আন শিয়েন আন্দালু : কিছু কথাবার্তা

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 


‘আন সিয়েন আন্দালু’ বা ‘আন্দালুশিয়ান ডগ’ ‘বা আন্দালুশিয়ার কুত্তা’ (১৯২৯)... লুইস বুনুয়েলের সব সিনেমার মধ্যে মোটেই আমার প্রিয় নয়। বরং সবচেয়ে কৌতুহলের। এর কারণ একটিই। এই সিনেমায় আমি অন্যান্য বুনুয়েলকে খুঁজে পাই না (‘গোল্ডেন এজ’ বাদ দিলে)। এই সিনেমা দেখার পরে যখন আমি তাঁর ‘লে চার্মে ডিস্ক্রিট ডি লা বুর্জোয়েসি’ (১৯৭২) দেখতে বসেছিলাম, আমি শুরু থেকেই ধাক্কা খেতে শুরু করেছিলাম। তারপরে যখন আবার ‘দ্যাট অবস্কিওর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ (১৯৭৭) দেখতে বসলাম, আবার শুরু থেকেই কেমন একটা প্রত্যাশাভঙ্গের আদল। এখানে বলে রাখি, প্রত্যাশাভঙ্গ অর্থে প্রত্যাশার কম নয়, প্রত্যাশার বেশিটাও তার মধ্যে পড়ে।
এটাও বলে রাখি ‘আন্দালুশিয়ার কুত্তা’ দালির প্রতি আমার প্রত্যাশা কিন্তু বিশেষ ভঙ্গ করেনি। তার কারণ হয়তো এই যে, ওই সিনেমা আমার দেখা প্রথম বুনুয়েল হলেও, তার আগে ঢের ঢের দালি আমি দেখেছিলাম, তাঁর লেখালেখি পড়েছিলাম, তাঁর জার্নাল আমি পড়েছিলাম।
কিন্তু দালি এখানে কি সেই ভূমিকাই পালন করেছেন, যেটুকু তাঁর ছিল আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ (১৯৪৫) সিনেমায়? এই সিনেমার প্রায় প্রতিটি ফ্রেমে তাঁর ছোঁয়া কিন্তু টের পাওয়াই যায়।
আবার বলি, ‘আন্দালুশিয়ার কুত্তা’ আমার প্রিয় বুনুয়েল নয়। আবার বলি, এখানে আমি আমার প্রত্যাশিত বুনুয়েলের ছাপ খুব কম পাই। বারবার মনে হয় এটা কি বুনুয়েলের চেয়ে সালভাদর দালির সিনেমাই বেশি? বুনুয়েল কি আইডিয়ার নিরিখে এখানে কিছুটা পার্শ্বভূমিকায়? এটা কি ঘটতে পারে? তবে কি বুনুয়েলের তুলনায় দালির মনের তীব্রতা এবং উচ্চাশা অনেক বেশি ছিল? অবশ্যই সালভাদর দালি বুনুয়েলের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ছিলেন। এই ক্ষেত্রে দালির ছাপ যে এই সিনেমা থেকে বুনুয়েলের ছাপের চেয়ে গভীর হয়ে পড়বে এটাই হয়তো স্বাভাবিক।
কিন্তু, তাই কি?
বুনুয়েলও কিন্তু শকটা দিতে চেয়েছিলেন। অপমান করতেই চেয়েছিলেন। প্রথম স্ক্রিনিং-এ পিকাসো, ককতোর সঙ্গে আঁদ্রে ব্রতঁ-র নেতৃত্বে পুরো সুররিয়াল গোষ্ঠীই হাজির ছিলেন। এবং প্রতিক্রিয়া ছিল পজিটিভ। এটা আবার নাকি দালিকে বেশ হতাশ করেছিল। তাঁর সন্ধ্যাটা নাকি উত্তেজনাহীন ও বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। বুনুয়েলও বলেছিলেন তিনি নাকি পকেটে ঢিল নিয়ে ঢুকেছিলেন, দর্শকদের থেকে তেমন কিছু ঘটলে পালটা দেবেন বলে। কিছুই ঘটেনি।
অবশ্যই বায়োস্কোপ পরিচালনার ধারণাকে এখানে কখনও সখনও যেন পিছু হটতে দেখি একজন চরম উৎকেন্দ্রিক চিত্রকরের সামনে। একের পর এক ফ্রেম আমাদের সামনে আসে, যেখানে সিনেমা নয়, মনে হয় চলমান ক্যানভাস দেখতে পাচ্ছি। এবং দালির পছন্দগুলো আমাদের চোখে দাগ কাটতে থাকে। এই যে দৃশ্য

