চিরকালের বাবাদের কথা

কৌশিক মজুমদার

 


এই সিনেমায় ডিজনি আছেন। এটি ডিজনির সিনেমা নয়।এই সিনেমায় "মেরি পপিন্স" বানানোর ইতিহাস আছে। কিন্তু এটা গড়পড়তা making of a film ও নয়। আসলে এ হল চিরন্তন বাবাদের গল্প। হাসি, কান্না, মজা সব কিছুর ফাঁকে নিরলস যে ধারা বয়ে চলে।


"মেরি পপিন্স" বইয়ের মলাট

লন্ডনের সতেরো নম্বর চেরি লেন বাড়ির ব্যাংক্স পরিবার আর তাদের বাড়িতে এক ঝড়ে উড়ুক্কু ছাতায় উড়ে আসা এক গভার্নেসকে নিয়ে ১৯৩৪ সালে "মেরি পপিন্স" বইটি লেখেন পামেলা "পি এল" ট্র্যাভার্স। ব্যাংক্সদের ছোট ছোট বাচ্চারা, জেন, মাইকেল, জন, বারবারার জীবন একেবারে বদলে দেয় মেরি-ম্যাজিকের মত। শত দুঃখ দারিদ্রের মাঝেও পৃথিবী যে কত সুন্দর, তা তাদের শিখায় সে। ধীরে বদলে যান খিটখিটে, কাজ পাগল মিঃ ব্যাংক্সও। অদ্ভুত এক ম্যাজিক রিয়েলিসম এর ছোঁয়া গোটা বইতে। প্রকাশমাত্রেই ক্লাসিকের মর্যাদা পেল এই বই। ঘরে ঘরে বাচ্চাদের কাছের মানুষ হয়ে উঠলো মেরি।
একদিন ওয়াল্ট ডিজনি তার দুই মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখলেন দুইজনেই ডুবে আছে একটা বইয়ের মধ্যে। "কি বই রে এটা?" জিজ্ঞেস করতেই বড় মেয়ে বলল, "সেকি বাবা!! তুমি মেরি পপিন্স-এর নাম শোননি!!" ছোট মেয়ে আবদার করলো, "তুমি এটা নিয়ে একটা সিনেমা বানাও না বাবা..." সেই রাত্রে জেগে বইটা শেষ করলেন ডিজনি। দেখলেন অসামান্য সিনেমাটিক উপাদান আছে এই বইতে। মেয়েকে কথা দিলেন তিনি বানাবেন এই সিনেমা..তার মেয়েদের জন্য।


দুই মেয়ের সাথে ডিজনি

আসল যন্ত্রণা শুরু হ'ল এইবার। লেখিকা "পি এল" ট্র্যাভার্স এক জাঁদরেল মহিলা। তিনি সিনেমা জিনিষটা পছন্দ করেন না। যদিও করেন অ্যানিমেশন তার দু'চোখের বিষ; আর ডিজনির কার্যকলাপ তো তার একেবারেই না পসন্দ। অতএব বারবার ডিজনি তাকে অনুরোধ করতে লাগলেন সিনেমা বানানোর অনুমতি দেবার জন্য...বারবার তিনি নাকচ করলেন। এভাবেই চলল কুড়ি বছর। এর মাঝে অনেক কিছু বদলে গেছে দুনিয়াতে। ট্র্যাভার্স তখন চরম আর্থিক সঙ্কটে ।



ডিজনি হাল ছাড়েন নি। প্রতি বছর একবার ক'রে অনুরোধ করে যাচ্ছেন, যদি রাজি হন লেখিকা। অবশেষে অভাবের কাছে প্রতিজ্ঞা হার মানলো। ট্র্যাভার্স রাজি হলেন ডিজনির অফারে। কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে। এক, সিনেমাটি কিছুতেই অ্যানিমেশন হবে না; দুই, গোটা স্ক্রিপ্ট আর ফিল্ম তদারক করবেন তিনি নিজে। নিরুপায় ডিজনি রাজি হলেন। ঠিক এই জায়গা থেকেই এই সিনেমাটি শুরু।

