তথাকথিত মশালা ছবিতে হাত পুড়িয়ে টলি টকিজে গণেশ উল্টেছিলেন ভার্সেস যে অঞ্জন দত্ত গানে অভিনয়ে এবং পরিচালনায় আমাদের খুব চেনা। যার গানের স্রেফ গীটারটুকু বাঝলেই আমরা বুঝে যাই, তুমি আসবে বলে তাই...। এক অর্থে এ ছবি সেই ভিন্টেজ অঞ্জনকে খুঁজে পাওয়ার ছবি। অঞ্জনের কমবেশি একইরকম ছায়াছবি যাত্রায় এই ছবিটা তাই একটু অন্যরকম গুরুত্বের দাবিদার।
১৯৯৪ সাল নাগাদ বেরিয়েছিল গানটা যার একটা লাইনই এই ছবির শিরোনাম...গানের মধ্যে কয়েকটা কথা লিখেছিলেন অঞ্জন এই ছবির বাঁধনদার হিসেবে সেগুলিই বোধহয় সবথেকে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কথাগুলো এরকম- যেমন মাঝ দরিয়ার নৌকা ফেরে কিনারায়, ওরে মানুষ যখন আছে তখন হাতও জুটে যায়... শেষ বলে কিছু নেই...। গল্পটা আসলে এই কটা লাইনই। ড্রাগের নেশায় আসক্ত ছেলেকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে এক বাবা পণ করেছন ছেলের বন্ধুকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনবেন। ফিরিয়ে আনার সোপান হচ্ছে মিউজিক। আসলে অঞ্জন দত্ত আর তার গীটারকে তো আলাদা করা যায় না। এ ছবিও করতে পারেনি। কিন্তু কথা হল স্রেফ টেকনো ইন্ডিয়া প্রযোজক বলেই কি অঞ্জনের মতো পরিচালক একখানি সমাজসেবক মূলক ছবি করলেন? অঞ্জনের কি তার দরকার ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে দাঁড়িয়েই অঞ্জন আমাদের ভাবান। ভাবায় অঞ্জনের মিডিয়ায় চাকরি করা বন্ধুটি। নিজের আসল কথাটি বলবার জন্য এই কুণাল নামের চরিত্রটিকে ডেকে এনেছেন। যে আমাদের ধরিয়ে দেয় এই কলকাতার ৩০ বছরের বদলে যাওয়ার কথা। বলে দেয় ৩০ বছরের আমাদের ব্যক্তিসত্ত্বার বদলের কথ। যে বন্ধুটি প্রশ্ন তুলে দেয়, একটা দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ের প্রেক্ষিতে কেউ কি রিপ ভ্যান উইঙ্কল হয়ে বাঁচবে নাকি সেও দেখার চোখটা পালটে নেবে? মজা হল, এই বুন্ধুটির চরিত্রে অভিনয় করেছেন বহুদিন আগে রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে থিয়েটারে এ প্রশ্ন তোলা ব্রাত্য বসু।
কলকাতা বদলে গেছে। বদলে গেছে তার ঘাম রক্তের আস্বাদ। অঞ্জন সেটা জানেন। জানেন তার জেনারেশনের অনেকেই। কিন্তু অনেকে যখন সব শেষ হয়ে যাওয়ার আক্ষেপে চশমার কাচ মোটা করছেন, তখন অঞ্জন বলছেন শেষ বলে কিছু নেই। মনে পড়ে তাঁর পূর্বসূরী লিখেছিলেন, সন্ধে নামার সময় হলে , পশ্চিমে নয়, পূবের দিকে, মুখ ফিরিয়ে দেখব আমি, কোনদেশে রাত হচ্ছে ফিকে? সন্ধে তো নামবেই, তবু এই যারা কলকাতাকে ভালোবেসে , কলকাতারই প্রেত হয়ে থেকে যেতে চান, এই যারা আত্মা-পরমাত্মা সুলভ বিষয়গুলোকে সযতনে অস্বীকার করে (কমিউনিস্ট না হলেও চলবে), তাঁরা তো পরবর্তী প্রজন্মের দিকে তাকিয়েই প্রত্যক্ষ করবেন সূর্যোদয়? তবে কি এ ছবি প্রজন্মের আয়নায় অঞ্জনের আত্মশুদ্ধি? নিজের সময়ের সারটুকু পরের সময়ের হাতে তুলে দিতে চাইছেন, সেই সময়টার শুদ্ধিকরণ করেই? আমরা কিন্তু জানি, শেষ বলে কিছু নেই?
তবু ড্রাগবিরোধী ছবিতেও আপনি অন্তত কয়েক প্যাকেট সিগারেটের খান্ডবদহন দেখবেন। যাকগে স্ক্রিনেও অবশ্য লেখা ছিল, স্মোকিং কিলস, ছবির চরিত্ররাও সেই বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে দেবে। অঞ্জনের এই গানটি ছাড়া সংগীত পরিচালক নীল দত্তকে আর বিশেষ কিছু করতে হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে হ্যাঁ আবহসংগীতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় ডিওপি সুপ্রিয় দত্তের কথা। কাটশটে কলকাতা না দেখিয়েও যে কলকাতার মেদ মজ্জা তুলে ধরা যায়, দেখিয়েছেন তিনি। দেওয়ালে কাস্তে হাতুড়ির পাশেই যখন সরস্বতী মূর্তিকে প্রণামরত বৃদ্ধকে দেখবেন, কিংবা বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে যেতে যখন পাশের ছেলেটিকে প্যান্টের উপর চুলকাতে দেখা যায়, তখন মনে হয় এ কলকাতাকে চেনে না ভিক্টোরিয়ার পরী, অথচ এ কলকাতাতেই আমরা ঘুরি। ছবির মেকিংয়েও অঞ্জন তাঁর ভিন্টেজ টাইম স্পেস ভাঙ্গা বং কানেকশন ধরন বজায় রেখেছেন। ফলত ছবিটা বার্তা, অন্তরাল বার্তার চোটেও নেতিয়ে পড়েনি। টানটান। সম্পাদক বোধাদিত্য বন্দোপাধ্যায় তার জন্যে অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন।
বহুদিন আগে অঞ্জন দত্ত একটি টেলিফিল্ম পরিচালনা করেছিলেন। ‘আমার বাবা’ নামে সে টেলি ছবিতেও বাবা-ছেলের অদ্ভুত এক রসায়ন ছিল। একই জুটি ফিরল এখানেও। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অঞ্জনের নিজের অভিনয় বসে দেখার মতো।যীশু সেনগুপ্ত যেখানেই সুযোগ পান নিজেকে প্রমাণ করেন, এখানেও করেছেন। তবে ভালো লাগবে শুভশ্রীকে দেখে। বেশি কিছু না বলে এটুকু বলা ভাল, এরকম শুভশ্রীকে আগে দেখেননি।
শেষ বলে কিছু না থাকলেও রিভিউয়ের শেষ আছে। এবার ছবিটা দেখবেন কিনা সে প্রশ্ন। আচ্ছা বলুন তো ২৪৪১১৩৯, এটা কার নম্বর? যদি একচান্সে বলে ফেলতে পারেন তাহলে অবশ্যই ছবিটি দেখে আসুন।
...................................................
শেষ বলে কিছু নেই
পরিচালকঃ অঞ্জন দত্ত
অভিনয়ঃ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, যীশু সেনগুপ্ত, শুভশ্রী, ব্রাত্য বসু।
সংগীত- নীল দত্ত


আপনার মতামত জানান