‘হাইওয়ে’

সরোজ দরবার

 


হাইওয়ে ধরে লং ড্রাইভে যেতে যেতে মাঝে মধ্যেই আমরা ব্রেক নিই। ধাবায় বসে চা-সিঙাড়া খেয়ে নিই। হালকা হয়েও নিই। কিন্তু যদি হাইওয়ের নাম হয় দাম্পত্য, তাহলে কী করবেন? অঙ্ক মাঝখানে পৌঁছে না মিললে শিক্ষক মহাশয়রা বলেন গোড়া থেকে শুরু করতে। কিন্তু সম্পর্কের অঙ্কে বোধহয় কেঁচে গণ্ডূষ করতে গেলে আদতে ভুলই হয়ে যায়। ঠিক সেই ভুলটাই করে বসল সোহিনী আর অশ্বিন। তারা কারা? তাহলে একটু গুছিয়ে বলা যাক।

হাইওয়ের টার্নিং পয়েন্ট
সোহিনী প্রবাসী বাঙালি কন্যে। আর অশ্বিন কলকাতাবাসী পাঞ্জাবি।নাহ, টু স্টেটসের ছায়া দেখবেন না, যদিও বিয়েটা তাদের হল। বলা ভাল, ফ্লার্টবাজ অশ্বিন, ন্যাশনাল লেভেলের পারফরমেন্স করে সোহিনীকে জিতে নিল। দেখতে দেখতে বছর চারেক গড়িয়ে গেল। অর্থাৎ বালিশ ছেঁড়া পালক উড়ানো খুনসুটি আর গায়ে জল ঢেলে ঘুম ভাঙানোর রোম্যান্টিকতার রঙ ফিকে হয়ে বুকের বাঁ পাশের লাল তিলখানাও অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। এবার? টার্ণিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যে সতর্কতা নেওয়া উচিত ছিল সেটা না নিয়ে ঐ কেঁচে গন্ডূষের ভুলখানাই করে বসল সোহিনী-অস্বিন। অস্বিনের জোরেই দুজনেই নামল একটা রিস্কি গেমে। আর সেটাই এই ‘হাইওয়ে’র টার্ণিং পয়েন্ট।

বসত করে কয়জনা
খেলতে খেলতে সোহিনী আবিষ্কার করতে থাকে অশ্বিনের কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ। যে মুহূর্তে মুখ খুঁজে পেয়ে সে গেম ওভার করতে যায়, সে মুহূর্তেই মুখোশ এসে তাকে আটকে দেয়। সত্যিই কি একটা মুখ আর একটা মুখোশ? নাকি দুটোই মুখ? একজনের ভিতর বসত করে কয়জনা? বছর কয়েকের সংসারে সেই সবজনাকেই কি চেনা যায়? বরং সবগুলোকে এক করে চেনার দোষেই গন্ডগোল হয়। সোহিনী, অশ্বিনের সেই এক একজনের ভিতর থাকা আর এক এক জনকেই চিনতে থাকে। অনেক দিনের চেনা সঙ্গে নতুন চেনায় ঠোকাঠুকি লাগে বলেই, সম্পর্কের পাত্র তলানিতে এসে ঠেকে। ‘A person isn’t who they are during the last conversation you had with them-they’re who they’ve been throughout your whole relationship.’- রিলকের এ কথা মাথায় থাকলে হয়ত সোহিনী-অশ্বিনের কোন সমস্যাই বাঁধত না। অবশ্য মাথায় না থেকেও, দিব্যি ৫০ বছর বিবাহিত জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন পুলক চাটুজ্যে আর হেম। জীবনের দুই অক্ষে পরিচালক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় একই সম্পর্কের দুই ভিন্ন স্থানাঙ্ক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। দুয়ে মিলে সরলরেখা টানা হয় কি না হয়, সেটাই ছিল দেখার।