এখানে মনে হয় বুনুয়েলকে সরাসরি মনে করা খুবই কঠিন হয়ে যায় যারা একবার দালিকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের পক্ষে। এই গ্র্যান্ড পিয়ানো একমাত্র সালভাদর দালির। ওই মৃত পশুও তাঁর। আর কারও হতে পারে না। বুনুয়েল এক দম্পতির শোবার ঘরে উটপাখি ঢুকিয়ে দিতে পারেন, তার বেশি নির্মম তিনি নন।
বুনুয়েলের সুররিয়াল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আসে। তা কোনো শারীরিক ঝাঁকুনি দেয় না। শুধু অভ্যাসের নিয়মটা তিনি একটু বাঁকিয়ে দেন যেন। যেমন ‘ডায়েরি অব আ চেম্বারমেড’ সিনেমায় যখন ধর্ষিতা বালিকার নগ্ন উরুতে তারই সংগ্রহ করা শামুকগুলোকে চরতে দেখা যায়, সেটা সুররিয়াল, কিন্তু উচ্চকিত নয়। দম্পতির শোবার ঘরে উটপাখি বা পোস্টম্যান যদি তিনি ঢুকিয়ে দেন ‘ফ্যান্টম অব লিবার্টি’ ছবিতে, সেটাও অদ্ভুত লাগে, শকিং লাগে না। ‘দ্যাট অবস্কিওর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’-এ পুরুষটি যখন ট্রেনের কামরা থেকে প্ল্যাটফর্মের মেয়েটির মাথায় এক বালতি জল ঢেলে দেয়, অবাক হই, চমকাই না। পেলব বিস্ময় জাগে। শক দেওয়াটা খুবই দালিসুলভ। এবং ‘আন শিয়েন আন্দালু’ আজও শকিং। বিবমিষা জাগিয়ে তোলার সীমাকে সে অনায়াসে ছুঁতে পারে, দ্বিধাই করে না। এখানেই এই বুনুয়েল আমার প্রত্যাশার সীমাটাকে ফুটো করে দেন। অবিশ্যি মহিলার বগলের চুল নিয়ে খেলাটা, এই যে ছবিতে দেখেই বিশ্রী লাগছে...


এখানে আমার বুনুয়েলকে চিনে নিতে ইচ্ছে করে দালিকে নয়। আবার যেখানে মহিলার খোলা পোঁদে হাত বোলানোর নেকড়েসুলভ সুখ ফুটে ওঠে এক পুরুষের কামানো মুখে, সেখানে চাবুকটা যেন দুজনেরই হাতে।

কিন্তু এই যে মথ, সে কি শুধুই সালভাদর দালির, নাকি বুনুয়েলের, নাকি ওঁদের কারো আলাদা করে নয়। মোটেই না। সেও বুনুয়েলের। ‘ফ্যান্টম অব লিবার্টি’-তে যে টারান্টুলার দেখা পাই, সে এই মথের আত্মীয়। আবার দালির দর্শক তাকে অনায়াসে পাবেন।

ওই চোখটিকে আড়াআড়ি চিরে দেওয়া ক্ষুর, তা বুনুয়েলের হাতে, আবার একই সঙ্গে সে দালির মালিকানাধীন। একজন ছবিকরই পারেন চাঁদের আড়াআড়ি মেঘকে চোখে কেটে দেওয়া ক্ষুর বানিয়ে দিতে। ওটা সিনেমার চেয়ে ক্যানভাসের জায়গা, আমার বিশ্বাস।

এটা ঘটনা, এই সিনেমা দালির হলেও, আসলে পুরোপুরিভাবেই লুইস বুনুয়েলের। সালভাদর দালি স্ক্রিপ্ট বাদ দিলে আর কোথাও সেই অর্থে সক্রিয় নেই। উনি নাকি শুটিং-এই আসতেন না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। এবং সেটাই... সম্ভবত প্রত্যাশিত।
এই সিনেমায় বুনুয়েল যতখানি স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেছেন, একমাত্র ‘গোল্ডেন এজ’ (১৯৩০) ছাড়া আর কোনো সিনেমায় সেটা পাননি। ‘আন্দালুশিয়ার কুত্তা’-র প্রযোজক ছিলেন বুনুয়েলের মা। কাজেই কেউ তাঁর পথে বাধা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন না। এর পরের সিনেমা ‘গোল্ডেন এজ’-এর ক্ষেত্রেও শৌখিন এক প্রযোজক তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরে শুধু ‘ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড’ (১৯৩৩) নামক শর্ট ফিল্মটি বানানোর পরে দীর্ঘ ১৪ বছর ফসলহীন কাটিয়ে তিনি একটি পূর্ণ দৈর্ঘের কাহিনিচিত্র ‘ম্যাগনিফিসেন্ট ক্যাসিনো’ (১৯৪৭) বানাতে পারেন। সেটাও বানান তিনি ফ্রান্সে নয়, মেহিকোয় গিয়ে।
স্বাধীনতার মূল্য লুইস বুনুয়েলকে দিতে হয়েছিল অসহনীয় কর্মহীনতায়। ফ্রান্স তাঁর উপর থেকে আস্থা তুলে নিয়েছিল প্রথম দুটি ছবির পরেই। এক দেশ থেকে আরেক দেশে তখন তাঁকে ছুটতে হয়েছে সিনেমা বানানোর সুযোগের খোঁজে। এমনকি, চাকরি করতে হয়েছে। স্রেফ একজন চাকর, বুনুয়েল সিনেমার। তারপরে সুযোগ যখন পেলেন, বেশ কিছু বায়োস্কোপ তিনি বানিয়েছিলেন যেগুলোর জন্য তিনি হয়তো শেষ অবধি খুব গর্বিত ছিলেন না। কিন্তু সেগুলো না বানালে তিনি তাঁর আসল কাজগুলো অবধি যাওয়ার সুযোগটাই পেতেন না।
এবং এই সুযোগের ব্যাপারটা... একজন শিল্পীকে মাথায় রাখতেই হয়।
কেন?
প্রশ্নটা, ধরে নেওয়া যাক, উত্তর দিক থেকে আসছে। কোনো প্রযোজক তো এই ‘কেন’-টা বলবেন না।

আপনার মতামত জানান