গোটা সিনেমাতে পরতে পরতে ফুটে উঠেছে দুইজন মানুষের কারুণ্য। একজন ডিজনি...যিনি এক চিরন্তন পিতা। মেয়েদের দেওয়া কথা পূরন করতে বদ্ধপরিকর। তার জন্য লেখিকার যে কোন দাবি মেনে নিতেও তিনি রাজি। ডিজনিসুলভ কোন ইগোকে তিনি প্রশ্রয় দেন না। তখন তিনি মেয়েদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক পিতামাত্র। লেখিকা পামেলার সমস্যা অবশ্য গাঢ়তর। তার ছেলেবেলা সুখের ছিল না মোটেই। তিনি তখন বাবার আদরের মণি হেলেন গফ। মদ্যপ বাবা আর অসুস্থ মা। তবু তারই মধ্যে বাবা চেষ্টা করতেন মেয়ের মুখে খানিক হাসি ফোটাতে। তিনিই ছিলেন তার একমাত্র আনন্দের উৎসার। মাঝে মাঝে ভাবতেন যদি এমন কেই আসতো, যে এক নিমেষে দূর করে দেবে সবার সব দুঃখ, তবে কেমন হতো? আর পরবর্তীতে এই চিন্তারই ফসল "মেরি পপিন্স" । সে তার না পাওয়া স্বপ্ন, মনের মনিকোঠার কাউকে না দেওয়া এক সম্পত্তি। তাই তিনি কারও সাথে ভাগ করবেন না তাকে। "মেরি পপিন্স" আসলে সেই মেয়েটি যা একদিন ছোট্ট গফ হতে চেয়েছিল....পারেনি। প্রতি মূহুর্তে তার ভয়, এই বুঝি ডিজনি ছিনিয়ে নেবেন তার ছোটবেলা। মিঃ ব্যাংক্স পামেলার মগ্ন চৈতন্যে পরিণত হয় তার পিতা ট্রেভর গফে। এ সিনেমা সেই আবেগেরই প্রকাশমাত্র।


সিনেমাতে ডিজনি ও পামেলার রূপে হ্যাঙ্কস ও থমসন

অভিনয়ে হাসিখুসি ডিজনির ভূমিকায় টম হ্যাঙ্কস একেবারে Perfect choice. বায়োপিকে তিনি চিরকালই তার শ্রেষ্ঠত্বর সাক্ষী রেখেছেন। খিটখিটে পামেলার ভূমিকায় এমা থমসন এক কথায় অনবদ্য। চরিত্রের নির্যাসটুকু কি দারুন তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন রূপালী পর্দায়। তবে চমকে দিয়েছেন ট্রেভর গফের চরিত্রে কলিন ফেরেল। পামেলার মদ্যপ এই বাবাটির জন্য আমদেরও চোখ জলে ভরে ওঠে। ছোট একটি ভূমিকায় পল জিওমাটি মাত করে দিয়েছেন। মিষ্টি লেগেছে শিশু পামেলাকে। সব শেষে যখন তৈরি হয়ে যায় সিনেমাটি, তখন অদ্ভুত এক লাবণ্যে দর্শক প্রানপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডিজনির বাবা, পামেলার বাবা, ডিজনি নিজে সব মিলেমিশে পিতৃত্বের অপরূপ এক আবেশে আমাদের ভরিয়ে দেয়। ডিজনির মতো আমরাও যেন ব'লে উঠি, "George Banks and all he stands for will be saved. Maybe not in life, but in imagination. Because that's what we storytellers do. We restore order with imagination. We instill hope again and again and again"

সিনেমা শেষের বহুক্ষণ বাদেও এই অভিঘাত যাবার নয়........



photo copyright: Disney

আপনার মতামত জানান