রেখা সরল, কিন্তু জীবন ??
পরিচালক অবশ্য সন্তানের স্কেল ফেলে সরলরেখা টানার পথটাই বেছে নিলেন। আর সেখানেই হাইওয়েতে যেন ছোটখাট নুড়ি পাথরের হোঁচট দেখা দিতে শুরু করল। আত্মসম্মান আঘাত কি চোখের জলের পানসি ভাসিয়ে সমঝোতার পথে হাঁটা দেয়, বিশেষত যখন সিঙ্গল মাদার আর বিরল কোনও ঘটনা নয়। সম্পর্কের রসায়ন আর প্রেমের গভীরতা যদি ৫০ বছর ঘর করা এক দম্পতির থেকে কেউ বুঝে উঠতেই পারে, তাহলে তো আত্মসম্মানে আঘাতের ক্ষত এত সহজে ভোলার নয়? অথবা যদি এটাই হয় যে, সবরকম ঠোকাঠুকি মেনে নিয়েই বোঝাপড়ার পথ ধরে এগিয়ে চলে সংসারের এক্কা। তবু তার জন্যে সন্তানের স্কেল বাধ্যতামূলকভাবে জরুরি হয়ে পড়লে, সম্পর্কের গোড়াতেই যেন নাড়া পড়ে যায়। সম্পর্ক নাকি একটা গাছের মতো, যাতে জল দিতে হয়, ভালোবাসতে হয়, কিন্তু এতো খানিকটা সার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো। এই সূচকের উপর ভর করে, সমাজে বহু সম্পর্ক টিকে ছিল বা আছ বৈকি, কিন্তু এতদিনেও কি তা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়নি? কেন একটা সম্পর্ক আজও ব্লে উঠতে পারবে না, ‘ I do not love you except because I love you.’ কেন কোনও কারণ ছাড়াই এই বিশ্বাসে দাঁড়াতে পারবে না যে ‘ I love you only because it’s you the one I love.’

কোয়েল-পরম প্রাপ্তিযোগ
পরিচালকের দরবারে কিছু প্রশ্ন থেকে গেলেও, কোয়েল পরম প্রাপ্তিযোগটা কিন্তু বেশ। চমৎকার রসায়ন। বিশেষত কোয়েল মল্লিককে তো বেশ অন্যরকমভাবেই পাওয়া গেল। হেমলক সোসাইটিতে যে কোয়েল খানিকটা বেমানান ছিলেন, হাইওয়েতে তিনি অত্যন্ত সাবলীল। পরম যথাযথ। অনুপমের গান আর ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের নেপথ্য সংগীতও ভালো। তবে মেকআপে কোয়েলের চোখের কোণে যত রিঙ্কল চোখে পড়ল, সিনেমাটোগ্রাফিতে দার্জিলিংয়ের ছিঁটেফোঁটাও তো তেমন চোখে পড়ল না। বেশ কয়েকটি চরিত্রও ছবিতে এসেছে, যাদেরকে না নিয়ে গল্প জমাট বাঁধলে ছবির অনেকখানি অংশ টেলিফিল্মসুলভ হয়ে পড়ত না।

দেখবেন তো?
হাইওয়ে কোথাও একটা পৌঁছতে চেয়েছিল। অভিমুখ আছে, তবে উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। সম্পর্কে পৌঁছতে চেয়ে হয়তো নিছকই দাম্পত্যের ডিপোয় গিয়ে ঠেকেছে । কিন্তু পথে যেতে যেতে যে অভিজ্ঞতা হয়, সেটা উপলব্ধির জন্য একবার ঘুরে আসতেই পারেন হাইওয়ে থেকে।
বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ ‘শাদি কে সাইড এফেক্টস’ যদি দেখে থাকেন তাহলে বাড়তি কিছু পাওনা করবেন না। বাড়তি পাওনা হতাশার কারণ হতে পারে।

.......................................................... ছবি- হাইওয়ে
পরিচালক- সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
অভিনয়- পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক, দীপঙ্কর দে, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, শিলাজিৎ, রীতা দত্ত চক্রবর্তী, গৌরব চক্রবর্তী প্রমুখ
সংগীত- অনুপম রায়


আপনার মতামত জানান