বাংলা প্যাকেটে দক্ষিণের পিৎজা কিংবা রিমেকের ভূত

সরোজ দরবার

 

বাংলা প্যাকেটে দক্ষিণের পিৎজা
সরোজ দরবার

টালিগঞ্জকে বেশ কিছুদিন হল ভূতে পেয়েছে। কিন্তু মুশকিল যেখানে ভূতের ভয়, সেখানে হাসি পায়। ভূতের ভবিষ্যতে কাটকাট মারমার হিউমার। কিন্তু গা ছমছমে ভয় ভয় ব্যাপারটা মিলবে কোথায়? নিম্নচাপের দৌলতে না হয় খানিক বৃষ্টি বাদলা পেলেন, তেলেভাজাটা ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে কিনে নিলেন, কিন্তু সিনেমায় ঐ গা ছমছম ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিচালকের হাতে। তো বাংলাতে হরনাথ চক্রবর্তী মশাইয়ের একটাও ছবি হরর ফিল্ম না হলেও, বিরসা দাশগুপ্তের ছবিটি সেই ঘরানারই। তবে সেটা সত্যি না গল্প ,সেটাই একটু খুলে বলার।

তামিল ছবি পিজ্জার পোস্টার

ছবির গল্পটা হল... আরে ভূত দেখবেন না। বালাই ষাট, হরর ফিল্মের গল্পটাই বলে দিলে আর থাকে কি? এই ধরুন শাটার ছবিতে যদি বলে দেওয়া হয় কলেজের গল্পটা তাহলে তো বলতে হয় কি বোর্ডে ভূত চেপেছে। ঐ একটু আধটু আভাস দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সে ঝুঁকিও আমি নিচ্ছি না। একটু কষ্ট করে উইকিতে গিয়ে পিৎজা, তামিল ফিল্ম বলে টাইপ করুন, প্লট এসে যাবে। এবার আপনার যতটা দরকার ততটা পড়ে নিন।
তাহলে গল্প বাদ দিয়ে থাকল কি? হ্যাঁ অভিনয়ে দেদার ভয় ভয় ভাব থাকার কথা। এ ছবিতেও আছে। নানারকম সিচুয়েশন তৈরি করে নায়ককে তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নায়কও তার থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টায় ঘেমে নেয়ে সিনেমার বেশ কিছুক্ষণ ধরে যে কসরৎ চালালেন, তাতে একটা দমবন্ধ ভাব আসে বটে। আর বাকি থাকে আবহ সংগীত। সেখানেও চমকে দেওয়ার বেশ চেষ্টা আছে। ক্রমাগত টর্চের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে হলে বশে থাকা অন্যান্য দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আপনার মনে হতেই পারে, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? হরর ফিল্ম বলে কথা, ভয় ভয় না পেলে নিজেরই যেন কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে।
তারচে বরং শুরুর দিকে নায়ক-নায়িকার প্রেমপর্বটি দেখতে বেশ মিষ্টি লাগে। বড় পর্দায় ছবির নামটা দেখলেও একটু নস্ট্যালজিয়া কাজ করে। এই নামে বাঙ্গলা সিনেমায় একটা মাইলস্টোন আছে তো। একটা জিনিস দেখে মজা লাগল, পুরনো ছবিটার ভিতরে দেখেছিলাম রবি ঘোষ দুপুরের অবসরে বউ-ঝি দের সামনে ম্যাগাজিন থেকে উত্তমকুমারের কথা পড়ছেন। এ ছবিতে সোহমকে দেখা গেল নায়ক সমকালীন আর এক নায়ক দেবের নাচগানের দিকে তাকিয়ে আছেন। সিনেমার মানচিত্রে এক ছবির ভিতরে আর এক নায়কের রেফারেন্স থাকা সেই নায়কের অবস্থান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে এখনও সমালোচকরা সেই ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। এখানে ব্যাপারটা কি নেহাতই কাকতালীয় নাকি পরিচালক ভেবেচিন্তেই রেখেছেন?
ভাবনাচিন্তার কথা উঠল এই কারণে যে, সম্প্রতি নাকি টলি ইন্ডাস্ট্রির হাল খুব খারাপ। সেই মরা বাজারে জোয়ার আনতে অন্যতম ভরসা দেব। তাঁর ছবি যে বাজার থেকে পয়সা তুলে আনে, এ কথা গল্প না, নির্ভেজাল সত্যিই। নায়কের এই স্থানাঙ্ক যদি পরিচালক বুঝেই ব্যবহার করেন, তাহলে প্রশ্ন, তিনি এই ছবিটা খামোখা বানালেন কেন? বানিয়েছেন মানে তিনি তো আসলে রিমেক করেছেন। তাহলে কি আমরা তাঁকে ফিল্মমেকার বলব, নাকি ফিল্মরিমেকার বলব?

বাংলা ছবি নিয়ে যারা এত ভাবনা চিন্তা করেন, তাঁরা এই রিভিউয়ের শেষে তাঁদের কাছে একটি বিনীত প্রশ্ন, ইউ টিউবেই যে সিনেমা দেখা যায়, তাঁর রিমেক বানিয়ে , পরিচালক-প্রযোজক কোন অভিপ্রায়ে দর্শকদের হলে আসার কথা ভাবান? হ্যাঁ রিমেক দেখে ভাষাশিক্ষার যদি কোনও উদ্দেশ্য থাকে তবে আলাদা কথা। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে ভূতের গল্পের আকাল পড়েছিল বলে তো কোনওদিন শুনিনি। টলিপাড়ায় চিত্রনাট্যকারদের হরতাল এমন কথাও খবরে জানা যায়নি। তাহলে কেন এরকম হুবহু অনুবাদ? দু’বছর আগের বানানো পিৎজা কি টকটক হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক না? পরিচালক মশাই কী বলেন? আর যদি বলেন যারা আগের সিনেমাটি দেখেননি, তাঁরা উপভোগ করবেন, তাহলে বলি, একট মৌলিক গল্প দিলে তারা উপভোগ করতেন না এমন জবানবন্দীও তো কেউ দেয়নি। তাহলে কাকে ঠকাচ্ছি আমরা? নিজেদের সততার কাছে দাঁড়িয়ে হয় স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে বাংলা সিনেমায় মৌলিকতায় টান পড়েছে, না তো মেনে নেওয়া ভালো যে বড় অর্থলগ্নিকারীর ইচ্ছে অনিচ্ছের কাছে বিকিয়ে গেছে। এই দুটোর কোনও একটা না হলে তো মশাই দু বছর আগের পিৎজা বাংলা প্যাকেট থেকে বের করে আপনাকে গিলতে হত না।
টলি ইন্ডাস্ট্রির পোস্টারে দেদার ভূত দেখা যায়। কিন্তু হলের ভিতরে তার দেখা ইদানিং নেই বললেই চলে। তবে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে অনেকরকম ভূত আছে। তার মধ্যে অন্যতম হল রিমেকের ভূত। জেনেশুনে এই ভূতের খপ্পরে আর নাই বা পড়লেন!

..............................
গল্প হলেও সত্যি
অভিনয়- সোহম, মিমি, রজতাভ দত্ত, সায়নি
পরিচালক-বিরসা দাশগুপ্ত
সঙ্গীত পরিচালক- ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত



ওহ দুঃখিত এটা তামিল ছবির ট্রেলার ছিল
এবার বাংলা ছবির ট্রেলার দেখুন

আপনার মতামত জানান