ববি জাসুস

অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়

 


১৯৯২-এর দাঙ্গার কবলে পড়া এক সর্বহারা নিজের স্ত্রীর হত্যাকারীকে নিজের হাতে নিকেশ করে বাধ্য হয়ে তিন ছেলেমেয়েকে এদেশে ফেলে পালানোর কুড়ি বছর পরে ফিরে এসে তাদের খুঁজতে গিয়ে নেহাতই এক পাতি প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য নিয়ে তাদের খুঁজে পেলেও কেন সেই হারানিধিদের সামনে নিজের পরিচয় গোপন রাখে... পরিস্কার হলনা... শেষে জানা গেল এতদিন সে ছিল বিলেত নিবাসী... জানা গেল লন্ডন-এ সে কোনো এক স্টোরে হ্যান্ডমেড পেপার সাপ্লাইয়ের কাজে নিযুক্ত ছিল... কিন্তু সেই ‘কাগজ বিলি’ করে সে আজ এতই ধনাঢ্য যে সে মুখের সামনে দিয়ে একটিবার মাছি বিতারণের ভঙ্গিমায় হাত নাড়ালেই অবলীলায় খসে পড়ে দু’লাখ-তিন লাখ-চার লাখ!!! সন্তানদের খুঁজতে এসে ওঠে এক প্রাসাদোপম বিলাসবহুল হোটেলে!!! অহর্নিশি সাথে করে রক্ষী-অনুচর নিয়ে তার ঘোরাঘুরি!!! সেই অর্থে চালায় একটা অনাথ আশ্রম!!! ... পরিস্কার হলনা এগুলোও। কিন্তু তার দরকার ছিল খুব। কারণ যে ছবি ‘থ্রিলার’ বিভাগে নাম লেখায় তার ধর্মই হল ইন্টারভালের আগে অবধি পাকানো জট গুলোকে ইন্টারভালের পরে খুব ধীরে ধীরে ধৈর্জ নিয়ে খোলা। একটু তাড়াহুড়ো করেছো কি দু’একটা জট সুতোয় বাকি রয়েই যাবে... ফলে সিনেমা হলে পায়রা আর উড়বেনা!! এক্ষেত্রেও কতকটা তাই-ই হল!! মানে ভালো বাংলায় শেষটা ‘স্লাইট ঝুলে গেল’!! নইলে ছবিটা কিন্তু শুরু থেকেই বেশ চলছিল! দিব্যি চলছিল! ... নিজের ‘সত্যান্বেষী’ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চাওয়া ববি... জোরালো কেস না পেয়ে বাধ্য হয়ে ‘ছেলে সিগারেট ফুঁকছে কিনা’ কিংবা ‘মেয়ে অন্য ছেলের সাথে ফস্টিনস্টি করছে কিনা’ টাইপের নিঘিন্নে কেস সল্ভ্‌ করে দেওয়া ববি... তার পরিবার... হায়দ্রাবাদের মুঘলপুরার অলিগলি... রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের অন্দরমহলের যাবতীয় খুঁটিনাটি... রোজা পালন... ইফতার পালন... ঈদ্‌ মুবারক... এবং একসময়ে ববির কাছে এক রহস্যময় ব্যাক্তির আসা এবং কেবলমাত্র শরীরের বিশেষ কিছু চিহ্ন দেখে দেখে তিনজনকে খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া... এবং তা করতে গিয়ে ববির উদ্ভট সব কান্ডকারখানা এবং ছদ্মবেশ ধারণ... এর মাঝেই পরোটায় ঘি মাখানোর মতো হালকা করে প্রেম... সবকিছুই চিত্রনাট্যে বেশ ভালো করেই খাপে খাপ বসে গিয়েছিল কিন্তু... ছিল কাহিনীর মারপ্যাঁচ... ছিল ঝরঝরে সংলাপ... ছিল মজা... ছিল সুপ্রিয়া পাঠক-তানভি আজমি-রাজেন্দ্র গুপ্তার চাঁছাছোলা তুখোড় অভিনয়... ছিল আলি ফজলের সৌম্যকান্তি স্ক্রিন প্রেজেন্স এবং মার্জিত অভিনয়... অসাধারণ শিল্প নির্দেশনা... পোশাক... তবে আরও দুখানা গান যদি বাদ পড়ত মেদময়ী ছবি আরও একটু তন্বী হত। আর পরিচালকের বাকি যা ছোটখাট কম্প্রোমাইজ... যা সাদা চোখে ধরা পড়ে এবং যা সাদা চোখে ধরা পড়েনা সেসব কিছু নিয়েই “ববি জাসুস” দু’ঘন্টার একটি পরিচ্ছন্ন মনোরঞ্জন।


এই ভরা আষাঢ়ে কাদা পেরিয়ে যদি হল অবধি পৌঁছতে পারেন ভালো বই মন্দ তো লাগবেনা বলেই মনে হয়! আর হ্যাঁ... যাঁর জন্য মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি মাথায় করেও... কোমর ডোবা পাঁক পেরিয়েও এ ছবি দেখা যায়... সেই তাঁকে আমার মতে আগামী অলিম্পিকে ভারতবর্ষের হয়ে ভারোত্তোলনের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিলেই হয়... স্বর্ণপদক বাঁধা! নইলে সম্পূর্ণ গোটা একটা ছবির ভার নিজের কাঁধে তুলে এভাবে ছুটতে পারতেন!!!!! কি ক্ষমতা!! কি শক্তি!! কি অভিনয়!! THE VIDYA BALAN ... বলি অভিভূত করার আর কত টোটকা বাকি আছে আপনার ওই ব্যাকপ্যাকে??

আপনার মতামত জানান